বিনীত শর্মা, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব, বৃষ্টির ঘাটতি এবং দেশের কয়েকটি অঞ্চলে জলসংকটের আশঙ্কার মধ্যেই ২০২৬-২৭ ফসল বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনের (India Foodgrain Production 2026-27) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করল কেন্দ্র। চলতি ফসল বছরে দেশের মোট খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে ৩৭৩.৯৩ মিলিয়ন টন। ২০২৫-২৬ সালে তৃতীয় অগ্রিম হিসাব অনুযায়ী খাদ্যশস্য উৎপাদন ৩৭৬.৫৬ মিলিয়ন টন হতে পারে বলে কৃষি মন্ত্রক জানিয়েছিল। অর্থাৎ গত বছরের হিসাবের তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২.৬৩ মিলিয়ন টন কম। সার্বিক লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলেও রবি মরশুমের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা আলাদা। ২০২৬-২৭ সালে রবি খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্য ১৭৭.৭২ মিলিয়ন টন রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে রবি মরশুমে উৎপাদনের হিসাব ছিল ১৭৪.৫১ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ গত বছরের প্রকৃত উৎপাদনের তুলনায় এবার রবি ফসলের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩.২১ মিলিয়ন টন বাড়ানো হয়েছে। দিল্লিতে আয়োজিত জাতীয় কৃষি সম্মেলন, রবি অভিযান ২০২৬-এ কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান (Shivraj Singh Chouhan) এই লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান।
ফসল বছর বলতে জুলাই থেকে পরের বছরের জুন পর্যন্ত সময়কে ধরা হয়। ফলে ২০২৬-২৭ ফসল বছরের উৎপাদনের ক্ষেত্রে আগামী খরিফ ও রবি এই দুই মরশুমের ফলনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই মুহূর্তে বর্ষার পরিস্থিতি, মাটিতে আর্দ্রতা, জলাধারে জলের পরিমাণ ও বিভিন্ন রাজ্যে চাষের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে কেন্দ্র। কৃষি মন্ত্রকের সাম্প্রতিক বৈঠকগুলিতেও এল নিনো, বৃষ্টির ঘাটতি এবং জলসম্পদের অবস্থান নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ ফসল বছর ভারতের কৃষির জন্য রেকর্ড উৎপাদনের বছর হতে চলেছে। কেন্দ্রের তৃতীয় অগ্রিম হিসাব অনুযায়ী ওই বছরে দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদন ৩৭৬.৫৬ মিলিয়ন টনে পৌঁছতে পারে। এর মধ্যে ধান, গম এবং ভুট্টার উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য ফলনের হিসাব দেওয়া হয়েছে। এর আগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬২.৬০ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় প্রকৃত উৎপাদনের হিসাব অনেকটাই বেশি ছিল। এবার সেই রেকর্ডের তুলনায় সামান্য কম লক্ষ্য নির্ধারণের পিছনে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রক এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের পাশাপাশি বৃষ্টির ঘাটতি থাকা অঞ্চলগুলির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। জুলাই মাস থেকেই কৃষি মন্ত্রকের বৈঠকে এল নিনো ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে জেলা ও রাজ্যভিত্তিক প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছিল।
রবি মরশুমের ক্ষেত্রে অবশ্য উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র। গম এই মরশুমের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য। ফলে গমের পাশাপাশি ডাল, তৈলবীজ এবং অন্যান্য রবি ফসলের উৎপাদন বাড়ানোও কৃষি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতীয় কৃষি সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলিকে রবি চাষের প্রস্তুতি, বীজ, সার, জল এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। খরিফ মরশুমে অবশ্য পরিস্থিতি তুলনামূলক জটিল। ২০২৬-২৭ সালে খরিফ খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ১৯৬.২১ মিলিয়ন টন। গত ফসল বছরে খরিফ খাদ্যশস্যের প্রকৃত উৎপাদন ছিল ১৭৪.১৪ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ গত বছরের উৎপাদনের তুলনায় এবার খরিফের লক্ষ্য যথেষ্ট বেশি। কিন্তু কোথায় কতটা জল রয়েছে, মাটিতে আর্দ্রতা কেমন এবং কোন ফসলের চাষে কতটা জলের প্রয়োজন, এই বিষয়গুলির উপর চাষের ধরন নির্ভর করতে পারে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের চাষের জমি কমে যাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। ধান, ভুট্টা, সয়াবিন এবং তুলার মতো ফসলের ক্ষেত্রে কিছু এলাকায় চাষের জমি কমেছে। অন্য দিকে উরদ, মুগ, তুর, বাজরা, জোয়ার, তিল ও সূর্যমুখীর মতো ফসলের আওতায় জমি বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গিয়েছে। কম জলের অঞ্চলে ফসলের ধরন বদলের যে পরিকল্পনা কেন্দ্র করছে, তার সঙ্গে এই প্রবণতার যোগ রয়েছে।
কেন্দ্রের পরিকল্পনায় জলনির্ভর ফসলের পরিবর্তে তুলনামূলক কম জল প্রয়োজন এমন ফসলের দিকে কৃষকদের নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। যেসব এলাকায় মাটিতে আর্দ্রতা কম কিংবা জলাধারে জলের পরিমাণ কম, সেখানে ডাল, তৈলবীজ এবং মোটা দানাশস্যের চাষ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রকের সাম্প্রতিক আলোচনায়ও জলভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা আর ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টির ঘাটতি নিয়েও নজরদারি চালাচ্ছে কেন্দ্র। কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক বৃষ্টিপাতের ঘাটতি প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি। তবে বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলের পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি তুলনামূলক বেশি, আবার কোথাও স্বাভাবিকের কাছাকাছি বৃষ্টি হয়েছে। ফলে জাতীয় গড়ের পাশাপাশি রাজ্য এবং জেলা ধরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই কৃষি পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা এবং রাজস্থানের কয়েকটি অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়েও নজর রয়েছে। কম বৃষ্টি বা জলসংকটের কারণে কোথাও চাষের ধরন বদলাতে হতে পারে। পরিস্থিতি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ চলছে। কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের তরফে কেন্দ্রীয় মূল্যায়ন দলের সাহায্য চাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এই ধরনের পরিদর্শনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রের কৃষি পরিকল্পনায় শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, কৃষিপণ্যের বাজার নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগ সম্পর্কে জানাতে দেশজুড়ে প্রচার চালানোর কথা জানিয়েছেন শিবরাজ সিং চৌহান। ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা FTA -এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের বাজারে ভারতীয় কৃষিপণ্যের জন্য তৈরি হওয়া সুযোগ কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। কৃষকদের কোন পণ্যের জন্য কোন বাজারে সুযোগ রয়েছে, সেই তথ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় এবং ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল নতুন দিল্লিতে দুই দেশের মন্ত্রীরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বাণিজ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তিতে নিউজিল্যান্ডের বাজারে ভারতীয় রপ্তানির জন্য বিস্তৃত শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সংবেদনশীল কৃষিপণ্যকে শুল্কছাড়ের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে এক দিকে আবহাওয়ার ঝুঁকি সামলে খাদ্যশস্য উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা, অন্য দিকে কৃষিপণ্যের নতুন বাজার খোঁজা, দু’ দিকেই পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র। ২০২৬-২৭ সালের খাদ্যশস্য উৎপাদনের সামগ্রিক লক্ষ্য ৩৭৩.৯৩ মিলিয়ন টন হলেও রবি মরশুমে ১৭৭.৭২ মিলিয়ন টনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। কিন্তু আগামী কয়েক মাসে বর্ষার অবশিষ্ট পরিস্থিতি, জলাধারে জলের পরিমাণ, মাটির আর্দ্রতা এবং শীতের সময় আবহাওয়ার ধরন খাদ্যশস্য উৎপাদনের চূড়ান্ত ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। তাই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা কতটা পূরণ হয়, তা নির্ভর করবে শুধু কৃষকের চাষের উপর নয়, আবহাওয়া ও জলসম্পদের পরিস্থিতির উপরও। কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়, ফসলের ধরন বদল ও রবি মরশুমের প্রস্তুতির মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি সামলে উৎপাদন ধরে রাখাই এখন কৃষি ব্যবস্থার সামনে বড় লক্ষ্য।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Shivraj Singh Chouhan on Agriculture University Jobs, ICAR Agriculture Education : কৃষি পড়েও চাকরি অভাব! কর্মসংস্থানের হিসাব রাখবে বিশ্ববিদ্যালয়, বড় নির্দেশ শিবরাজের




