সূর্য মিত্র ✪ সাশ্রয় নিউজ : দুই বা ততোধিক ভাষা জানা মানে শুধুই আলাদা ভাষায় কথা বলা নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মস্তিষ্কের নানা জটিল কাজের দক্ষতা। বহু বছর ধরেই গবেষকরা বলে আসছেন, দ্বিভাষিকতা (Bilingualism) মানুষের এক্সিকিউটিভ ফাংশন (Executive Function) বাড়ায়, যার মধ্যে পড়ে মনোযোগ ধরে রাখা, জটিল পরিকল্পনা করা এবং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে পূর্বধারণা পরিবর্তনের ক্ষমতা। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা সেই প্রচলিত ধারণায় চিড় ধরাচ্ছে। কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের (York University) সাইকোলজিস্ট এলেন বিয়ালিস্টক (Ellen Bialystok) বলছেন, ‘দ্বিভাষিক মানুষেরা একসঙ্গে দুই ভাষার মধ্যে নিয়মিত পরিবর্তন করতে করতে এমন এক মানসিক দক্ষতা তৈরি করে, যা জীবনের নানা ক্ষেত্রেই কাজে লাগে।’ তার মতে, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় যাওয়া একধরনের মস্তিষ্কের ব্যায়াম, যা আমাদের কগনিটিভ রিজার্ভ (Cognitive Reserve) তৈরি করে। কগনিটিভ রিজার্ভ হল মস্তিষ্কের সেই সক্ষমতা, যা বয়স বাড়লেও নানা নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এ কারণে বহু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, দ্বিভাষিকদের মধ্যে ডিমেনশিয়া (Dementia) বা স্মৃতিভ্রংশের প্রাদুর্ভাব একক ভাষা-ভাষীদের তুলনায় গড়ে চার বছর পরে দেখা যায়। ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর (University of Toronto) এক গবেষণায় এমনই তথ্য উঠে আসে, সেখানে দেখা যায়, দুই বা একাধিক ভাষায় সাবলীল বৃদ্ধরা অনেক বেশি দিন মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন। কিন্তু সমস্ত গবেষণা যে একই ফল দিচ্ছে, তা নয়। সম্প্রতি ক’য়েকটি বড় রিসার্চ সেই ফলাফল পুনরায় প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। মনোবিজ্ঞানী আন্নে মেহতার (Anne Mehta) মতে, ‘দ্বিভাষিকতার উপকারিতা থাকলেও, সেটা ঠিক কতখানি ও কোনও কোনও ক্ষেত্রে, তা নিয়ে এখনও আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।’ অনেক বিজ্ঞানীর মতে, এর ফলাফল ভিন্ন হতে পারে— ব্যক্তির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত প্রেক্ষাপটের ওপরও। অর্থাৎ একজন স্প্যানিশ-ইংলিশ দ্বিভাষিক ও একজন হিন্দি-বাংলা দ্বিভাষিকের ক্ষেত্রে প্রভাব একরকম নাও হতে পারে।

অন্যদিকে, সান দিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটির (San Diego State University) লিংগুইস্টিকস অধ্যাপক এরিকা লুইস (Erika Lewis) বলছেন, ‘একটা কথা নিশ্চিত যে দুই বা ততোধিক ভাষা শেখা কখনওই ক্ষতিকর নয়। মস্তিষ্ককে নতুনভাবে ব্যবহার করার ফলে জীবনের নানা স্তরে সুবিধা হয়, এমনকী তা কর্মজীবনেও প্রতিফলিত হয়।’ তবে সমালোচকরাও রয়েছেন। কিছু বিজ্ঞানীর মতে, দ্বিভাষিকতা ও ডিমেনশিয়ার দেরিতে শুরু হওয়ার মধ্যে সরাসরি কারণ-ফলাফলের সম্পর্ক এখনও প্রমাণিত হয়নি। হয়ত অন্য কোনও সামাজিক বা পারিবারিক ফ্যাক্টরও এর পিছনে থাকতে পারে। যেমন, যে সব মানুষ একাধিক ভাষা জানেন, তাদের সামাজিক মেলামেশা, শিক্ষাগত মান ও জীবনের অন্যান্য সুবিধা বেশি থাকে, যা আলাদাভাবে তাদের মস্তিষ্ককে সচল রাখতে সাহায্য করে। এই বিতর্কের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট, বিশ্বায়নের যুগে একাধিক ভাষা জানা পেশাগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সবসময়ই ইতিবাচক। তাছাড়া নতুন ভাষা শেখা মানে নতুন সংস্কৃতি জানা, নতুন মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। নিউরোসায়েন্স এক্ষেত্রে যতই বিভক্ত হোক না কেন, জীবনযাপনে দ্বিভাষিকতার সুবিধা অস্বীকার করার উপায় নেই। মস্তিষ্কের ওপর এই প্রভাব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বিজ্ঞানীদের আরও গভীর, দীর্ঘমেয়াদি এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উপর ভিত্তি করে গবেষণা করতে হবে। তবে একাধিক ভাষায় দক্ষতা যে মানুষের চিন্তাভাবনায় প্রসার আনে, তা মানছেন প্রায় সকলেই।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Sasraya News Sunday’s Literature Special | Issue 71, 29th June 2025 | Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ২৯ জুন ২০২৫, সংখ্যা ৭১| রবিবার




