সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, ঠাকুরনগর ★ উত্তর ২৪ পরগণা, ১ অক্টোবর ২০২৬: নাগরিকত্বের আবেদন ঘিরে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে৷ এমনই আশ্বাস দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর ঘোষণা, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ (Citizenship Amendment Act) সংক্রান্ত শুনানির প্রক্রিয়া শেষ করে আবেদনকারীদের হাতে শংসাপত্র তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। মতুয়া সমাজের উদ্দেশে এই আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকত্বের প্রশ্নে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) নিশানা করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সিএএ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে ভুল ধারণা দেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, তার জন্য বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানকেই দায়ী করেছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী।

মতুয়া সমাজের নাগরিকত্বের দাবি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষত সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে বসবাসকারী বহু পরিবারের কাছে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি কেবল প্রশাসনিক নথি পাওয়ার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিচয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। সেই আবহে শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণা রাজনৈতিক ও সামাজিক, দুই ক্ষেত্রেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিএএ-র আওতায় যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের শুনানি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এরপর যোগ্য আবেদনকারীদের শংসাপত্র দেওয়ার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। সভায় বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, ধর্মীয় কারণে নিজেদের দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যই সিএএ কার্যকর করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এই আইনের বিরোধিতা করে তৎকালীন রাজ্য সরকার সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি করেছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করে শুভেন্দু বলেন, ‘ধর্ম বাঁচানোর জন্য যাঁরা ভারতবর্ষের আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু একজন এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। মানুষের সঙ্গে অন্যায় করার ফল তাঁকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই ভোগ করতে হয়েছে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যে নাগরিকত্বের প্রশ্নের পাশাপাশি রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, মতুয়া অধ্যুষিত একাধিক বিধানসভা এলাকায় তাঁর দলের প্রতি মানুষের সমর্থন রয়েছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এই সরকার আপনাদের সরকার। মতুয়া সমাজের মানুষের সমর্থন নিয়ে ৭০টি বিধানসভা কেন্দ্রে আমরা নির্বাচিত হয়েছি। তাই নাগরিকত্ব নিয়ে কারও আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।’ তাঁর বক্তব্য, রাজ্য সরকার মতুয়া সমাজের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ও সিএএ-র বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।
সিএএ সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়েও বক্তব্য রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, শিলিগুড়িতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের (Amit Shah) সঙ্গে একাধিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাবি, গুজরাত ও রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলিতে সিএএ কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশাসনিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে পূর্ববর্তী সরকারের বিরোধিতার কারণে নাগরিকত্বের আবেদন ও শংসাপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। যদিও এই বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা ও আবেদনকারীদের যোগ্যতার শর্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় ৩১ ডিসেম্বর তারিখটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ওই সময়সীমার মধ্যে সিএএ-র আবেদনকারীদের শুনানি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে নাগরিকত্বের শংসাপত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজ করা হবে। তবে কতজন আবেদনকারীর শুনানি বাকি রয়েছে, কোন কোন জেলায় কতগুলি আবেদন জমা পড়েছে কিংবা শংসাপত্র দেওয়ার কাজ কোন পর্যায়ে আছে,সে বিষয়ে সভায় বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়নি। ফলে ঘোষিত সময়সীমা বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নথি যাচাই এবং আবেদনকারীদের শুনানির অগ্রগতির উপর।
সিএএ শংসাপত্র পাওয়ার পর ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় এনেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) কাছে আবেদন জানানো হবে। জানুয়ারি মাসে এই বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, সিএএ-র শংসাপত্র পাওয়ার পর নাগরিকত্বের স্বীকৃতির পাশাপাশি ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিতে চাইছে রাজ্য সরকার, এমনটাই তাঁর বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু, নাগরিকত্বের শংসাপত্র পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় নাম উঠে যাবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে দেওয়া হয়নি। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম, আবেদনপত্র, প্রয়োজনীয় নথি এবং যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তাই সিএএ-র শংসাপত্র ও ভোটার তালিকায় নাম তোলার বিষয় দু’টি আলাদা প্রশাসনিক ধাপ হিসেবেই বিবেচিত হবে। এই পার্থক্যটি আবেদনকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আবেদন করতে হতে পারে।
শুধু নাগরিকত্ব নয়, মতুয়া সমাজের পরিবারগুলির সরকারি পরিষেবা পাওয়ার বিষয়টিও সামনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সিএএ শংসাপত্র পাওয়ার পর যাতে কোনও যোগ্য পরিবার সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বাদ না পড়ে, তার জন্য আলাদা করে তালিকা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে মহিলাদের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধা ও পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যবিমা সংক্রান্ত পরিষেবা পাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন তিনি। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি মহিলাদের জন্য অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সুবিধা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা এবং আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat) কার্ডের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর নির্দেশ, মতুয়া সমাজের যেসব পরিবার এই প্রকল্পগুলির আওতায় আসার যোগ্য, তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে প্রশাসনের কাছে জমা দিতে হবে। কোনও পরিবার যাতে নথিপত্রের অভাব বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সরকারি পরিষেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখার কথাও বলেছেন তিনি। এই কাজের সমন্বয়ের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে একজন আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নাগরিকত্বের শংসাপত্র পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি করা হবে। সেই তালিকা ধরে প্রশাসনিক স্তরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। তবে কোন প্রকল্পে কারা যোগ্য হবেন, কী কী নথি জমা দিতে হবে ও সুবিধা পাওয়ার জন্য কী ধরনের আবেদন করতে হবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নিয়মের উপর নির্ভর করবে। ফলে শুধু শংসাপত্র হাতে পেলেই সব সরকারি সুবিধা মিলবে, এমন ধারণা না করে প্রত্যেক আবেদনকারীকে প্রকল্পভিত্তিক যোগ্যতার শর্ত সম্পর্কে খোঁজ রাখতে হবে। উল্লেখ্য যে, মতুয়া সমাজের কাছে সিএএ দীর্ঘদিনের আলোচনার বিষয়। নাগরিকত্বের দাবিকে কেন্দ্র করে বহু পরিবার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শুনানি শেষ করার ঘোষণা তাঁদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ভোটার তালিকায় নাম তোলা আর সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার আশ্বাসও আলোচনায় এসেছে। তবে ঘোষণার বাস্তবায়ন কত দ্রুত হবে, কতজন আবেদনকারী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শংসাপত্র পাবেন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ধাপগুলি কীভাবে সম্পন্ন হবে, তার উপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সাফল্য।
আরও পড়ুন : মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘোষণার গুরুত্ব রয়েছে। সিএএ-কে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেস (All India Trinamool Congress) ও বিজেপির (Bharatiya Janata Party) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ আছে। মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক পশ্চিমবঙ্গের একাধিক নির্বাচনী এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়ার সময়সীমা ঘোষণা ও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাসকে রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত আবেদনকারীদের কাছে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল, তাঁদের নথি যাচাই, শুনানি ও শংসাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছন্দে সম্পন্ন হয়। শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণায় আপাতত ৩১ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নাগরিকত্বের আবেদনকারীদের অপেক্ষা আরও নির্দিষ্ট সময়সীমা পেয়েছে। জানুয়ারিতে ভোটার তালিকায় নাম তোলার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনাও জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার, মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা এবং আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক নজরদারির আশ্বাস দিয়েছেন। এখন নজর থাকবে, ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে শুনানি শেষ করে কতজনের হাতে সিএএ শংসাপত্র তুলে দেওয়া সম্ভব হয় এবং পরবর্তী পরিষেবাগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Matua Announcement | ঠাকুরনগরে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর, মতুয়া উন্নয়নে ৫০ কোটি ও পৃথক পুরসভার প্রতিশ্রুতি



