Sasraya News Sunday’s Literature Special | 1st November 2026, Issue 133, Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল। ১ নভেম্বর ২০২৬, সংখ্যা ১৩৩। রবিবার

SHARE:

সম্পাদকীয়

যাঁরা নীরবে, নিভৃতে বছরের পর বছর সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন, তাঁদের সামনে নিয়ে আসা হোক। তাঁদের মূল স্রোতে যুক্ত করা হোক। আর একটা কথা না বললেই নয়। আমাদের বর্ষীয়ান কবি-সাহিত্যিকরা যখন চলে যান, তখন রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে যে সম্মানটুকু তাঁদের প্রাপ্য, তা আমরা দিতে পারি না। এই অবহেলা বন্ধ হওয়া দরকার। তাঁদের সম্মান দিলে, আসলে বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাহিত্যই সম্মানিত হয়।

আস্থার প্রদীপটি নিভতে দেবেন না

কোনও একটি অদৃশ্য আলোড়ন এখন চারিদিকে। পরিবর্তন এসেছে? সময় বদলেছে? এটা সত্য। কিন্তু পরিবর্তনের নামে যদি অযোগ্যতা প্রশ্রয় পায়, তবে সেই পরিবর্তন অর্থহীন হয়ে যায়। আমরা দেখছি, সাহিত্যের আঙিনায় এমন কিছু মুখ ভিড় করছে, যাদের সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার চেয়ে সুবিধাবাদই বড়। তাদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে। তাদের জন্য কঠোর পর্যালোচনার প্রয়োজন। যদি সত্যিই মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়, তবে যাঁরা সুযোগের জন্য ঝোলা পাতে, তাদের দূরে রাখতেই হবে। দলের ভিতরে যদি এই প্রবণতা ঢুকে পড়ে, তবে ভাঙন অনিবার্য।

এই কথাগুলো সাহিত্যের পাতায় লিখছি বলে অনেকেরই হয়ত গায়ে লাগবে। লাগুক। সত্যিটা হল, আগের আমলে একটা বড় অংশের প্রকৃত কবি-সাহিত্যিক কোণঠাঁসা হয়ে ছিলেন। আবার উল্টোদিকে, একেবারে আনকোরা কিছু তরুণকে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে, লোভ দেখিয়ে মঞ্চ আলো করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এই দৃশ্য চোখে লাগার মতো, এবং এই নিয়েই বিতর্কের সূত্রপাত। বিশেষ করে ‘কবিতা আকাদেমি’র মতো একটি প্রতিষ্ঠান আর সাহিত্য প্রতিষ্ঠান নেই, এটি কার্যত একটি রাজনৈতিক পুরস্কারের পদে পরিণত হয়েছে। তাই আমাদের স্পষ্ট মত, এই পদে দলীয় আনুগত্য নয়। সাহিত্যের প্রতি নিষ্ঠা দেখে বিচার হোক। সেইসব সুবিধালোভি পদাধিকারীকে সরিয়ে এমন কাউকে নিয়ে আসা হোক, যাঁরা সত্যিই সংস্কৃতি-মনস্ক ও নিরপেক্ষভাবে সাহিত্যের সেবা করবেন।

বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই ইশারায় এই কথাই বলছেন। আমাদের দাবি সহজ, যাঁরা নীরবে, নিভৃতে বছরের পর বছর সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন, তাঁদের সামনে নিয়ে আসা হোক। তাঁদের মূল স্রোতে যুক্ত করা হোক। আর একটা কথা না বললেই নয়। আমাদের বর্ষীয়ান কবি-সাহিত্যিকরা যখন চলে যান, তখন রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে যে সম্মানটুকু তাঁদের প্রাপ্য, তা আমরা দিতে পারি না। এই অবহেলা বন্ধ হওয়া দরকার। তাঁদের সম্মান দিলে, আসলে বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাহিত্যই সম্মানিত হয়।

এই পথ খুঁজে না পেলে, সেই সহজ পথের সন্ধান দেবে সাশ্রয় নিউজ।🍁

 

 

🍁মহামিলনের কথা

 

দম্ভ কিম্বা অতিভক্তি সহকারে, নিষ্কাম অথবা সকাম যে কোনভাবে রামনাম গীত হলে নিখিল পাপ ভস্মীভূত হয়ে যায়। অগ্নিতে তুলারাশি নিষ্কাম অথবা সকাম যে কোনভাবে নিক্ষেপ করলে যেমন তৎক্ষণাৎ দগ্ধ হয়ে যায়, পাপও সেইরূপ জানবে।
শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব। ছবি: সংগৃহীত

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ

পঙ্গুর গিরিলঙ্ঘনের মত আমাদের ন্যায় সংসার-লুব্ধের সাক্ষাৎ দর্শন লাভের ইচ্ছা করাটা কি উন্মত্ততা নয়?
না— না— না— উন্মত্ততা কেন হবে? পতিতপাবন,অধমতারণ তাঁর নাম। কাজে কাজেই পতিতের তো তাঁর উপর খুব দাবী রয়েছে। তাঁর অহৈতুকী কৃপা পঙ্গুকে গিরিলঙ্ঘন ও মুককে বাচাল করে একথা তো চিরপ্রসিদ্ধ।
মূলেই ভূয়োকড়ি— ভক্তি নেই যে! নাম করি লোক দেখিয়ে নাম কেনবার জন্য, লোকে সাধু বলবে, সম্মান করবে— এ কামনা তো ভেতরে ভেতরে খেলা করে।
হোক না, তাতেই ক্ষতি কি!
দম্ভ কিম্বা অতিভক্তি সহকারে, নিষ্কাম অথবা সকাম যে কোনভাবে রামনাম গীত হলে নিখিল পাপ ভস্মীভূত হয়ে যায়। অগ্নিতে তুলারাশি নিষ্কাম অথবা সকাম যে কোনভাবে নিক্ষেপ করলে যেমন তৎক্ষণাৎ দগ্ধ হয়ে যায়, পাপও সেইরূপ জানবে।
পাপ যে নষ্ট হয় সেই পাপী অথবা অপর লোকে বুঝতে পারে?
হাঁ হাঁ সকলেই বুঝতে পারে।
কোন্ প্রমাণে বুঝা যায়?
পাপ নষ্ট হলেই তার প্রকৃতি সত্ত্বগুণময়ী হয়ে যায়। জপ, পূজা, পাঠ, সদগ্রন্থ নিয়ে সে থাকবে; চোখ-মুখ তার নিষ্পাপের পরিচয় দেবে। কিছুদিনের আগের কথা বলছি। একটি লোক জাতিতে উগ্রক্ষত্রিয়। বর্ধমান জেলায় বাড়ী। হুগুলী জেলায় মাতুলের সম্পত্তি পায়। একে যৌবন তাতে ধন-সম্পত্তি, মদ ও বেশ্যা তাকে অধিকার করলে। বেচারা মদ ও বেশ্যার নেশায় বিভোর হয়ে জাতি-জ্ঞাতি, ধর্ম-কর্ম, মান-সম্ভ্রম সব ভাসিয়ে দিয়ে, তাতেই মশগুল হয়ে দিনের পর দিন কাটাতে লাগলো। শুধু স্ফূর্তি আর স্ফূর্তি।
হঠাৎ কি জানি কি প্রকারে তার চাকাখানা ঘুরে গেল। তার বাবু বেশ, মদ, বেশ্যা সূর্য্যোদয়ে অন্ধকারের ন্যায় কোথায় অন্তর্হিত হল তার আর কেউ সন্ধান করতে পারল না। দ্বাদশাঙ্গে তিলক, গলায় তুলসীমালা, হাতে হরিনামের ঝুলি— সেই বদ্ধ মাতাল বেশ্যাসক্ত জপ আরম্ভ করলে। দিন নেই, রাত নেই—
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥
অষ্টপ্রহর, চব্বিশ প্রহর, বাড়ীতে নাম চলতে লাগলো। লোকজন খাওয়ান, সাধুসেবা এই নিয়ে পাপমুক্ত পুরুষ, জীবনের শেষ কটাদিন কাটিয়ে দিয়ে নাম করতে করতে নিত্যলোকে গমন করলেন। গল্প কথা নয়, তাকে জানেন এমন লোক এখনও জীবিত আছেন।
আধার ভেদে কার্য্যের ভেদ হয়?
অবশ্যই হয়। একটি প্রদীপকে কাচের লণ্ঠনের ভিতর রাখো— সে চারদিক আলোকিত করবে, আবার সেই প্রদীপ মাটির কলসীর ভিতর রাখলে প্রদীপেরই অস্তিত্ব জানা যাবে না।
তাহলে নামের অলৌকিকী শক্তির মূল সাধকের শক্তি?
না— সাধকের শক্তি নয়, নামেরই শক্তি। নামকে ধরে থাকার ফলে সাধকের দেহ-দোষ নষ্ট হয়ে যায়। দোষনাশের সঙ্গে সঙ্গে শত্তির বিকাশ হতে থাকে। নামের কৃপাতে সাধক সিদ্ধ হন— সাধকের শক্তিতে নয়। কিছু ভাবতে হবে না, মাত্র কিছুদিন নামকে প্রাণপণে ধরে থাকবার চেষ্টা অর্থাৎ উঠতে-বসতে, খেতে-শুতে, সর্বদা নাম করলে, শ্বাসে-প্রশ্বাসে নাম রাখলে নাম হৃদয়ে উপস্থিত হবেনই হবেন; হৃদয়-বীণা আপনি বেজে উঠবে, সে বাজনা আর থামাতে কেউ পারবে না— স্বতঃই নাম হতে থাকবে। নামকারীকে চিরদিনের মত নিশ্চিন্ত করে দিয়ে সেই নাদময়ী মা-বাবাতে একীভূতা হবেন। যে কোন ভাবে, যে কোন স্থানে, যে কোন অবস্থায় সতত নাম করাই পরম শান্তিলাভের সহজ, সুগম উপায়। রাম রাম।

🍁শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী

 

 

🍂সমসাময়িক 
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই। এখানে ঈশ্বরকে পূজার আসনে বসিয়ে দূর থেকে শুধু প্রণাম করা হয় না। তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনচক্র। কখনও তিনি অসুস্থ, কখনও বিশ্রামরত, কখনও উৎসবের সাজে সজ্জিত, আবার কখনও রথে চড়ে ভক্তদের কাছে পৌঁছে যান।

জগন্নাথদেবের সপ্তাবরণ

পুরীর মন্দিরের সাত স্তরের রহস্যময় পরিচর্যা

অসিতদেবল মজুমদার

পুরীর জগন্নাথদেবকে নিয়ে রহস্যের আকর্ষণ যেন কোনও দিন ফুরোয় না। তাঁর বিশাল চোখ, অসম্পূর্ণ হাত, কাঠের শরীর ও বিচিত্র উপাসনাপদ্ধতি। প্রতিটি বিষয়ই সাধারণ দেবমূর্তির ধারণাকে অন্য খাতে বইয়ে দেয়। কোটি কোটি ওড়িয়া মানুষের কাছে তিনি পরিবারের সদস্য। তাঁর সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক নিছক প্রার্থনা আর পূজার মধ্যে আটকে নেই। তাঁকে খাওয়ানো হয়, ঘুম পাড়ানো হয়, অসুস্থ হলে পরিচর্যা করা হয়, গরমে চন্দন মাখানো হয়। এমনকী তাঁর শরীরের সুরক্ষার জন্য আছে বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা বিশেষ ব্যবস্থা। যে ঈশ্বরকে মানুষ নিজের দুঃখের কথা জানাতে মন্দিরে যায়, সেই ঈশ্বরের শরীর নিয়েও ভক্তদের উদ্বেগের অন্ত নেই। ধর্মীয় বিশ্বাসের এই মানবিক রূপই পুরীর জগন্নাথ সংস্কৃতিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। আসলে, শ্রীক্ষেত্র পুরীর বড়দেউলে অধিষ্ঠিত জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে তাঁদের ব্যতিক্রমী অবয়ব। প্রচলিত হিন্দু দেবদেবীর মূর্তির মতো নিখুঁত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নির্মাণ এখানে নেই। কাঠের তৈরি এই বিগ্রহগুলির মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত স্বাতন্ত্র্য। শিল্পের প্রচলিত মাপকাঠিতে তাঁদের বিচার করলে হয়ত অনেকেরই আপত্তি উঠবে। কিন্তু ভক্তের চোখে এই অসম্পূর্ণতাই পূর্ণতার আর একটি প্রকাশ।

অবলেহ বা ঔষধি প্রলেপ। প্রাকৃতিক উপাদান, ভেষজ ও বিশেষভাবে প্রস্তুত মিশ্রণের সাহায্যে এই প্রলেপ তৈরি হয় বলে প্রচলিত। এর উদ্দেশ্য আবরণগুলিকে সংহত রাখা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা আরও মজবুত করা। আর সবশেষে আসে চূড়ান্ত লেপ। প্রাকৃতিক খনিজ ও উদ্ভিজ্জ উপাদান থেকে তৈরি রং প্রয়োগের মাধ্যমে দেববিগ্রহের পরিচিত বহিরঙ্গ ফুটিয়ে তোলা হয়। অর্থাৎ ভক্তরা যে রূপে তিন দেবতাকে দর্শন করেন, সেই রূপের পিছনে আছে একাধিক স্তরের প্রস্তুতি ও পরিচর্যা।

জগন্নাথ যেন মানুষের সমস্ত সীমাবদ্ধতাকে নিজের শরীরে ধারণ করে আছেন। তাঁর বড় বড় চোখের দিকে তাকিয়ে ভক্তরা খুঁজে পান অনন্ত আশ্রয়। অথচ এই কাঠের বিগ্রহকে ঘিরেই প্রচলিত এমন কিছু বিশ্বাস, যা শুনলে কোনও যুক্তিবাদী মনও প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়! মন্দিরের অঙ্গলাগি সেবকদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা, তাঁরা বিগ্রহের শরীরের সঙ্গে এমনভাবে পরিচিত যে কাঠের কঠিন স্পর্শের বদলে অনেক সময় অস্বাভাবিক কোমলতা অনুভব করেন। কারও কারও বিশ্বাস, দেববিগ্রহের মধ্যে জীবন্ত মানুষের মতো হৃদস্পন্দনের অনুভূতিও পাওয়া যায়। গ্রীষ্মের দিনে শরীর থেকে ঘাম নির্গত হওয়ার কথাও লোকবিশ্বাসে প্রচলিত আছে। কিন্তু জগন্নাথ উপাসনার পরিসরে বিশ্বাসের নিজস্ব যুক্তি আছে। সেখানে দেবতা কোনও জড় বস্তু নন। তাঁর শরীর রয়েছে, অনুভূতি রয়েছে, এমনকী ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর দৈনন্দিন পরিচর্যার ধরনও বদলে যায়। আধুনিক মানুষের কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ধারণার উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে শ্রীমন্দিরের বহু আচার। জগন্নাথদেবের উপাসনায় দেবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় স্নানযাত্রা ও রথযাত্রার সময়ে।

বছরের নির্দিষ্ট পর্বে তিন দেবতা রত্নসিংহাসন ছেড়ে জনসমক্ষে আসেন। তাঁদের দর্শনের জন্য পুরীর রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই যাত্রা কেবল মানুষের ঈশ্বরদর্শনের আয়োজন নয়, দেবতাও যেন নিজে থেকে ভক্তদের কাছে আসেন। মন্দিরের অন্তঃপুরে অধিষ্ঠিত থাকার বদলে তিনি সাধারণ মানুষের মাঝে উপস্থিত হন। ঈশ্বরকে নির্দিষ্ট মন্দিরের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার ধারণাকে এই উৎসব যেন প্রতিবার নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। রথের দড়ি টানার অধিকার, দেবতার সামনে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা আর দূরদূরান্ত থেকে মানুষের সমাগম! এসবকিছুর মধ্যেই নিহিত এক বৃহত্তর সামাজিক তাৎপর্য। আর রথযাত্রার আগে দেবতাদের সাজানোর প্রক্রিয়াতেও লক্ষ্যণীয় নানা আচার। সেনাপটালাগি-সহ বিশেষ বিধিতে তাঁদের যুদ্ধসজ্জায় প্রস্তুত করা হয় বলে মন্দিরের পরম্পরায় উল্লেখ আছে। ভক্তদের কল্পনায়, এই সময় দেবতারা যেন মন্দিরের নিয়মিত জীবনের গণ্ডি ছেড়ে বাইরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। রত্নসিংহাসনের গাম্ভীর্য ছেড়ে রথের উপর সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থিত হওয়ার মধ্যে তাঁদের এক অন্য রূপ প্রকাশ পায়। রথের উপরে দেববিগ্রহের পরিচর্যার জন্য দৈতাপতিরা বিশেষ যত্ন নেন। চন্দন প্রয়োগ, শরীরের পরিচর্যা ও নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন আচার পালনের মাধ্যমে তাঁদের সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করা হয়। দেবতাকে জীবন্ত ভাবার দর্শন এখানে কথার বিষয় নয়, প্রতিদিনের সেবার মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটে।

এই পরিচর্যার ধারার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও তুলনায় কম আলোচিত দিক হল ‘সপ্তাবরণ’। নাম থেকেই বোঝা যায়, সাতটি পৃথক স্তরে দেববিগ্রহের শরীরকে আবৃত করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া এর সঙ্গে যুক্ত। মাদলা পাঁজি ও কলিঙ্গের প্রাচীন কারুশিল্পের পরম্পরার সঙ্গে এই ব্যবস্থার সম্পর্ক আছে বলে জানা যায়। বিশেষত অনসর পর্বে দেববিগ্রহের পরিচর্যা ও আচারগত সংস্কারের ক্ষেত্রে সপ্তাবরণের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনসর এমন একটি সময়, যখন নিয়মিত দর্শনের বাইরে থাকেন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা। ভক্তদের বিশ্বাস, স্নানযাত্রার পর দেবতারা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নির্দিষ্ট সময় ধরে তাঁদের বিশ্রাম ও পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। ফলে মন্দিরের নিয়মিত দর্শনব্যবস্থায় সাময়িক বিরতি ঘটে। দেবতার অসুস্থতা আর চিকিৎসার এই ধারণা জগন্নাথ উপাসনার একটি আশ্চর্য মানবিক দিক। সপ্তাবরণের প্রথম স্তরেই লক্ষ্য করা যায়, প্রকৃতির স্পর্শ। তাজা সুগন্ধি ফুল ও বিশেষ সুগন্ধযুক্ত তেলের সাহায্যে প্রাথমিক আবরণ তৈরি করা হয় বলে প্রচলিত। ফুলের সুবাস ও তেলের ব্যবহার দেববিগ্রহের পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত হয়। এর পরে সূক্ষ্ম রেশমি পট্টবস্ত্র দিয়ে শরীর আবৃত করা হয়। এই বস্ত্রের ব্যবহার সাতটি স্তরের ধারাবাহিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। প্রাচীন মন্দিরশিল্পে বস্ত্র, প্রাকৃতিক উপাদান আর ধর্মীয় শুদ্ধতার ধারণা যে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল, এই রীতিতে তার পরিচয় পাওয়া যায়।

তৃতীয় স্তরে ব্যবহৃত হয় ঝুনা ও ফুলরি তেল। ঝুনা হল শালগাছের রজনজাত পদার্থ। অন্য দিকে, ফুলরি তেল বিশেষ সুগন্ধিযুক্ত দেহতেল হিসেবে পরিচিত। এই দুই উপাদানের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি হয় পরবর্তী আবরণ। প্রাকৃতিক রজনের ব্যবহার প্রাচীন কারুশিল্পে বহুদিনের পরিচিত। কাঠের বিভিন্ন সামগ্রী সংরক্ষণ কিংবা শিল্পবস্তুর স্থায়িত্ব রক্ষার কাজে এ ধরনের উপাদানের ব্যবহার দেখা যায়। জগন্নাথদেবের বিগ্রহের পরিচর্যায় এই উপাদানের উপস্থিতি প্রাচীন শিল্পজ্ঞান ও ধর্মীয় পরম্পরার একটি সংযোগরেখা তৈরি করে। এর পরের পর্যায়ে আসে পট্টজালিকা। রেশমি বস্ত্র দিয়ে তৈরি সূক্ষ্ম জালের মতো এই আবরণ বিগ্রহের শরীরের উপর স্থাপন করা হয়। তার পরে ব্যবহার করা হয় ঝিনা বস্ত্র। অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রায় স্বচ্ছ প্রকৃতির এই বস্ত্র সপ্তাবরণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাইরে থেকে এই স্তরগুলির প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা সহজ নয়। কারণ প্রতিটি উপাদান ব্যবহারের পিছনে রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম ও দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কোন বস্ত্রের পরে কোন উপাদান প্রয়োগ করা হবে, তারও নিজস্ব ধারাবাহিকতা আছে। এই প্রক্রিয়াকে নিছক পোশাক পরানোর আচার ভাবলে ভুল হবে। এর মধ্যে বিগ্রহের পরিচর্যা, সংরক্ষণ এবং ঐতিহ্যগত শিল্পদক্ষতার সমন্বয় দেখা যায়।

ষষ্ঠ স্তরে প্রয়োগ করা হয় অবলেহ বা ঔষধি প্রলেপ। প্রাকৃতিক উপাদান, ভেষজ ও বিশেষভাবে প্রস্তুত মিশ্রণের সাহায্যে এই প্রলেপ তৈরি হয় বলে প্রচলিত। এর উদ্দেশ্য আবরণগুলিকে সংহত রাখা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা আরও মজবুত করা। আর সবশেষে আসে চূড়ান্ত লেপ। প্রাকৃতিক খনিজ ও উদ্ভিজ্জ উপাদান থেকে তৈরি রং প্রয়োগের মাধ্যমে দেববিগ্রহের পরিচিত বহিরঙ্গ ফুটিয়ে তোলা হয়। অর্থাৎ ভক্তরা যে রূপে তিন দেবতাকে দর্শন করেন, সেই রূপের পিছনে আছে একাধিক স্তরের প্রস্তুতি ও পরিচর্যা। এখানে রঙের ব্যবহারও যথেচ্ছ নয়। দেবতাদের নিজস্ব গাত্রবর্ণের সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট উপাদান ও ধর্মীয় প্রতীক। আবার, শ্রীবলভদ্রের গাত্রের শুভ্রতা ফুটিয়ে তুলতে শঙ্খচূর্ণ ব্যবহারের কথা প্রচলিত। সুভদ্রার অঙ্গশোভায় হরিতালের প্রয়োগের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্য দিকে, জগন্নাথের অঙ্গরাগে প্রাকৃতিক কজ্জল ব্যবহৃত হয় বলে জানা যায়। লাল রঙের ক্ষেত্রে বনকলাগিতে হিঙ্গুলের ব্যবহারও এই পরম্পরার অংশ। এই উপাদানগুলির নির্বাচন কিন্তু বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রশ্ন নয়! প্রতিটি রঙের সঙ্গে যুক্ত দেবতার নিজস্ব পরিচয়, মন্দিরের শিল্পরীতি ও ধর্মীয় তাৎপর্য। আধুনিক রঙের সহজলভ্যতার যুগেও প্রাচীন উপাদানের প্রতি এই নির্ভরতা ঐতিহ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

সপ্তাবরণের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক হল, এর জ্ঞান সংরক্ষণের পদ্ধতি। শ্রীমন্দিরের পরম্পরায় এই প্রক্রিয়ার সমস্ত নিয়ম সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না। দৈতাগণ ও বিদ্যাপতি মহাভাগদের উত্তরাধিকারসূত্রে এই বিশেষ জ্ঞান অর্জনের কথা প্রচলিত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নির্দিষ্ট সেবকগোষ্ঠীর মধ্যে এই দায়িত্ব ও দক্ষতা প্রবাহিত হয়েছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে এই ধরনের উত্তরাধিকারভিত্তিক জ্ঞানব্যবস্থা অনেকের কাছে বিস্ময়ের বিষয়। যেখানে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাতের মুঠোয় চলে আসে, সেখানে পুরীর মন্দিরের কিছু আচার এখনও নিজস্ব পরিসরে সংরক্ষিত। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই গোপনীয়তা শুধুই ধর্মীয় বিধানের কী অংশ? নাকি এর পিছনে আছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বিশেষ কারিগরি দক্ষতা রক্ষার প্রয়োজন? উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগের পাশাপাশি পুরাণ ও ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে। জগন্নাথ সংস্কৃতির গুরুত্ব এখানেই যে, এটি ধর্মীয় বিশ্বাসকে শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে একাকার করে দিয়েছে। দেবতার শরীরের পরিচর্যার জন্য যে উপাদান ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে প্রকৃতির দান আছে। যে সেবকরা এই কাজ করেন, তাঁদের দক্ষতা কোনও সাধারণ কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। তাঁদের দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা। ফলে সপ্তাবরণকে কেবল অলৌকিকতার আবরণে ঢেকে রাখলে তার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিটি দাবিকে পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে তুলে ধরাও অনুচিত। ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং বাস্তব আচার, এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখেই জগন্নাথদেবের পরম্পরাকে বুঝতে হবে।

বস্তুত, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই। এখানে ঈশ্বরকে পূজার আসনে বসিয়ে দূর থেকে শুধু প্রণাম করা হয় না। তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনচক্র। কখনও তিনি অসুস্থ, কখনও বিশ্রামরত, কখনও উৎসবের সাজে সজ্জিত, আবার কখনও রথে চড়ে ভক্তদের কাছে পৌঁছে যান। তাঁর কাঠের শরীরের পরিচর্যার জন্য সাতটি স্তরের আয়োজন যেমন লক্ষ্য করতে হবে, তেমনি দেখার অসংখ্য সেবকের নিরলস দায়িত্ব। দেবতা ও মানুষের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে নিয়ে আসার এই রীতি ধর্মীয় সমাজতত্ত্বের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলেই গৃহীত। আসলে, কোটি কোটি মানুষের আরাধ্য জগন্নাথকে এক কথায় ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি একই সঙ্গে দেবতা, পরিবারের সদস্য, পুরীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্র ও শতাব্দীপ্রাচীন শিল্পপরম্পরার ধারক। তাঁর দারুবিগ্রহের সাতটি আবরণের মধ্যে ভক্তরা খুঁজে পান সেবার পবিত্রতা, কারুশিল্পের ইতিহাস ও ঈশ্বরের প্রতি নিবেদনের এক অনন্য ভাষা। কাঠের শরীর সত্যিই মানুষের মতো অনুভূতি ধারণ করে কি না, তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু সেই তর্কের বাইরে দাঁড়িয়েও একটি সত্য অস্বীকার করা কঠিন যে, জগন্নাথকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্য ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি অসাধারণ সম্পদ। রহস্যের পর্দা সরিয়ে তার গভীরে পৌঁছনোর চেষ্টা যত বাড়বে, ততই নতুন করে আবিষ্কৃত হবে পুরীর জগন্নাথ সংস্কৃতির বিস্ময়কর জগৎ।🍁

 

 

 

🍂ফিচার  
এলা জানে, তার মৃত্যু আসন্ন হতে পারে। অতীনকে সে অনুরোধ করে নিজের হাতে তাকে হত্যা করতে। তার কাছে প্রিয় মানুষের হাতে মৃত্যু যেন বাইরের অপমান ও নির্যাতনের চেয়ে গ্রহণযোগ্য। এই আবেদন নিছকই প্রেমের আবেগ নয়। এর মধ্যে ভয়াবহ অসহায়তা ও নিজের দেহের উপর শেষ অধিকারটুকু ধরে রাখার আকুতিও দেখা যায়। এলা বারবার অতীনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে চায়। কিন্তু অতীন পাথরের মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার ওই নীরবতা ও প্রত্যাখ্যানের মধ্যে প্রেমের পাশাপাশি নৈতিক সঙ্কটও কাজ করে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর ‘চার অধ্যায়’ ও তার অসামান্য শিল্প বিন্যাস

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা উঠলেই একটি পরিচিত অভিযোগ ঘুরেফিরে সামনে আসে। তিনি কবি হিসেবে অতুলনীয়, ছোটগল্পকার হিসেবে অনন্য, নাট্যকার হিসেবেও অসামান্য, কিন্তু ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর সাফল্য নাকি প্রশ্নাতীত নয়। কেন? এই ধারণার পিছনে কতটা সাহিত্যবিচার ও কতটা প্রতিষ্ঠিত ছক মেনে পাঠ করার অভ্যাস কাজ করে, তা নিয়ে অবশ্য নতুন করে ভাবার অবকাশ আছে। কারণ, রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধ্যায়’ হাতে নিলে বোঝা যায়, উপন্যাসের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে নিজেকে আটকে রাখার কোনও দায় লেখক অনুভব করেননি। জীবনের শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে এমন একটি উপন্যাস নির্মাণ করেছিলেন, যা বাংলা উপন্যাসের পরিচিত পাঠাভ্যাসকে অস্বস্তিতে ফেলে। এই উপন্যাসে প্রেম আছে, রাজনীতি আছে, আদর্শের সংঘাত আছে, আবার মানুষের ব্যক্তিগত সত্তাকে দলীয় আনুগত্যের কাছে বিসর্জন দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতিও দেখিয়েছেন লেখক। কিন্তু এসবের কোনও কিছুই রবীন্দ্রনাথ সহজে পাঠকের সামনে সাজিয়ে দেননি। চরিত্রদের মুখে কথা বসিয়ে, তাদের দ্বন্দ্ব ও আত্মপক্ষ সমর্থনের ভিতর দিয়ে এমন এক জটিল মানসিক পরিসর তৈরি করেছেন, যেখানে প্রতিটি বক্তব্যের বিপরীতে আরেকটি বক্তব্য দাঁড়িয়ে যায়।

১৯৩৪ সালে প্রকাশিত ‘চার অধ্যায়’ রবীন্দ্রনাথের শেষ উপন্যাস। তখন কবিগুরুর বয়স তিয়াত্তর। জীবনের দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় তিনি তত দিনে অসংখ্য কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও উপন্যাস লিখেছেন। ফলে নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার কোনও প্রয়োজন তাঁর ছিল না। তবু এই উপন্যাসে যে ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন, তা একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের নিরাপদ অবস্থান থেকে সরে আসার সাহসেরই পরিচয় দেয়। সমকালীন বাংলা উপন্যাসের প্রচলিত রীতিতে যেখানে ঘটনার ধারাবাহিকতা, বর্ণনার বিস্তার আর সর্বজ্ঞ কথকের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেখানে রবীন্দ্রনাথ অনেকটাই উল্টো পথে হাঁটলেন। কাহিনির মূল ভার তুলে দিলেন সংলাপের কাঁধে। চরিত্ররা কথা বলছে, তর্ক করছে, অতীতের হিসাব মেলাচ্ছে, নিজেদের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছে, আবার সেই যুক্তির ভিতরেই নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলছে। লেখক যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকার করেছেন। এই নির্মাণকৌশলকে নিছক সংলাপের আধিক্য বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু তা করলে উপন্যাসটির প্রকৃত শিল্পমূল্যই ধরা পড়বে না। কারণ, এখানে সংলাপ কিন্তু কাহিনির অলংকার না, কাহিনি নির্মাণের প্রধান উপাদানও। চরিত্রের পরিচয়, রাজনৈতিক মতাদর্শ, সম্পর্কের পরিবর্তন, অতীতের স্মৃতি, ভবিষ্যতের আশঙ্কা ইত্যাদি কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ প্রকাশিত হয়। কখনও একটি ছোট বাক্য চরিত্রের বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভকে সামনে নিয়ে আসে, কখনও দীর্ঘ তর্কের ভিতর দিয়ে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নৈতিক সঙ্কট উন্মোচিত হয়। আবার কখনও প্রেমিক-প্রেমিকার কথার মধ্যে এমন আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে, যার অভিঘাত কোনও দীর্ঘ বর্ণনাও হয়ত তৈরি করতে পারত না। এখানেই রবীন্দ্রনাথের নির্মাণশৈলীর সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি পাঠককে কাহিনির বাইরে দাঁড় করিয়ে সবকিছুর ব্যাখ্যা দেন না। পাঠককে চরিত্রদের কাছাকাছি নিয়ে যান, তাদের কথার মধ্যে দিয়ে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ও আবেগ-যুক্তির সংঘাত বিচার করার দায়িত্ব তাঁর হাতেই ছেড়ে দেন। এই পদ্ধতিতে উপন্যাসের গতি কখনও দ্রুত, কখনও মন্থর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ‘চার অধ্যায়’

 

এলা ও অতীন কখনও পরস্পরের আশ্রয়, কখনও পরস্পরের অসহায়তার কারণ হয়ে ওঠে। এখনে এলার চরিত্রটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। উপন্যাসে এলা নিছক প্রেমিকা নন। আবার কেবল রাজনৈতিক কর্মীও নন। তার মধ্যে আছে দৃঢ়তা, আত্মসম্মান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু একই সঙ্গে তার জীবনে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত ভালবাসার মধ্যে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। এই দ্বন্দ্বকে রবীন্দ্রনাথ কোনও সহজ নৈতিক সিদ্ধান্তে মেটাননি। এলাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বা সম্পূর্ণ অপরাধী করে তোলার চেষ্টা করেননি।

উপন্যসের কোনও কোনও অংশে দীর্ঘ দার্শনিক আলোচনা কাহিনির স্বাভাবিক প্রবাহকে ভারাক্রান্ত করেছে বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু সেই ভারের মধ্যেও লেখকের পরিকল্পনা কাজ করে। তিনি জানেন, রাজনৈতিক উন্মাদনার সময়ে মানুষ শুধু কাজ করে না, নিজের কাজকে ন্যায্য প্রমাণ করার জন্য যুক্তিও তৈরি করে। সেই যুক্তির ভিতরেই তার বিপজ্জনক আত্মপ্রবঞ্চনা লুকিয়ে থাকে। ‘চার অধ্যায়’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র এলা ও অতীন। তাদের প্রেমের সম্পর্ককে ঘিরেই উপন্যাসের আবেগময় পরিসর গড়ে উঠেছে। কিন্তু এ প্রেম কোনও নির্জন, ব্যক্তিগত সুখের গল্প না। এর চারদিকে বিপ্লবী রাজনীতির কঠোর শাসন, সংগঠনের নির্দেশ, গোপন কার্যকলাপ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর ক্রমাগত চাপও আছে। এলা রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। অতীনও সেই পরিসরের মানুষ। তাদের সম্পর্কের মধ্যে প্রেম যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে আদর্শের প্রশ্ন। ব্যক্তিগত অনুভূতি কি বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অধীন হবে? কোনও সংগঠন কী মানুষের বিবেক, প্রেম ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের উপর চূড়ান্ত অধিকার দাবি করতে পারে? বিপ্লবের নামে মানুষের স্বাভাবিক সত্তাকে ধ্বংস করা কী ন্যায়সংগত? এই প্রশ্নগুলিই উপন্যাসের অন্তঃসলিল স্রোত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সময় ‘চার অধ্যায়’ লিখছেন, তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রান্ত। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন, গোপন সংগঠন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও তরুণদের আত্মত্যাগের ঘটনা জনমানসে গভীর ছাপ ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। বিশেষত এমন একটি সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতিটি ঘটনাই জাতীয় আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সেই আবেগের বাইরে দাঁড়িয়ে অন্ধ আনুগত্যের বিপদ নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর আপত্তি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাই শুধু না। আপত্তি সেই মানসিকতায়, যেখানে একটি লক্ষ্য অর্জনের অজুহাতে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করা হয়। এই বক্তব্যের জন্য তাঁকে তীব্র বিরোধিতার মুখেও পড়তে হয়েছিল। কারণ, জাতীয়তাবাদী আবেগের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে এমন সাহিত্যকর্মকে সহজে গ্রহণ করার মানসিকতা তখন সমাজে খুব বেশি ছিল না। অনেকেই উপন্যাসটির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু এত বছর পরেও এই বিতর্কের গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। রাজনৈতিক সংগঠন, মতাদর্শ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে বর্তমান সময়ের নানা অভিজ্ঞতা ‘চার অধ্যায়’-কে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন তৈরি করে। কোনও রাজনৈতিক লক্ষ্যই কী প্রশ্নাতীত হতে পারে? সংগঠনের স্বার্থে ব্যক্তিমানুষের বিবেককে স্তব্ধ করে দেওয়া কী গ্রহণযোগ্য? মতাদর্শের নামে হিংসাকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার অধিকার কার? রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস এই প্রশ্নগুলির সামনে পাঠককে দাঁড় করায়।

কিন্তু, রাজনৈতিক বক্তব্যের তীক্ষ্ণতা সত্ত্বেও ‘চার অধ্যায়’-কে কেবল রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে বিচার করলে তার অর্ধেকই দেখা হবে। এর প্রকৃত প্রাণ নিহিত রয়েছে এলা ও অতীনের সম্পর্কের মধ্যে। এ সম্পর্কের কোনও সরল রোম্যান্টিক পরিণতি নেই। এখানে ভালবাসা শুধু একে অপরকে কাছে পাওয়া না। একে অপরের স্বাধীন সত্তাকে স্বীকার করার কঠিন পরীক্ষাও। রাজনৈতিক সংগঠন যেখানে ব্যক্তির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেখানে প্রেম মানুষের নিজস্ব অস্তিত্বের দাবি নিয়ে হাজির হয়। এই দ্বন্দ্বে এলা ও অতীন কখনও পরস্পরের আশ্রয়, কখনও পরস্পরের অসহায়তার কারণ হয়ে ওঠে। এখনে এলার চরিত্রটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। উপন্যাসে এলা নিছক প্রেমিকা নন। আবার কেবল রাজনৈতিক কর্মীও নন। তার মধ্যে আছে দৃঢ়তা, আত্মসম্মান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু একই সঙ্গে তার জীবনে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত ভালবাসার মধ্যে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। এই দ্বন্দ্বকে রবীন্দ্রনাথ কোনও সহজ নৈতিক সিদ্ধান্তে মেটাননি। এলাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বা সম্পূর্ণ অপরাধী করে তোলার চেষ্টা করেননি। তার সিদ্ধান্ত, তার দুর্বলতা, তার আবেগ ও তার আত্মমর্যাদার সংঘাত মিলিয়ে একটি জটিল চরিত্র নির্মাণ করেছেন এই উপন্যাসটিতে।

অতীনের মধ্যেও একই ধরনের দ্বিধা দেখা যায়। অতীন ভালবাসে, কিন্তু সেই ভালবাসাকে রক্ষা করার ক্ষমতা তার কতখানি, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়! রাজনৈতিক দায়িত্ব, সংগঠনের চাপ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন তাকে ক্রমাগত বিপর্যস্ত করে। তার চরিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সে সবসময় নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিন্ত নয়। এই অনিশ্চয়তাই তাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে। কারণ, জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ সবসময় নায়কোচিত দৃঢ়তা দেখাতে পারে না। কখনও সে নীরব থাকে, কখনও ভুল করে, কখনও নিজের অনুভূতিকেই বুঝতে পারে না। উপন্যাসটির শিল্পমূল্য বিচার করতে গেলে এর সংলাপের প্রসঙ্গ আলাদা করে তুলতেই হয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষা এই উপন্যাসে শুধু সুন্দর নয়, নাটকীয়ও। প্রতিটি চরিত্রের কথার মধ্যে তার মানসিক অবস্থান, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের প্রকৃতি কাজ করে। কোথাও কথোপকথন যুক্তির ধারাল লড়াই, কোথাও তা আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ, আবার কোথাও একটি বাক্যই বহুদিনের সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেয়। সংলাপের এই বৈচিত্র্য বাংলা উপন্যাসে বিরল। অনেক সময় চরিত্ররা যা বলে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তারা যা বলতে পারে না। স্তব্ধতার ভিতরেও এখানে একটি আলাদা ভাষা তৈরি হয়েছে। কিন্তু, উপন্যাসটির দুর্বলতা অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। কাহিনির কিছু অংশে বাস্তবতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। চরিত্রদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কার্যকলাপের কিছু ব্যাখ্যা কখনও অতিরিক্ত তাত্ত্বিক হয়ে পড়ে। বিশেষত যে রাজনৈতিক সংগঠনকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি এগিয়েছে, তার কার্যপদ্ধতি, চরিত্রদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও কিছু ঘটনাক্রমের উপস্থাপনায় এমন কিছু অসংগতিও আছে, যা মনোযোগী পাঠকের চোখ এড়ায় না। কোনও কোনও জায়গায় মনে হয়, লেখক চরিত্রদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার চেয়ে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠায় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ফলে উপন্যাসের স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানেই ‘চার অধ্যায়’-এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। রবীন্দ্রনাথ যখন রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচনা করছেন, তখন কখনও কখনও চরিত্ররা জীবন্ত মানুষ না থেকে তাঁর বক্তব্যের বাহক হয়ে ওঠে। বিশেষত তাত্ত্বিক আলোচনার অংশে কথোপকথনের স্বাভাবিকতা কিছুটা কমে যায়। মানুষের মুখে এত সুসংবদ্ধ দার্শনিক বক্তব্য সবসময় বিশ্বাসযোগ্য শোনায় না। একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আরও সংযত উপস্থাপনা প্রত্যাশা করা যেত। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর আখ্যান নির্মাণের অভিনবত্বকে খাটো করা যায় না। দুর্বলতাগুলি চিহ্নিত করেই বোঝা যায়, কতখানি সচেতনভাবে তিনি প্রচলিত উপন্যাসের কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন।

‘চার অধ্যায়’ নাটকে শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্র। ছবি: সংগৃহীত

এ প্রসঙ্গে শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের অভিনীত নাট্যরূপের প্রভাবের কথাও মনে রাখা প্রয়োজন। তাঁদের অভিনয়ের মাধ্যমে ‘চার অধ্যায়’-এর সংলাপ যে স্বতন্ত্র জীবন পেয়েছিল, তা বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাসেও উল্লেখযোগ্য। বিশেষত ইনরেকো কোম্পানির প্রকাশিত অডিয়ো রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে বহু পাঠকের কাছে উপন্যাসটির কথোপকথন পরিচিত হয়ে ওঠে। অভিনয়শিল্পীদের কণ্ঠ, উচ্চারণ, বিরতি ও আবেগের ওঠানামা সংলাপগুলিকে যেন নতুন মাত্রা দিয়েছিল। ফলে বইটি পড়ার সময় অনেক পাঠকের মনে মুদ্রিত বাক্যের পাশাপাশি পরিচিত কণ্ঠস্বরও ফিরে আসে। সাহিত্যের সঙ্গে অভিনয় ও শ্রুতিমাধ্যমের এই সংযোগ উপন্যাসটির গ্রহণযোগ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একাধিকবার এলা ও অতীনের সংলাপের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এই উপন্যাসের প্রেমের অংশ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রেমকাহিনির পর্যায়ে পড়ে। এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, রবীন্দ্রনাথ এখানে প্রেমকে আবেগের মিষ্টি আবরণে ঢেকে রাখেননি। প্রেমের মধ্যে যে ভয়, অধিকারবোধ, ঈর্ষা, আত্মসমর্পণ, আত্মসম্মান ও বিচ্ছেদের আশঙ্কা আছে, তার সবকিছুকেই সামনে এনেছেন। এলা ও অতীনের সম্পর্কের মধ্যে কোনও নিশ্চিন্ত আশ্রয় নেই। আছে ক্রমাগত হারানোর আশঙ্কা। আর সেই আশঙ্কাই তাদের কথোপকথনকে তীব্র করে তোলে।

উপন্যাসটির শেষ পর্বে এসে এই আবেগ ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগোয়। এলা জানতে পারে, পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে আসবে। তার অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সংগঠনের গোপন তথ্য ও পরিচিত মানুষদের নাম জানার সম্ভাবনা তাকে বিপদের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তার কাছে বটুর প্রস্তাব আসে। বিয়ে করলে সে এলাকে জামিনে মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করতে পারে বলে জানায়। কিন্তু এলা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে চিঠির উপর মাত্র একটি শব্দ লিখে দেয়, ‘পিশাচ’। এই একটি শব্দের মধ্যে তার ঘৃণা, আত্মমর্যাদাবোধ, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একসঙ্গে প্রকাশিত হয়। এখানে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত নির্মমভাবে দেখিয়েছেন, বিপদের সময়ে মানুষের অসহায়তাকে কীভাবে অন্য কেউ নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। বটুর প্রস্তাবের মধ্যে সাহায্যের ভাষা থাকলেও তার ভিতরে দেখা যায় অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। এলা বুঝতে পারে, এক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে তাকে আরেক শৃঙ্খলে বন্দী হতে হবে। তাই তার সেই প্রত্যাখ্যান একটি বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানই না, নিজের অস্তিত্বের উপর অন্যের কর্তৃত্ব অস্বীকার করারও চেষ্টা!

এলার চার অধ্যায়-এ এলার ভূমিকায় অভিনেত্রী পাওলি দাম। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু এই শেষ পর্বের সবচেয়ে গভীর সঙ্কট তৈরি হয় অতীন ও এলার মুখোমুখি অবস্থানে। এলা জানে, তার মৃত্যু আসন্ন হতে পারে। অতীনকে সে অনুরোধ করে নিজের হাতে তাকে হত্যা করতে। তার কাছে প্রিয় মানুষের হাতে মৃত্যু যেন বাইরের অপমান ও নির্যাতনের চেয়ে গ্রহণযোগ্য। এই আবেদন নিছকই প্রেমের আবেগ নয়। এর মধ্যে ভয়াবহ অসহায়তা ও নিজের দেহের উপর শেষ অধিকারটুকু ধরে রাখার আকুতিও দেখা যায়। এলা বারবার অতীনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে চায়। কিন্তু অতীন পাথরের মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার ওই নীরবতা ও প্রত্যাখ্যানের মধ্যে প্রেমের পাশাপাশি নৈতিক সঙ্কটও কাজ করে। এই দৃশ্যের নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে কোনও দীর্ঘ বর্ণনায় না শুধু কথার পর কথা সাজিয়ে। এলা যখন মৃত্যুর আবেদন জানায়, তখন তার ভাষায় ভালবাসা ও আতঙ্ক একাকার হয়ে যায়। অন্যদিকে অতীন তাকে ঘুমোতে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সে ক্লোরোফর্মের কথা বলে। এলা সেই পথও প্রত্যাখ্যান করে। সে চায়, চেতনা হারিয়ে নয়, জেগে থেকেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে। এখানে প্রেমের প্রচলিত কোমলতা প্রায় অনুপস্থিত। প্রেমের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে এমন অন্ধকার, যেখানে মানুষের সমস্ত আবেগ চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখে পড়ে। এই শেষ দৃশ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সংযম। লেখক পাঠককে কোনও সিদ্ধান্ত ধরিয়ে দেন না। অতীন কেন এলাকে হত্যা করতে অস্বীকার করছে? তার মধ্যে ভালবাসা কতখানি? নৈতিক দ্বিধা কতখানি, আর অসহায়তা কতখানি? এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাঠককে নিজেকেই খুঁজতে হয়। একই সঙ্গে এলার আত্মসমর্পণের আকুতিকে কিন্তু প্রেমের মহিমা বলে উদ্‌যাপন করাও চলে না। কারণ, তার অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক হিংসা, ক্ষমতার প্রয়োগ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার নির্মম বাস্তবতা দেখা যায় উপন্যাসে। এলা নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে, অথচ তার সামনে কোনও গ্রহণযোগ্য পথ খোলা নেই। এই অসহায় পরিস্থিতিই উপন্যাসের শেষ অংশকে এত মর্মান্তিক করে তুলেছে।

এলার চার অধ্যায়-এ এলার ভূমিকায় অভিনেত্রী পাওলি দাম। ছবি: সংগৃহীত

শেষে দূর থেকে পুলিশের হুইস্‌লের শব্দ শোনা যায়। মাত্র কয়েকটি শব্দের এই সমাপ্তি পাঠকের মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথ এখানে কোনও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেননি, কোনও আবেগঘন উপসংহার লেখেননি, এমনকি চরিত্রদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও নিশ্চিত কিছু জানাননি। একটি শব্দ এসে সমস্ত কথোপকথনের উপর যেন পর্দা নামিয়ে দেয়। সেই হুইস্‌ল ব্যক্তিগত জীবনের উপর রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অনিবার্য হস্তক্ষেপেরও পরিচয় বহন করে। এতক্ষণ যে প্রেম, ভয়, আত্মসম্মান ও মৃত্যুর আকুতি কথার মধ্যে দিয়ে তৈরি হচ্ছিল, তা হঠাৎ বাস্তব বিপদের মুখোমুখি হয়। এই সমাপ্তির শক্তি নিয়ে নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এমন সংলাপনির্ভর, নাটকীয় অথচ গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি খুব বেশি দেখা যায় না। তবে এই দৃশ্যের আবেগকে আরও তীব্র করে তুলতে অভিনয় ও শ্রুতিমাধ্যমের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। যাঁরা শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের কণ্ঠে এই অংশ শুনেছেন, তাঁদের কাছে মুদ্রিত বাক্যগুলির সঙ্গে অভিনয়ের স্মৃতিও জড়িয়ে থাকে। ফলে পুনঃপাঠের সময়ও পরিচিত স্বর ফিরে আসে। কিন্তু সেই অভিনয় উপন্যাসের সাহিত্যিক শক্তিকে প্রতিস্থাপন করেনি; বরং রবীন্দ্রনাথের সংলাপের মধ্যে যে নাটকীয় সম্ভাবনা ছিল, তাকে আরও উন্মুক্ত করেছে। ‘চার অধ্যায়’ পড়তে গিয়ে তাই বারবার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উপন্যাসের মাপকাঠিতে বিচার করার সময় আমরা নিজেরাই কত সঙ্কীর্ণ ধারণা নিয়ে বসে থাকি। উপন্যাস মানেই বিস্তৃত কাহিনি, অসংখ্য চরিত্র, ধারাবাহিক ঘটনা এবং সর্বজ্ঞ কথকের ব্যাখ্যা এই ধারণা থেকে বেরতে না পারলে তাঁর এই রচনার মূল্য বোঝা কঠিন। তিনি এখানে প্রচলিত ছক ভেঙে এমন কাঠামো নির্মাণ করেছেন, যেখানে কথোপকথনই প্রধান শিল্পমাধ্যম। সেই পরীক্ষায় সব জায়গায় তিনি সম্পূর্ণ সফল হয়েছেন, এমন দাবি করা যাবে না। কাহিনির কিছু দুর্বলতাও আছে, রাজনৈতিক বক্তব্যের ভারে কিছু অংশ ক্লান্তিকর হয়েছে, চরিত্র নির্মাণেও কোথাও কোথাও অসমতা দেখা যায়। কিন্তু একটি সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করতে গেলে তার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি তার অর্জনকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।

বর্তমানের পাঠকের কাছে ‘চার অধ্যায়’ আরও একটি কারণে জরুরি। রাজনৈতিক আনুগত্যের নামে ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্কোচন, মতাদর্শের প্রশ্নে অন্ধ সমর্পণ, বিরোধী মতকে শত্রু বলে চিহ্নিত করা, বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অজুহাতে ব্যক্তিগত জীবনের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা এখনও সমাজের নানা স্তরে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ যে বিপদের কথা প্রায় এক শতাব্দী আগে লিখেছিলেন, তা কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে নেই। তাঁর আপত্তি কোনও বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধও নয়। মানুষের স্বাধীন বিবেককে অস্বীকার করে এমন প্রতিটি ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে। সেই কারণেই উপন্যাসটির রাজনৈতিক বক্তব্য আজও আলোচনার দাবি রাখে। বর্তমান সময়ে বইটি পড়ার সময় একটি সতর্কতাও জরুরি। রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যকে সরাসরি চূড়ান্ত রাজনৈতিক সত্য বলে গ্রহণ করলে উপন্যাসের সাহিত্যিক জটিলতা নষ্ট হবে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার পাঠকের আছে। সেই দ্বিমত থেকেই আলোচনা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। একটি সাহিত্যকর্মের সার্থকতা শুধু পাঠককে সম্মত করানোই না, তাকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করাতেও। ‘চার অধ্যায়’ সেই কাজটি করে। এর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, কিছু ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু এর শিল্পরূপকে উপেক্ষা করা যায় না।

সাহিত্যের বাজারে প্রতিদিন নতুন বই আসে। নতুন লেখকেরা নতুন বিষয় নিয়ে পরীক্ষা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইয়ের প্রচার, পাঠ-আলোচনা এবং তাৎক্ষণিক মূল্যায়নের ভিড়ে কোনও কোনও পুরনো বইয়ের গুরুত্ব যেন ক্রমশ আড়ালে চলে যায়। অথচ সময়ের ব্যবধানে কিছু রচনা আরও বেশি করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। ‘চার অধ্যায়’ তেমনই একটি বই। একাধিকবার পড়ার পরেও এর সংলাপের অভিঘাত কমে না। বয়স, অভিজ্ঞতা ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রদের কথার নতুন অর্থ ধরা পড়ে। যে পাঠক একসময় কেবল প্রেমের কাহিনি হিসেবে বইটি পড়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর কাছে রাজনৈতিক প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আবার যিনি প্রথম পাঠে রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে বেশি ভেবেছিলেন, পুনঃপাঠে তাঁর কাছে এলা ও অতীনের ব্যক্তিগত যন্ত্রণাই প্রধান হয়ে উঠতে পারে। এই বহুমাত্রিকতাই একটি বড় সাহিত্যকর্মের পরিচয়।অনেকের দৃষ্টিতে ‘চার অধ্যায়’ নিখুঁত উপন্যাস নয়! উপন্যাসটির কাঠামো নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, কাহিনির কিছু জায়গায় দুর্বলতা ধরা পড়তে পারে, রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে পাঠকের মতভেদও হতে পারে। কিন্তু যে উপন্যাস কয়েকটি সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রেম, ভয়, ক্ষমতা, আত্মসম্মান এবং মৃত্যুর এমন ঘন আবহ তৈরি করতে পারে, তাকে সহজে বাতিল করার উপায় নেই। রবীন্দ্রনাথ এখানে কথার ভিতর দিয়ে একটি অস্থির সময়ের নৈতিক সঙ্কটকে ধরে রাখতে চেয়েছেন। ‘চার অধ্যায়’-এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তার বিষয়বস্তুর চেয়েও বেশি তার নির্মাণে। সংলাপকে কাহিনির কেন্দ্রে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, মানুষের মুখের কথাই কখনও কখনও সবচেয়ে শক্তিশালী আখ্যান হয়ে উঠতে পারে। প্রেমের স্বীকারোক্তি যেমন রাজনৈতিক ঘোষণার সমান তীব্র হতে পারে, তেমনই একটি প্রত্যাখ্যানের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে গোটা জীবনের প্রতিবাদ। আর দূরের একটি হুইস্‌ল কখনও কখনও দীর্ঘ উপন্যাসের সমস্ত বক্তব্যকে এক মুহূর্তে সংহত করে দিতে পারে। এই শিল্পসাফল্যই ‘চার অধ্যায়’-কে সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করার ক্ষমতা দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ উপন্যাস লিখতে পারতেন কি না, সেই পুরনো বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি প্রশ্ন হল, তাঁর এই উপন্যাসের মতো আর কতগুলি রচনা বাংলা সাহিত্যে তৈরি হয়েছে, যেগুলি এত বছর পরেও পাঠকের হৃদস্পন্দন বদলে দিতে পারে? উত্তরটি খুব সহজ নয়। কিন্তু ‘চার অধ্যায়’ যে সেই বিরল তালিকার অন্যতম, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ সামান্যই।🍁

 

 

🍂কবিতা

 

সুতীর্থ নায়েক -এর একটি কবিতা 

তোমার আমার জানালা থেকে 

একটা জানালাই তো
তাতেই রাত জেগে থাকে
তাতেই তুমি নেই, কিন্তু তোমারই ছায়াটুকু বাঁচে

এখন সমস্ত কিছু ব্যর্থ
আমার ঠোঁট ছুঁতে পারে না
যেভাবে তুমি
ছুঁতে…

চাঁদ? ওটা তো অজুহাত
চুপচাপ অজুহাত…

আসল স্তব্ধতা তুমি
কোথাও তুমি নেই
আমার বুকের ভেতর এত শব্দ ভেঙে যায়

এখন আর কোনও প্রার্থনা নেই
শুধু এই রাত দাও
যে রাতে তুমি থাকবে, চাঁদ থাকবে না

মৃত্যুর মত গভীর রাত

 

 

মোহনচাঁদ সেনগুপ্ত -এর একটি কবিতা

বিকেল অথবা ধুলোর নকশা 

কে নেমেছে রাস্তার ধারে, তিনটে চড়ুই…
একটা সাইকেল চলে গেল ঘণ্টি বাজল না!

কে মাটির কথা শোনে
মাটি শোনে কার কথা, জানো।

এই যে চায়ের কাপে শোক, কফির ছায়া, কফিতে চায়ের।
টেবিলে একটি পিঁপড়ে, ও কোথাও যাচ্ছে না।

দূরে, হাওয়া, একটিই নাম, তুমি নও?
তোমার নামের মতো কিছু!

সব স্থির, সব অপেক্ষায় না,
শুধু বিকেলবেলা বসে আছে,
আমার পাশের চেয়ারে।

 

 

পুণ্যব্রত মুখোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

শ্লোক

পুরাতাত্ত্বিক সবকিছু দূর করে দেব একদম।
ভাঙাচোরা পার্টিক্যালে স্তুপাকার হয়ে থাক।

পড়ে রইল ছিন্নভিন্ন আমার কবিতা।
টিকটিকির কাটা ল্যাজের মত
ছটফট করছিল ছেঁড়া অক্ষরগুলো।
একটা অস্ফুট আর্তনাদ আমি শুনতে পেলাম।
কী জানি কী সব বলছিল ওরা।
আমি মুখ ফিরিয়ে চললাম ভিন্ন পথ ধরে।

একটা হু-হু বাতাস হি-হি করে হেসে
দুরদার সব ফেলে দিয়ে শতাব্দী প্রাচীন বটগাছটার শাখা দুলিয়ে দিয়ে চলে গেল, আমিও ছিটকে গিয়ে পড়লাম ওই গাছের ঠিক নিচটায়।
চিৎকার করে বললাম, আমি পুরাতন কবিতা সব ছিঁড়ে ফেলেছি। পুরাতন সব কিছু বাদ দিয়ে আমি আবার নতুন করে কবিতা লিখতে চাই।
হু-হু বাতাস গাছের পাতার কানে ফিসফিস করে
আমার বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে গেল।
আমি চিৎকার করে উঠলাম।
গাছ বলল, তোমাকে আমি কবিতা লিখতে শেখাব
কিন্তু তার আগে তোমাকে কাঁদতে হবে।
না, না, আমি হাসতে চাই, কাঁদতে চাই না আমি।
তুমি কিচ্ছু জাননা, আমিই সৃষ্টির ধারক বাহক,
আমি জানি পৃথিবীর প্রথম কবিতা ছিল শোক।
শোক থেকেই শ্লোক আওড়েছিলেন মহর্ষি বাল্মীকি।
তাই শুনে আমি সারারাত কাঁদলাম- কাঁদলাম।
কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলের সাগর হয়ে গেল।
ওই জলে আমি ভেসে গেলাম।

সকালবেলা দেখলাম সাগর সৈকতে আমাকে ঘিরে অসংখ্য মানুষ, ওরা বলছে একটা লাশ ভেসে এসেছে।

লাশ? কিন্তু এই তো আমি বেঁচে আছি, দিব্যি আমি সব দেখতে পাচ্ছি!
সাগর আমাকে সেই ধংসস্তুপের কাছে এনে ফেলেছে-  সত্যিই সাগর কিচ্ছু নেয় না, সব ফিরিয়ে দেয়।

আমি নিঃসাড় পড়ে ছিলাম।
সৎকার করবে বলে দূর থেকে হু-হু বাতাস ছুটে এল, তারপর দুহাত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা কবিতার টুকরোগুলো দিয়ে আমার কবিতার নিচেই আমার সমাধি দিয়ে গেল।

 

দীপান্বিতা রায় সরকার -এর তিনটি কবিতা

মুসাফির নামা

অত‌এব সে তোড়ন বন্ধ,
সেই দশদিকে দরবেশ হয়।
বন্ধুতো যারা রোশনাই,
মাঝপথে কেউ কারো নয়।

এই যে মুসাফির নামা,
একলা অন্ত আদি পথ।
সময়ের সংযত রেখা
হিসেব ভোলাতে তৎপর।

তারপর‍ও বাঁধি ঘর,
বুননের রোজনামচায়।
দক্ষ সে একলা নাবিক,
লিখে ফেলে মাস্তুলে জয়।

 

মৃত্যু জানে

এই আগুনেই সহজ বড়,
ভরিয়ে নিই এই উষ্ণ প্রহর আলিঙ্গনে।

ধীর অতি ধীর নদীর মতো,
কোন সংজ্ঞায় সহজতর জীবন মানে!

এইখানে কালের বোনা স্বরলিপি,
যে ভ্রামক ভুলিয়ে রাখে সুকৌশলে।

যে মায়াবন আলোর কেতন উড়িয়ে দিলো,
ঝাপসা হলো শাশ্বত এক ধ্রুবক কথা।

সেসব কথার বৃত্ত বলয় সত্য বলে!
সে পরিহাস মৃত্যু জানে।

 

প্রলয় না প্রণয়

স্বপ্ন বিষাদের মাঝে নির্জন সুখে,
যেখানেই থেমে গেল সমস্ত ভ্রামক।

ওরা প্রণয়ের কথা বলেছিলো!
না প্রলয়ের কথা?

আসলে তো একি,
পৃথিবীর কঠিনতম শ্লোক।
যেন নশ্বর আলোর পদরেখা।

এই পড়ন্ত দুপুর, মসৃণ শোভা
জীবনের শেষ কথাগুলোর মতো সরল কিছু।
কি বলেছি তাকে? প্রলয় না প্রণয়ের কথা।

 

সমীরণ রায় -এর একটি কবিতা 

রোদসী

রোদসী,
আমাদের প্রেম কয়েকটি ঋতুর,
বিচ্ছেদ দীর্ঘ অনন্তের।
তুমি নাকি কবিতা লেখো—
আমি ব্যাকরণ খুঁজি শূন্য গলিতে।

ফগলাইটে ধরা পড়ে ততটুকুই পথ,
বাকিটা অধরা তুমি।

ক্যালেন্ডারে কত বসন্তের মৃত্যু হলো,
অথচ কবিতা আর ব্যাকারণের মিল হলো না।

তুমি অসমাপ্ত অধ্যায়।
আমি প্রথম পাতায় আটকে আছি…
তোমাকে ভালোবাসার বানান শিখি!

আলোকবর্ষ দূরত্বেও
তোমার মীন আঁখি চেনা।
এ জনমে ডোবা হল না তোমার অতলে।

 

 

রেহানা বীথি -এর তিনটি কবিতা 

মানুষের জ্যামিতি

বনবন করে ঘুরতে থাকা লাটিম
হাতের তালুতে তুলে নিতে চেয়েছি বহুবার
পারিনি

এ শৈশব-বেদনা
লিখে রেখেছিলাম একটি পৃষ্ঠায়
বেদনার ভার বইতে না পেরে
পৃষ্ঠাটি ভাঁজ করে নিয়েছিল নিজেকে

এখন আর লাটিম দেখি না
দেখি- নেমে পড়েছি পথে
আর আমাকে কেন্দ্রে রেখে
চক্রাকারে ঘুরে চলেছে
একটি রঙিন পেন্সিল…

 

একটি বিচ্ছেদী গান

এত পাখি উড়ে যাচ্ছে!
এত পাখি পড়ে যাচ্ছে!
এত পাখি ঘুরে যাচ্ছে!

কেন?

ওরা ওড়ে
কিন্তু, পড়ে যায় আঘাতে
ওরা ঘুরে যায় বিচ্ছেদে

আমরা উড়ি না
আমাদের উড়োজাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত
তবে আমরাও ঘুরে যাই

বিচ্ছেদের বেদনায় কাতর হলে …

 

বৃত্তের বাইরে

চেয়ারের নিচে
হাঁটু ভেঙে পড়ে আছে রোদ
দেখছি,  খুব কাছ থেকেই দেখছি
কিন্তু প্রবল আলস্য হয়ত আমাকেও ভেঙে ফেলেছে

আমি রোদের পাশে না গিয়ে
চুপচাপ বসে রইলাম
অথচ আমার শীতকাতর পা-জোড়া জমে বরফ
যদি চেয়ারটায় গিয়ে বসি
ওই হাঁটুভাঙা রোদই
আমার পা-জোড়ায় উত্তাপ ছড়িয়ে দেবে
কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না

মাঝে মাঝে এমনই আলস্য
কেন যে প্রবলভাবে চেপে ধরে!
এই আলস্যই আমাকে প্রেম থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে
ভীষণ ধীরে এবং একেবারে সচেতন আলস্যেই
সরে গিয়েছি প্রেম থেকে
এই আলস্যে কি ঘৃণা মিশে আছে?
মধ্যবর্তী প্রেমে কি ঘৃণা মিশে যায় ধীরে ধীরে?
অবহেলা? মিশে যায় ধীরে ধীরে!

প্রশ্নগুলো উত্তরের কাছাকাছি এসে
থমকে দাঁড়াল
তারপর বলল-
বহু বহুদিন তুমি কাঁদোনি সেভাবে
একটু কাঁদবে এখন?

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস  
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী 

৩৫. 

চারিদিকে মাইকের আওয়াজ আর ঢাকের তালে
আজ মহা ষষ্ঠীর দিনে মেতে উঠেছে উৎসব প্রিয় জাতি। শুধু তিথি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে উৎসবের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো মনের ভেতরে জড়ো করে উপভোগ করার চেষ্টা করছে। আজ মনটা ভাল নেই। পঞ্চমীর দিন কাগজি মাসি চলে গেল। কবে আসবে ঠিক জানা নেই। সব কাজগুলো এখন তিথিকেই করতে হবে। যদিও একটা দিক বাঁচোয়া
পুজোর কটা দিন রান্নাবান্না বন্ধ। দুপুরে বাররোয়ারিতে খাওয়ানো হবে। তাতে কি হয়েছে রান্না তো করতে ই হবে। শাশুড়ি মার জন্য, পুচুর জন্য, বুবুনের জন্য। আর পুজো মানেই হাজারও কাজ কাজের লোকের কামাই। তিথির ছুটি বলে কিছু থাকে না। এসব ভাবনার মাঝেও লতাদির কথাগুলো কুরে কুরে খায়। কোথায় যেন একটা ক্ষতের জায়গা সৃষ্টি হয়েছে।

মাসি সেদিনও অঝোরে কেঁদেছিল আর বলেছিল বৌমা, ভগবান কী এক জীবনেই এত দুঃখ কষ্ট লিখতে পারেন একটুও কি সুখের মুখ দেখতে পারবে না! কি এমন, কী অন্যায় কাজ করেছিল লতা? এই কাজে যে নেমেছিল সেই কাজে কী তার সায় ছিল? একাজে তো সে-নিজের থেকে আসেনি। তবে কেন এত ভগবান এত কষ্ট লিখেছে বলতে পারো বৌমা?
তিথির মুখে ও ভাষা ছিল না।

কাগজি মাসি বলছিল, শেষের জীবনে লতা অনেক টাকা রোজগার করেছে বটে কিন্তু সুখ, শান্তি কোনওটাই ছিল না।
লতার নাতি শেষ জীবনে লতাকে কাঁদিয়ে ছেড়েছে। লতা যে তিল তিল করে নিজের শরীর বিক্রি করে শুধু মাত্র একটা পরিবার চেয়েছিল, যদিও সেই পরিবারে স্বামীর সুখ সে কখনও পায়নি। গলির ভেতরে জং ধরে গিয়েছিল তার জীবন। তার মধ্যে থেকেই ক্ষণিক সন্তান সুখ লাভ করেছিল। সে সন্তান যখন তাকে ছেড়ে চলে যায় চিরতরে না ফেরার দেশে। তার একমাত্র শিবরাত্রি সলতে নাতিটিকে ঘিরে তারপর পরবর্তী জীবন আবর্তিত হওয়ার কথা ছিল।ভেবেছিল, তার নাতিই তার একমাত্র শিবরাত্রি সলতে। নাতিকে ঘিরে সে কোজাগরী আকাশ দেখতে চেয়েছিল, সে এক বুক দখিনা বাতাস নিতে চেয়েছিল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চেয়েছিল জীবনের পরবর্তী কতগুলি অধ্যায়গুলিতে। যে অধ্যায়ের ক্যানভাসে শুধুই ফুটে থাকবে তার জীবনের অত্যন্ত পরমপ্রাপ্তি তার নাতির সুরক্ষা। নাতিরকে ঘিরে তার ভালবাসা। প্রথমদিকে তার সেই স্বপ্ন মনে হচ্ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। বড় হতেই সে গুড়ে বালি। নাতির ভেতরের বদ রক্ত যেন জেগে উঠেছিল। লতাকে দেখলেই সব সময় কেমন যেন তার মনে হতো, কোথায় যেন একটা প্যারা লাগছে। লতা ভেবে পায়নি, তার কারণ খুঁজে পাবার চেষ্টা করেছে! কিন্তু না সে বুঝেই উঠতে পারেনি। আসলে গলিতে তো অনেক লোক আসে জীবনটাকে উপভোগ করার জন্য, কোনও অসুরের জৈবিক্রবৃত্তি নিবৃও করার জন্য লতার শরীরটাকে ব্যবহার করা হয়েছিল তার ই কিছু বীজ ছড়িয়ে দিয়েছিল লতার উর্বর জমিতে। অপেক্ষায় ছিল আলো বাতাস আর পুষ্টির। যথাযথ সময়ে বেড়ে উঠেছিল ছোট্ট চারা গাছ। যখন বনস্পতিতে পরিণত হল, তখন তার স্বরূপ প্রকাশ পেল। মাসি বলেছিল, লতার সেই জীবন ভীষণ বেদনাদায়ক। বৌমা আমি তো তবু অন্যের বাড়িতে কাজ করে খেতে পারছি, ওর সে অবস্থাও ছিল না শরীরটা ভঙ্গুর হয়ে গেছিল। তার শেষ জীবনের কামাই দিয়ে যে বড় একটা বাড়ি করেছিল। সেই বাড়ি থেকেই তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তিথি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, —আচ্ছা কাগুজি মাসি তাহলে সে কোথায় গেছিল?
—শেষ জীবন ভিক্ষা করতে হয়েছিল। তাকে মারণব্যাধির মরা কামড় তাকে শেষ করে দিয়েছিল।
কথাগুলো বলতে বলতে কাগুজি মাসির চোখ দিয়ে জল পড়ছিল টপটপ করে।
—এতটাই মর্মান্তিক জানো, আমি যে ওকে সাহায্য করব আমার সে সামর্থ্যও ছিল না। তবুও আমি মাঝে মাঝে ওকে খাবার কিনে দিয়ে আসতাম।
শেষেবার রাস্তায় ফুটপাতে দেখা গেল, পড়ে আছে। চিরনিদ্রায় শায়িত লতা।
তিথিরও চোখের জল বাগ মানেনি। সব থেকে বেশি প্যাথেটিক লেগেছিল কাগজি মাসির কথায় তার নাতি তার শেষকৃত্য পর্যন্ত করতে আসেনি। কাগুজে মাসি তার শেষকৃত্য করার দায়িত্বে ছিল।
মাসি সেদিনও অঝোরে কেঁদেছিল আর বলেছিল বৌমা, ভগবান কী এক জীবনেই এত দুঃখ কষ্ট লিখতে পারেন একটুও কি সুখের মুখ দেখতে পারবে না! কি এমন, কী অন্যায় কাজ করেছিল লতা? এই কাজে যে নেমেছিল সেই কাজে কী তার সায় ছিল? একাজে তো সে-নিজের থেকে আসেনি। তবে কেন এত ভগবান এত কষ্ট লিখেছে বলতে পারো বৌমা?
তিথির মুখে ও ভাষা ছিল না।
—তবে যাই বল বৌমা, আমি লতার ওই কাজটা করে একটু ভেতরে শান্তি পেয়েছিলাম। লতা তো তাকে অনেক সাহায্য করেছে লতার জন্য তো সেইটুকু করতেই পারে।
কাগুজি মাসির কথা শুনে তিথি বলেছিল,
—একদমই ঠিক কাজ করেছ।
সব থেকে অবাককাণ্ড কি জানো? যারা ওই গলিতে আনন্দ ফূর্তি করার জন্য আমাদের মতো নারীদের দেহটাকে ব্যবহার করে ওখান থেকে বেরোনোর পরেই নিজেদেরকে কেমন ভদ্র সভ্য বলে চিহ্নিত করে। নইলে লতাকে ভোগ করেনি এমন এই শহরের কেউ নেই যে তার রূপে পাগল হয়নি। অথচ তার যখন এমন পরিণতি হল তখন তারাই নাক সিটকেছে। এই হচ্ছে ভদ্র সমাজ! লুকিয়ে গলিতে গিয়ে আনন্দ ফূর্তি করবেন মেয়েদের সঙ্গে বেহাল্লাপনা করব, সব করব ওখান থেকে বেরোনোর পরেই গঙ্গা জলে নিজের শরীরটাকে ধুয়ে নিয়ে পবিত্র হয়ে গেল!
তিথির মনে আছে লতাদির এই কথাগুলো বলার পর সেদিন কাগজি মাসি বিছানায় শুয়ে ছিল খাবার খায়নি। অনেকবার তিথি অনুরোধ করেছে, কিন্তু সে বলেছে আমাকে এই সময়ে বিরক্ত কোরো না বৌমা আমাকে একটু একা থাকতে দাও।
আসলে এই যে নারীরা যাঁরা হারিয়ে গিয়েছে এই সমাজে হারিয়ে ফেলেছে, এই অমূল্য রত্নগুলোকে যদিও আজকের দিনে তারা অমূল্য রত্ন নয় গলির ভেতরে থাকা মরচে ধরা ঘুম পোকা!
তিথি ও আর কাগুজি মাসিকে ঘাটায়নি। এসময়টুকু তার একান্ত দরকারী নিজেকে বোঝার জন্য। কাগজি মাসিও তো এই জীবনের সঙ্গে লড়াই করেছে। নারীদের জীবন বোধহয় এইরকমই! যে সমাজের জন্য তারা এই অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যায় তাদের জীবনে আলোর উৎস বলে আর কিছু থাকে না। কোনও দেবদূত এসেও বোধ হয় তাদেরকে আর উদ্ধার করতে পারে না। এসব ভাবতে ভাবতেই একদিন কাগজি মাসিকে বলেছিল,
—আচ্ছা মাসি জানো, ওই গলি থেকে আমার কাছে একটি মেয়ে পড়তে এসেছিল।
সেদিন কাগজি মাসী অবাক হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল,
—কী নাম তার?
তিথি বলেছিল,
—মেয়েটির নাম কবিতা।
—কবিতা!
কাগুজি মাসি অবাক হয়ে যায়।
দিয়ে আর কোনও কথা বলেনি তারপর বলেছিল,
—ওর মায়ের কথা আমি একদিন-অন্যদিন বলব তোমায়। তবে মেয়েটি যে তোমার কাছে পড়তে এসেছিল তুমি ওকে পড়তে নাওনি?
—কেন নেব না মাসি? আমি তো প্রথমত ওর কথা জানতামই না, পরে শুনেছিলাম…
—আর শোনার পর তোমার কী মনে হয়েছিল?
—কী মনে হবে, আমার কাজ শিক্ষা দান করা। আমরা তো চাই এই অন্ধকার গলিতে এই শিক্ষার আলো প্রবেশ করুক।
—বৌমা!
—কেন মাসি আমি কী ভুল করেছি?
—না আমি যত তোমাকে দেখছি তত তোমার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে।
আজ মাসি নেই কিন্তু আজকেই লতাদির কথাগুলো বসে বসে সে লিখছে। ব্যালকনি থেকে, অনেক আগেই সে মাসির ঘরটাতে বসেই লিখতে শুরু করেছিল। কিন্তু আর লিখতে পারল না। তার পুচুরানী এসে তাকে তাড়া দিয়ে গিয়েছে। ওদিক থেকে বুবুনের চিৎকার, মাম মাম মাম… লেখা থামিয়ে তিথি সাড়া দিল,
—হ্যাঁ, যাই বাবা।
—মাম মাম আমাকে পাস্তা বানিয়ে দাও।
—কেন?
—আজকে সানডে মাম মাম
—ওকে বেটা।
—আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার ভুল হয়ে গিয়েছে, স্যরি।
তিথি একগাল হেসে পুচুর গাল দু’টো টিপে দিল। তারপর বলল,
—তুমি কি খাবে সোনা মা?
ওতো লেজ নাড়তে নাড়তে তিথির সঙ্গে রান্নাঘরে গেল। তিথি দুধ রুটি মেখে ওকে দিল।
ওকি সুন্দর লেজ নাড়াতে নাড়াতে খাচ্ছিল, এই যে এদের আনন্দ সহকারে খাবার খাওয়ার দেখলে তিথির বুকটা ভরে ওঠে। আহা! সব মানুষ যদি এরকম করে এঁদেরকে ভালবাসত, তাহলে বোধহয় পৃথিবীটাই অন্যরকম হতো! 🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

🍂বইপত্র | ১

 

গোষ্ঠীটির পুরুষ সদস্যদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেখা যায় অদ্ভুত বৈপরীত্য। তাঁদের প্রেমিকা, বাগদত্তা কিংবা গোপন সম্পর্কের নারীরা প্রত্যেকেই প্রিয় পুরুষের শিল্পকর্মের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত। কিন্তু যে বিমূর্ত শিল্পকে কেন্দ্র করে তাঁদের প্রেমিকদের এত আত্মগরিমা, সেই শিল্পের ভাষা তাঁরা নিজেরা কতটা বোঝেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়! নারীদের এই অবস্থান উপন্যাসে কেবল প্রেমের পার্শ্বচরিত্রই হয়ে ওঠেনি। তা শিল্পীর আত্মমুগ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের অনুভবের মধ্যবর্তী দূরত্বকে তা উন্মোচন করেছে।

 

শিল্পের মুখোশে অপরাধের আবছায়া আর ক্ষমতার দম্ভে মানুষের পতন

দেবব্রত সরকার

জাপানি গোয়েন্দাসাহিত্যের পরিচিত ছক থেকে বেরিয়ে এসে যে উপন্যাস পাঠককে অপরাধের পাশাপাশি সমাজ, শিল্প, প্রেম এ মানুষের আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে, সেইকো মাতসুমোতোর (Seicho Matsumoto) ‘ইন্সপেক্টর ইমানিশি ইনভেস্টিগেটস’ (Inspector Imanishi Investigates) তেমনি একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। নামের মধ্যে গোয়েন্দার উপস্থিতি থাকলেও এই উপন্যাসকে নিছক খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটনের কাহিনি বলে দাগিয়ে দেওয়া যাবে না। অপরাধের সূত্র ধরে লেখক প্রবেশ করেছেন যুদ্ধোত্তর জাপানের সামাজিক মনস্তত্ত্বে। সেখানে শিল্পের নামে আত্মপ্রচার, বুদ্ধিজীবী পরিচয়ের আড়ালে সুবিধাবাদ, প্রেমের নামে অধিকারবোধ আর ভাবমূর্তি রক্ষার তাগিদে মানবিকতার বিসর্জন, এসবই জায়গা করে নিয়েছে। অপরাধের তদন্ত যত এগোয়, ততই পাঠকের সামনে খুলে যায় এমন এক-একটি সমাজের ছবি, যেখানে মানুষের প্রকৃত পরিচয়ের চেয়ে তার নির্মিত পরিচয়ের দাম অনেক বেশি।

এই উপন্যাসের নারীদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশও যথেষ্ট। শিল্পী পুরুষদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তাঁদের আত্মপ্রতিষ্ঠার সঙ্কট ও নৈতিক দুর্বলতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপ্রতারণার শিকার হয়ে ওঠেন। তাঁদের নিজস্ব শিল্পবোধ, সামাজিক অবস্থান কিংবা স্বাধীন আকাঙ্ক্ষার পরিসর কতটা বিস্তৃত, তা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান প্রত্যাশিত ছিল। নারীরা শিল্পীদের মুগ্ধ দর্শক, প্রেমিকা অথবা সম্পর্কের জটিলতার শিকার এই পরিচয়ের বাইরে কতটা উঠে আসতে পারেন, সেই প্রশ্ন থেকে যায় নাকি?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পনেরো বছর পরের জাপান এই উপন্যাসের সময়কাল। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু তার অভিঘাত থেকে সমাজ তখনও পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। দেশ নতুন করে নিজের অবস্থান তৈরি করছে। বদলে যাওয়া রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে পুরনো মূল্যবোধের জায়গায় জন্ম নিচ্ছে নতুন চিন্তা, নতুন শিল্পবোধ ও নতুন সামাজিক আকাঙ্ক্ষা। এই পরিবর্তনের মধ্যে তরুণ শিল্পীদের একটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী গোষ্ঠী হয়ে উঠেছে উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ‘ন্যুভে’ (Nouvelle) নামে পরিচিত এই আঁভা-গার্দ গোষ্ঠীর সদস্যরা মূলত তরুণ পুরুষ শিল্পী। বয়স বাইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে। তাঁদের শিল্পচর্চা, রাজনৈতিক অবস্থান, প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি বিরাগ তাঁদের আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। টোকিওর বাইরে ওসাকা, আকিতা ও জাপানের দূরবর্তী মফসসলেও তাঁদের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিদ্রোহের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের আচরণের ফারাকই উপন্যাসের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিকগুলির একটি। যাঁরা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাঁরাই নিজেদের চারপাশে আরেকটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ফেলেন। যাঁরা ক্ষমতার দম্ভকে প্রত্যাখ্যান করেন, তাঁরাই নিজেদের শিল্পীসত্তার মর্যাদা রক্ষার নামে অন্যের প্রতি ক্ষমতার প্রয়োগে পিছপা হন না। ফলে তাঁদের বিদ্রোহ অনেক সময়েই হয়ে ওঠে আত্মপ্রতিষ্ঠার কৌশল। প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধিতা করতে করতে তাঁরা নিজেরাই এমন বৃত্ত গড়ে তোলেন, যেখানে প্রবেশের অধিকার সবার নেই, প্রশ্ন করার স্বাধীনতাও সীমিত। এই দ্বিচারিতাকে লেখক আলাদা করে বক্তৃতার বিষয় করেননি। চরিত্রদের ব্যবহার, সম্পর্ক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তা সামনে এনেছেন।

গোষ্ঠীটির পুরুষ সদস্যদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেখা যায় অদ্ভুত বৈপরীত্য। তাঁদের প্রেমিকা, বাগদত্তা কিংবা গোপন সম্পর্কের নারীরা প্রত্যেকেই প্রিয় পুরুষের শিল্পকর্মের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত। কিন্তু যে বিমূর্ত শিল্পকে কেন্দ্র করে তাঁদের প্রেমিকদের এত আত্মগরিমা, সেই শিল্পের ভাষা তাঁরা নিজেরা কতটা বোঝেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়! নারীদের এই অবস্থান উপন্যাসে কেবল প্রেমের পার্শ্বচরিত্রই হয়ে ওঠেনি। তা শিল্পীর আত্মমুগ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের অনুভবের মধ্যবর্তী দূরত্বকে তা উন্মোচন করেছে। শিল্পীর কাজকে ভালবাসা আর শিল্পীর তৈরি ভাবমূর্তির প্রেমে পড়া যে এক বিষয় নয়, সেই তফাতও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই উপন্যাসে ‘ক্লাব বওনহিয়ো’ (Club Bonheur) একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিসর। এটি এমন একটি নৈশ আসর, যেখানে ধনী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মানুষের পাশাপাশি হাজির হন ন্যুভে গোষ্ঠীর শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা। সেখানে পানীয় ও খাবার পরিবেশন করেন তরুণীরা। তাঁদের চোখে শিল্পীরা আকর্ষণীয়, তাঁদের বিদ্রোহী মনোভাবও মুগ্ধতার কারণ। কিন্তু মাতসুমোতো এই সম্পর্কের একতরফা ছবিটি আঁকেননি। শিল্পী পরিচয়ে পরিচিত পুরুষদেরও ওই মেয়েদের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে। সেই আকর্ষণ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাঁদের সতর্কতা অনেক বেশি। নিজেদের বুদ্ধিজীবী ভাবমূর্তি, সামাজিক অবস্থান কিংবা শিল্পীসুলভ গাম্ভীর্য অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য তাঁরা ব্যক্তিগত বাসনাকে আড়াল করতে চান। এই গোপনীয়তার মূল্য দিতে হয় এমন একজন তরুণীকে, যে একজন শিল্পীর ভালবাসাকে নিঃশর্ত বলে বিশ্বাস করেছিল।

এখানেই উপন্যাসটি গোয়েন্দাকাহিনির প্রচলিত সীমা অতিক্রম করে। একজন মানুষের অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি লেখক অনুসন্ধান করেন সামাজিক ভণ্ডামির প্রকৃতি। শিল্পের নামে যে উচ্চমার্গীয় পরিচয় নির্মাণ করা হয়, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কামনা, স্বার্থ এবং কাপুরুষতা লেখক তুলে ধরেছেন প্রায় নির্বিকার ভঙ্গিতেই। কোথাও চরিত্রদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগের পাহাড় গড়ে তোলেননি। তাঁদের নিজেদের আচরণই তাঁদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। এই সংযম লেখকের বড় গুণ। কারণ, লেখক যদি প্রতিটি অসংগতির পাশে দাঁড়িয়ে পাঠককে তার নৈতিক ব্যাখ্যা বুঝিয়ে দিতে চান, তাহলে তো লেখার শক্তি কমে যায়। মাতসুমোতো কিন্তু সেই ফাঁদে পা দেননি।

মাতসুমোতোর এই নির্লিপ্ত বয়ানকে দুর্বলতা ভেবে ভুল করলে চলবে না। এই সংযত ভাষার আড়ালেই দেখা যায় তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। ন্যুভে গোষ্ঠীর সদস্যরা যে নিজেদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলে দাবি করেন, সেই পরিচয় তাঁদের কাছে ক্রমে এক ধরনের সামাজিক পুঁজি হয়ে ওঠে। তাঁদের কাছে বিদ্রোহও একটি প্রদর্শনযোগ্য গুণ। তাঁরা নিজেদের আলাদা প্রমাণ করতে চান, আবার সেই আলাদা পরিচয়ের স্বীকৃতিও প্রত্যাশা করেন। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান, সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই তাঁরা সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা আদায় করতে চান। এই আত্মবিরোধিতা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জাপানি শিল্পজগতের সমস্যা নয়। যে কোনও সমাজেই নতুন চিন্তার দাবিদার গোষ্ঠী নিজেদের চারপাশে অনুগামী, প্রশংসক ও সুবিধাভোগীদের বলয় তৈরি করলে একই অসুখ দেখা দিতে পারে। এই জায়গায় উপন্যাসটির সঙ্গে সমকালীন শহুরে জীবনের তুলনা টানার সুযোগ মেলে। ১৯৬০ সালের জাপান এবং ২০২৫-২৬ সালের আমাদের শহর অবশ্যই এক নয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শিল্পের পরিসর, সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চরিত্রে বিস্তর পার্থক্য আছে। কিন্তু ভাবমূর্তি তৈরির প্রতিযোগিতা, ক্ষমতাবানদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও নিজের সুবিধার জন্য নীতির সঙ্গে আপস করার প্রবণতা কোনও একটি দেশের একচেটিয়া সম্পত্তি না। আমাদের শহরেও শিল্প-সংস্কৃতির নামে নানা বৃত্ত তৈরি হয়। সেখানে কে কতটা সৃষ্টিশীল, তার চেয়ে কখনও কখনও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কে কার ঘনিষ্ঠ, কার সঙ্গে ছবি তুলেছে, কোন মঞ্চে উপস্থিত হয়েছে কিংবা কোন প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রশ্রয় পেয়েছে! বিদ্রোহের পোশাক পরে ক্ষমতার দরজায় কড়া নাড়ার এই প্রবণতা মাতসুমোতোর উপন্যাসকে সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে পাঠযোগ্য করে তোলে।

এই উপন্যাসের নারীদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশও যথেষ্ট। শিল্পী পুরুষদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তাঁদের আত্মপ্রতিষ্ঠার সঙ্কট ও নৈতিক দুর্বলতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপ্রতারণার শিকার হয়ে ওঠেন। তাঁদের নিজস্ব শিল্পবোধ, সামাজিক অবস্থান কিংবা স্বাধীন আকাঙ্ক্ষার পরিসর কতটা বিস্তৃত, তা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান প্রত্যাশিত ছিল। নারীরা শিল্পীদের মুগ্ধ দর্শক, প্রেমিকা অথবা সম্পর্কের জটিলতার শিকার এই পরিচয়ের বাইরে কতটা উঠে আসতে পারেন, সেই প্রশ্ন থেকে যায় নাকি? অবশ্য এই সীমাবদ্ধতাকে শুধুই লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা বললে তৎকালীন জাপানি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক কাঠামোর প্রভাবও উপেক্ষা করা হবে। ১৯৬০ সালের শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের গোষ্ঠীতে নারীর অনুপস্থিতি অথবা, পুরুষ শিল্পীদের চারপাশে নারীদের অবস্থান নিজেই একটি সামাজিক বাস্তবতার পরিচয় বহন করে।
অন্যদিকে, গোয়েন্দাকাহিনির দিক থেকেও ‘ইন্সপেক্টর ইমানিশি ইনভেস্টিগেটস’ পাঠকের কাছে আলাদা প্রত্যাশা তৈরি করে। কারণ, অপরাধের রহস্য এখানে কে খুন করেছে, কীভাবে করেছে, কিংবা কোন সূত্র ধরে অপরাধীকে চিহ্নিত করা যাবে, এই ক’য়েকটি প্রশ্নে আটকে থাকে না। তদন্তের পথে জাপানের নানা অঞ্চল, শহর ও মফসসলের জনজীবন এই উপন্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কামাতা স্টেশন থেকে ওসাকা, আকিতা -এর ভৌগোলিক বিস্তার কাহিনিকে একটি জায়গায় আটকে থাকতে দেয় না। হাইকু কবিতা, শিল্পচর্চা আর তৎকালীন সাংস্কৃতিক আবহও রহস্যের পরিসরকে সমৃদ্ধ করে। ফলে পাঠক শুধু অপরাধের সমাধান জানার জন্য পাতা ওলটান না, অপরাধের পেছনে থাকা সমাজটিকেও চিনতে শুরু করেন। কি অসাধারণ না?

এখন আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এই ধরনের গোয়েন্দাকাহিনি পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন জাগতেই পারে। সিসিটিভি, ডিজিটাল নজরদারি আর আধুনিক ফরেনসিক ব্যবস্থার বিস্তারের আগে অপরাধের তদন্তের ধরন ছিল অনেকটাই আলাদা। এখন যে ঘটনার সূত্র ক’য়েক মিনিটের মধ্যে ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়তে পারে, অতীতে তার সমাধানে প্রয়োজন হত দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ, মানুষের বক্তব্যের অসংগতি খুঁজে বের করা ও বিচ্ছিন্ন তথ্যের মধ্যে গিয়ে যোগসূত্র স্থাপন। এই পরিবর্তন গোয়েন্দাসাহিত্যের লেখকদের কাজও কঠিন করেছে। কারণ, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা রহস্যের অনেক পুরনো কৌশলকে অকার্যকর করে দিতে পারে। কিন্তু মাতসুমোতোর উপন্যাসের মূল্য শুধু অপরাধের কৌশলগত জটিলতায় নয়। মানুষের চরিত্র, সামাজিক অবস্থান কিংবা আত্মপরিচয়ের সঙ্কট নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান প্রযুক্তির পরিবর্তনে পুরনো হয়ে যায় না। উপন্যাসটির ইংরেজি সংস্করণ ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে পেঙ্গুইন ক্লাসিকস (Penguin Classics) থেকে বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পাঠপরিসরে এর গুরুত্ব আরও বাড়ে। প্রকাশনার পরিচিতি বা ক্লাসিকস তালিকায় স্থান পাওয়া কোনও বইয়ের সাহিত্যিক সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না। পাঠের পর তার নিজস্ব শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বিচার করাই জরুরি। এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে তার বড় শক্তি হল, গোয়েন্দা কাহিনির নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে সমাজের নৈতিক অসুখকে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া, যাতে একটি অন্যটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া মনে হয় না। অপরাধের রহস্য অথবা শিল্পীসমাজের অন্তর্লীন সমস্যা পাশাপাশি এগিয়েছে।

এক্ষেত্রে বইটির প্রতিটি দিক সমানভাবে সফল, এমন দাবি কিন্তু করা যায় না। শিল্পী গোষ্ঠীর মানসিকতা ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ যতটা ধারাল, নারীদের স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতার নির্মাণ ততটা বিস্তৃত না। আবার গোয়েন্দা কাহিনির গতি ও সামাজিক বিশ্লেষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও পাঠকের প্রত্যাশা ভিন্ন হতে পারে। যাঁরা দ্রুতগতির রহস্য, পরপর চমক ও শেষ মুহূর্তের নাটকীয় সমাধান চান, তাঁদের কাছে বইটির কিছু অংশ অপেক্ষাকৃত ধীর মনে হতে পারে। কিন্তু যাঁরা অপরাধের আড়ালে মানুষের সামাজিক মুখোশ খুঁজতে আগ্রহী, তাঁদের কাছে এই ধীর-স্থিরতা প্রয়োজনীয়। ‘ইন্সপেক্টর ইমানিশি ইনভেস্টিগেটস’ শেষ পর্যন্ত এমন একটি উপন্যাস একশ্রেণির পাঠকদের ভিজিয়ে রাখবে লেখার গুনেই।🍁

 

 

 

🍂বইপত্র | ২

 

চরিত্রগুলির নির্মাণে লেখক সর্বত্র সমান গভীরতায় পৌঁছতে পারেননি। কয়েকটি চরিত্রের মধ্যে যে বিপুল সামাজিক সম্ভাবনা রয়েছে, তা আরও বিস্তৃত ভাবে অনুসন্ধান করা যেত। তাদের জীবনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন কিংবা পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ ছিল। কখনও কখনও তারা ব্যক্তিমানুষের চেয়ে বৃহত্তর ভাবনার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে পাঠক তাদের জীবন সম্পর্কে কৌতূহলী হলেও সব প্রশ্নের উত্তর পান না। এই সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

 

কালীঘাটের পবিত্রতার আড়ালের  কথা অবধূতের ‘কলিতীর্থ কালীঘাট’

অভিরাজ চক্রবর্তী 

তীর্থের মাহাত্ম্য নিয়ে মানুষের বিশ্বাসের অন্ত নেই। মন্দিরের চূড়া, দেবীর বিগ্রহ, পুজোর আচার কিংবা পুণ্যলাভের আকাঙ্ক্ষা এসবের মধ্যে দিয়েই সাধারণত তীর্থের পরিচয় তৈরি হয়। কিন্তু কোনও তীর্থের প্রকৃত পরিচয় কি কেবল তার দেবদেবী ও ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ? যে মানুষ প্রতিদিন সেই তীর্থকে ঘিরে বেঁচে থাকে, তাদের ক্ষুধা, লোভ, দুঃখ, অপরাধ, বঞ্চনা ও অস্তিত্বের লড়াই কি পবিত্রতার আলোচনায় জায়গা পাওয়ার যোগ্য নয়? অবধূত ওরফে দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘কলিতীর্থ কালীঘাট’ এই প্রশ্নগুলিকেই সামনে নিয়ে আসে। বইটির নাম শুনে কালীঘাটের (Kalighat) মন্দিরকেন্দ্রিক কোনও ধর্মীয় আখ্যানের প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে, কিন্তু লেখক পাঠককে নিয়ে যান অন্য এক জগতে। সেখানে দেবী দক্ষিণাকালী (Dakshina Kali) যেমন আছেন, তেমনই আছেন কংসারি হালদার, ফণা, ফিনকি ও ধনারা। তাঁদের জীবনযাপনের মধ্যেই লেখক খুঁজেছেন তীর্থের প্রকৃত অর্থ। ধর্মের গাম্ভীর্যের আড়ালে মানুষের যে বিচিত্র, কখনও নিষ্ঠুর, কখনও করুণ মুখ লুকিয়ে থাকে, অবধূত তারই সাহিত্যিক অনুসন্ধান করেছেন। ১৯৫৮ সালে ত্রিবেণী প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের পুরনো সংস্করণটি আজ সহজে মেলে না। বর্তমানে এটি মিত্র ও ঘোষের ‘সাধক জীবন সমগ্র’-এর অন্তর্ভুক্ত। আলাদা বই হিসেবে পাঠকের হাতে পৌঁছনোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। অথচ বিষয়, ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ‘কলিতীর্থ কালীঘাট’ স্বতন্ত্র পাঠের দাবি রাখে। অবধূতের লেখার একটি নিজস্ব মাদকতা আছে। তাঁর গদ্যে কখনও আবেগের তীব্রতা, কখনও পৌরাণিক অনুষঙ্গ, কখনও বা সাধারণ মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তবতা একসঙ্গে উপস্থিত হয়। তবে এই মাদকতার কাছে আত্মসমর্পণ করলেই চলবে না, পাঠককে লেখকের বক্তব্যের ভিতরের দ্বন্দ্বগুলিও খুঁজে দেখতে হবে। কারণ বইটি যতটা মানুষের জয়গান, ততটাই মানুষের তৈরি অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের অভিযোগপত্র।

অবধূতের গদ্যের আর একটি বৈশিষ্ট্য তার নাটকীয়তা। তিনি দৃশ্য নির্মাণ করতে জানেন। নদীর অতীত, বর্তমানের অবক্ষয়, দেবীর সামনে মানুষের আত্মসমর্পণ এবং ভবিষ্যতের সংহার, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভাষার মধ্যে আবেগঘন গতি দেখা যায়। তাঁর বর্ণনায় কখনও কবিতার ছায়া, কখনও লোকজ জীবনের গন্ধ, আবার কখনও পৌরাণিক আখ্যানের গাম্ভীর্য এসে মিশেছে। তবে এই উচ্চকিত ভাষা সর্বত্র সমান কার্যকর নয়। কিছু জায়গায় আবেগের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে বক্তব্যের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধা পায়। সংস্কৃত মন্ত্র ও পৌরাণিক উল্লেখের ঘনত্বও সাধারণ পাঠকের কাছে পাঠকে কিছুটা কঠিন করে তুলতে পারে। লেখক যখন সংযত থাকেন, তখন তাঁর গদ্য অনেক বেশি ধারাল হয়ে ওঠে; অতিরিক্ত অলংকারের আশ্রয় নিলে সেই ধার কখনও কিছুটা ভোঁতা হয়ে যায়। বইটির মূল আকর্ষণ অক্ষুণ্ণ থাকে।

লেখকের মুখবন্ধে তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে বক্তব্য পাওয়া যায়, তা বইটির সামগ্রিক পাঠের ভিত্তি তৈরি করে। অবধূত জানিয়েছেন, কোনও জীবিত বা মৃত ব্যক্তিকে ইঙ্গিত করে কাউকে আঘাত করা কিংবা কালীঘাটের তীর্থমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা তাঁর লক্ষ্য নয়। তিনি লিখতে চেয়েছেন মানুষের কথা সেই মানুষ, যে সুখ ও দুঃখের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটায় এবং যার অস্তিত্ব ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়েও বৃহত্তর। এই ঘোষণার মধ্যে মানবতাবাদী অবস্থান রয়েছে। কিন্তু লেখকের প্রকৃত সাফল্য ঘোষণায় নয়, সেই ভাবনাকে কাহিনির চরিত্র ও পরিবেশের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতায়। তিনি কালীঘাটকে শুধু দেবীর অধিষ্ঠান হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন এমন এক জনপদ হিসেবে, যেখানে মানুষের যাবতীয় দুর্বলতা ও আকাঙ্ক্ষা প্রতিদিন নতুন করে প্রকাশিত হয়।

কংসারি হালদার, ফণা, ফিনকি ও ধনা এই চরিত্রগুলি বইটির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তারা কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকা মানুষ নয়। তাদের মধ্যে যেন বহু যুগের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা জমা রয়েছে। কখনও তারা বিশ্বাসের আশ্রয় খোঁজে, কখনও নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ছুটে বেড়ায়, আবার কখনও জীবনের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে নেয়। লেখক তাদের নৈতিকতার মাপকাঠিতে মেপে চূড়ান্ত রায় দিতে আগ্রহী নন। তাদের জীবনযাপনের ভিতর দিয়ে মানুষের স্বভাবের নানা দিক তুলে ধরেন। দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের পাপ-পুণ্যের হিসাব মেলে, কিন্তু মন্দিরের বাইরে তার আচরণ কতখানি বদলায়, সেই প্রশ্নও বইটির ভিতরে ঘুরে ফিরে আসে। এখানেই অবধূতের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত তীর্থকথা থেকে আলাদা। ধর্মীয় সাহিত্যে অনেক সময় মানুষকে ভক্ত, পাপী, সাধক কিংবা পুণ্যার্থী হিসেবে ভাগ করে দেখানো হয়। কিন্তু ‘কলিতীর্থ কালীঘাট’-এ মানুষকে কোনও একটি পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। একই মানুষ বিশ্বাসী হতে পারে, আবার স্বার্থপরও হতে পারে। পাপ স্বীকার করতে পারে, অথচ পরক্ষণেই অন্যের ক্ষতি করতে দ্বিধা নাও করতে পারে। এই দ্বৈত চরিত্রই লেখকের আগ্রহের জায়গা। তিনি যেন বলতে চান, দেবীর কাছে মানুষের উপস্থিতি যতই নিয়মিত হোক, মানুষের ভিতরের অন্ধকার দূর করার কাজটি কোনও যান্ত্রিক ধর্মাচরণে সম্পন্ন হয় না।

চরিত্রগুলির নির্মাণে লেখক সর্বত্র সমান গভীরতায় পৌঁছতে পারেননি। কয়েকটি চরিত্রের মধ্যে যে বিপুল সামাজিক সম্ভাবনা রয়েছে, তা আরও বিস্তৃত ভাবে অনুসন্ধান করা যেত। তাদের জীবনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন কিংবা পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ ছিল। কখনও কখনও তারা ব্যক্তিমানুষের চেয়ে বৃহত্তর ভাবনার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে পাঠক তাদের জীবন সম্পর্কে কৌতূহলী হলেও সব প্রশ্নের উত্তর পান না। এই সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু লেখকের লক্ষ্য যেহেতু প্রচলিত অর্থে চরিত্রনির্ভর সামাজিক উপন্যাস নির্মাণ নয়, তাই এই অসম্পূর্ণতার মধ্যেও তাঁর আখ্যানের নিজস্বতা বজায় থাকে। বইটির অন্যতম শক্তিশালী অনুষঙ্গ আদিগঙ্গা (Adi Ganga)। এক সময় এই নদীপথে বাণিজ্যতরী চলাচল করত। কালীঘাটের ঘাটে নোঙর করত বড় বড় নৌযান। জল, বাণিজ্য, মানুষের যাতায়াত ও ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে নদীর ছিল নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই জলপথের প্রাণশক্তি ক্ষয়ে গিয়েছে। আদিগঙ্গার বর্তমান দুরবস্থাকে অবধূত কেবল একটি নদীর অবক্ষয় হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে এটি কালীঘাটের সামগ্রিক অবনতির প্রতীক। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে মানুষের জীবন থেকেও যেন হারিয়ে গিয়েছে স্বচ্ছতা ও উদারতার বোধ। তীর্থের বাহ্যিক জৌলুস থাকলেও তার ভিতরে জমে থাকা পঙ্ক আর আড়াল করা যায় না। এই প্রতীক ব্যবহারে লেখকের কল্পনাশক্তি প্রশংসার দাবি রাখে। নদীকে তিনি প্রাকৃতিক পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি। আদিগঙ্গা হয়ে উঠেছে ইতিহাসের সাক্ষী, মানুষের আচরণের আয়না ও ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার বাহন। এক সময় যে জলপথে প্রাণের প্রবাহ ছিল, সেখানে এখন স্থবিরতা। এই স্থবিরতা ভাঙার জন্যই লেখক কল্পনা করেন এক অভাবনীয় দৃশ্য, কোনও এক সিদ্ধপুরুষ ব্রাহ্মমুহূর্তে নদীর জলে দাঁড়িয়ে দক্ষিণাকালীর উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদন করছেন। সেই অর্ঘ্য থেকে আগুন জ্বলে উঠবে ও কালীঘাটের যাবতীয় কলুষ পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। ভাগীরথী সেই ছাই বয়ে নিয়ে গিয়ে সাগরে বিসর্জন দেবে। এই দৃশ্য ধর্মীয় কল্পনা নয়। এর ভিতরে নিহিত সামাজিক শুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা। আগুন এখানে একদিকে ধ্বংসের প্রতীক, অন্য দিকে নতুন করে শুরু করার সম্ভাবনা। লেখক মনে করেন, কালীঘাটকে জাগিয়ে তুলতে হলে তার ভিতরে জমে থাকা অশুচিতা দূর করতে হবে। কিন্তু তাঁর এই কল্পনার সঙ্গে একটি প্রশ্নও জড়িত। যে সমাজের কলুষ মানুষেরই সৃষ্টি, সেই কলুষ দূর করার দায়িত্ব কি কোনও সিদ্ধপুরুষের হাতে তুলে দেওয়া যায়? মানুষের লোভ, স্বার্থপরতা ও অন্যায় যদি মানুষেরই আচরণ থেকে জন্ম নেয়, তবে তার পরিবর্তনের জন্য মানুষের সক্রিয় ভূমিকা কোথায়? লেখকের মানবকেন্দ্রিক অবস্থান এবং অলৌকিক শক্তির উপর নির্ভরশীল মুক্তির কল্পনার মধ্যে এই টানাপোড়েন বইটির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

অবধূতের লেখায় দেবী মন্দিরের বিগ্রহ হয়ে থাকেন না। কখনও তিনি যেন রক্তমাংসের চরিত্র, কখনও মানুষের আশ্রয়, আবার কখনও ভয়ংকর সংহারিণী শক্তি। এই বহুরূপী দেবীভাবনা বইটির ভাষা ও কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে শেষের দিকে ফণা, ফিনকি ও ধনাদের যে কালীভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়, তা প্রচলিত বরাভয়দায়িনী দেবীমূর্তির থেকে আলাদা। তারা যে কালীর ধ্যান করে, তিনি অম্বিকার ভ্রূকুটি থেকে আবির্ভূত ভয়ংকরী শক্তি, যাঁর হাতে অস্ত্র, মুখে সংহারের চিহ্ন, যাঁর উপস্থিতি অশুভের বিনাশের প্রতীক। এই অংশে লেখকের ভাষা আরও তীব্র, প্রায় পৌরাণিক মহাকাব্যের আবহ তৈরি করে। সংস্কৃত মন্ত্র ও চণ্ডীর অনুষঙ্গ ব্যবহার করে তিনি এমন এক দেবীমূর্তি নির্মাণ করেন, যাঁর আগমন শুধু আশীর্বাদ দেওয়ার জন্য না, ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি করার জন্য। ফণা, ফিনকি ও ধনারা বিশ্বাস করে, এই সংহারিণী শক্তি একদিন কলিতীর্থে আবির্ভূত হবেন। তাঁর ক্ষুধা নিবৃত্ত না হওয়া পর্যন্ত তীর্থের জাগরণ ঘটবে না। এই কল্পনা পাঠকের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ এখানে মুক্তি আর কোমল আশ্বাসের বিষয় নয়; তার আগে প্রয়োজন কঠোর বিনাশ। তবে সংহারের এই রূপক ব্যবহারে লেখকের ভাবনার গভীরতা যেমন আছে, তেমনই কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ধ্বংসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি প্রবল আবেগ তৈরি করেন, কিন্তু ধ্বংসের পর কীভাবে নতুন সমাজ গড়ে উঠবে, তার কোনও বিস্তারিত ধারণা দেন না। কালীঘাটের কলুষ পুড়ে ছাই হলে সেই জায়গায় কী ধরনের সামাজিক পরিবর্তন আসবে? মানুষের লোভ, প্রতারণা ও নিষ্ঠুরতার জায়গায় কোন মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাঠককে নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। লেখকের কল্পনা তাই অনেক সময় বাস্তব পরিবর্তনের কর্মপরিকল্পনার চেয়ে নৈতিক ক্ষোভের শিল্পিত প্রকাশ হয়ে ওঠে।

অবধূতের গদ্যের আর একটি বৈশিষ্ট্য তার নাটকীয়তা। তিনি দৃশ্য নির্মাণ করতে জানেন। নদীর অতীত, বর্তমানের অবক্ষয়, দেবীর সামনে মানুষের আত্মসমর্পণ এবং ভবিষ্যতের সংহার, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভাষার মধ্যে আবেগঘন গতি দেখা যায়। তাঁর বর্ণনায় কখনও কবিতার ছায়া, কখনও লোকজ জীবনের গন্ধ, আবার কখনও পৌরাণিক আখ্যানের গাম্ভীর্য এসে মিশেছে। তবে এই উচ্চকিত ভাষা সর্বত্র সমান কার্যকর নয়। কিছু জায়গায় আবেগের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে বক্তব্যের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধা পায়। সংস্কৃত মন্ত্র ও পৌরাণিক উল্লেখের ঘনত্বও সাধারণ পাঠকের কাছে পাঠকে কিছুটা কঠিন করে তুলতে পারে। লেখক যখন সংযত থাকেন, তখন তাঁর গদ্য অনেক বেশি ধারাল হয়ে ওঠে; অতিরিক্ত অলংকারের আশ্রয় নিলে সেই ধার কখনও কিছুটা ভোঁতা হয়ে যায়। বইটির মূল আকর্ষণ অক্ষুণ্ণ থাকে। কারণ অবধূত পাঠককে কালীঘাটের পরিচিত ধর্মীয় ছবির বাইরে নিয়ে যেতে পেরেছেন। তাঁর কাছে তীর্থ কেবল পুণ্য অর্জনের জায়গা নয়, মানুষের জীবনকে বোঝারও একটি ক্ষেত্র। দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের অপরাধ স্বীকার করে, কিন্তু সেই স্বীকারোক্তি যদি তার আচরণে কোনও পরিবর্তন না আনে, তবে সেই ধর্মাচরণের মূল্য কতটা, এই প্রশ্ন বইটির ভিতরে অনুচ্চারিত থেকেও প্রবল হয়ে ওঠে। তীর্থের পবিত্রতা নিয়ে যতই গর্ব করা হোক, সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন যদি অবহেলা, অন্যায় ও শোষণে জর্জরিত থাকে, তবে সেই পবিত্রতার দাবি কতখানি গ্রহণযোগ্য? এখনকার কালীঘাটের দিকে তাকিয়েও বইটির প্রশ্নগুলি অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় না। নদীর দূষণ, নগরজীবনের সংকট, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক আচরণের ব্যবধান এসব সমস্যা এখনও আলোচনার দাবি রাখে। অবধূতের সময়ের কালীঘাট আর বর্তমানের কালীঘাট এক নয়, কিন্তু তাঁর রচনার ভিতরে যে নৈতিক অস্বস্তি রয়েছে, তা সময় পেরিয়েও পাঠকের কাছে পৌঁছয়। লেখক যে আগুনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবে জ্বলেছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর বইটি দেয় না। পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে, কেবল দেবীর কাছে অর্ঘ্য নিবেদন করলেই কি মানুষের তৈরি কলুষ দূর হয়?

‘কলিতীর্থ কালীঘাট’-তে চরিত্রের আরও বিস্তার, সামাজিক বাস্তবতার গভীরতর অনুসন্ধান ও সংহারের পরবর্তী সমাজ নির্মাণের ভাবনা থাকলে রচনাটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারত। কিন্তু তার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বইটি এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা দেয়। অবধূত ধর্মের প্রচলিত মাহাত্ম্যকথা লিখতে বসেননি; তিনি তীর্থের ভিতরে মানুষের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কালীঘাটে দেবী আছেন, কিন্তু মানুষের জীবনই শেষ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রে। তাই এই বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনও অলৌকিক সাধনার কাহিনি না। তীর্থের পবিত্রতার আড়ালে চাপা পড়ে থাকা মানুষের মুখগুলিকে সামনে নিয়ে আসা। দেবীর কাছে অর্ঘ্য দেওয়ার আগে মানুষকে দেখার প্রয়োজন যে ফুরিয়ে যায়নি, অবধূতের এই রচনা সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।🍁

 

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | ফিচার ছবি: সৌরভ  | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ফিরেপড়া: কবিতা ‘আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন