সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বনাসকাঁঠা, গুজরাত : পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা যুদ্ধের প্রভাব যখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও কৃষি ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি করছে, তখন সেই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতেও উত্তাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে বিরোধীরা ভারতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi)। তাঁর দাবি, ইরান (Iran), ইজরায়েল (Israel) ও আমেরিকার (United States) সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সারের বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব ভারতীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষের উপর যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। অথচ এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলি সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। শুক্রবার গুজরাতের (Gujarat) বনাসকাঁঠা (Banaskantha) জেলায় একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরব হন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, দেশের সামনে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হলে কিছু রাজনৈতিক দল সরকারের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে সেই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের সরবরাহ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তাকে হাতিয়ার করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য, ভারত যাতে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিঘাত থেকে রক্ষা পায়, তার জন্য সরকার নিরন্তর কাজ করছে। কিন্তু বিরোধীরা সেই উদ্যোগকে গুরুত্ব না দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে। জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের নাগরিকেরা ভারতকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে পরিশ্রম করছেন। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কৃষি উৎপাদন ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সাধারণ মানুষের এই প্রচেষ্টাকে তিনি গুরুত্ব দেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, কিছু রাজনৈতিক শক্তি দেশের অগ্রগতির পরিবর্তে সঙ্কটের পরিস্থিতি দেখতে বেশি আগ্রহী। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ চলার কারণে আন্তর্জাতিক স্তরে যখন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তখন দেশের ভিতরে সার ও গ্যাসের অভাব নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। মোদীর কথায়, ‘দেশ বিপদে পড়লে কিছু মানুষ আনন্দ পান। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে গোটা দেশ যখন উদ্বিগ্ন, তখন তাঁরা ভুয়ো খবর ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে ব্যস্ত।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল কৃষকদের স্বার্থ ও সারের দাম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে রাসায়নিক সারের মূল্যবৃদ্ধি হলেও তার সম্পূর্ণ চাপ যাতে ভারতীয় কৃষকদের উপর না পড়ে, সেই লক্ষ্যে কেন্দ্র বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে বলে তিনি দাবি করেন। নরেন্দ্র মোদী জানান, বিশ্ববাজারে সারের দাম বেড়ে যাওয়ার পরেও দেশের কৃষকদের জন্য দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের তরফে প্রায় ১৬ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে কৃষি উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কৃষকদের উপর সেই অতিরিক্ত চাপ সরাসরি চাপিয়ে না দিয়ে সরকার আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। কৃষকদের উদ্দেশ্যে আশ্বাস দিয়ে নরেন্দ্র মোদী বলেন, সঙ্কটের সময়েও সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশের কৃষকদের যাতে বাড়তি আর্থিক সমস্যায় পড়তে না হয়, সেই বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে তিনি জানান। কৃষি ভারতের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে সারের দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, খাদ্যপণ্যের দাম ও সামগ্রিক বাজারেও তার প্রতিফলন ঘটতে পারে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে সামনে রেখেই কেন্দ্রের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বিরোধীদের আক্রমণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আরও অভিযোগ করেন, ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংঘাত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, ভারত একযোগে আন্তর্জাতিক সঙ্কটের মোকাবিলা করছে। অথচ কিছু রাজনৈতিক দল সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করতে চাইছে। সার নিয়ে কৃষকদের ভুল বোঝানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমালোচনা করা বিরোধীদের অধিকার। কিন্তু দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৃষকদের স্বার্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উল্লেখ্য যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরান আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্র খবর। সংঘাতের প্রভাব ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়েছে। সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির কাছে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জলপথের উপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব বহু দেশের বাজারে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে বার বার বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। অন্য দিকে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আছে, এমন জাহাজের উপর আমেরিকার অবরোধমূলক পদক্ষেপের কথাও উঠে এসেছে। দুই দেশের সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহে। জ্বালানি পরিবহণে বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সেই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আমদানি নির্ভর দেশগুলির অর্থনীতিতে পড়ে। ভারতও জ্বালানি আমদানির উপর উল্লেখযোগ্য ভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব ভারতীয় বাজারে যাতে বড় আকারে না পড়ে, তার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেছে। জ্বালানি ও সারের ক্ষেত্রে সরবরাহ বজায় রাখা আর সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো কেন্দ্রের অন্যতম লক্ষ্য বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। যদিও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কত দিন এমন থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি পরিবহণ, বাণিজ্যিক সরবরাহ এবং কৃষি উপকরণের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে যেমন অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনই বিরোধীদের কাছেও কেন্দ্রের নীতি ও পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সারের দাম, গ্যাসের সরবরাহ ও জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এই বিষয়গুলি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বনাসকাঁঠার সভা থেকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছেন, তার জবাবে বিরোধী শিবির কী অবস্থান নেয়, সে দিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি আমদানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারের সঙ্গে যুক্ত একাধিক দেশের অর্থনীতিই এই পরিস্থিতির উপর নির্ভর করছে। ভারতের ক্ষেত্রেও তাই সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক দিকে যুদ্ধের অভিঘাত থেকে দেশের বাজারকে রক্ষা করার দাবি জানাচ্ছে কেন্দ্র, অন্য দিকে সেই দাবি ও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বনাসকাঁঠার সভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সেই সংঘাতকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Indian GDP growth 7.8 percent, PM Narendra Modi GDP speech | ৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির পর মোদীর নিশানা রাহুলকে, বিদেশ ভ্রমণ-বিয়ে-সোনা নিয়ে দেশবাসীকে তিন পরামর্শ



