সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: গোবিন্দভোগ, তুলাইপাঞ্জি, কালো নুনিয়া ও রাধুনিপাগল বাংলার এই চার জিআই-ট্যাগযুক্ত সুগন্ধি চালকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য সরকার। উৎপাদিত চালের গুণমান বজায় রাখা, আধুনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণ ও বিদেশে রফতানির পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্যে পূর্ব বর্ধমান ও উত্তর দিনাজপুরে দুটি আধুনিক চাল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি চালের বিপণন ব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের কৃষি ক্ষেত্রে সুগন্ধি চালের গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত এই চালের নিজস্ব গন্ধ, স্বাদ এবং রান্নার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দেশের বাজারে পরিচিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও এই চালের চাহিদা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে রাজ্য সরকার। সেই লক্ষ্যেই উৎপাদন থেকে শুরু করে চালের মান যাচাই, প্যাকেজিং ও রফতানি পর্যন্ত গোটা ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পূর্ব বর্ধমানে গোবিন্দভোগ ও উত্তর দিনাজপুরে তুলাইপাঞ্জিকে কেন্দ্র করে পরিকাঠামো গড়ে উঠলে সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকেরা বিশেষভাবে লাভবান হতে পারেন। এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃত চালের পরিচিতিকে কাজে লাগানো। গোবিন্দভোগ (Gobindobhog Rice), তুলাইপাঞ্জি (Tulaipanji Rice), কালো নুনিয়া (Kalonunia Rice) আর রাধুনিপাগল (Radhunipagal Rice) এই চারটি জাত বাংলার কৃষি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জিআই স্বীকৃতি কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত পণ্যের স্বতন্ত্র পরিচিতি ও সুনামকে চিহ্নিত করে। ফলে এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে বিদেশের বাজারে বাংলার চালের পরিচিতি বাড়ানো ও নকল বা ভুল পরিচয়ে বিক্রি হওয়া পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী জায়গা করে নিতে হলে শুধু পরিচিতি নয়, মান, সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক দামও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কৃষি দফতর সূত্রে খবর, চালের বিপণন ও রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্যে বেসরকারী সংস্থার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ আছে। সেই সূত্রে ইন্ডিয়া গেট (India Gate) ব্র্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের সাহায্যে এই চার জাতের চালের উৎপাদন ও গুণমান উন্নয়নের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে চালের পুষ্টিগুণ আরও উন্নত করা, গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কমানোর সম্ভাবনা যাচাই ও উচ্চ ফলনশীল বীজ উদ্ভাবনের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এই গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পরীক্ষার ফল ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের প্রয়োজন হবে। রাজ্যের সুগন্ধি চাল চাষের বর্তমান পরিসংখ্যানও এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরছে। রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনা (Rashtriya Krishi Vikas Yojana বা RKVY)-র আওতায় পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১.৭৩ লক্ষ হেক্টর জমিতে সুগন্ধি চালের চাষ হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এই জমি থেকে উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৩.৮৯ লক্ষ মেট্রিক টন। চারটি জাতের মধ্যে উৎপাদনের নিরিখে এগিয়ে রয়েছে গোবিন্দভোগ। এর উৎপাদন প্রায় ১.১২ লক্ষ টন। তুলাইপাঞ্জির উৎপাদন প্রায় ১৮ হাজার টন। কালো নুনিয়ার উৎপাদন প্রায় তিন হাজার টন এবং রাধুনিপাগলের উৎপাদন প্রায় ৪০০ টন।
পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, চারটি জাতের উৎপাদনের পরিমাণে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। গোবিন্দভোগের চাষ ও বাজার ইতিমধ্যেই তুলনামূলকভাবে বড় হলেও রাধুনিপাগলের উৎপাদন এখনও অনেক কম। ফলে এই জাতগুলির জন্য একই ধরনের বিপণন কৌশল কার্যকর নাও হতে পারে। যে চালের উৎপাদন বেশি, তার ক্ষেত্রে বড় পরিমাণে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও রফতানির ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যদিকে, উৎপাদন কম অথচ বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন চালের ক্ষেত্রে মান বজায় রাখা, চাষের পরিসর বাড়ানো ও পণ্যের স্বতন্ত্র পরিচিতি তুলে ধরার উপর জোর দিতে হবে। উল্লেখ্য যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আরও ১৫ হাজার ১৪৮ হেক্টর জমিতে সুগন্ধি চালের চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। চাষের জমি বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের উন্নত বীজ, প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করাও জরুরি। উৎপাদন বাড়লেও যদি বিক্রির উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকে, তা হলে কৃষকের প্রত্যাশিত আয় নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। সেই কারণে নতুন প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলির সঙ্গে কৃষকদের যোগাযোগ গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
পূর্ব বর্ধমানে গোবিন্দভোগের চাষ বহুদিন ধরেই পরিচিত। এই অঞ্চলে আধুনিক চাল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে উঠলে ধান সংগ্রহ, মিলিং, মান যাচাই, প্যাকেজিংয়ের মতো কাজ একই পরিকাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে কৃষককে উৎপাদিত ধান বিক্রির জন্য বিভিন্ন মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীর উপর নির্ভর করতে হয়। নতুন কেন্দ্রের মাধ্যমে সরাসরি সংগ্রহ ও বিপণনের ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে কৃষক এবং ক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে পারে। তবে তার জন্য স্বচ্ছ ক্রয়নীতি, মান নির্ধারণের নিয়ম এবং সময়মতো অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, উত্তর দিনাজপুরে তুলাইপাঞ্জিকে কেন্দ্র করে প্রক্রিয়াকরণ পরিকাঠামো তৈরি হলে উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। এই জাতের চালের নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে। উন্নত প্যাকেজিং, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও তার প্রসার ঘটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। দুটি কেন্দ্রকে শুধু চাল তৈরির জায়গা হিসেবে না দেখে কৃষক, চালকল, প্যাকেজিং সংস্থা, পরিবহণ ব্যবসায়ী এবং রফতানিকারকদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চাল রফতানির ক্ষেত্রে গুণমান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চালের আর্দ্রতা, পরিচ্ছন্নতা, দানার অখণ্ডতা, সংরক্ষণ পদ্ধতি ও প্যাকেজিংয়ের মান ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন দেশের খাদ্য আমদানির নিয়মও আলাদা। ফলে বাংলার সুগন্ধি চাল বিদেশে পাঠাতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের শর্ত মেনে পণ্য প্রস্তুত করা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা দরকার। আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এই কাজে সহায়তা করতে পারে। তবে রফতানি বাড়ানোর সাফল্য নির্ভর করবে বিদেশি বাজারের চাহিদা, পরিবহণ খরচ, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং নিয়মিত সরবরাহের উপরও। চালের পুষ্টিগুণ উন্নত করার গবেষণাও এই উদ্যোগের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা সফল হলে স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের মধ্যে কিছু চালের চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট জাতের চালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কমেছে বলে দাবি করতে হলে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। একইভাবে, উচ্চ ফলনশীল বীজ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি চালের স্বাভাবিক গন্ধ, স্বাদ এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বজায় রাখাও জরুরি। কারণ, সুগন্ধি চালের বাজারমূল্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে তার স্বতন্ত্র গুণমানের উপর।
এই উদ্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব কৃষিক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। চাল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র চালু হলে মিলিং, প্যাকেজিং, গুদামজাতকরণ, পরিবহণ ও বিপণনের কাজে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিষেবা প্রদানকারীরাও লাভবান হতে পারেন। মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে প্যাকেজিং, স্থানীয় বিপণন এবং সহায়ক কাজে যুক্ত করার সুযোগও খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে বাস্তবে কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের আকার, বিনিয়োগ এবং পরিচালন ব্যবস্থার উপর। বাংলার চারটি জিআই-ট্যাগযুক্ত সুগন্ধি চালকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা তাই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ, কৃষকের ন্যায্য মূল্য এবং রফতানির উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রশ্ন। পূর্ব বর্ধমান ও উত্তর দিনাজপুরে প্রস্তাবিত দুটি কেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে এই ক্ষেত্রগুলিতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন নজর থাকবে পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায় এবং তার সুফল কতটা সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছয়, তার দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Dussehra Speech | ‘দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে একজোট হতে হবে’, দশেরার মঞ্চ থেকে বার্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর



