সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : আইপিএলে দীর্ঘদিনের ট্রফিখরা কাটাতে এ বার আগেভাগেই ঘর গোছানোর কাজে নেমে পড়েছে দিল্লি ক্যাপিটালস। দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly)। কোচিং বিভাগে একের পর এক প্রাক্তন ক্রিকেটারকে নিয়ে এসে দলকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাচ্ছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। প্রথমে যুবরাজ সিংকে (Yuvraj Singh) সহকারী কোচ তথা ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব দেওয়ার পর শ্রীলঙ্কার প্রাক্তন পেসার চামিন্ডা ভাসকে (Chaminda Vaas) পেস বোলিং কোচ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। দিল্লি ক্যাপিটালসের স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পেলেন ভারতের প্রাক্তন লেগ স্পিনার অমিত মিশ্র (Amit Mishra)। ফলে আসন্ন আইপিএল মরসুমের আগে কোচিং বিভাগকে নতুনভাবে সাজানোর পথে আরও এক ধাপ এগোল দিল্লির ফ্র্যাঞ্চাইজি। সৌরভের সঙ্গে অমিতের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। ভারতীয় দলের হয়ে দু’জনে একসঙ্গে খেলেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা ও আইপিএলে দীর্ঘদিনের পরিচিতি, দুই দিক থেকেই অমিতের উপস্থিতি দিল্লির কোচিং বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে স্পিন বোলিংয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা দলের কাজে লাগবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে শুধু পরিচিত মুখকে দায়িত্ব দেওয়াই সৌরভের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য কি না, তা সময়ই বলবে। মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতাকে কতটা কার্যকর ভাবে যুক্ত করা যায়, আগামী মরসুমে তারই পরীক্ষা হবে দিল্লির। অমিত মিশ্রের দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে সম্পর্ক বহু বছরের। ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এবং পরে ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি এই ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছেন। আইপিএলে যে দলের হয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, এ বার সেই দলেই নতুন ভূমিকায় ফিরছেন প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার। খেলোয়াড় হিসেবে দিল্লির জার্সিতে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, কোচ হিসেবে তা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন তিনি। দলের স্পিনারদের প্রস্তুতি, ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে বল করার কৌশল ও চাপের মুহূর্তে নিজেদের পরিকল্পনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আইপিএলের ইতিহাসে অমিত মিশ্রের পরিচিতি মূলত তাঁর লেগ স্পিন, বৈচিত্র ও উইকেট নেওয়ার ক্ষমতার জন্য। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেট এবং আইপিএলে তিনি খেলেছেন। ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করার মতো বল করার দক্ষতা তাঁর অন্যতম বড় শক্তি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যেখানে কয়েকটি বলেই ম্যাচের গতি বদলে যেতে পারে, সেখানে স্পিনারদের সঠিক সময়ে ব্যবহার করা ও তাঁদের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা কোচিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অমিতের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটার সেই দায়িত্ব সামলালে দিল্লির স্পিন বিভাগ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
গত ৬ অক্টোবর সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে দিল্লি ক্যাপিটালসের প্রধান কোচ হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এর আগে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও প্রধান কোচের দায়িত্বে এবারই প্রথমবার দেখা যাবে তাঁকে। মেন্টর আর ক্রিকেট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে সৌরভের। কিন্তু দলের দৈনন্দিন প্রস্তুতি, খেলোয়াড় বাছাই, ম্যাচের পরিকল্পনা ও মাঠে কৌশল নির্ধারণের মতো দায়িত্ব এবার আরও প্রত্যক্ষভাবে সামলাতে হবে তাঁকে। ফলে কোচিং বিভাগে তিনি কাদের নিয়ে আসছেন সেই সিদ্ধান্তও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই পরিচিত ক্রিকেটারদের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন সৌরভ। যুবরাজ সিংহকে ব্যাটিং কোচ তথা সহকারী হিসেবে নিয়ে আসার মাধ্যমে তিনি প্রথম বড় পদক্ষেপ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যুবরাজের অভিজ্ঞতা, বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তাঁর সাফল্য দিল্লির ব্যাটারদের কাজে লাগতে পারে। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি দলের সামগ্রিক প্রস্তুতিতে তাঁর ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিও নজরে থাকবে।
এরপর পেস বোলিং বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয় চামিন্ডা ভাসকে। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সফল বাঁহাতি পেসার হিসেবে পরিচিত ভাসের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানও উল্লেখযোগ্য। ১১১টি টেস্টে তাঁর সংগ্রহ ৩৫৫টি উইকেট ও ৩২২টি এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিয়েছেন ৪০০টি উইকেট। গতির পাশাপাশি বলের সুইং, লাইন ও লেংথের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর বোলিংয়ের বড় বৈশিষ্ট্য। প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের দুর্বলতা বুঝে বল করার ক্ষমতা তাঁকে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কার্যকর রেখেছিল। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী শ্রীলঙ্কা দলেরও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ভাস। সেই দলের সাফল্যের পিছনে শ্রীলঙ্কার বোলিং বিভাগের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর অভিজ্ঞতা দিল্লির পেসারদের প্রস্তুতিতে কীভাবে কাজে লাগে, তা আগামী মরসুমে বোঝা যাবে। এক দিকে ভাসের নেতৃত্বে পেস বোলিং বিভাগ, অন্য দিকে অমিত মিশ্রের হাতে স্পিন বিভাগ দুই ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের দায়িত্ব দিয়ে বোলিং আক্রমণকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে দিল্লি।
দিল্লি ক্যাপিটালসের সামনে অবশ্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। আইপিএলের প্রথম মরসুম থেকেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও এখনও পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি এই ফ্র্যাঞ্চাইজি। বিভিন্ন মরসুমে দল বদলেছে, অধিনায়ক বদলেছে, কোচিং বিভাগেও এসেছে পরিবর্তন। কখনও নক-আউট পর্বে পৌঁছেও শেষ ধাপ অতিক্রম করা যায়নি, আবার কখনও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ধারাবাহিকতার অভাব দলকে পিছিয়ে দিয়েছে। তাই শুধু নতুন কোচ নিয়োগ করলেই সাফল্য আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকতা, চোটের সমস্যা সামলানো, সঠিক একাদশ নির্বাচন এবং চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সৌরভের সামনে তাই প্রধান দায়িত্ব হবে কোচিং বিভাগের অভিজ্ঞতাকে মাঠের সাফল্যে রূপান্তরিত করা। যুবরাজ, ভাস ও অমিত তিন জনেরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে তাঁদের কাজের ক্ষেত্র আলাদা। ব্যাটিং, পেস বোলিং এবং স্পিন বোলিং তিনটি বিভাগকে সমন্বিত রেখে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে নতুন কোচিং ব্যবস্থার অন্যতম বড় পরীক্ষা। পাশাপাশি তরুণ ক্রিকেটারদের তৈরি করা এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের কাছ থেকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আদায় করাও গুরুত্বপূর্ণ।
অমিত মিশ্রের নিয়োগের ফলে দিল্লি ক্যাপিটালসের কোচিং বিভাগে ভারতীয় ক্রিকেটের পরিচিত মুখের সংখ্যা আরও বাড়ল। সৌরভের সঙ্গে তাঁর পুরনো সম্পর্ক এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে দীর্ঘদিন খেলার অভিজ্ঞতা থাকায় দলের পরিবেশ ও আইপিএলের প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতা সম্পর্কে অমিতের ধারণা রয়েছে। নতুন দায়িত্বে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর বড় সম্পদ হতে পারে। আসন্ন মরসুমের আগে দিল্লির এই ধারাবাহিক নিয়োগে একটি বিষয় সামনে আসছে, দলটি এবার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোনও ঘাটতি রাখতে চাইছে না। তবে কোচিং বিভাগে বড় নামের উপস্থিতি আর ট্রফি জেতার মধ্যে ব্যবধান অনেক। সেই ব্যবধান কমাতে হলে পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হবে মাঠে। সৌরভের নেতৃত্বে নতুন কোচিং দল কতটা কার্যকর হয়, অমিত মিশ্রের পরামর্শে স্পিনাররা কতটা সাফল্য পান ও দিল্লি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের আইপিএল খরা কাটাতে পারে কি না, এখন সেদিকেই নজর ক্রিকেটপ্রেমীদের। যুবরাজ, ভাসের পর অমিতকে দায়িত্ব দিয়ে সৌরভ যে নতুন মরসুমের প্রস্তুতিতে গতি আনছেন, তা নিয়ে সংশয় নেই। কিন্তু এই নতুন সাজসজ্জা দিল্লিকে প্রথম আইপিএল ট্রফির কাছে পৌঁছে দিতে পারে কি না, তার উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sonakshi Sinha Maldives Vacation | স্বপ্নের গন্তব্য মালদ্বীপে রোম্যান্টিক ছুটির মেজাজে সোনাক্ষী সিনহা ও জাহির ইকবাল



