সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় সল্টলেকের করুণাময়ী সেন্ট্রাল পার্কে রাবণ দহনের অনুষ্ঠান ঘিরে তৈরি হল উৎসবের আবহ। একদিকে দশমীর ঐতিহ্য, অন্যদিকে আসন্ন ছবি ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’ -এর প্রচারের মেলবন্ধনে জমজমাট হয়ে উঠল অনুষ্ঠানস্থল। বলিউড অভিনেতা রণবীর কপূর (Ranbir Kapoor), দক্ষিণী চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা যশ (Yash) ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে দর্শকদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। মঞ্চ থেকে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি তুলে দশমীর শুভেচ্ছা জানান দুই অভিনেতা। পাশাপাশি তাঁদের আসন্ন ছবিটি দেখার ও সেই ছবি নিয়ে পরিচিতদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য আহ্বানও তাঁরা জানান।
সনাতনী সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেন দর্শকেরা। শিশু থেকে প্রবীণ, বিভিন্ন বয়সের মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবের মেজাজ আরও জমে ওঠে। রাবণ দহনের প্রথাগত আয়োজনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের তারকাদের এক ঝলক দেখার আগ্রহও ছিল দর্শকদের মধ্যে। রণবীর ও যশকে সামনে থেকে দেখতে অনেকেই দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেন। তাঁদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানের আকর্ষণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষত ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’ ছবিতে রাম ও রাবণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুই চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতাদের একই মঞ্চে দেখা দর্শকদের কাছে ছিল বাড়তি পাওনা। বাল্মীকি রামায়ণকে অবলম্বন করে নির্মিত হয়েছে পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির (Nitesh Tiwari) ছবি ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’। ভারতীয় মহাকাব্যের কাহিনিকে আধুনিক চলচ্চিত্রের পর্দায় তুলে ধরার এই উদ্যোগ নিয়ে ইতিমধ্যেই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ছবিতে রামের চরিত্রে অভিনয় করছেন রণবীর কপূর। অন্যদিকে, রাবণের ভূমিকায় দেখা যাবে যশকে। সীতার চরিত্রে রয়েছেন সাই পল্লবী (Sai Pallavi), লক্ষ্মণের ভূমিকায় রবি দুবে (Ravi Dubey) এবং হনুমানের চরিত্রে অভিনয় করছেন সানি দেওল (Sunny Deol)। ছবিটির মুক্তির আগে প্রচারের অংশ হিসাবেই কলকাতার এই অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন কলাকুশলীরা। দশমীর মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রণবীর কপূর সত্য ও শুভ শক্তির জয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। উৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অশুভ শক্তি যতই চেষ্টা করুক না কেন, দিনের শেষে জয় সত্যের এবং শুভ শক্তিরই হয়। ভালবাসা এবং খুশি ভাগ করে নিন। সকলকে দশমীর শুভেচ্ছা, জয় শ্রী রাম।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে রামায়ণের পরিচিত নৈতিক ভাবনা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়। রাবণ দহনের মতো প্রতীকী একটি আয়োজনের সঙ্গে এই বক্তব্যের সংযোগও অনুষ্ঠানের আবহকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
রামায়ণের কাহিনিতে রাম ও রাবণ দুই বিপরীত চরিত্র। সেই দুই চরিত্রকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলছেন রণবীর ও যশ। ফলে বিজয়া দশমীর অনুষ্ঠানে তাঁদের একসঙ্গে উপস্থিতি দর্শকদের কাছে আলাদা মাত্রা পেয়েছে। একদিকে রামের চরিত্রে রণবীর, অন্যদিকে রাবণের ভূমিকায় যশ। ছবির এই দুই মুখের উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়েই প্রচারের মঞ্চে দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করেন নির্মাতারা। তবে অভিনেতাদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল উৎসবের শুভেচ্ছা জানানো, ছবির প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং দর্শকদের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া। উল্লেখ্য, কলকাতার সঙ্গে নিজের পুরনো সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন যশ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে অভিনয়জীবনের শুরুর দিকে শহরে আসার স্মৃতি। ২০০৪-০৫ সালে নান্দীকারের (Nandikar) একটি নাটকে অংশ নিতে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার সূত্রেই শহরটির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বলে জানান অভিনেতা। যশের কথায়, ‘আমার অভিনয়ের শুরু কিন্তু এই কলকাতা থেকেই বলা চলে। এখানে এসে সকাল থেকে সন্ধ্যা প্রচুর মিষ্টি খেয়েছিলাম। রসগোল্লা, গোলাপজাম। কলকাতার মানুষও খুব মিষ্টি।’

যশের এই স্মৃতিচারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়। বাঙালির মিষ্টিপ্রীতি ও কলকাতার মানুষের আন্তরিকতার কথা তুলে ধরে অভিনেতা শহরের প্রতি নিজের ভাল লাগার কথা জানান। সাধারণত চলচ্চিত্রের প্রচারে তারকারা ছবির বিষয়বস্তু, সহ-অভিনেতা কিংবা শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু যশের বক্তব্যে ব্যক্তিগত স্মৃতির জায়গা পাওয়ায় কলকাতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অন্য একটি দিকও সামনে আসে। অভিনয়ের সূত্রে বহু শহরে যাতায়াত থাকলেও কোনও জায়গার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি যে দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়, তাঁর কথায় সেই অনুভূতিই ধরা পড়ে। অনুষ্ঠানের উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেও উঠে আসে সাম্প্রতিক এক মর্মান্তিক ঘটনার প্রসঙ্গ। বক্তব্য রাখতে গিয়ে চোরবাগানের ঘটনায় মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নীরবতা পালন করেন মুখ্যমন্ত্রী, ছবির কলাকুশলী এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যরা। উৎসবের আনন্দের মাঝে এই শোকপর্ব অনুষ্ঠানকে অন্য মাত্রা দেয়। রাবণ দহনের আয়োজন যেখানে অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, সেখানে প্রাণহানির ঘটনায় মৃতদের স্মরণ করে নীরবতা পালন মানবিক সংবেদনশীলতার দিকটিও সামনে আনে।

বিজয়া দশমীর সঙ্গে রাবণ দহনের সম্পর্ক বহুদিনের। রামায়ণের কাহিনি অনুসারে, রামের হাতে রাবণের পরাজয় অশুভ শক্তির অবসান এবং শুভের জয়ের প্রতীক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। কলকাতার সল্টলেকের অনুষ্ঠানেও সেই ঐতিহ্য বজায় ছিল। তবে এবারের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’-এর প্রধান দুই অভিনেতার উপস্থিতি। তাঁদের বক্তব্য, দর্শকদের সঙ্গে আলাপচারিতা এবং ছবির প্রচার উৎসবের পরিচিত আবহে চলচ্চিত্রের সংযোগ তৈরি করে। ছবিটি ৫ নভেম্বর দেশ জুড়ে মুক্তি পাওয়ার কথা বলে আয়োজনে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তা নিয়ে কৌতূহলও ছিল। রণবীর ও যশ তাঁদের অভিনীত ছবিটি দেখার পাশাপাশি পরিচিতদের মধ্যেও ছবির কথা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। মহাকাব্যভিত্তিক এই ছবিতে রামায়ণের পরিচিত চরিত্রগুলিকে কী ভাবে পর্দায় উপস্থাপন করা হয়েছে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন দর্শকেরা। বিশেষ করে রাম ও রাবণের চরিত্রে দুই জনপ্রিয় অভিনেতার অভিনয় ছবিটির প্রতি আগ্রহের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
সল্টলেকের করুণাময়ী সেন্ট্রাল পার্কে বিজয়া দশমীর এই আয়োজন তাই কেবল রাবণ দহনের অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ঐতিহ্য, চলচ্চিত্রের প্রচার, তারকাদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ ও শোকজ্ঞাপনের মুহূর্ত এসব কিছুর উপস্থিতিতে সন্ধ্যাটি পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। মঞ্চে রণবীর ও যশের ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দর্শকদের উৎসাহ বাড়িয়েছে, আবার চোরবাগানের ঘটনায় মৃতদের স্মরণ অনুষ্ঠানকে দিয়েছে গম্ভীর আবহ। উৎসবের দিনে আনন্দের পাশাপাশি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার যে জায়গা রয়েছে, সল্টলেকের এই অনুষ্ঠানেও তার প্রতিফলন দেখা গেল।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari, Chorebagan Stampede | চোরবাগান পদপিষ্টের ঘটনায় শোকাহত পরিবারগুলির পাশে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, ২৫ লক্ষের চেক ও চাকরির আশ্বাস ঘিরে রাজনৈতিক তরজা



