সাশ্রয় নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬: দুবাই থেকে তেল আভিভ যাওয়ার পথে মাঝ আকাশে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ল ফ্লাইদুবাইয়ের (flydubai) একটি যাত্রীবাহী বিমান। ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স (Boeing 737 MAX)। আচমকাই ককপিটের ভিতরে দুই পাইলটের মধ্যে শুরু হয় হিংসাত্মক সংঘর্ষ। অভিযোগ, এক পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। এর পরই বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা। অল্প সময়ের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুটের বেশি নীচে নেমে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে বিমান থেকে প্রথমে জরুরি সংকেত এবং পরে ছিনতাই বা বেআইনি হস্তক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত সংকেত পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের মধ্যে থাকা অন্য পাইলট ও কয়েক জন যাত্রীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। ঘটনাটি ঘটে ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে। বিমানটি দুবাই থেকে তেল আভিভের দিকে যাচ্ছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বিমানে প্রায় ১৭৪ থেকে ১৮০ জন যাত্রী ও কর্মী থাকার কথা বলা হয়েছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছনোর পর হঠাৎ উচ্চতা হারাতে শুরু করে। এক পর্যায়ে কয়েক দশ সেকেন্ডের মধ্যেই সেটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। পরে বিমানটি আবার কিছুটা উচ্চতা ফিরে পেলেও স্বাভাবিক ভাবে নির্দিষ্ট উচ্চতায় উড়তে পারেনি।
ককপিটের ভিতরে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে যাত্রীদের বক্তব্য ও একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দুই পাইলটের মধ্যে আচমকা হাতাহাতি শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী পাইলট পাইলট-ইন-কমান্ডকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। আক্রান্ত পাইলটের শরীরে গুরুতর আঘাত লাগে ও বিমানের ভিতরে রক্তাক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে আহত পাইলট-সহ দুই পাইলটকেই তাবুকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় বলে উল্লেখ। আক্রান্ত পাইলটের পরিচয় নিয়ে ভারতেও বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পাইলট-ইন-কমান্ড ছিলেন ভারতীয় নাগরিক স্মিত মাচ্ছর (Smit Machchhar)। তিনি এর আগে স্পাইসজেট (SpiceJet) -এ দীর্ঘ সময় কাজ করেছিলেন এবং ২০২২ সালে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁর প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা উড়ানের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে। তবে ঘটনার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। অন্য দিকে, হামলার অভিযোগ ওঠা সহকারী পাইলট ওমানের নাগরিক বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটক করেছে ও ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, কীভাবে ককপিটে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হল এবং অস্ত্রটি বিমানের ভিতরে কী ভাবে পৌঁছল, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও তদন্তের আওতায় রয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয় বিমানটির উচ্চতা আচমকা কমতে শুরু করার পর।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি ৩৪ হাজার ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা থেকে দ্রুত নীচে নামতে থাকে। এক পর্যায়ে প্রায় ১৭ হাজার ফুট পর্যন্ত নেমে যায়। পরে আবার কিছুটা উঠে এলেও বিমানটি দীর্ঘ সময় স্থির উচ্চতায় থাকতে পারেনি। এই আচরণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। বিমানের যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও তখন একের পর এক জরুরি সংকেত ধরা পড়ে। প্রথমে ৭৭০০ স্কোয়াক কোড পাঠানো হয়। বিমান চলাচলে এটি সাধারণ জরুরি পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর কিছু পরেই ৭৫০০ কোড পাঠানো হয়, যা বিমানে বেআইনি হস্তক্ষেপ বা ছিনতাইয়ের পরিস্থিতি বোঝায়। ফলে বিমানটির নিরাপত্তা নিয়ে মাটিতে থাকা নিয়ন্ত্রণকক্ষগুলির মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। এই ৭৫০০ সংকেতের পর পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। ইজরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিমানটির দিকে ইজরায়েলি যুদ্ধবিমানও পাঠানো হয়েছিল। কারণ, তখনও মাটিতে থাকা কর্তৃপক্ষের কাছে ককপিটের ভিতরের প্রকৃত পরিস্থিতি পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না। বিমানটি তেল আভিভের দিকে যাওয়ার বদলে সৌদি আরবের দিকে ঘুরে যায় আর তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণের প্রস্তুতি নেয়।
বিমানে থাকা কয়েক জন যাত্রী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁরা ককপিটের দিক থেকে চিৎকার শুনতে পেয়েছিলেন। পরে দরজা খোলার পর সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় এক পাইলটকে দেখতে পান বলে তাঁদের দাবি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক জন যাত্রী ককপিটের দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের মধ্যে অন্য পাইলটও ছিলেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার পর বিমানের নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়। এই বিমানে যাত্রীদের মধ্যে পাইলট থাকা ঘটনাটিকে সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের সাহায্যে ককপিটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা হয়। এর পর বিমানটিকে তাবুকের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় এক ঘণ্টার মতো সময়ের মধ্যে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। যাত্রীদের কেউ গুরুতর আহত হননি বলে ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে।
অবতরণের পর বিমানের ভিতরের কয়েকটি ভিডিয়োও প্রকাশ্যে আসে (যদিও সেইসব ভিডিও-এর সত্যতা সাশ্রয় নিউজ যাচাই করেনি)। সেখানে যাত্রীদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। কেউ হাততালি দিচ্ছেন, কেউ গান গাইছেন। দীর্ঘ সময়ের আতঙ্কের পর বিমান নিরাপদে মাটিতে নামায় যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে ওই ভিডিয়োগুলির বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সব ভিডিয়োর স্বাধীন ভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার গুরুত্ব বোঝা যায় বিমানের রুট ও যাত্রীদের পরিচয় থেকেও। FZ1073 দুবাই থেকে তেল আভিভ যাচ্ছিল ও বিমানে অধিকাংশ যাত্রী ইজরায়েলি ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ। ফলে মাঝ আকাশে ককপিটে সংঘর্ষ এবং ৭৫০০ সংকেত পাঠানোর ঘটনা ইজরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাছেও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) পরে জানান, যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়।
প্রথম দিকে ঘটনাটি বিমান ছিনতাই হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পরে পরিস্থিতির ধরন নিয়ে তদন্তকারীরা আলাদা করে অনুসন্ধান শুরু করেন। ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ইচ্ছাকৃত হামলা হিসেবে দেখার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে ঘটনার পেছনে অন্য কোনও কারণ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। এখনও পর্যন্ত ঘটনার চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে সব পক্ষের তরফে পূর্ণাঙ্গ সরকারি ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি। তাই হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে তদন্ত শেষ হওয়া জরুরি। বিমানটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে বিমানের পিছনের রাডার বা উল্লম্ব স্ট্যাবিলাইজারের অংশে ক্ষতির চিহ্ন দেখা গিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। বিমানটি দ্রুত নীচে নামার সময় এই ক্ষতি হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তদন্তে ককপিটের ঘটনাক্রম, বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জরুরি সংকেত এবং উড়ানের তথ্য, সব কিছুই পরীক্ষা করা হবে। ঘটনার পর ফ্লাইদুবাইও তদন্তে সহযোগিতা করছে বলে জানানো হয়েছে। সংস্থার পক্ষ থেকে যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপদ থাকার কথা জানানো হয়েছে এবং ঘটনাটিকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলছে। এদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ বিমানটি তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছে এবং অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক করেছে বলে জানা গিয়েছে।
একটি স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক যাত্রা কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ জরুরি পরিস্থিতিতে বদলে যেতে পারে, FZ1073-এর ঘটনা তারই উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ককপিটের ভিতরের সংঘর্ষ, দ্রুত উচ্চতা হারানো, ৭৭০০ ও ৭৫০০ সংকেত, যাত্রীদের হস্তক্ষেপ এবং শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ, পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রায় ১৮০ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদে মাটিতে নামলেও মাঝ আকাশের সেই কয়েক মিনিটের ঘটনা যাত্রীদের কাছে দীর্ঘদিন মনে থাকার মতো এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India New Zealand trade deal, India New Zealand FTA 2026 | নিউ জিল্যান্ডের পার্লামেন্টে ভারত-এফটিএ পাস, অক্টোবরে বদলাতে পারে বাণিজ্যের ছবি! কতটা লাভবান হবে নতুন দিল্লি?




