সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে বড় আইনি মোড়। কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে (Milan Pradhan) অন্তর্বর্তী জামিন দিল কলকাতা হাই কোর্ট। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের (Justice Tirthankar Ghosh) নির্দেশে ছ’টি মামলাতেই আপাতত তিনি জামিন পেয়েছেন। ফলে জেলের বাইরে থেকেই ৬ অক্টোবরের নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রচার ও নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন মিলন। তবে এই জামিন স্থায়ী নয়। ২০ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর অন্তর্বর্তী জামিন বহাল থাকবে এবং পরের দিন, অর্থাৎ ২১ অক্টোবর, হলদিয়ার সংশ্লিষ্ট আদালতে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। আদালতের এই নির্দেশে দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের আপাতত একটি পর্বের অবসান হল। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া একাধিক পুরনো মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন মিলন। তাঁর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম ও খেজুরি থানায় খুন, খুনের চেষ্টা, বেআইনি জমায়েত-সহ একাধিক অভিযোগে মামলা রয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়েছে। এই মামলাগুলির জেরেই তিনি গ্রেফতার হয়ে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ছিলেন।
এবার কলকাতা হাই কোর্টের অন্তর্বর্তী জামিনের ফলে নির্বাচনের ময়দানে থাকার সুযোগ পেলেন কংগ্রেস প্রার্থী। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে তাঁকে জামিনের নির্দিষ্ট শর্তগুলি মেনে চলতে হবে। ২০ অক্টোবর পর্যন্ত বাইরে থাকার পর ২১ অক্টোবর তাঁকে ফের আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হবে। অর্থাৎ ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পরই তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরে যেতে হবে। মিলনের জামিনের আবেদন নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই কলকাতা হাই কোর্টে শুনানি চলছিল। তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য ছিল, তিনি নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের প্রার্থী। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার বজায় রাখতে তাঁকে সাময়িকভাবে জেলের বাইরে থাকার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তী জামিনের বিষয়টি আদালতের সামনে আসে। এর আগে আদালতে তাঁর নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়েও পর্যবেক্ষণ হয়েছিল।
গত সপ্তাহে মামলাগুলির শুনানিতে মিলনের আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা পুরনো মামলাগুলিতে জামিনের আবেদন করা হয়েছে। প্রথমে কয়েকটি মামলার শুনানি হয়। পরে বাকি মামলাগুলিও শুনানির তালিকায় আসে। শুক্রবার চারটি মামলায় শুনানি হলেও তখনই চূড়ান্ত জামিনের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বাকি দু’টি মামলার বিষয়েও আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার ছ’টি মামলাতেই অন্তর্বর্তী জামিনের নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশে মিলনের উপর একাধিক শর্তও রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মামলায় জামিনের বন্ড জমা দিতে হবে তাঁকে। পাশাপাশি তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর সংশ্লিষ্ট থানায় ফোন করে তদন্তকারী আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলার শর্ত রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিলেও তদন্তের প্রক্রিয়া থেকে তাঁকে দূরে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মিলনের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির সূত্র নন্দীগ্রামের সেই সময়ের জমি অধিগ্রহণ-বিরোধী আন্দোলন। ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে তীব্র আন্দোলন হয়েছিল। সেই সময়ের বিভিন্ন ঘটনায় একাধিক ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়। দীর্ঘ সময় পর সেই মামলাগুলির কয়েকটির ভিত্তিতে মিলনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে উল্লেখ। তাঁর গ্রেফতারিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পরই পুরনো মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। অন্য দিকে, রাজ্যের তরফে আদালতে মিলনের বিরুদ্ধে থাকা গুরুতর অভিযোগগুলির কথা তুলে ধরা হয় ও জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করা হয়েছিল। আদালতের নথি ও শুনানিতে দু’পক্ষের বক্তব্যই উঠে এসেছে। তবে অভিযোগগুলির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও বিচারাধীন।
এর আগে মিলনের আইনি সুরক্ষা নিয়েও কলকাতা হাই কোর্টে একাধিক পর্যায়ে শুনানি হয়েছে। একটি ডিভিশন বেঞ্চ আগের সুরক্ষা খারিজ করে তাঁকে নিয়মিত জামিনের আবেদন করার নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে নতুন করে অন্তর্বর্তী জামিনের আবেদন করা হয়। নির্বাচনের সময়সূচি সামনে রেখে সেই আবেদন নিয়েই পরবর্তী শুনানি হয়। উল্লেখ্য, নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হওয়ার কথা ৬ অক্টোবর। প্রচারপর্ব শেষ হবে ৪ অক্টোবর ও ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর। ফলে অন্তর্বর্তী জামিনের নির্দেশ মিলনের নির্বাচনী প্রচারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভোটের সময় তিনি জেলের বাইরে থাকতে পারবেন। তবে নির্বাচনী পর্ব শেষ হওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলি বহাল থাকবে এবং ২১ অক্টোবর আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ কার্যকর থাকবে।
নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক উত্তাপ রয়েছে। তার মধ্যেই কংগ্রেস প্রার্থীকে ঘিরে গ্রেফতারি, আদালতের শুনানি এবং এবার অন্তর্বর্তী জামিন, পরপর এই ঘটনাগুলি ভোটের আগে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে মিলনের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির বিচারপ্রক্রিয়া এবং নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুটি বিষয়ই আলাদা আইনি পরিসরে চলবে। মঙ্গলবারের আদালতের নির্দেশের ফলে আপাতত জেল থেকে বেরিয়ে নির্বাচনী ময়দানে ফেরার সুযোগ পেলেন মিলন প্রধান। তবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত এই সুযোগ কার্যকর থাকবে। ২১ অক্টোবর তাঁকে হলদিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। ফলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পর আবারও এই মামলাগুলিকে ঘিরে আইনি প্রক্রিয়া সামনে আসতে চলেছে।




