মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। রেকর্ডের পর রেকর্ড। একাধিক বিশ্বকাপের স্মৃতি, অধিনায়ক হিসেবে দীর্ঘ সময়ের দায়িত্ব এবং ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত দিক হয়ে ওঠা বিরাট কোহলির (Virat Kohli) ক্রিকেটজীবনের পরিধি কম নয়। কিন্তু এত কিছুর পরেও নিজের নামের পাশে ‘সর্বকালের সেরা’ তকমা বসাতে নারাজ ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। তাঁর মতে, ভিন্ন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের একই মাপকাঠিতে বিচার করা কঠিন। সংখ্যার বিচারে কারও সঙ্গে কারও তুলনা করা গেলেও একজন ক্রিকেটারের আসল প্রভাব কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজ়ের আগে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে নিজের ক্রিকেটজীবন, সাফল্য, দেশের হয়ে খেলার অনুভূতি ও সবচেয়ে কষ্টদায়ক হারের স্মৃতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন কোহলি।
কোহলির ক্রিকেটজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলির একটি হল ধারাবাহিকতা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাট হাতে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ব্যাটার করে তুলেছে। তবু নিজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য যথেষ্ট সংযত। সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার কে, এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার বদলে কোহলি মনে করিয়ে দিয়েছেন ক্রিকেটের প্রজন্মগত ব্যবধানের কথা। এক সময়ে যে ক্রিকেটাররা খেলেছেন, তাঁদের সামনে যে পরিস্থিতি ছিল, পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটাররা হয়তো সম্পূর্ণ অন্য পরিবেশে খেলেছেন। ফলে কেবল রান, শতরান কিংবা অন্য পরিসংখ্যান দিয়ে তুলনা করলে ক্রিকেটারের সামগ্রিক অবদান ধরা পড়ে না। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোহলির বক্তব্য, তিনি নিজেকে সর্বকালের সেরা মনে করেন না। বিভিন্ন সময়ে অসাধারণ ক্রিকেটার এসেছেন এবং প্রত্যেকেরই নিজস্ব কৃতিত্ব রয়েছে। কারও পরিসংখ্যান হয়তো তাঁর চেয়ে ভাল, আবার কারও হয়ত তাঁর মতো সংখ্যাগত সাফল্য নেই। কিন্তু তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একজন ক্রিকেটার দলের উপর এবং খেলাটির উপর কতটা প্রভাব ফেলেছেন। অর্থাৎ ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি ম্যাচের পরিস্থিতিতে একজন খেলোয়াড়ের অবদানকেও মূল্য দিতে চান তিনি।
এই দৃষ্টিভঙ্গি কোহলির ক্রিকেটচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। ক্রিকেটে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একই সঙ্গে একজন ক্রিকেটারের নেতৃত্ব, কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত, ম্যাচের মোড় ঘোরানোর ক্ষমতা ও দীর্ঘ সময় ধরে দলের জন্য অবদানও মূল্যায়নের অংশ। তাই নিজের কেরিয়ারের দিকে তাকিয়েও কোহলি কেবল রান বা শতরানের হিসাব সামনে রাখছেন না। তাঁর কাছে দেশের হয়ে দীর্ঘ সময় খেলার অভিজ্ঞতাটিই বড় প্রাপ্তি।
১৯ বছরের ক্রিকেটজীবন নিয়ে সন্তুষ্ট কোহলি। এখনও মাঠে নামার আগের উত্তেজনা তাঁর মধ্যে কাজ করে বলেই জানিয়েছেন তিনি। এত দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকা যে সহজ নয়, তা স্বীকার করেও দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামার সুযোগকে এখনও বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। তাঁর কথায়, ক্রিকেটার হিসেবে দীর্ঘ সময় ভাল থাকার জন্য মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি ফিটনেস, অভিজ্ঞতা এবং খেলা সম্পর্কে উপলব্ধি, সবকিছুর প্রয়োজন হয়। নিজের ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও দলের ফলকে সামনে রাখার কথা বলেছেন কোহলি। তাঁর মতে, একজন ক্রিকেটারের মূল দায়িত্ব শুধু নিজের পরিসংখ্যান বাড়ানো নয়, দলকে কাঙ্ক্ষিত ফলের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দলের উন্নতিতে অবদান রাখতে পারাটাই তাঁর কাছে বড় বিষয়। সেই কারণেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ক্রিকেটের ধরন, শরীর আর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দলকে কী ভাবে সাহায্য করা যায়, সেটিই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কোহলির ক্রিকেটজীবনের এই পর্যায়ে এসে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়েও স্বাভাবিক ভাবেই আলোচনা বাড়ছে। ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন চক্র শুরু হয়েছে। কোহলি জানিয়েছেন, ২০২৭ বিশ্বকাপই ভারতের হয়ে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হবে এবং তাঁর লক্ষ্য সেই প্রতিযোগিতায় ভারতকে জেতানো। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজ় দিয়ে সেই লক্ষ্যে নতুন অধ্যায়ের শুরু হচ্ছে। রবিবার প্রথম ম্যাচে ১৫০০০ রান করে বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয় স্থানে কোহলি। তবে দীর্ঘ কেরিয়ারের সাফল্যের পাশে কিছু পরাজয়ের স্মৃতিও থেকে যায়। কোহলির কাছে তেমনই একটি হার ২০১৯ সালের এক দিনের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল।
ম্যানচেস্টারে নিউ জ়িল্যান্ডের (New Zealand) বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে ভারত ১৮ রানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল। ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে দুই দিনে গড়িয়েছিল। নিউ জ়িল্যান্ড প্রথমে ২৩৯/৮ রান করে। রান তাড়া করতে নেমে ভারতের শুরুটা ভয়াবহ হয়, মাত্র কয়েক রানের মধ্যে রোহিত শর্মা (Rohit Sharma), লোকেশ রাহুল (KL Rahul) এবং কোহলি ফিরে যান। শেষ পর্যন্ত ভারতের ইনিংস থামে ২২১ রানে। সেই ম্যাচে কোহলির ব্যক্তিগত স্কোর ছিল মাত্র এক রান। ট্রেন্ট বোল্টের (Trent Boult) বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের প্রথম কয়েক ওভারেই নিউ জ়িল্যান্ডের পেস আক্রমণ প্রবল চাপ তৈরি করেছিল। ম্যাচের পরে কোহলি নিজেই জানিয়েছিলেন, প্রথম ৪০-৪৫ মিনিটের ব্যাটিং ভারতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিউ জ়িল্যান্ড নতুন বলে যে ভাবে বোলিং করেছিল, তাতে ভারতীয় ব্যাটাররা স্বাভাবিক ভাবে রান করার সুযোগ পায়নি।
পরবর্তী সময়ে সেই ম্যাচ নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি (Mahendra Singh Dhoni) ও রবীন্দ্র জাডেজার (Ravindra Jadeja) জুটি ভারতকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। জাডেজা করেছিলেন ৭৭ রান, ধোনির ব্যাট থেকে এসেছিল ৫০। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৮ রানে থেমে যায় ভারতের লড়াই। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো বড় মঞ্চে এমন পরাজয়ের অভিঘাত স্বাভাবিক ভাবেই গভীর ছিল। বিরাট কোহলির সাম্প্রতিক কথায়ও ২০১৯-এর সেই ম্যাচের স্মৃতি ফিরে এসেছে। তাঁর কাছে ২০১৯-এর সেমিফাইনাল হার ২০২৩ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ ফাইনালের পরাজয়ের থেকেও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কারণ, ২০১৯-এর সেই ম্যাচে ভারত লিগ পর্বে দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলেছিল। পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থেকে সেমিফাইনালে ওঠার পর শেষ চারে নিউ জ়িল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র একটি খারাপ সময়ের প্রভাব কতটা বড় হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা কোহলির কাছে এখনও মনে দাগ কেটে রয়েছে।
সেই ম্যাচের কাঠামোটিও কোহলির হতাশার অন্যতম কারণ। বৃষ্টিতে প্রথম দিনের খেলা বিঘ্নিত হওয়ার পর নিউ জ়িল্যান্ডকে পরের দিন ইনিংস শেষ করতে হয়েছিল। তার পর ভারত রান তাড়া করতে নামে। পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় ম্যাচের ছন্দও পাল্টে যায়। নিউ জ়িল্যান্ডের বোলাররা নতুন বলে সুবিধা পেয়েছিলেন এবং ভারতের প্রথম সারির ব্যাটিং দ্রুত ভেঙে পড়েছিল। আইসিসির নথিতেও সেই ম্যাচে নিউ জ়িল্যান্ডের নতুন বলের বোলিং এবং ভারতের প্রথম দিকের উইকেট পতনকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোহলির কাছে এই হার বেদনার। বহু বছর পরেও সেই ম্যাচের কথা বলতে গিয়ে তাঁর হতাশার মাত্রা ফুটে উঠছে। ২০২৫ সালেও দেওয়া এক পডকাস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, সেই সেমিফাইনালের পরের সকালটি তাঁর কাছে অস্বাভাবিক রকমের ভারী ছিল। নিজের দৈনন্দিন কাজ কী ভাবে শুরু করবেন, সেটিও যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সেই অভিজ্ঞতা দেখায়, বড় ম্যাচের হার একজন ক্রিকেটারের উপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
পরাজয় নিয়ে দীর্ঘ সময় আক্ষেপ থাকলেও সেখান থেকে শেখার কথাও বলেছেন কোহলি। ২০১৯ সালে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পরও তাঁর বক্তব্য ছিল, খেলাধুলায় ব্যর্থতা মেনে নিয়ে ভুল বিশ্লেষণ করা জরুরি। একটি ম্যাচ বা একটি ভুল একজন ক্রিকেটারের পুরো পরিচয় হয়ে উঠতে পারে না। বরং সেখান থেকে পরবর্তী ম্যাচের জন্য শিক্ষা নেওয়াই দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের অংশ। এখন সেই কোহলিই কেরিয়ারের শেষ বিশ্বকাপের দিকে এগোচ্ছেন। দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের পরিসমাপ্তির আগে তাঁর সামনে রয়েছে আরও একটি বড় লক্ষ্য। ২০২৭ সালের বিশ্বকাপ তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হতে চলেছে বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন। তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজ় সিরিজ় থেকে শুরু হওয়া নতুন এক দিনের পর্ব তাঁর শেষ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশও।
নিজেকে সর্বকালের সেরা বলার পথে না গিয়ে কোহলি নিজের ক্রিকেটজীবনের দিকে তাকাচ্ছেন অন্য ভাবে। কত রান করেছেন, কত শতরান রয়েছে, কত রেকর্ড ভেঙেছেন, তার পাশাপাশি দেশের হয়ে কতটা অবদান রাখতে পেরেছেন, সেই প্রশ্নটিই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর দীর্ঘ কেরিয়ারের অসংখ্য সাফল্যের মাঝেও ২০১৯-এর সেই সেমিফাইনাল হার এখনও তাঁর স্মৃতিতে আলাদা জায়গা দখল করে রয়েছে। ক্রিকেটে সাফল্য যত বড়ই হোক, কিছু পরাজয় সময় পেরিয়েও মুছে যায় না, কোহলির সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই বাস্তবতাই ফের সামনে এল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Virat Kohli Injury, Kohli Out Afghanistan Series | হ্যামস্ট্রিং চোটে ধাক্কা! আফগানিস্তান সিরিজে নেই বিরাট কোহলি, চিন্তায় ভারতীয় শিবির




