সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : মাইক্রো-সার (Micro fertilizer export), বিশেষায়িত সার এবং উদ্ভিদের পুষ্টি উপকরণ তৈরির ক্ষেত্রে দেশে ব্যবসা পরিচালনার নিয়ম আরও সহজ করার দাবি উঠল। একই সঙ্গে রপ্তানির অনুমোদন দ্রুত করা, রাজ্যভিত্তিক লাইসেন্স ব্যবস্থার জট কমানো এবং সার নিয়ন্ত্রণ আদেশ বা FCO-র আওতাধীন পণ্যে এক ধরনের GST কাঠামো চালুর প্রস্তাবও সামনে এসেছে। নতুন দিল্লির ভারত মণ্ডপমে ১৭ সেপ্টেম্বর আয়োজিত ভারতীয় মাইক্রো-ফার্টিলাইজার্স ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বা আইএমএমএ (Indian Micro-Fertilizers Manufacturers Association) -এর তৃতীয় শিল্প-সরকার গোলটেবিল বৈঠকে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকদের পাশাপাশি মাইক্রো-সার ও বিশেষায়িত সার উৎপাদক সংস্থার প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেন। কৃষি, রপ্তানি এবং কর কাঠামো, তিনটি আলাদা ক্ষেত্রকে একই আলোচনার আওতায় এনে শিল্পের পক্ষ থেকে একাধিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। শিল্প প্রতিনিধিদের বক্তব্য, বর্তমান ব্যবস্থায় একই ধরনের নথি ও তথ্য একাধিক জায়গায় জমা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। রাজ্যভেদে অনুমোদনের নিয়ম ও সময়ের পার্থক্যও ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ তৈরি করে। সেই জায়গা থেকেই উঠে এসেছে ‘এক দেশ, এক লাইসেন্স’-এর ধারণা।

আইএমএমএ-র সভাপতি রাহুল মিরচান্দানি (Rahul Mirchandani) কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের কাছে একটি জাতীয় ডিজিটাল সার লাইসেন্স তথ্যভাণ্ডার তৈরির প্রস্তাব দেন। এই ব্যবস্থায় কোনও সংস্থা একবার তার প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি জমা দিলে তা কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজ্যের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় একই নথি বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। শিল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলি জাতীয় তথ্যভাণ্ডার থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারে। আইএমএমএ-র সহ-সভাপতি সমীর পাঠারে (Sameer Pathare) আলোচনায় এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলেন, যেখানে একই তথ্য বারবার সংগ্রহের বদলে একবার তথ্য দেওয়া এবং একবার যাচাইয়ের পর প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি ব্যবহার করা যাবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে তথ্যের অভিন্ন কাঠামো তৈরি হলেও রাজ্যগুলির নিজস্ব নিয়ন্ত্রক ভূমিকা বজায় রাখা সম্ভব। ফলে রাজ্য সরকারের অনুমোদনের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখেই আবেদন যাচাই ও লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াকে দ্রুত করা যেতে পারে।
শিল্পের এই প্রস্তাব নিয়ে কেন্দ্রীয় স্তর থেকেও আলোচনার ইঙ্গিত মিলেছে। কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের সার বিষয়ক সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপসচিব সুবোধ কুমার (Subodh Kumar) জানান, জাতীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার এবং ‘এক দেশ, এক লাইসেন্স’-এর ধারণা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। ফলে প্রস্তাবটি শুধুমাত্র শিল্পের দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারি স্তরেও আলোচনার পরিসরে এসেছে। লাইসেন্স ব্যবস্থার পাশাপাশি বৈঠকে ভারতের মাইক্রো-সার শিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। শিল্প প্রতিনিধিদের বক্তব্য, মাইক্রো-সার, বিশেষায়িত সার, নির্দিষ্ট ফসল বা মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি পুষ্টি উপকরণ ও অন্যান্য উদ্ভিদ পুষ্টি পণ্য তৈরিতে ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। সেই উৎপাদনকে দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে রপ্তানি ক্ষেত্রটি আরও বড় হতে পারে।
কিন্তু বিদেশে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে অনুমোদন সংক্রান্ত একাধিক ধাপ শিল্পের কাছে সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। বিশেষ করে রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় NOC বা No Objection Certificate এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনুমোদন পেতে সময় লাগার বিষয়টি তুলে ধরেন শিল্প প্রতিনিধিরা। তাঁদের বক্তব্য, একটি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পরও প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রপ্তানি আটকে থাকলে উৎপাদক সংস্থাকে আর্থিক ও ব্যবসায়িক চাপের মুখে পড়তে হয়। এই প্রসঙ্গে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীন বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদফতর বা ডিজিএফটি (Directorate General of Foreign Trade) -এর উপ-পরিচালক প্রকাশ কাম্বলে (Prakash Kamble) জানান, অনুমোদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হলে ডিজিএফটি এবং কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। অর্থাৎ রপ্তানির নিয়ম সরল করতে শুধু একটি দফতরের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়, একাধিক সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। রপ্তানিমুখী উৎপাদনের জন্য আলাদা ব্যবস্থার দাবিও উঠেছে এই বৈঠকে। শিল্পের প্রস্তাব, কোনও পণ্যের গায়ে যদি উল্লেখ থাকে, ‘রপ্তানির জন্য নির্ধারিত পণ্য, ভারতে বিক্রির জন্য নয়’, তা হলে সেই পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে পৃথক অনুমোদন কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। এই ধরনের পণ্য শুধুমাত্র বিদেশের বাজারের জন্য তৈরি হলে দেশীয় বাজারে বিক্রির সঙ্গে যুক্ত কিছু নিয়ন্ত্রক শর্ত তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না রাখার বিষয়টি বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছে শিল্পমহল।

তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ফর্মুলেশনের পণ্য তৈরি করার সুযোগ থাকলে ভারতীয় সংস্থাগুলি বিভিন্ন দেশের চাহিদার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে। পাশাপাশি রপ্তানি অনুমোদন যদি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা যায়, তা হলে বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি থেকে পণ্য পাঠানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সময় কমতে পারে। বৈঠকে কর কাঠামো নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে আসে। আইএমএমএ-র সদস্যরা FCO -এর আওতাধীন উদ্ভিদ পুষ্টি পণ্যগুলির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ GST চালুর দাবি জানান। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য, প্যাকেটের আকার এবং পণ্যের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী কর কাঠামোয় পার্থক্য দেখা যায় বলে শিল্প প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, একই ধরনের বা কাছাকাছি প্রকৃতির পণ্যের ক্ষেত্রে করের হারে অমিল থাকলে উৎপাদক এবং বাজার, দুই ক্ষেত্রেই হিসাব জটিল হয়। এর সঙ্গে উঠে এসেছে ইনভার্টেড ডিউটি বা উল্টো কর কাঠামোর সমস্যাও। কোনও পণ্য তৈরির জন্য ব্যবহৃত কাঁচামালের উপর যে হারে কর দিতে হচ্ছে, চূড়ান্ত পণ্যের ক্ষেত্রে তার চেয়ে কম হারে GST প্রযোজ্য হলে সংস্থার ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট জমে থাকতে পারে। এর ফলে উৎপাদনকারী সংস্থার কার্যকরী মূলধনের উপর চাপ পড়তে পারে। শিল্পের দাবি, এই ধরনের পরিস্থিতি কমাতে FCO-র আওতাধীন উদ্ভিদ পুষ্টি পণ্যগুলির জন্য কর কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার।
প্যাকেটের মাপের ভিত্তিতে করের পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিল্প প্রতিনিধিদের মতে, একই বা কাছাকাছি ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্যাকেটের আকার বদলানোর কারণে করের ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি হলে উৎপাদক ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ে। বিশেষ করে প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি সার এবং বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণে তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে কোন শ্রেণিতে পণ্য পড়বে এবং কত শতাংশ GST প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে একরকম নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়েছে। এই গোলটেবিল বৈঠকে তাই শুধু লাইসেন্স বা কর নয়, পণ্যের সত্যতা যাচাই, FCO-র নিয়ন্ত্রক কাঠামো, ডিজিটাল অনুমোদন ও রপ্তানির জন্য পৃথক উৎপাদন ব্যবস্থার মতো একাধিক বিষয়ও আলোচনায় আসে। শিল্পের প্রস্তাবগুলির মধ্যে রয়েছে জাতীয় স্তরে অভিন্ন লাইসেন্স তথ্যভাণ্ডার, একবার তথ্য জমা দিয়ে বিভিন্ন সরকারি ব্যবস্থায় তার পুনর্ব্যবহার, সময়সীমাবদ্ধ রপ্তানি অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পৃথক ফর্মুলেশন তৈরির সুযোগ।
মাইক্রো-সার ও বিশেষায়িত সার শিল্প কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এই ক্ষেত্রের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি কৃষি অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। নতুন ধরনের পুষ্টি উপকরণ, নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী তৈরি সার এবং বিভিন্ন ফসলের জন্য বিশেষ ফর্মুলেশনের বাজার বাড়ছে। শিল্পের বক্তব্য, দেশীয় উৎপাদন কাঠামোকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে শুধু কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়, লাইসেন্স, কর, রপ্তানি অনুমোদন এবং পণ্যের নিয়ন্ত্রক কাঠামোকেও একই সঙ্গে সহজ করতে হবে। ‘এক দেশ, এক লাইসেন্স’ -এর প্রস্তাব কার্যকর হলে রাজ্যভিত্তিক অনুমোদনের সঙ্গে জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের সমন্বয় তৈরি হতে পারে। আবার রপ্তানি পণ্যের জন্য পৃথক অনুমোদন ব্যবস্থা চালু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মাইক্রো-সার ও বিশেষায়িত সার প্রস্তুতকারকদের কাজের পরিধি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে FCO-র আওতাধীন পণ্যে ৫ শতাংশ GST-এর দাবি কার্যকর হলে কর কাঠামো নিয়ে শিল্পের দীর্ঘদিনের কিছু প্রশ্নের সমাধানের পথ খুলতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি। কিন্তু, এই প্রস্তাবগুলির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর। আপাতত গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় মাইক্রো-সার শিল্পের সামনে থাকা লাইসেন্স, রপ্তানি ও কর সংক্রান্ত সমস্যাগুলিকে একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এখন নজর থাকবে জাতীয় ডিজিটাল লাইসেন্স ব্যবস্থা, রপ্তানি অনুমোদনের সময়সীমা এবং FCO-র পণ্যে GST কাঠামো নিয়ে পরবর্তী সরকারি পদক্ষেপের দিকে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Annapurna Yojana fourth installment, Annapurna Yojana September 2026 | অন্নপূর্ণার চতুর্থ কিস্তিতে ৩ হাজার টাকা, দেড় কোটিরও বেশি মহিলার অ্যাকাউন্টে অর্থ! বাংলায় ‘কাটমানি’ নিয়েও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কটাক্ষ




