সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: রাশিয়ার কাছ থেকে তেল (India Russia Oil 2026) কেনা নিয়ে আমেরিকার নতুন চাপের মুখে নিজেদের অবস্থান ফের জানিয়ে দিল ভারত। ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে নতুন দিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সেই প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের নীতি বজায় রাখবে ভারত। এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’। রাশিয়ার জ্বালানি কিনছে এমন দেশগুলির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে এই আইন। সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিধান নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারত ও চিন রাশিয়ার বড় তেল ক্রেতা হওয়ায় নতুন মার্কিন পদক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে দুই দেশের ক্ষেত্রেই আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে আইনটি পাস হওয়ার পর এখন পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দিকে নজর রয়েছে।
শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সয়াল (Randhir Jaiswal) বলেন, মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের আধিকারিকদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই এই আইনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভারতের উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তাঁর কথায়, এই আইনের প্রভাব ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং ভারত-মার্কিন সামগ্রিক সম্পর্কের উপরও পড়তে পারে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এই মুহূর্তে আগের বক্তব্যের বাইরে নতুন করে কিছু যোগ করার নেই। ভারতের এই অবস্থানকে বুঝতে গেলে দেশের তেল আমদানির সাম্প্রতিক ছবিটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ মোট আমদানির প্রায় ৫০.৮৩ শতাংশে পৌঁছেছিল বলে রয়টার্সের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের হিসাব ধরলেও রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী ছিল। তবে আগস্টে রাশিয়া থেকে আমদানির পরিমাণ কমেছে এবং সেপ্টেম্বরেও সরবরাহের পরিমাণ কিছুটা নিচে নেমেছে। অর্থাৎ রাশিয়ার উপর নির্ভরতা নিয়ে আলোচনা চললেও ভারতের তেল আমদানির কাঠামো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে।
রাশিয়ার তেলের গুরুত্ব গত কয়েক বছরে আরও বেড়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আবহে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ক্রেতা ও নতুন বাণিজ্যপথ তৈরি হয়। ভারত সেই সময়ে তুলনামূলক কম দামে রাশিয়ার তেল কেনার পরিমাণ বাড়ায়। ফলে ভারতীয় শোধনাগারগুলির জন্য রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ উৎসে পরিণত হয়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ সংক্রান্ত ঝুঁকি বাড়ার সময়ও রাশিয়ার তেল ভারতের জ্বালানি আমদানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ছবিতে কিছু পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। আগস্টে ভারতের রুশ তেল আমদানি জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কমে যায় বলে বিভিন্ন বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। রাশিয়ার সরবরাহের পরিবর্তন, চিনা শোধনাগারগুলির বাড়তি চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক পরিবহণ পরিস্থিতি—একাধিক কারণ এর পিছনে রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। আগস্টে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ঝুড়িতে রাশিয়ার অংশ প্রায় ৪৫ শতাংশে নেমেছিল, যা জুলাইয়ের প্রায় ৫৫.৯ শতাংশের তুলনায় কম।
এই পরিবর্তনের পাশাপাশি ভারত তেল আমদানির উৎসও বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে রাশিয়া থেকে আমদানির পরিমাণও আগস্টের গড়ের তুলনায় কম ছিল বলে কেপলার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে রুশ তেল ভারতের আমদানির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে, অন্যদিকে বিকল্প সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও তেল সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। বিদেশ মন্ত্রকের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই বৈচিত্র্যময় উৎসের নীতিই সামনে এসেছে। ভারত জানিয়েছে, ১৪০ কোটি মানুষের প্রয়োজন মেটাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানি করা হবে। ফলে নয়াদিল্লির বক্তব্যে কোনও একটি দেশ থেকে তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণের বদলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।
মার্কিন আইনটির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও ভারতের ব্যবসায়ী মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদি রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মার্কিন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়, তা হলে ভারতীয় রফতানিকারকদের উপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ ভারত-মার্কিন বাণিজ্য ইতিমধ্যেই শুল্ক ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই আলোচনায় আরও একটি জটিল বিষয় যোগ করতে পারে।
ভারতের জন্য বিষয়টি শুধু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহণ খরচ, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, পণ্য পরিবহণ এবং সাধারণ ভোক্তার উপর পড়তে পারে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে গেলে আমদানি ব্যয়ের উপর তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। মার্কিন আইন নিয়ে ভারতের উদ্বেগের অন্যতম জায়গা তাই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাও। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থানের পিছনে রয়েছে রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রি থেকে আয় কমানোর মাধ্যমে মস্কোর উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্য। মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া আইনটি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি রুশ তেল পরিবহণে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা জোরদার করার কাঠামো তৈরি করেছে। আইনটি নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতেও কিছু মতভেদ রয়েছে এবং প্রেসিডেন্টের হাতে দেওয়া অতিরিক্ত শুল্ক ক্ষমতার পরিধি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ভারত অবশ্য রাশিয়া থেকে তেল কেনাকে দেশের জ্বালানি চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখে এসেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও একটি উৎসের উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী সরবরাহের উৎস পরিবর্তন করা হবে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনাও চালিয়ে যাবে ভারত। এখন নজর থাকবে পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের দিকে। মার্কিন আইনটি কার্যকর হওয়ার পরে ওয়াশিংটন কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) নতুন ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করেন এবং কোন দেশ বা বাণিজ্যিক সংস্থার উপর কী ধরনের শুল্ক প্রয়োগ করা হয়, তার উপর পরিস্থিতির পরবর্তী দিক নির্ভর করবে। ভারতও জানিয়েছে, দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং শিল্প ও বাণিজ্য মহলের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে।
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাই রাশিয়ার তেল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে আমেরিকা রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে ভারত তার জ্বালানি আমদানির খরচ, সরবরাহের নিশ্চয়তা ও দেশের অর্থনীতির প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে। ফলে আগামী দিনে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির আলোচনায় জ্বালানি, বাণিজ্য এবং শুল্ক, এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত হয়ে উঠতে পারে। এই মুহূর্তে তাই ভারতের অবস্থানকে ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানব না’ এই সরল ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করার বদলে নয়াদিল্লির ঘোষিত নীতিটি দেখা হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহের বৈচিত্র্য এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানির পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও দেশটি এখনও ভারতের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। আর মার্কিন কংগ্রেসের নতুন আইন সেই বাণিজ্যিক সম্পর্কের উপর সম্ভাব্য চাপ তৈরি করেছে। আগামী দিনে ভারত কোন পথে তেল আমদানির ভারসাম্য বদলায় এবং ওয়াশিংটনের নতুন আইন বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হয়, তার উপরই পরবর্তী পরিস্থিতির অনেকটাই নির্ভর করবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Modi stops speech for Xi Jinping, Modi Xi Jinping BRICS Summit | ‘উনি ঠিক আছেন তো?’ জিনপিংকে দেখে বক্তৃতা থামালেন মোদী, ব্রিক্সের দ্বিতীয় দিনে ঐক্যের ডাক




