সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বিদেশের ঝাঁ-চকচকে কর্মজীবন ছেড়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে ভারতে ফিরেছিলেন আইএএস অফিসার দিব্যা মিত্তল (Divya Mittal)। আইআইটি দিল্লি ও আইআইএম বেঙ্গালুরুর প্রাক্তনী সেই দিব্যা মিত্তল এবার ১৩ বছরের প্রশাসনিক কর্মজীবনের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রবিবার, ৩০ আগস্ট সমাজমাধ্যমে নিজের পদত্যাগের কথা জানিয়ে দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি তুলে তিনি ধরেছেন। দিব্যা মিত্তলের কর্মজীবনের শুরুটা হয়েছিল অন্য রকমভাবে। দেশের দুই নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন লন্ডনে। সেখানে ফিনান্স ক্ষেত্রে চাকরিও পান। পেশাগত দিক থেকে সেই জীবন সফল হলেও দেশের বাইরে থাকার সময় নিজের মধ্যে এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই টানই তাঁকে বিদেশের চাকরি ছেড়ে ভারতে ফিরিয়ে আনে।
ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়ার পর ২০১৩ ব্যাচের আইএএস অফিসার হিসেবে প্রশাসনে যোগ দেন দিব্যা। ২০১২ সালের সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় তাঁর সর্বভারতীয় স্থান ছিল ৬৮। আইআইটি দিল্লি থেকে বিটেক এবং আইআইএম বেঙ্গালুরু থেকে পিজিডিএম করার পর লন্ডনে পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু দেশের মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রশাসনের পথে নিয়ে আসে। ১৩ বছর পর সেই প্রশাসনিক অধ্যায়েই এবার দাঁড়ি টানার সিদ্ধান্ত। সমাজমাধ্যমে নিজের পদত্যাগের কথা জানিয়ে দিব্যা লেখেন, ‘আজ আইএএস থেকে পদত্যাগ করে ১৩ বছরের এক অবিস্মরণীয় যাত্রা থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ালাম।’ একই সঙ্গে নিজের জীবনের সেই সময়ের কথাও তুলে ধরেছেন, যখন বিদেশে থাকার পরও মনে হয়েছিল, জীবনের কোনও একটি জায়গা যেন অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ভালো জীবন গড়ার লক্ষ্য ছোটবেলা থেকেই ছিল বলে জানিয়েছেন দিব্যা। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পড়াশোনায় কঠোর পরিশ্রম করেন। আইআইটি দিল্লিতে পড়ার সুযোগ, তার পর আইআইএম বেঙ্গালুরুতে উচ্চশিক্ষা এবং লন্ডনের ফিনান্স সংস্থায় কাজ, কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে একের পর এক সাফল্য এলেও তিনি তাতেই থেমে থাকতে পারেননি। বিদেশে থাকার সময় দেশের সঙ্গে দূরত্ব তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। নিজের দক্ষতা ও শিক্ষাকে দেশের মানুষের কাজে লাগানোর ইচ্ছা থেকেই ভারতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ইউপিএসসি পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়ার পর উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের আইএএস হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রশাসনে থাকার ১৩ বছরে উত্তরপ্রদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছেন দিব্যা মিত্তল। দেওরিয়া, মির্জাপুর ও সন্ত কবীর নগরের জেলাশাসক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ সরকারের রাজস্ব দফতরেও স্পেশাল সেক্রেটারি পদে কাজ করেছেন। নিজের প্রশাসনিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়কে আলাদা আলাদা শিক্ষার সঙ্গে তুলনা করেছেন দিব্যা। দেওরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, সঠিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, দায়িত্বের অংশ। মির্জাপুরের কাজ তাঁকে শিখিয়েছে, কোনও কাজকে ‘অসম্ভব’ বলে ধরে নেওয়া সব সময় ঠিক নয়। মানুষের ধারণা অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
মির্জাপুরের মা বিন্ধ্যবাসিনী মন্দিরের কথাও নিজের লেখায় স্মরণ করেছেন দিব্যা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক পদ যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, মানুষের জীবনে প্রকৃত শক্তির উৎস শুধুমাত্র পদ বা ক্ষমতা নয়। মানুষের আস্থা এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদও একজন প্রশাসনিক আধিকারিকের কর্মজীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তাঁর পদত্যাগের লেখায় সবচেয়ে আবেগঘন হয়ে উঠেছে একটি বৃদ্ধার স্মৃতি। লহুরিয়া দিহ এলাকার এক বৃদ্ধার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর গ্রামে প্রথম বার জল পৌঁছেছিল। সেই সময় ওই বৃদ্ধা কোনও দীর্ঘ বক্তব্য দেননি। কাঁপা হাতে দিব্যার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন। বহু বছর পরেও সেই মুহূর্ত তাঁর মনে রয়ে গিয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
দিব্যার লেখায় উঠে এসেছে, প্রশাসনিক পদ থেকে সরে গেলেও মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক মুছে যায় না। কোনও সরকারি প্রকল্পের সাফল্যের পরিসংখ্যানের চেয়েও মানুষের জীবনে তার প্রভাব অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে তাঁর স্মৃতিচারণে সেই কথাই উঠে এসেছে। কিন্তু আইএএস পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর অর্থ যে মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা শেষ হয়ে যাওয়া নয়, নিজের বক্তব্যে সেই ইঙ্গিতও রেখেছেন দিব্যা মিত্তল। বিদেশের ফিনান্স সংস্থা থেকে ভারতীয় প্রশাসন, জেলা শাসনের দায়িত্ব থেকে রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দফতর, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার তিনি নতুন পর্বের দিকে এগোচ্ছেন। ১৩ বছরের প্রশাসনিক জীবনের শেষে তাঁর পদত্যাগ তাই কেবল একটি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা নয়। লন্ডনের পেশাগত জীবন থেকে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ফিরে আসা যে লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতার নানা অধ্যায় স্মরণ করেই বিদায় নিয়েছেন তিনি। এখন প্রশ্ন, প্রশাসনের বাইরের জীবনে দিব্যা মিত্তলের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে চলেছে। দেশের মানুষের জন্য কাজ করার যে ইচ্ছার কথা তিনি লিখেছেন, ভবিষ্যতে সেটি কোন পথে এগোয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : UPSC Success Story, Yuvraj Marmat UPSC, P. Monica UPSC | UPSC জয় করে ভালবাসায় বাঁধা যুবরাজ-মনিকা, অনুপ্রেরণার সাফল্যের গল্প




