সম্পাদকীয়
দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোরতা, আইনের শাসনেই হোক প্রতিকার এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকই তার দেশ ভক্তির গৌরব চিত্র তুলে ধরুক নিজের মত করে… দেশ শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়। দেশ মানে মানুষের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। দেশের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তাকে আঘাত করে এমন কর্মকাণ্ড তাই কোনওভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, হিংসার উস্কানি, সন্ত্রাসে মদত, বিদেশি শক্তির স্বার্থে সহযোগিতা কিংবা দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ও আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অন্যদিকে, স্বাধীনতার অধিকারকে সামনে রেখে দেশের নিরাপত্তা বিপন্ন করার কর্মকাণ্ডকেও প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। কোনও বক্তব্য, দেওয়াল লিখন, পোস্টার, প্রচার বা সংগঠিত কার্যকলাপে যদি সরাসরি হিংসার আহ্বান, সন্ত্রাসের প্রচার, বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে উসকানি কিংবা দেশের শত্রুপক্ষকে সহায়তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী তদন্ত হওয়া উচিত। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। আমরা দেশের কথা ভেবে গণতন্ত্রকে সামনে রেখে প্রতিবাদ করতেই পারি। সরকার ভুল করলে ধরতেই পারি তা বলে দেশের বিরোধিতা করে কখনওই কোন বাক্য ব্যবহার উচিৎ হবে না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আবেগের পরিবর্তে প্রমাণ। কোনও দেওয়ালে আপত্তিকর লেখা দেখা গেলেই সঙ্গে সঙ্গে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত এ কথা বলব না। কারণ মনে রাখতেই হবে, আসল মাথা ধরতে গেলে জানা দরকার, লেখাটি কে করেছে, তার উদ্দেশ্য কী ছিল, এর সঙ্গে কোনও সংগঠিত অপরাধের সম্পর্ক রয়েছে কি না ইত্যাদি রকম প্রতিটি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা জনতার রোষ কখনও বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। একটি সুস্থ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হল, অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে কোনও আপস থাকা উচিত নয়; একই সঙ্গে নিরপরাধ নাগরিকের অধিকারও কোনও পরিস্থিতিতে উপেক্ষা করা যায় না। দেওয়াল লিখন বা প্রচারের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে। জনস্থান, সরকারি সম্পত্তি কিংবা অন্যের সম্পত্তিতে বেআইনি লেখা হলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক বা বিতর্কিত লেখাকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত করা উচিত নয়। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়াই হবে পরিণত প্রশাসনের পরিচয়। তবে দেশ বিরোধী যে কোনও লেখায় দেশের সম্মানে হস্তান্তর বলেও দাবি হতেই পারে। দেশ বিরোধী মন্ত্যব অত্যন্ত দুঃখজনক। মানবিক ব্যথারও কারণ। দেশ বিরোধী কোনও শব্দ বা বাক্য বা উচ্চারিত ভাষা যে বা যারাই ব্যবহার করবে তাদের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেই মনে করি। দেশের প্রতি ভালোবাসা কেবল পতাকা উত্তোলন কিংবা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হবে এটা বলব না। দেশের আইন মেনে চলা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, জনসম্পত্তি রক্ষা করা এবং সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোও দেশপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। আজকের সমাজে রাজনৈতিক মেরুকরণ যত বাড়ছে, ততই দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন বাড়ছে। শব্দের উত্তেজনা দিয়ে দেশপ্রেমের মাপকাঠি তৈরি করা যায় না। আবার দেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধকেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে রাখা যায় না। দুটির মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করতে হবে।দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ হলে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই নেওয়া উচিত। কিন্তু সেই ব্যবস্থা হতে হবে সংবিধানসম্মত, প্রমাণভিত্তিক ও নিরপেক্ষ। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি শুধু শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতায় হবে এমন নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতাতেও প্রয়োগ থাকতে হবে। আমরা এই দেশের নাগরিক দেশের মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী পথ। তাই প্রতিহিংসা নয়, আইন রক্ষা। আইনের শাসন কার্য সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার। ক্ষমতায় থাকা মানেই বলপূর্বক ক্ষমতার অপব্যবহার করা উচিৎ হবে না। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। মতের পার্থক্য থাকুক, রাজনৈতিক বিতর্ক থাকুক, তবু দেশের স্বার্থে সংবিধান ও আইনের প্রতি আস্থা অটুট থাকুক এই হোক দায়িত্বশীল সমাজের অঙ্গীকার।আমাদের দেশ ভারতবর্ষ হয়ে উঠুক গৌরবময় পৃথিবীর অন্তর।🍁
🍂মহামিলনের কথা
পিতা দেহ দান করেছেন বলেই আজ আমি মানব দেহ যে শরীর মুক্তির সোপান সে দেহ পেয়েছি। এ ঋণ শোধের উপায় পুত্র উৎপাদন করা। সদৃশী ভাৰ্য্যা গ্রহণ করত তাতে পুত্র উৎপন্ন করার দ্বারা পিতৃঋণ শোধ হয়। যাঁরা ব্রহ্মচর্য্য গ্রহণ করেন বা সন্ন্যাসী হন, তার দ্বারাই তাঁদের পিতৃঋণ শোধ হয়। যাঁরা ব্রহ্মচর্য্য গ্রহণ করেন, তাঁর মাতা আগামী জন্মে পুরুষ দেহ লাভ করেন। এইভাবে সকাম কর্মকারিগণ সৃষ্টিচক্রে পুনঃ পুনঃ যাতায়াত করতে থাকে। বহু হব জন্মাব এ বাসনার নিবৃত্তি হলে জন্ম মরণ নিবৃত্তি হয়।
শ্রীলীলাবিভূতি
৺৭ শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ।
মাতর্গঙ্গে
২১/৩/১৩৮৮
জয়গুরু
আমরা লীলাবিভূতির লীলা কথা লিখেছি, অতঃপর লীলাবিভূতিবাসিগণের লীলার কথা আলোচনা করবো। এই বিভূতিতে যারা যথেচ্ছাচারী শাস্ত্রপথপরিত্যাগী, তারা দেহত্যাগের পর ‘জায়স্ব ম্রিয়স্ব’ দংশ-মশকাদি হয়ে যাতায়াত করতে থাকে।

যাঁরা সকাম কৰ্ম্ম করেন অর্থাৎ স্বর্গকামনায় যাগ যজ্ঞ দান ধ্যানাদি সকাম কৰ্ম্ম করেন, তাঁদের মৃত্যুকালে বাকরোধ হয়, শিথিল ইন্দ্রিয়গণ মনে প্রবেশ করে, মন প্রাণে প্রবিষ্ট হয়। তখন সূক্ষ্মদেহ নষ্ট হয়ে যায়।
জীবাত্মা বর্তমান জন্মের মৃত্যুকালীন চিন্তা নিয়ে সূক্ষ্মদেহ নির্মাণ করেন। তিনি বায়ুভূত নিরাশ্রয় অবস্থায় অবস্থান করেন। আত্মীয়গণ দেহটি দগ্ধ করে। দশদিনে দশপিণ্ড দান করলে তিনি প্রেত-দেহ প্রাপ্ত হন, শ্রাদ্ধাদি ভোজন করেন। এক বৎসর গত হলে পুত্রাদি আত্মীয়গণ সপিণ্ডীকরণ করলে পুণ্যবানেরা দেবদেহ আর পাপিগণ যাতনা-দেহ প্রাপ্ত হন। বিচার অন্তে পাপীরা নরকে গিয়ে স্ব স্ব পাপের ফল ভোগের পর ছাগাদি পশুদেহ লাভ করে। আর পুণ্যবানসকল পিতৃলোকে উপস্থিত হন। সেখান থেকে আলোকময় স্বর্গে গমন করেন। স্বর্গের তিন প্রকার ভেদ। উত্তম পুণ্যে উত্তম স্বর্গ, মধ্যম পুণ্যে মধ্যম স্বর্গ, অধম পুণ্যে অধম স্বর্গ। জীব আপনার যেরূপ পুণ্য, সেইরূপ স্বর্গ ভোগ করে। স্বর্গ আলোকময়, নৃত্যগীতে স্বর্গ আনন্দধাম হয়ে আছে। যখনই পুণ্য শেষ হয়, তৎক্ষণাৎ জীব দেবদেহ পরিত্যাগ করে আকাশ হন। তা থেকে— বাতাস— ধূম— পাতলা মেঘ— ঘনমেঘ হয়ে বৃষ্টিরূপে শস্যে পড়ে— ধান্য, মুগ, ব্রীহিশস্য, যবাদি শস্য। সেই শস্য পুরুষ কর্তৃক ভক্ষিত হয়ে বীর্য্যরূপে পরিণত হয়। ঋতুস্নাতা স্ত্রী-যোনিতে শুক্র নিষিক্ত হয়ে স্ত্রীরজের সহিত সমাযোগে দ্রবাকার ধারণ করে।
শিবগীতা অষ্টমোহধ্যায়ঃ
শ্রীভগবানের আদি সঙ্কল্প “বহু স্যাং প্রজায়েয়েতি” বহু হব জন্মাবো। সেজন্য নরনারী পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ সকলেরই মধ্যে ‘বহু হব জন্মাবো’ এই সঙ্কল্প খেলা করে। সকলেই চায় বহু হতে। বহু হতে হলে চাই ক্ষেত্র আর বীজ। যাঁদের কর্মক্ষয় হয়ে গেছে, তাঁরা আর বহু হতে চায় না। পুত্র বললো বিয়ে করবো না। মাতা যথেষ্ট কান্নাকাটি করেও পুত্রের মত পরিবর্তন করতে পারলে না, যুবতী কন্যা বললো বিয়ে করবো না। পিতা পাদুকা ও চাবুক প্রহার করে কন্যার মত যখন পরিবর্তন করতে পারেন না, তখন এঁদের গতি উর্দ্ধ দিকে হয়। যারা বিবাহ করতে সম্মত হন না, তাঁদের গতি উপর দিকে হয় তাঁদের আর যাতায়াত করতে হয় না।
জীবমাত্রেই দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ এই তিনটি ঋণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দেবঋণের কারণ, জীব চৌরাশীলক্ষ যোনি ভ্রমণ করেন, দেবগণ বৃষ্টি দ্বারা খাদ্য সামগ্রী উৎপাদন করে থাকেন আর অন্নাদি ভোজন করে জীবিত থাকেন। জীব তজ্জন্য দেবতার নিকট ঋণগ্রস্ত হন, সে ঋণ শোধ নিত্য হোমের দ্বারা করতে হয়।
অগ্নৌ প্রাস্তাহুতিঃ সম্যগাদিত্যমুপতিষ্ঠতে। আদিত্যাজ্জায়তে বৃষ্টির্বৃষ্টেরন্নং ততঃ প্রজাঃ॥
অগ্নিতে আহুতি দিলে সেই আহুতি সূর্য্যে গমন করে। সূর্য্য হতে বৃষ্টি হয় ও তার দ্বারা জীবগণ পোষিত হন।
দ্বিজাতিমাত্রেরই নিত্য হোমের দ্বারা দেবঋণ শোধ করা কর্তব্য। জীবগণ ‘আমি দেহ’ এই অবিদ্যা বশে বার বার যায়ায়াত করতে থাকেন। ঋষিগণই তাঁকে শাস্ত্রজ্ঞান দান করেন। চরম জন্মে ঋষি বলেন, তুমি দেহ হবে কেন? তুমি শ্রীভগবানের অংশ। তাঁর ইচ্ছা হয়েছিল বহু হবো জন্মাবো। বালুকণার এক সহস্রভাগের একভাগের ন্যায় তুমি জীবরূপে তোমার দেহের ডান চোখে অবস্থিত হলে। তুমি দেহ নও তুমি আত্মা, দেহ ব্রহ্মপুর শ্রীভগবান্ গুরুদেবের দেহ। তিনি চিদণু হয়ে পঞ্চপর্ব্বা অবিদ্যাকে আশ্রয় করেন, আমি দেহ (১), অহং অস্মিতা (২), রাগ ইচ্ছা (৩), ইচ্ছার ব্যাঘাতে ক্রোধ (৪), ও মৃত্যু ভয় (৫) এই পঞ্চপর্ব্বা অবিদ্যা। স্বেদজ একুশ লক্ষ, উদ্ভিজ্জ একুশ লক্ষ, অণ্ডজ একুশ লক্ষ এবং জরায়ুজ একুশ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে। তিনি, তুমি হয়ে দ্বিজত্ব লাভ করে যাতায়াত-রূপ লীলা করছো। তুমি দেহ নও আত্মা। তুমি শ্রীভগবানের অংশ শ্রীভগবানই। এই পরম চরম জ্ঞান দান করে যিনি জীবের পুনঃ পুনঃ দেহধারণ নিবারণ করেন, তাঁর ঋণ কি ভাবে শোধ করা যাবে। এ যুগে অধ্যয়ন অধ্যাপনা নাই। তাই ঋণ শোধের কলিযুগের উপায়। শ্রীভগবানের মঙ্গলময় নাম সঙ্কীর্ত্তন।
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা।।
এই নাম সঙ্কীর্ত্তনের দ্বারা সমস্ত জগৎ পবিত্র হবে। পৃথিবীর পরিমাণ ৫০ কোটি যোজন অর্থাৎ ২০০ কোটি ক্রোশ হলেও আকাশ একটি। এখানে নাম সঙ্কীর্ত্তন করলে সমগ্র জগতে এ নাম ধ্বনিত হয়ে সমস্ত বিশ্বকে পবিত্র করবে, সকলের পাপক্ষয় হয়ে যাবে। তখন জ্ঞান উৎপন্ন হবে।
জ্ঞানমুৎপদ্যতে পুংসাং ক্ষয়াৎ পাপস্য কৰ্ম্মণঃ।
পাপ কর্ম্মের ক্ষয় হলে জ্ঞান উৎপন্ন হয়। এ যুগে প্রত্যহ নামসঙ্কীর্ত্তনই ঋষিঋণ শোধের উপায়।
পিতা দেহ দান করেছেন বলেই আজ আমি মানব দেহ যে শরীর মুক্তির সোপান সে দেহ পেয়েছি। এ ঋণ শোধের উপায় পুত্র উৎপাদন করা। সদৃশী ভাৰ্য্যা গ্রহণ করত তাতে পুত্র উৎপন্ন করার দ্বারা পিতৃঋণ শোধ হয়। যাঁরা ব্রহ্মচর্য্য গ্রহণ করেন বা সন্ন্যাসী হন, তার দ্বারাই তাঁদের পিতৃঋণ শোধ হয়। যাঁরা ব্রহ্মচর্য্য গ্রহণ করেন, তাঁর মাতা আগামী জন্মে পুরুষ দেহ লাভ করেন। এইভাবে সকাম কর্মকারিগণ সৃষ্টিচক্রে পুনঃ পুনঃ যাতায়াত করতে থাকে। বহু হব জন্মাব এ বাসনার নিবৃত্তি হলে জন্ম মরণ নিবৃত্তি হয়।
পূর্ব্বকালে ব্রাহ্মণ গর্ভাষ্টমে, ক্ষত্রিয় গর্ভ একাদশে, বৈশ্য গর্ভ দ্বাদশে গুরুগৃহে গমন করত ভিক্ষার দ্বারা জীবন ধারণ পূর্ব্বক দ্বাদশ বৎসর বেদ পাঠ করত গৃহে ফিরে এসে সমাবর্তন অন্তে পিতৃঋণ শোধ করবার জন্য সদৃশী ভাৰ্য্যা দ্বারা পুত্রোৎপাদন করত, শাস্ত্রমত আদর্শ গৃহী হতেন। ব্রাহ্মণ দেহ তপস্যার জন্য। তপস্যা করতেন, জীবিকা ছিল উঞ্ছবৃত্তি, অযাচিত বৃত্তি, ভিক্ষা ইত্যাদি। তারপর পঞ্চাশ বৎসর উত্তীর্ণ হলে বানপ্রস্থ আশ্রমে গমন করত শীতকালে আকণ্ঠ জলে নিমজ্জিত হয়ে, গ্রীষ্মকালে পঞ্চতপা, বর্ষাকালে অনাবৃতস্থানে থেকে তপস্যা- পূর্ব্বক ৭৫ বৎসর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করতেন। তপস্যা দ্বারাই তার বহু হবার বাসনা দূর হয়ে যেতো। ক্ষত্রিয়গণ গর্ভ একাদশে উপনীত হয়ে গুরুগৃহে গমন করত যথাশাস্ত্র বেদপাঠ পূর্ব্বক প্রজাপালন করতেন। নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে প্রজাগণকে শাস্ত্রপথে চালিত করতেন। বৈশ্য বালক গর্ভ দ্বাদশে গুরুগৃহে গমন করত ভিক্ষার দ্বারা জীবিকা অর্জন পূর্ব্বক বেদ পাঠ পূর্ব্বক ১২ বৎসর পরে গৃহে এসে সমাবর্তন করত আদর্শ সংসারী হয়ে জনগণকে সাত্ত্বিক দ্রব্য বিক্রয় করত তাদের ভগবৎপথে চালিত করতেন।
কালের পরিবর্তনে ‘গুরুগৃহে বাস’ বহুদিন বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রীভগবান্ শঙ্কর ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র স্ত্রী পুরুষ যে কোন বর্ণের হোক্ তাদের উদ্ধারের জন্য মন্ত্র সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। সেই মন্ত্র গুরুগণ যে, যে মন্ত্রের অধিকারী তাকে তা দান করে তাদের শ্রীভগবল্লাভের উপায় করে থাকেন।
আকাশস্যাধিপো বিষ্ণুরগ্নেশ্চাপি মহেশ্বরী।
বায়োরগ্নিঃ ক্ষিতেরীশো জীবনস্থ্য গণাধিপঃ।।
আকাশ তত্ত্বের অধিপতি বিষ্ণু, যাঁর শরীরে আকাশতত্ত্বের আধিক্য আছে, শ্রীশ্রীগুরু তাঁকে বিষ্ণুমন্ত্র, এরূপ যাঁর শরীরে অগ্নিতত্ত্বের আধিক্য, তাঁকে মহেশ্বরীর মন্ত্র, বায়ুতত্ত্বের আধিক্য অগ্নি বা সূর্য্য, জলতত্ত্বের গণেশ, পৃথ্বীতত্ত্বের আধিক্যযুক্তকে শিবমন্ত্র দান করেন। শ্রেয়স্কামী শিষ্যগণকে ব্রহ্মজ্ঞ গুরু তত্ত্বৎ দেবতার মন্ত্রদান পূর্বক সাধন পথে চালিত করেন। ক্ষীণকৰ্ম্মা শিষ্য ভগবৎ-সাক্ষাৎকার লাভ করত স্বয়ং কৃতার্থ হয়ে অধিকারী শিষ্যগণকে আমরণ চালিত করত কেহ দেবযান মার্গে পরমপদ লাভ করেন, কেহ বা বাঞ্ছিত স্বরূপ লাভে জীবলীলা শেষ করে আত্ম-স্বরূপ লাভ করেন। এখানেই লীলা অবসান।
—শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব
(বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)
🍂ফিরেপড়া | কবিতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর কবিতা

বিদায়
ক্ষমা করো, ধৈর্য ধরো,
হউক সুন্দরতর
বিদায়ের ক্ষণ।
মৃত্যু নয়, ধ্বংস নয়,
নহে বিচ্ছেদের ভয়—
শুধু সমাপন।
শুধু সুখ হতে স্মৃতি,
শুধু ব্যথা হতে গীতি,
তরী হতে তীর,
খেলা হতে খেলাশ্রান্তি, বাসনা হইতে শান্তি,
নভ হতে নীড়।
যোগীন্দ্রনাথ সরকার -এর কবিতা

কাজের ছেলে
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।
পথে হেঁটে চলি, মনে মনে বলি, পাছে হয় ভুল;
ভুল যদি হয়, মা তবে নিশ্চয়, ছিঁড়ে দেবে চুল।
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।
বাহবা বাহবা- ভোলা ভুতো হাবা খেলিছে তো বেশ!
দেখিব খেলাতে, কে হারে কে জেতে, কেনা হলে শেষ।
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,
ডিম-ভরা বেল, দু’টা পাকা তেল, সরিষার কৈ।
ওই তো ওখানে ঘুরি ধরে টানে, ঘোষদের ননী;
আমি যদি পাই, তা হলে উড়াই আকাশে এখনি!
দাদখানি তেল, ডিম-ভরা বেল, দুটা পাকা দৈ,
সরিষার চাল, চিনি-পাতা ডাল, মুসুরির কৈ!
এসেছি দোকানে-কিনি এই খানে, যত কিছু পাই;
মা যাহা বলেছে, ঠিক মনে আছে, তাতে ভুল নাই!
দাদখানি বেল, মুসুরির তেল, সরিষার কৈ,
চিনি-পাতা চাল, দুটা পাকা ডাল, ডিম ভরা দৈ।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত -এর কবিতা

দূরের পাল্লা
ছিপখান তিন-দাঁড়-তিনজন মাল্লা
চৌপর দিন-ভোর দ্যায় দূর-পাল্লা!
পাড়ময় ঝোপঝাড় জঙ্গল-জঞ্জাল,
জলময় শৈবাল পান্নার টাঁকশাল।
কঞ্চির তীর-ঘর ঐ-চর জাগছে,
বন-হাঁস ডিম তার শ্যাওলায় ঢাকছে।
চুপ চুপু ওই ডুব দ্যায় পান কৌটি
দ্যায় ডুব টুপ টুপ ঘোমটার বৌটি!
ঝকঝক কলসীর বক বক শোন গো
ঘোমটার ফাঁক বয় মন উন্মন গো।
তিন-দাঁড় ছিপখান মন্থর যাচ্ছে,
তিনজন মাল্লায় কোন গান গাচ্ছে?
রূপশালি ধান বুঝি এইদেশে সৃষ্টি,
ধুপছায়া যার শাড়ী তার হাসি মিষ্টি।
মুখখানি মিষ্টিরে চোখ দুটি ভোমরা
ভাব-কদমের ভরা রূপ দেখ তোমরা!
ময়নামতীর জুটি ওর নামই টগরী,
ওর পায়ে ঢেউ ভেঙে জল হোলো গোখরী!
ডাক পাখী ওর লাগি’ ডাক ডেকে হদ্দ,
ওর তরে সোঁত-জলে ফুল ফোটে পদ্ম।
ওর তরে মন্থরে নদ হেথা চলছে,
জলপিপি ওর মৃদু বোল বুঝি বোলছে।
দুই তীরে গ্রামগুলি ওর জয়ই গাইছে,
গঞ্জে যে নৌকা সে ওর মুখই চাইছে।
আটকেছে যেই ডিঙা চাইছে সে পর্শ,
সঙ্কটে শক্তি ও সংসারে হর্ষ।
পান যিনে ঠোঁট রাঙা চোখ কালো ভোমরা,
রূপশালী-ধান-ভানা রাগ দেখ তোমরা।
🍂ফিরেপড়া | গদ্য
বিদেশি মানুষও তাঁর কাছে সন্তান। একবার বিদেশি কাপড় নিয়ে আপত্তি করা এক ব্রহ্মচারীকে তিনি বলেছিলেন, “ওরাও তো আমার সন্তান।” কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি দেশের দুঃখ বা বিদেশি শাসনের অন্যায়কে মেনে নিয়েছিলেন। দেশের খাদ্য ও বস্ত্রের সংকট, মানুষের দুর্দশা, ঔপনিবেশিক শোষণ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। কোয়ালপাড়ার ঘটনাও এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ।
ব্রিটিশ পুলিশের ফাইলে লেখা ছিল ‘Mataji’s Ashrama’, আর মায়ের আঁচলে লেখা ছিল, ‘সবাই আমার সন্তান’

এস. পি. চক্রবর্তী
১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারির শেষভাগ। জয়রামবাটী। শিবরাত্রির আগের দিন। সেই সময় বাংলার গ্রাম আর গ্রাম ছিল না ব্রিটিশের চোখে। স্বদেশি আন্দোলনের আগুন নেভাতে সরকার তখন প্রতিটি ধূলিকণার ওপরও চোখ বসিয়ে রেখেছে। সেই কড়া নজর থেকে বাদ পড়েনি জয়রামবাটীতে মায়ের ছোট্ট বাড়িটিও। কে আসছে, কোথা থেকে আসছে, কতক্ষণ থাকছে— সব লিখে রাখা হচ্ছে। পুলিশের গোপন নথিতে পর্যন্ত মায়ের বাড়ির নাম উঠে গিয়েছিল : ‘Mataji’s (Mother’s) Ashrama’। কোয়ালপাড়া আশ্রমও ছিল একই নজরদারির ঘেরাটোপে।
স্বামী গম্ভীরানন্দ নিজেই উল্লেখ করেছেন, এই ঘটনাটি তিনি কোনো আধুনিক ইতিহাসবিদের মতো পুনর্গঠন করেননি। ১৯১৭-১৮ সালের সেই সময়ে গ্রামাঞ্চলে সংবাদ মুখে মুখে ছড়াত, ফলে খুঁটিনাটিতে বিকৃতি থাকার সম্ভাবনা ছিল। তাই এই অংশটি মূলত মায়ের কাছে পৌঁছানো সংবাদ এবং সেই সংবাদে তাঁর প্রতিক্রিয়ার দলিল হিসেবে দেখা উচিত। এখানেই সারদা দেবীর দেশপ্রেমের প্রকৃত সৌন্দর্য, প্রকৃত মহত্ত্ব।
ঠিক এমনই এক থমথমে সময়ে, শিবরাত্রির আগের দিন গ্রামের চৌকিদার অম্বিকা এসে খবর দিলেন— কাল শিরোমণিপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর দলবল নিয়ে মায়ের বাড়িতে আসবেন। কারণ? স্বামী জ্ঞানানন্দকে ঘিরে এক অদ্ভুত সন্দেহ।
স্বামী জ্ঞানানন্দ তখন ম্যালেরিয়ায় ভুগে কাটিহারে ডা.অঘোরনাথ ঘোষের বাড়িতে চিকিৎসাধীন। সেখানেই খবর পান, জয়রামবাটীতে মা অসুস্থ। মায়ের টানে ছুটে আসেন জয়রামবাটীতে। আবার ফিরে যান কাটিহারে। আর এই আসা-যাওয়াটুকু নিয়েই পুলিশের মনে জন্ম নেয় এক উদ্ভট সন্দেহ— জ্ঞানানন্দ নাকি আসলে সন্ন্যাসীই নন, তিনি ডা. ঘোষের রাজনৈতিক কারণে পলাতক কোনো আত্মীয়, সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছেন! সেই ভুল সন্দেহের সূত্র ধরেই শুরু হয় তদন্ত। বাড়ির সবার বুক কেঁপে উঠল। ব্রিটিশ পুলিশের নাম তখনই তো ভয়ের আর এক নাম। তার ওপর কাছাকাছি গ্রামে সিন্ধুবালা-কে নিয়ে পুলিশের নির্মম ঘটনার স্মৃতি তখনও টাটকা, রক্তের দাগ যেন শুকোয়নি। কিন্তু এই ভয়ের ভিতরেই এক আশ্চর্য ছবি। মা।
বাইরে পুলিশ আসার আশঙ্কা, ভিতরে তদন্তের উৎকণ্ঠা— আর তার মাঝেও মা আশ্চর্য শান্ত, অবিচল। সেই রাতেও তিনি প্রতিদিনের মতো নিজের ছেলেদের পাশে বসে পরম মমতায় খাওয়ালেন। তাঁর চোখে-মুখে অস্থিরতার লেশমাত্র নেই। এই শান্তিকে অবশ্য ভয়হীনতা বলে ভুল করবেন না। কারণ এর কিছুদিন আগেই পুলিশি নজরদারি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, মায়ের শিষ্য বিভূতিভূষণ ঘোষ বাধ্য হয়ে জেলা সদর থেকে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিককে মায়ের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। মায়ের সৌজন্য, তাঁর স্নেহে সেই আধিকারিক গভীরভাবে মুগ্ধ হন। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, মা পুলিশকে ভয় পান কি না। বিভূতিভূষণবাবু প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চাইলেও, মা সত্য গোপন করেননি। অতি সরল, বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা গলায় বলেছিলেন—
“ভয় তো হয়, বাবা।”
এই একটি বাক্যেই মা আরও বড় হয়ে ওঠেন, আরও মানুষ হয়ে ওঠেন আমাদের কাছে। তিনি ভয় পেতেন, কিন্তু সেই ভয় তাঁকে কখনও ছোট করতে পারেনি। ভয়ের কাছে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেননি। সেই সাক্ষাতের পর পুলিশের নজরদারিও কিছুটা শিথিল হয়েছিল, তারা তখন শুধু নাম-পরিচয়টুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে শুরু করে।
পরদিন সন্ধ্যা নামছে। ধুলো উড়িয়ে সত্যিই এসে হাজির হলেন শিরোমণিপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর, সঙ্গে কয়েকজন কনস্টেবল। বুটের আওয়াজে জয়রামবাটীর উঠোন ভারী হয়ে উঠল। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন সেখানে ছিলেন মায়ের আর এক সন্তান, আরামবাগের আইনজীবী মণীন্দ্রনাথ বসু। তিনিই এগিয়ে গেলেন, শুরু হলো কথাবার্তা, শুরু হলো তদন্ত। আর ঠিক তখনই ঘটল সেই ছোট্ট, অথচ যুগ-ছাপিয়ে যাওয়া ঘটনাটি। ভিতরের ঘর থেকে খবর এলো— মা তাঁদের জন্য সামান্য জলখাবারের ব্যবস্থা করেছেন। তদন্ত করতে এসেছিল পুলিশ। কিন্তু মায়ের ঘরে পা দিয়েই সেই পুলিশ আধিকারিক এবং মণীন্দ্রনাথ বসু প্রথমে মাকে প্রণাম করলেন। তারপর মা নিজের হাতে তাঁদের সামনে যে জলখাবার পরিবেশন করলেন, তাঁরা তা গ্রহণ করলেন। কয়েক মুহূর্ত আগেও যাঁরা সন্দেহ আর তদন্তের কঠিন মনোভাব নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরাই তখন এক মায়ের ঘরে বসে, এক মায়ের হাতের অন্ন গ্রহণ করছেন।কোনো তর্ক নেই। কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা নেই। কোনো উত্তেজনা নেই। আছে শুধু এক মায়ের স্বাভাবিক, নিঃশব্দ আতিথেয়তা।
মায়ের এই কোমল ব্যবহারে সেই পুলিশ আধিকারিকের মন আনন্দে ভরে গিয়েছিল। যে তদন্ত কঠোর হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ হলো অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণভাবে। ঘটনাটি এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু সারদা দেবীকে বুঝতে হলে এখানে থেমে গেলে তাঁকে ছোট করা হবে। কারণ যে মা সন্দেহ নিয়ে আসা পুলিশকেও নিজের সন্তানের মতো অতিথি করে জলখাবার খাওয়াতে পারেন, সেই মা-ই অন্যায়ের সামনে কখনও নীরব থাকেননি। তাঁর এক শিষ্যকে যখন পুলিশ অকারণে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল, সামান্য প্রসাদটুকু মুখে দেওয়ার বা এক গ্লাস জল খাওয়ার সুযোগও দিল না, সেই খবর শুনে মা গভীর বেদনা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। ইংরেজের অন্যায়ের কথা বলতে গিয়ে তাঁর মুখ থেকেই বেরিয়ে এসেছিল সেই আগুন-প্রশ্ন— ইংরেজের এই শাসন কি চিরকাল চলবে? অর্থাৎ মায়ের কাছে মানুষ আর অন্যায়— এই দুটি কখনও এক ছিল না। মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন, অন্যায়কে নয়। এই সত্যটি আরও স্পষ্ট হয় সিন্ধুবালা-সংক্রান্ত ঘটনায়। পুলিশের দুর্ব্যবহারের সংবাদ পেয়ে মায়ের স্বাভাবিক কোমলতা ক্ষোভে পরিণত হয়েছিল। তবে এখানে একটি ঐতিহাসিক সতর্কতা জরুরি– স্বামী গম্ভীরানন্দ নিজেই উল্লেখ করেছেন, এই ঘটনাটি তিনি কোনো আধুনিক ইতিহাসবিদের মতো পুনর্গঠন করেননি। ১৯১৭-১৮ সালের সেই সময়ে গ্রামাঞ্চলে সংবাদ মুখে মুখে ছড়াত, ফলে খুঁটিনাটিতে বিকৃতি থাকার সম্ভাবনা ছিল। তাই এই অংশটি মূলত মায়ের কাছে পৌঁছানো সংবাদ এবং সেই সংবাদে তাঁর প্রতিক্রিয়ার দলিল হিসেবে দেখা উচিত। এখানেই সারদা দেবীর দেশপ্রেমের প্রকৃত সৌন্দর্য, প্রকৃত মহত্ত্ব।
তিনি কখনও বিদেশিকে ঘৃণা করতে শেখাননি। বিদেশি মানুষও তাঁর কাছে সন্তান। একবার বিদেশি কাপড় নিয়ে আপত্তি করা এক ব্রহ্মচারীকে তিনি বলেছিলেন, “ওরাও তো আমার সন্তান।” কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি দেশের দুঃখ বা বিদেশি শাসনের অন্যায়কে মেনে নিয়েছিলেন। দেশের খাদ্য ও বস্ত্রের সংকট, মানুষের দুর্দশা, ঔপনিবেশিক শোষণ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। কোয়ালপাড়ার ঘটনাও এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেখানে চরকা ও তাঁতের কাজ চলছিল, স্বদেশি ভাবনার প্রবল জোয়ার। মা সেই কর্মকাণ্ডকে প্রাণভরে উৎসাহ দিয়েছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন— দেশসেবা যেন মানুষের প্রতি বিদ্বেষে পরিণত না হয় এবং সব কাজের ভিতরে যেন শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ থাকে। আর একটি বিষয় পরিষ্কার করে রাখা জরুরি— কোয়ালপাড়া ও জয়রামবাটীকে এই ঘটনার ক্ষেত্রে এক করে দেখা যাবে না। পুলিশের নজরদারি ছিল দুই জায়গাতেই। কিন্তু ১৯১৮ সালের শিবরাত্রির আগের দিন যে খবর এলো, শিরোমণিপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর যেদিন এলেন, স্বামী জ্ঞানানন্দকে ঘিরে যে তদন্ত হলো এবং মা যেদিন পুলিশকে জলখাবার খাওয়ালেন— সেই পুরো ঘটনাটি ঘটেছিল জয়রামবাটীতে মায়ের বাড়িতেই। এরপর মা কোয়ালপাড়ায় যান এবং সেখানে প্রায় দুই মাস অবস্থান করে ৩০ এপ্রিল ১৯১৮ জয়রামবাটীতে ফিরে আসেন।
আজ স্বাধীন ভারতের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সেই সন্ধ্যার কথা ভাবলে দৃশ্যটা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একদিকে ব্রিটিশ পুলিশের উর্দি, সন্দেহ আর তদন্ত। অন্যদিকে জয়রামবাটীর একটি সাধারণ মাটির ঘর। আর সেই ঘরের ভিতরে বসে আছেন শ্রীশ্রী সারদা দেবী— একজন অসুস্থ, সরল, গ্রামবাংলার মা। তিনি জানতেন— “ভয় তো হয়।” তবু সেই ভয়ের মধ্যেই তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে এল অতিথির জন্য জলখাবার। এটি আত্মসমর্পণের অন্ন ছিল না। এটি ছিল মানবতার অন্ন। তিনি পুলিশকে শত্রু বানিয়ে জয় করেননি, মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে তাঁদের মন জয় করেছিলেন। আবার সেই একই মা যখন নিরপরাধ মানুষের ওপর অত্যাচারের কথা শুনেছেন, তখন তাঁর মমতাই প্রতিবাদের আগুনে পরিণত হয়েছে। এইখানেই সারদা দেবীর মহত্ত্ব। মমতা তাঁর দুর্বলতা ছিল না— মমতাই ছিল তাঁর শক্তি। স্বাধীনতা শুধু অস্ত্রের ঝনঝনানি, কারাগারের অন্ধকার কিংবা আত্মত্যাগের রক্তে লেখা হয় না। কখনও কখনও স্বাধীনতার চেতনাও প্রকাশ পায় একটি সাধারণ মায়ের আচরণে— যিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে জানেন, কিন্তু অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেন না। তাঁর হাতে ছিল না কোনো রাজদণ্ড, ছিল না কোনো বাহিনী। ছিল শুধু এক মায়ের হৃদয়। আর সেই হৃদয়ই ব্রিটিশ পুলিশের সন্দেহের সামনে একটি থালা জলখাবার রেখে যেন নিঃশব্দে বলে দিয়েছিল— মানুষের হৃদয় জয় করার শক্তি অনেক সময় ক্ষমতার চেয়েও বড়। সেই জগৎজননী মায়ের শ্রীচরণে আভূমি লুণ্ঠিত প্রণাম।
জয় মহামাঈকী জয়।
তথ্যসূত্র:
১. স্বামী গম্ভীরানন্দ, Holy Mother Sri Sarada Devi, অধ্যায় : “In a Rural Setting”, পৃ. 273-289।
২. স্বামী গম্ভীরানন্দ, Holy Mother Sri Sarada Devi, অধ্যায় : “Angle of Vision”, পৃ. 252-262।
৩. স্বামী গম্ভীরানন্দ, Holy Mother Sri Sarada Devi, অধ্যায় : “Her Human Personality”, পৃ. 464-501।
৪. গ্রন্থপরিচয়: Holy Mother Sri Sarada Devi : Swami Gambhirananda; Publisher: Sri Ramakrishna Math, Chennai.
🍂ফিরেপড়া | গল্প
হারিত জারুলকে কোক-এর সঙ্গে রাম মিশিয়ে দিয়ে নিজে জলের সঙ্গে রাম নিল। ঝাঁঝিকে শুধু কোক দিল গ্লাসে ঢেলে। তারপর চেয়ারে বসে বলল, একটু ব্যাখ্যা করে বলুন দাদা। ঝাঁঝির বাবা আর্টিস্ট ছিলেন। আমার বাবা তো ছিলেন না। এইসব আর্টিস্টিক টার্মস আমরা জানি না।
আরণ্য

বুদ্ধদেব গুহ
চিকরাসি যখন গাড়িটা ঢোকাল ন্যাশনাল হাইওয়ে থেকে ডানদিকে কিছুটা গিয়ে গ্রীনফিল্ডস-এর হাতাতে তখন রাত হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। তবে চাঁদ ওঠেনি তখনও। চতুর্থী কী পঞ্চমী। চাঁদ উঠতে এখনও দেরি আছে। হারিতরা ততক্ষণে পৌঁছে গিয়ে চেয়ার-টেয়ার বাইরে বের করিয়ে লন-এ পাতিয়েছে। গ্রীনফিল্ড লজ -এর একটা অংশ কোনো ব্যাঙ্ককে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। গামহাররা গাড়ি পার্ক করে নামতে নামতে ব্যাঙ্কের আনোগুলো সব নিভে গেল এক এক করে। লন-এ একটা আলো আছে। কয়েকটা রোগা-রুখু ইউক্যালিপটাস গাছ। ওরা গিয়ে বসতে না বসতেই মশা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। গামহার যেদিকে বসেছে সেদিকটা আধো-অন্ধকার। আলোটা আটকে যাচ্ছিল ইউক্যালিপটাসের ডালে। কামড়াতে লাগল মশা। গামহার জিনস পরে রয়েছে, তাই পায়ের পাতা গোড়ালি, মুখ এবং হাত ছাড়া অন্যত্র অবশ্য কামড়াতে পারছিল না। ঝাঁঝি ঠিক গামহার -এর উল্টোদিকের চেয়ারে বসেছিল। একটা ঝাঁঝি-রঙা ফিকে হলুদ শিফনের শাড়ি পরেছিল সে। গায়ে সবুজ ব্লাউজ-এর সঙ্গে হাতে সবুজ ব্যান্ডের হাতঘড়ি। তার মুখের একটা দিকে আলো পড়ে তাকে আরও ব্যক্তিত্বময়ী দেখাচ্ছিল। পাছে ঝাঁঝির মুখটাকে দুচোখ ভরে দেখতে না পায় তাই যথেচ্ছ মশা কামড়ানো সত্ত্বেও ওই চেয়ার ছেড়ে গামহার বেশি আলোতে পাতা অন্য চেয়ারে উঠে গেল না। ও যে আর্টিস্ট। ওর দেখার চোখই আলাদা, ও ফুল দেখে, প্রজাপতি দেখে, সূর্যোদয় বা সুর্যাস্ত দেখে যেমন আনন্দ পায় তেমনই এক অতীন্দ্রিয় আনন্দ পাচ্ছিল ঝাঁঝির মুখের দিকে চেয়ে। একজন আর্টিস্ট বা কবির চোখ যা দেখে, তা কি সাধারণে কখনও দেখতে পায়?

নেশারই মতো একজন নারীতে অভ্যস্ত হওয়াটাও অনুচিত। তাতে নারী বা পুরুষ কারওই গৌরব বৃদ্ধি হয় না, যে কারণে বিয়ে ব্যাপারটাই শিক্ষিত, সচ্ছল সমাজে বাতিল হয়ে যেতে বসেছে। বিয়েটা একঘেয়েমির সংজ্ঞা হয়ে গেছে। যুগ বদলাচ্ছে, কাল বদলাচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সমাজ ব্যবস্থা বদলাতে বাধ্য।
গ্রীনফিল্ডস-এ খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত নেই। হাইওয়ের ওপরে সর্দারজীদের ভাল ধাবা আছে। সেখান থেকে খেয়ে আসেন অনেকেই। এদের বললে, এরাও এনে দেয়। তবে চিকরাসি সঙ্গে করে চারটি বড় ক্যাসাবোল নিয়ে এসেছে। গাড়ি নিয়ে গিয়ে ও গরম গরম খাবার নিয়ে আসবে।
গামহার বলল, আমাকে কী করতে হবে বলো?
তোমাকে কিছুই করতে হবে না। রিল্যাক্স করো। এনজয় করো। আমরা ছোট ভায়েরা আছি কী করতে।
গামহার-এর কোনো ভাই নেই। এক দিদি। দিদি তো স্পেইন-এ থাকতেই মারা গেছেন। বড় জামাইবাবু ফরেন সার্ভিসে ছিলেন। তিনিও আর নেই। রিটায়ার করার পরেই মারা গেছেন। গামহার লক্ষ্য করেছে যে অধিকাংশ চাকরিসর্বস্ব চাকরিজীবীরাই রিটায়ার করার পরপরই চলে যান। যাদের চাকরি ছাড়াও অন্য কোনো শখ, বা নেশা, বা ধ্যান থাকে তারাই চাকরি ছাড়ার পর বাঁচেন এবং আনন্দেই বাঁচেন। গামহার যেহেতু চাকরি করে না, ছবি আঁকে, ওর রিটায়ারমেন্ট নেই। যতদিন শরীরে কুলোবে, ইচ্ছে করবে, ততদিন ছবি এঁকে যাবে। তবে চিকরাসির কথাতে মনে পড়ল যে, ওর ভাই-বোন না থাকার দুঃখ চিকরাসির মতো অগণ্য ভায়েরা পূর্ণ করে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলতেন না যে, যেই আত্মার কাছে থাকে সেই তো আত্মীয়। রক্তসূত্রের আত্মীয়তার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। যে আত্মীয়তা মানুষে জীবনের পথে চলতে চলতে অর্জন করে নিজের ব্যবহারে, গুণে, রুচিতে, মানসিকতাতে সেই আত্মীয়তাই আসল আত্মীয়তা। সেই অর্থে এই চিকরাসি তার আসল ভাই-এর চেয়েও হয়তো আপন। আপন ভাই থাকলে হয়তো তুলনা করে দেখতে পারত। নেই বলে, সেই তুলনা করার উপায় নেই। ভাগ্যিস নেই।
জারুল গাড়ি থেকে নেমেই বাথরুমে গেছিল। তিনটি ঘর খুলে দিয়েছে এরা। উজ্জ্বল আলো জ্বলছে ঘরে। হারিত হুইস্কি ও রাম-এর বোতল এনে টেবিলের ওপরে রাখল। গ্লাসগুলো, কলকাতা থেকে আনা ন্যাপকিন দিয়ে ভাল করে মুছল। আইস-বক্সে করে বরফও এনে দিল বেয়ারা।
চিকরাসি বলল, দাদার জন্যে স্কচ এনেছি। দাদা স্কচই খান। বুঝলে, হারিত।
গামহার বলল, তোমাদের জন্যে একটি জ্যাপানীজ হুইস্কি এনেছি আমি। সানটোরি। টুয়েলভ ইয়ার্স ওল্ড। আমার ছবির একজন অ্যাডমায়রার তপন মিত্র টোকিও থেকে নিয়ে এসেছেন। টোকিওতে ওঁদের কোম্পানির ব্রাঞ্চ আছে। প্রায়ই যেতে হয় কাজে।
হারিত বলল, ওটা জোরান্ডাতে গিয়ে খোলা হবে।
চিকরাসি কী একটা বলতে যাচ্ছিল এমন সময়ে প্রচণ্ড আর্তনাদ করে প্রায় লাফাতে লাফাতে জারুল ঘর থেকে বাইরে এল দড়াম করে দরজা খুলে। ওরা সকলেই দাঁড়িয়ে উঠল, কী হলো? কী হলো? বলে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল জারুল-এর। সে বিবর্ণ মুখে বলল, ইঁদুর।
কোথায়?
ঝাঁঝি শুধোল।
কোথায় নয় বলো? ঘরে, বাথরুমে। এত বড় বড় ইঁদুর যে নাক-কান খেয়ে ফেলবে মুহূর্তের মধ্যে।
চিকরাসি বলল, সেজন্যে এমন চিৎকার করবে। আমি তো ভাবলাম ঘরের মধ্যে কেউ লুকিয়ে থেকে তোমাকে রেপ করতে গেল বুঝি। প্রত্যঙ্গ খেয়ে ফেলার ভয় তো তোমাদের থেকে আমাদের, মানে পুরুষদেরই বেশি।
ঝাঁঝি মুখ ফিরিয়ে নিঃশব্দে হাসল।
জারুল চিকরাসির কথাটার মানে প্রথমে বুঝতে পারল না, পরক্ষণেই বলল, এত অসভ্য না তুমি!
গামহার বলল, চলো তো ঘরগুলো একটু দেখে আসি। থাকার মতো না হলে কিন্তু রাতে থাকব না। তার চেয়ে সারারাত গাড়ি চালিয়ে চলি চলো, এখানে খাদ্য-পানীয়র শ্রাদ্ধ করে।
তারপর হারিতের দিকে চেয়ে বলল, জঙ্গলে প্রথমে আমরা যেখানে যাব সেখানে পৌঁছতে ক’ঘণ্টা লাগবে?
এখান থেকে কখন বেরোব আমরা তারই ওপর ডিপেন্ড করছে।
এখন বাজে সাড়ে ন’টা প্রায়। যদি এখানে না থেকে রাত এগারোটা নাগাদ বেরোই তবে আস্তে আস্তে চালিয়ে গেলে যোশিপুরের আগেই বাঁদিকে ঢুকে গিয়ে চাহালা পৌঁছে যাব সকালেই।
তাহলে তো ভালই।
তার আগে ঘরগুলো তো দেখা যাক। বলে, ওরা তিনজনেই গেল ঘর দেখতে। বিছানা, বেডকভার, বালিশের তেলচিটে ও মর্দিত চেহারা দেখে হারিত বলল, এসব ঘর তো দেখছি ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়।
গামহার বলল, ইঁদুর কেন? এখানে বাঘ থাকাও আশ্চর্য নয়।
চিকরাসি বলল, তার চেয়েও বড় কথা এই বিছানাতে রাত কাটালে এইডস হবে নির্ঘাৎ।
যে বেয়ারা বরফ নিয়ে এসেছিল, সে বলল, ভাল করে স্প্রে মেরে গুডনাইট জ্বালিয়ে দেব স্যার। মচ্ছর লাগবে না।
গুডনাইটে কি ইঁদুর মরবে?
ইঁদুর কোথায়? মাঠ থেকে হয়তো জানালার ভাঙা কাঁচ দিয়ে একটা হঠাৎই ঢুকে এসেছিল।
তার কথা শেষ হতে না হতেই বাথরুম থেকে একটা এবং খাটের তলা থেকে আরেকটা বেড়ালের মতো ইঁদুর লাফ মেরে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে ওদিকের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। হারিত বলল, দ্যা ডিসিশন ইজ মেড। চলো, খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পড়ি। সারারাত গাড়ি চালালে রাফিং হবে। ছেলেবেলায় জি টি রোড দিয়ে গাড়ি চালিয়ে বার্নপুরে বড়পিসের বাড়ি যেতাম। রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর বেরোতাম। ধীরে সুস্থে গিয়ে গরম গরম সিঙ্গাড়া-জিলিপি কিনে নিয়ে পিসি-পিসেকে হল্লাগুল্লা করে ঘুম থেকে তুলতাম সকালে।
ছেলেবেলা আবার কি! তুমি তো এখনও ছেলেমানুষই।
আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক গামহারদা। আমার বউকে শুনিয়ে আরেকবার বলুন। এই যে শুনছো!
শুনেছি। আমি তো জানিই যে তুমি ছেলেমানুষ। তুমি যেটাকে গুণ ভাবছ, আমি তোমার মধ্যে সেটাকেই দোষ বলে মনে করি। সব বুড়োমানুষী সব ছেলেমানুষকে যেমন মানায় না, সব ছেলেমানুষী তেমনই সব বুড়োমানুষকে মানায় না। সব ফুলদানীতে কি সব ফুল মানায়? আধারে আধারে তফাৎ থাকেই।
হারিত বলল, দেখলেন স্যার। একটা সরল কথার পিঠে কী দার্শনিক এবং গোলমেলে তত্ত্ব আওড়ালো আমার বউ।
আবার স্যারটার কেন ভাই। গামহারদাই বোলো।
তাই বলব।
কে কি খাবে বল। আমি অর্ডারটা দিয়ে আসি তারপর সয়ে গিয়ে নিয়ে আসব।
যা হয় বলে কিন্তু সকলের জন্যে একই মেনু বল। একি জামাইষষ্ঠী না কি? অত ঝামেলা করার কি দরকার।
নাই বা কেন? নানারকম জিনিস যখন পাওয়া যায় তখন আপরুচিসে খানার অসুবিধা কোথায়? মেয়েদের অন্তত ওই সম্মানটা দেওয়া যাক।
নেশারই মতো একজন নারীতে অভ্যস্ত হওয়াটাও অনুচিত। তাতে নারী বা পুরুষ কারওই গৌরব বৃদ্ধি হয় না, যে কারণে বিয়ে ব্যাপারটাই শিক্ষিত, সচ্ছল সমাজে বাতিল হয়ে যেতে বসেছে। বিয়েটা একঘেয়েমির সংজ্ঞা হয়ে গেছে। যুগ বদলাচ্ছে, কাল বদলাচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সমাজ ব্যবস্থা বদলাতে বাধ্য।
ঝাঁঝি বলল।
তা ঠিক। একঘেয়েমির মতো এত বড় অভিশাপ আধুনিক মানুষের জীবনে সম্ভবত আর নেই। তাই হয়ত অসচ্ছল সমাজেও বাতিল হতে বসেছে।
এই যে। নিন গামহারা।
তোমার?
তারপর ঝাঁঝিদের দিকে ফিরে বলল, তোমরা খাবে না কিছু?
ঝাঁঝি বলল, মদ-এর চেয়েও অনেক বেশি নেশা হয় আমি তেমন তেমন নেশাতে বিশ্বাস করি।
সে কেমন নেশা? গামহার বলল।
আমরা কোক খাব। জারুল বলল।
যেমন প্রকৃতি, যেমন পূর্ণিমা রাত, যেমন মনের মতো পুরুষ, ভাল লাগার গান, বহুদিন মন-খারাপ অথবা মন-ভাল করে-রাখা সাহিত্য। সেটাই আমার হ্যাঙ্গ-ওভার।
বাঃ। তুমি ভারি ভাল কথা বলো তো। ঝাঁঝি বলল।
সেটা বুঝি একমাত্র আপনাদেরই প্রেরোগেটিভ করে রাখতে চান? ভাল কথা বলি বুঝি আমি? পারলে তো ভালই হতো। একসঙ্গে এত কথা আমার মনে আসে, নানা শেডস এরই মতো যে, surealistic ছবি আঁকতে গিয়ে নিতান্তই daub হয়ে যায়।
হারিত জারুলকে কোক-এর সঙ্গে রাম মিশিয়ে দিয়ে নিজে জলের সঙ্গে রাম নিল। ঝাঁঝিকে শুধু কোক দিল গ্লাসে ঢেলে। তারপর চেয়ারে বসে বলল, একটু ব্যাখ্যা করে বলুন দাদা। ঝাঁঝির বাবা আর্টিস্ট ছিলেন। আমার বাবা তো ছিলেন না। এইসব আর্টিস্টিক টার্মস আমরা জানি না।
ঝাঁঝি বলল, হ্যাঁ। আমি চিত্রীরই মেয়ে। তবে আমার বাবাদের প্রজন্ম আপনাদের মতো অর্থ, যশ, প্রচার কিছুই পাননি। বরং সমাজের উপেক্ষাই পেয়ে গেছেন। আমার মা বড়লোকের মেয়ে ছিলেন। চালচুলোহীন, ফাইন-আর্ট করা আর্টিস্টকে ভালবাসার অপরাধে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে বিপুল অর্থবান, হাওড়ার ঢালাইওয়ালা দাদু। মাকে নিয়ে বাবা বস্তীতে গিয়ে উঠেছিলেন। তখন শিল্পীদের জনগণায়নও হয়নি। সরকার অথবা মিডিয়ার তাঁবেদারী করে তখনকার শিল্পীরা কিছুই পেতে চাইতেন না। সেই সময়ের কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, বাদক, নাচিয়ে, চিত্ৰী সকলেরই আত্মসম্মানজ্ঞান ছিল প্রখর। কোনো প্রলোভনেই নিজস্বতাকে তারা বিকোতেন না।
একটু চুপ করে থেকে বলল, তবে আপনার বেলাতে এই সব নিন্দামন্দ যে খাটে না, তা জানি। কিন্তু চারদিকে যা দেখি! কবি সাহিত্যিক গাইয়ে চিত্রীদের যে পরিমাণ তৈলমর্দন করতে দেখি মন্ত্রী ও মিডিয়াদের তাতে তাদের আর শ্রদ্ধা করতে পারি না। আমার বাবা তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন। সাহিত্য-শিল্পী-সঙ্গীতের এমন পণ্যায়ন, জনগণায়ন, তাকে দেখে যেতে হল না!
গামহার বলল, চিয়ার্স।
জারুল বলল, ইসস, তোমাদের বরফ লাগবে কি না জিজ্ঞেস করতে একদম ভুলে গেছি। আপনাকে আরও কি দেব গামহারদা।
দাও। আই লাইক প্লেন্টি অফ আইস। তারপর বলল, আউ গুট্টে দিয়স্তু।
জারুল বলল, আপনি ওড়িয়া বলতে পারেন?
সামান্য।
কী করে শিখলেন?
একটি ওড়িয়া মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম।
কোথায়? কটকে?
না, না। কটকে নয়, কলকাতাতেই। আমাদের পাশের বাড়ি তার বাবা ভাড়া নিয়েছিলেন। কাস্টমস-এর বড় অফিসার ছিলেন বাবা। অমন নরম, সুশ্রী, সভ্য, ভদ্র, সুগায়িকা মেয়ে আর দেখিনি। সুনন্দা পট্টনায়কের ছাত্রী ছিল। ওদের পরিবারের সঙ্গে আমি উটি, ভুবনেশ্বর, সম্বলপুর, সাতকোশীয়া গণ্ড সব ঘুরেছি।
তাহলে বিয়েটা হলো না কেন?
ওই একই কারণ।
কি কারণ?
ওই ঝাঁঝির বাবারই মতন আমার চালচুলো ছিল না। আমাকে কুমুদিনী বিয়ে করতে চায় শুনে তার প্রতিষ্ঠিত বাবাও কুমুদিনীকে তাড়িয়ে দেবেন বলেছিলেন।
তা আপনি কুমুদিনীকে নিয়ে চলে গেলেন না কেন?
গ্লাসে, গামহার একটা বড় চুমুক দিয়ে বলল, আসলে আমার সাহস কম ছিল। বেশ কম। তাছাড়া, সেই সঙ্কটে পড়ে দুটো জিনিস হৃদয়ঙ্গম করেছিলাম। দুটোই গ্রেট রিভিলেশান। জীবনে খুবই কাজে লেগেছিল। পরে।
কি? কি?
ঝাঁঝি তার দু’চোখের মণি গামহার -এর দু’চোখের মণিতে না-ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে রাখল এমন করে, যেন একফোঁটা চাউনিও উপচে না পড়ে যায় বাইরে।
ঝাঁঝি বলল, বলুন, কি? কি?
হারিত একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ঝাঁঝির দিকে। ঝাঁঝির মধ্যে কী যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল ও। এই গামহার ঘোষ লোকটার মধ্যে এমন কিছু আছে যাতে মেয়েরা দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়। লোকটা ডেঞ্জারাস। লেখক-শিল্পীদের মধ্যে বেশ কিছু আছে ওরকম। গোলমেলে। এই কিছুটা যে কি? তা সিমলিপালে পৌঁছে জঙ্গলের মধ্যে গামহার ঘোষকে মশলা বেটে দেখতে হবে। সেটার উপাদানগুলিকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বলল, হারিত মনে মনে। চলো জঙ্গলে মক্কেল, তোমার আক্কেল গুড়ুম করব। তোমার মধ্যে কী ডেবিট কী ক্রেডিট হয়ে আছে দেখব ইনসাইড আউট করে।
বললেন না, কি কি?
হ্যাঁ। বলছি।
প্রথমটা হল, ভালবাসার শেষ, প্রাপ্তিতে নয়, হারানোতেই।
চলো, হারানো আরও বোঝাব ভাল করে।
মনে মনে আবারও বলল হারিত। রাম-এর গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে।
আমি যে সত্যিই কুমুদিনীকে ভালবেসেছিলাম। ও যে বড় আদরে মানুষ হয়েছিল। ওড়িয়া সমাজে আমার চেয়ে হাজারগুণ ভাল ভাল ছেলেরা ওর জন্যে পাগল ছিল।
গামহার বলল।
কুমুদিনী তাহলে আপনাকে ভালবাসেনি আসলে?
না, না, সেও বেসেছিল বইকি। অমন ভালবাসা এ জীবনে আমাকে আর কেউই বাসেনি। জানি না, বললে তোমরা বিশ্বাস করবে কি না, তার সঙ্গে কোনরকম শারীরিক সম্পর্কই হয়নি আমার। একমাত্র হাতে হাত রাখা ছাড়া।
ন্যাকা ব্যাটা! নেকু-পুষু-মুনু! না বলে বলল, হারিত।
তাতেই যেন ইলেকট্রিক শক লাগত– ভাললাগার। ওকে ভালবেসেছিলাম আমি, ও আমাকে ভালবেসেছিল। ওর গায়িকা-সত্তা আমার শিল্পী-সত্তাকে ভালবেসেছিল। তাই ওর কষ্ট হোক তা আমি হতে দিইনি। তাছাড়া, আমাকে বিয়ে করলে ওর গান নষ্ট হয়ে যেত। বাঙালি সমাজে ওড়িশী সংস্কৃতির প্রভাব কম। সেটা আমাদেরই উচ্চমণ্যতা আর কুপমণ্ডুকতারই দোষ। নইলে অসম আর ওড়িশা থেকে আমরা অনেক কিছু নিয়ে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি-সঙ্গীতকে অবশ্যই আরও অনেক সমৃদ্ধ করতে পারতাম।
ওরা চোখ বড় বড় করে গামহার-এর কথা শুনছিল।…🍁 (বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৪০.
ঘরে ফেরার গান
ফেরারও একটি শব্দ আছে। সে শব্দ বন্দরের সাইরেন নয়, জাহাজের নোঙর পড়ার আওয়াজও নয়। সেই শব্দ প্রথম জন্ম নেয় মানুষের বুকের ভেতরে। তারপর ধীরে ধীরে তার পায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। তখন মানুষ বুঝতে পারে, সে ফিরছে। কিন্তু কোথায় ফিরছে? বাড়িতে, না নিজের কাছে? নীলয়ের জাহাজ যখন বঙ্গোপসাগরের জল ছুঁল, তখন আকাশে ফাল্গুনের মেঘ। বহু মাস পরে সে এই আকাশ দেখছে। সমুদ্রের নীল আর এই আকাশের নীল এক নয়। এই নীলের মধ্যে ধানের গন্ধ আছে, নদীর শব্দ আছে, মাটির উষ্ণতা আছে। তার কেবিনে রাখা ছোট্ট কাঠের জানালাটি সে শেষবারের মতো হাতে নিল। অদ্ভুত! নীল কাচটি এখন স্বচ্ছ। কোনও ছবি নেই, কোনও আলো নেই।
শিউলিগাছটি বড় হয়েছে। জানালাটি এখনও খোলা। হাওয়ায় পর্দা দুলছে। ঠিক যেমন রেখে গিয়েছিল। তার বুকের ভেতর যেন কেউ ঢাক বাজাতে লাগল। ও-ধীরে ধীরে উঠোনে পা রাখল। মেঘলা তখন জানালার পাশে বসে একটি চিঠি লিখছে। হঠাৎ যেন কারও উপস্থিতি টের পেল।
যেন তার কাজ শেষ হয়েছে। ইউসুফ পাশে এসে দাঁড়াল,
—ফেলে দিয়ে যাবি?
—না।
—ভাল করবি। কিছু জিনিসের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না। ওগুলো মানুষকে তার নিজের কাছে ফিরিয়ে দেয়।
নীলয় তাকিয়ে রইল বৃদ্ধের দিকে,
—আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে?
ইউসুফ হাসল,
—সমুদ্রে যারা একবার দেখা করে, তারা কোনওদিন আলাদা হয় না। আমরা সবাই একে অপরের গল্পের মধ্যে বেঁচে থাকি।
সেদিনই ছিল ইউসুফের শেষ যাত্রা। তিনি আর কোনও জাহাজে উঠবেন না। নীলয়ের মনে হল, মানুষটিকে বিদায় নয়, প্রণাম করা উচিত।
চরকমলপুরে সেদিন সকাল থেকেই অদ্ভুত উত্তেজনা। খবর এসেছে, জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে। আর দু-এক দিনের মধ্যেই নীলয় ফিরবে। খবরটা শুনেও মেঘলা দৌড়ে বেরিয়ে এল না। চুপচাপ জানালার পাশে গিয়ে বসে রইল। বৃদ্ধ সমুদ্রবাবা দূর থেকে সব দেখছিলেন। তিনি এসে শুধু বললেন, আজ জানালাটা খুলে রেখ।
মেঘলা হেসে বলল, এতদিন তো বন্ধ করিনি।
বৃদ্ধ দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, মানুষ জানালা খোলা রাখে অন্যকে দেখার জন্য। কিন্তু একদিন বুঝতে পারে, জানালা আসলে নিজের ভেতরটা দেখার জন্যও।
মেঘলা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। বৃদ্ধ চলে গেলেন। সেদিনের পর গ্রামে আর কেউ তাকে দেখেনি। যেন তিনি কখনও ছিলেনই না। নীলয় বাসে চেপে ফিরছিল। রাস্তার দু’পাশে কাশবন। তালগাছ। ধান কাটা মাঠ। কতদিন পরে এই দৃশ্য! তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কোনও সমুদ্র নয়, দূরে একটি গ্রাম, যেখানে কেউ একজন অপেক্ষা করছে। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই অদ্ভুত সঙ্কোচ। মেঘলার সামনে দাঁড়িয়ে ও-কী বলবে? বলবে, আমি ফিরে এসেছি? কথাটা কি এত সহজ? ফিরে আসা কী শুধু শরীরের?
সন্ধ্যা নেমেছে। চরকমলপুরের পথ দিয়ে হাঁটছে নীলয়। বাড়িগুলো আগের মতোই। কেবল মানুষের মুখে একটু বেশি বয়স। নিজেদের বাড়ির সামনে এসে সে থমকে দাঁড়াল। শিউলিগাছটি বড় হয়েছে। জানালাটি এখনও খোলা। হাওয়ায় পর্দা দুলছে। ঠিক যেমন রেখে গিয়েছিল। তার বুকের ভেতর যেন কেউ ঢাক বাজাতে লাগল। ও-ধীরে ধীরে উঠোনে পা রাখল। মেঘলা তখন জানালার পাশে বসে একটি চিঠি লিখছে। হঠাৎ যেন কারও উপস্থিতি টের পেল। মুখ তুলে তাকাল। দু’জনের চোখে চোখ পড়ল। বাকরুদ্ধ। কোনও নাটকীয়তা নেই। কেবল দীর্ঘ নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যে একসময় মেঘলা উঠে এসে দরজা খুলল। বলল, এসেছ?
নীলয় শুধু মাথা নাড়ল। তারপর খুব আস্তে বলল, —অনেক দেরি হয়ে গেল!
মেঘলা উত্তর দিল,
—না।
—না?
—যারা সত্যিই ফিরে আসে, তাদের কখনও দেরি হয় না।
রাতে দু’জনে অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসে গল্প করতে করতে কখন যে ভোরের পাখি ডেকে উঠল!🍁 (ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
অশোক কুমার রায় -এর একটি কবিতা

শব্দব্রহ্ম
প্রাগৈতিহাসিক সীমানার ওপারে
আগ্নেয়গিরি অগ্নিকুণ্ডের জঠরে
জন্ম নিয়েছিল যে শব্দ।
আজ সেই শব্দের বুদবুদ থাকলেও
খিল দিয়ে রেখেছে ধর্ষণ রঙানো সজ্জা।
অবৈধ বাহুবলির মুখে উচ্চারিত হয়
সেই শব্দের সংকলিত মহাকাব্য।
তারই স্তবকে স্তবকে
ইতিহাস কলঙ্কিত মুদ্রায় মগ্ন আজও।
দাবানল ও নত শির।
বিদ্রোহ বিমুখ।
আজও সেই শব্দের জীবাশ্ম উদ্ধারে পরাজিত
চৈতন্যদেব গৌতম বুদ্ধ যীশু ও হযরত।
অমিত কাশ্যপ -এর দু’টি কবিতা

হিলকার্ট রোডের পিঠে
১.
ডিসেম্বরকে পেছনে ফেলে যে সকালটা দাঁড়াল
করোনেশন ব্রিজ আসতেই জিপ থেমে বলল
ওই তো জঙ্গল, হাতি আসতে পারে
ব্রিজের ওপর দিয়ে কয়েকটা মুখ ঝুঁকে পড়তেই
ঠান্ডা জলে রেশম দানা, টলটল করে নুড়িগুলো সরা
পা ভিজিয়ে প্যান্টুল দাগ নিয়ে উঠে এল
বুনো জংলি ফুল গোটা কুয়াশায় গন্ধ ঝরছে
দশটা আসতে ঘড়ি বলল চা খাব
আজ রবিবার ভোরের মহানন্দা পেরিয়ে ট্রেকার চলল
যেখানে সবুজ খুলে দাঁড়িয়ে যাবে পাহাড়
যেখানে নেমে পিকনিক, কোনও পিকনিক স্পট নেই
হতে পারে চা খেতে গিয়ে সুকনার মস্ত পাথরটার ওপর স্নিগ্ধ একটা ছবির মতো
বিবিজান, ও বিবিজান, মোহ গলে পড়ছে
২.
মেডিকেল কলেজ থেকে রাতের শেষ বাস সরকারি
ছুঁয়ে আসছে চা বাগান উত্তরবঙ্গের হাওয়া মেখে
ঘন অন্ধকারের ভেতর জোনাকী, বাসের ভেতরও তারা
তারা আসছে শিলিগুড়ি ঝুমঝুম বাগান পেরিয়ে
কেমন এক তন্দ্রা, নশ্বরতা বলা যায়
গুয়া সুপুরি চিবিয়ে যাচ্ছে বৃদ্ধ নেপালি
চটেরহাট যাওয়া হয়নি বহুদিন
এই তো মেডিকেল হয়ে ছুটে যাবে হাট, হাটবার
মণ মণ সবজি-আনাজ-মুড়ি যাবে
ডাক্তার, তুমিও কি টেথো ফেলে যাবে হাটে
ছোট জায়গায় তেলেভাজার সঙ্গে তালরস
বাঙালি, বিলিতি ফারাক নেই, আয়নার সামনে তার মুখ
বিকাশ চন্দ -এর দু’টি কবিতা

মাটি ছুঁলে আনন্দ বারোয়ারী
গঙ্গা মেঘনা পদ্মা যমুনা এখনো শোনে কি বদর বদর
ত্রিকাল পেরিয়ে গেছে বহু দিন বৃদ্ধ কপাল জানে,
এখনো ভরা জোয়ারের শব্দে শরীর কেঁপে ওঠে—
কেরোসিন ল্যাম্প হাতে উঠোনে দাঁড়িয়ে কেউ ঘরে ফেরা অপেক্ষায়।
এ তো সোজা ছিল না কখনো সহাস্যে এসেছে যৌবন
আমগাছ নদীর পাড় ঘেঁষে এক নাগাড়ে ডাকে বৌ-কথা-কও পাখি,
গ্লানিহীন অভ্যাসে এসেছে অন্য শরীরের মগ্ন উত্তাপ—
সৃষ্টি খেলার দুর্মতি আসেনি কেতকী গুলঞ্চা ফুল জানে।
বিশ্বাসে বিপ্লবে ভাষার স্মিত গৌরবে চলে বৈঠা—
খুশি খুশি জলের হাসি বোঝে সকল মাঝি মাল্লা,
পাড়ে সার সার মৎস্যকন্যা হাত নাড়ে ডাকে আঙিনায়
ব্যথিত মুখে অন্য যন্ত্রণা কপালে সিঁদুর সিঁথির যন্ত্রণা।
উঠোনের চারদিকে লতা গুন্ম গাছে পাতার কথা—
অমনোযোগী শালিক দোয়েল বুলবুলি গানে মাতায়,
আঁধার এলে ঘোমটা ঢাকে নান্দিমুখ আর হাসি
মাটি জল বাতাস আর নদী নারী মাটি ছুঁলে আনন্দ বারোয়ারী।

ফুলশয্যা
আহা মরা গাঙে ঢেউ উঠেছে নাগর—
পা হাঁটু জানু জঙ্ঘা উথলে ওঠে সাগর,
খিদের জীবন চিংড়ি খোঁজে যারা—
তারাই জানে জড়িয়ে ধরে সুন্দরী কাঁকড়া।
কি জানি কোন বাসনা খুলে ফেলছে অতীত
একটি গাছে ফুল ফুটেছে বাকি জমি পতিত,
বর্ষা এলে সব জমিতে হবে অশ্বগন্ধা—
জীবন জানে কেটেছে কাল অকাল জীবন বন্ধ্যা।
মাটি ফুঁড়ে হঠাৎ জাগে নাম না জানা অঙ্কুর,
সবাই জানে সম্পর্ক সব অজেয় নয় ভঙ্গুর।
শিউলি টগর বকুল কুড়োনো হয়তো ষোড়শী
মন্দ নিন্দে না চাইলেও গড়ে তোলে পড়শী।
নয়নতারার উলুক ঝুলুক দু’চোখে তো বন্দী
রক্তিম রঙ চলকে ওঠে চোখ মুখে জাদু ফন্দি।
শরীর জুড়ে মরশুমি ফুল এ তোর কেমন শয্যা
সব কটা ফুল শরীর থেকে সরিয়ে খোলো লজ্জা।
সোমাশ্রী সাহা -এর একটি কবিতা

নীলখাম
নীল খামে যত্ন করে তুলে রেখেছি
আমার জমানো দুঃখগুলো
সেখানে কখনও আলো পৌঁছোবে না
অন্ধকারে কুঁকড়ে কুঁকড়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে
একটা একটা মন কেমনের দুপুর
মাঝে মাঝে ওদের কাছে বসব হাঁটু মুড়ে
মাঝে মাঝে খুলে দেব সেই সমস্ত
ছান্দিক ও মোলায়েম কথার ঝাঁপি
আমার মফসসল জুড়ে একজন ফেরারী বাউল
গাইবে বিগত সময়ের গান
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
২৬.
লতাদি
‘যেভাবেই তুমি সকাল দেখো সূর্য কিন্তু একটাই।’ তিথি সকালে উঠে ফুরফুরে মেজাজে শুভমিতার গান শুনছে। কে কাজে আসবে না আসবে এই নিয়ে সজ কোনও মাথা ব্যথা নেই। কারণ তিথির অবলম্বন কাগুজে মাসি আছে। নো চিন্তা নো টেনশন। চা করতে করতে হঠাৎই ফোন বেজে ওঠে, ‘আমার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের কিনারায়’। চা করতে এসেও শান্তি নেই বেশ গান শুনছিল, হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে ওঠাতে তিথি একটু বিরক্তি প্রকাশ করল। না, চা করে যাবে তাতে ফোন বাজে বাজবে, যার দরকার হয় আবার করবেই। এই ভেবে ছাকনিতে চা ঢালতে লাগল কিন্তু না আবার রিং হচ্ছে। ‘আমার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের কিনারায়…’
তিথি ছুটে এসে ফোনটা ধরল বলল,
—হ্যালো… কে?
—বৌদি, আমি সোমা।
—হ্যাঁ, কী খবর?
কথা বলতে বলতেই তিথি চা কাপেতে ঢালল প্লেটে সাজিয়ে কানে ফোন লাগিয়ে কথা বলতে বলতে শাশুড়ি মা’র ঘরের দিকে গেল।
কী বলি, এসব মেয়েদের জীবনের মূল্য কোথায় বলো! রংচং মেখে নিজের জীবনকে বাঁচিয়ে রেখে, আব্রু বিক্রি করে দিয়ে অন্যকে খুশি করে নিজেকে খুশি রাখা! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বাটনা বাটতে শুরু করল।
—সে অনেকদিন আগের কথা জানো তো? লতা, আমারও আগে এসেছে ওই গলিতে।
তাই তিথি মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগল,
—তারপর?….
—বলছি বৌদি, আমি না আরও কিছুদিন কাজে যেতে পারব না।
—আমার মনে হয় সোমাদি তোমার কাজটা না করাই ভাল।
—কেন?
—না না… তোমার তো নিত্যই লেগে রয়েছে কামাই, আমার কী করে চলবে বলত?
—মা চা নিন…
—কে বৌমা?
তিথি ইশারায় বোঝাল সোমাদি ফোনে।
—ওমা সে আবার ফোন করে কী বলছে?
তিথি উত্তর না দিয়ে আবার রান্না ঘরের দিকে গেল। দেখল কাগজি মাসি বাসন-কাসন নিয়ে কল ঘরের দিকে গিয়েছে।
—হ্যাঁ বুঝতে পারছি বৌদি,
—কী বুঝতে পারছ গো? বুঝতে পারলে তুমি এত কামাই করতে পারতে?
—আসলে হয়েছে কি…
তিথি বলল,
—মাসি চা নাও।
—এখানে নিয়ে এসেছ, আমি তো ওখানেই গিয়ে খেতে পারতাম!
সোমাদি শুনতে পেল কথাটা, আর মনে মনে ভাবতে লাগল, এইজন্যেই বৌদির কটাশ-কটাশ কথা। গলাটা খুব চেনা লাগছে তাহলে কী বৌদি লোক নিয়ে নিয়েছে? একটু ভয়ও পেল। কাজটা চলে গেলে এখন কাজ পাওয়া খুব মুশকিল হবে।
—ও বৌমা রান্নাঘরে আর যে বাসনগুলো আছে বের করে দাও।
—একি কাগজি মাসির গলা মনে হচ্ছে!
—ও-বৌদি তাহলে কী বলছ?
তিথিও ভাবছে, সোমাদি হঠাৎ আমার কথার প্রতি এত গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাপারটা কী?
—কী ব্যাপার তোমাদের বাড়িতে কাজ করি তোমাদের অনুমতি না নিলে হবে?
—সেজন্যই তো অবাক হচ্ছি, আজকে সূর্য কোন দিকে উঠছে কে জানে!
—সে যে দিকে উঠুক, আর যা-ই বল না কেন…
তিথি সোমাদির গলায় সেই ঝাঁঝালো স্বরটা শুনতে পেল না। একটু অবাক হল।
—ও-বৌমা, তোমার পুচু বল নিয়ে খেলতে বলছে গো…
—ভালই হয়েছে, খেলার সঙ্গী হয়েছ তুমি।
—বাটনাটা বেটে দেব।
—হ্যাঁ যাচ্ছি। বাটতে থাকো ভেজানো আছে।
—সরষে বাটব?
—সরষে পোস্ত বাটো।
—আজকে কী হবে গো?
—ইলিশ! ইলিশ!
সোমা ভাবছে ভালই আছে তো আমার কাজটা চলে যাবে নাকি? এ-বুড়ি তো ভাল কাজ করে।
—ঠিক আছে আর কিছু বলবে সোমাদি।
—না এটাই বলছিলাম।
—কদিন আসছ না?
—এই তিনদিন।
—ঠিক আছে।
তিথি ফোনটা কেটে দিল।
ওদিকে সোমা ভাবতে লাগল এক সপ্তাহ ছুটি নেবে ভেবেছিল কিন্তু কথাটা বলতেই পারল না, একটু ধাক্কা খেল যদি কাজটা চলে যায়! এজন্য কমের উপর দিয়ে সারল। যদিও এতদিনে ছুটির প্রয়োজন না ওই মিছিমিছি বলে ছুটিটা নেওয়া। যাই হোক…
—ওমা, ফোনে কথা হল?
—এই পুঁটি তুই গেছিলি ওই খুড়ির কাছে?
—হ্যাঁ।
—মাসি বলো লতা মাসির কথা।
কী বলি, এসব মেয়েদের জীবনের মূল্য কোথায় বলো! রংচং মেখে নিজের জীবনকে বাঁচিয়ে রেখে, আব্রু বিক্রি করে দিয়ে অন্যকে খুশি করে নিজেকে খুশি রাখা! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বাটনা বাটতে শুরু করল।
—সে অনেকদিন আগের কথা জানো তো? লতা, আমারও আগে এসেছে ওই গলিতে।
তাই তিথি মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগল,
—তারপর?….
—যদিও আমার থেকে বয়সে ছোট।
—তবে বেশ সুন্দরী তো কাগুজে মাসি আমি দেখেছি।
—হ্যাঁ। জানো তো, একদিন দুঃখ করতে করতে বলেছিল, কথাগুলো। নিজের বাবা-মা যদি এরকম কাজ করতে পারে কার কাছে নিরাপদ আশ্রয় পাবে?
—নিজের বাবা মা!
—হ্যাঁ, বাবাটা তো নিজের, মাটা ছিল সৎ।
—ও বাবা তাই নাকি!
—যা হয় দেখতে শুনতে ভাল, পাত্রপক্ষ আসতে শুরু করল সবার নজর ছিল শরীরটার প্রতি। মাঝ বয়সী লোকের সঙ্গে ওর মা বিয়ে ঠিক করে।
—বল কি গো!
—হ্যাঁ, ও-তো কাঁদতে থাকে। কিন্তু, ওর কান্নার কেউ মূল্য দেয় না। বাবা তো কোনও কথাই বলতে পারে না মায়ের ওপর।
—মাসি দাঁড়াও দাঁড়াও আমি একবার রান্নাঘর থেকে আসি। পনির রেজালাটা হয়েই এসেছে। কই কই আমার পুচু সোনা কই?
তিথি আরেক কাপ চা নিয়ে বসল।
—তবে ও-গ্রামের একটা ছেলেকে ভালবাসত।
—তাহলে মাসি সেই ছেলেটাকেই তো বিয়ে করতে পারত?
—হ্যাঁ, সেই আশাতেই তো তার হাত ধরে ছিল।
—তাহলে গলিতে আসলো কী করে মাসি?
—কী বলি মা, ভাগ্যের পরিহাস!
—বাড়ি কোথায় ছিল মাসি?
—পূর্ব বাংলায় অর্থাৎ বাংলাদেশে।
—বাংলাদেশে!
তিথি খুব অবাক হয়ে যায়। বাংলাদেশ থেকে এদেশে! বলো কি!
—ওদেশ থেকে এদেশে, তারপর আবার গলিতে স্থান হয়েছে। এটাই তো ভাগ্যের পরিহাস বৌমা মানুষ জানে না, কী কোথায় ছিটকে যায়!
—সে তো ঠিকই মাসি। তারপর কী হল?
—পূর্ব বাংলার বাসিন্দা।
—পূর্ব বাংলার কোথায়?
—খুলনা।
–আর ধর্ম কী?
—মুসলিম।
—বলো কি মাসি, তাহলে এখানে হিন্দু হয়ে আছে?
—হ্যাঁ।
—-ও-বৌমা… বৌমা…বৌমা…
—ও-বৌমা দেখো, তোমার শাশুড়ি মনে হয় ডাকছে।
—কোনও কথা ঠিকঠাক শুনতে পারব না!
—আচ্ছা পরে তোমাকে বলব, আমিও কাজটা গুছিয়ে নিই।
—সেই ভাল।
তিথি দ্রুত গতিতে শাশুড়িমা’র ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আর ভাবতে থাকে, ভাগ্য মানুষকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায়, কেউ বলতে পারে না! কোথায় এই লতা দিয়ে একটা সুখের সংসার করবে! নাহ, সে সুখ তার কপালে নেই। নিজের দেশ ছাড়তে হল, আবার এসে গলিতে স্থান হল। ভেরি স্যাড! 🍁 (ক্রমশঃ)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ফিরেপড়া- গদ্য, ফিরেপড়া – গল্প ও ফিরেপড়া- কবিতা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।




