সম্পাদকীয়
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের শুধু আসল মুখ দেখান। এবং আমাদের বিবেকও স্পষ্ট করে জাগিয়ে তোলেন ও তুলে চলেছেন। সার্ধশতবর্ষে তাই সুকান্তের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা হোক ওঁর কবিতাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে। তাঁর কবিতাকে উৎসবের মঞ্চ থেকে মানুষের জীবনের মাটিতে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে। মনে রাখতে হবে যে, সুকান্ত ভট্টাচার্য আমাদের অতীত নন। তিনি আমাদের বর্তমানের প্রশ্ন ও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।
সুকান্তের সার্ধশতবর্ষ: ক্ষুধার পৃথিবীতে যে কবিতা আজও জেগে আছে

বাংলা সাহিত্যে কিছু কবি কেবল তাঁদের সময়ের কবি নন, তাঁরা সময়কে অতিক্রম করে এক-একটি বিবেকের নাম হয়ে ওঠেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য তেমনই এক অনিবার্য উচ্চারণ। তাঁর জন্মের সার্ধশতবর্ষ আমাদের সামনে তাই আত্মসমীক্ষারও গভীর মুহূর্ত। মনে রাখতে হবে, সুকান্তের কবিতা যে সময়ে জন্ম নিয়েছিল, সেই সময় ছিল দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, ঔপনিবেশিক শোষণ, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যে ক্ষত-বিক্ষত। কিন্তু তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি এই যে, তিনি সেই ক্ষতকে শুধু দেখেনইনি, তার ভিতরের গভীর যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন। সুকান্তর কাছে কবিতা ছিল জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের বড় অস্ত্র। যেখানে বিলাসিতার কোনও স্থান ছিল না।
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’ এই উচ্চারণ আজও আমাদের থমকে দাঁড় করায়। কারণ, পৃথিবী কী সত্যিই বদলে গিয়েছে? প্রযুক্তি বদলেছে, অর্থনীতির পরিসর বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রার বাহ্যিক চেহারা বদলেছে, কিন্তু ক্ষুধা, বৈষম্য, বঞ্চনা ও প্রান্তিক মানুষের দীর্ঘশ্বাস কি ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গিয়েছে? সুকান্তের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। কবি কবিতাকে অভিজাত সৌন্দর্যের কাচঘরে বন্দী রাখেননি। তাই তাঁর কবিতায় রুটি আছে, শ্রমিক আছে, কৃষক আছে, ক্ষুধার্ত মানুষ আছে, যুদ্ধের বিভীষিকা আছে। আছে এমন ভবিষ্যতের স্বপ্ন, যেখানে মানুষ তার প্রাপ্য মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে। এই কারণেই সুকান্তকে শুধুমাত্র ‘কিশোর কবি’ বলে সীমাবদ্ধ করা তাঁর সাহিত্যিক সত্তার প্রতি বড় অবিচার। অল্প বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর কবিসত্তা ছিল আশ্চর্য পরিণত। তাঁর বয়স কম ছিল, কিন্তু তাঁর সময়বোধ ছিল গভীর। তাঁর জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তাঁর সাহিত্যের ভেতর দিয়ে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলি কালজয়ী।
বর্তমান পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে সুকান্তকে পড়লে আমরা আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করি, তা হল, সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধু পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন তা নয়। পরিবর্তনের নৈতিক দায়ের কথাও বলেছেন। সমাজের অন্যায়কে দেখেও যদি আমরা চুপ থাকি, তাহলে সেই চুপ থাকাও ভীষণতর অন্যায়। সমাজের প্রতি অবিচার। এই সময় যখন একদিকে বিপুল ভোগের সংস্কৃতি, অন্যদিকে অসংখ্য মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, একদিকে উন্নয়নের ঝলক, অন্যদিকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা, তখন সুকান্তের কবিতা আমাদের কাছে আবার ফিরে আসে। ফিরে আসে প্রশ্ন হয়ে। যেমন: আমরা কাদের জন্য উন্নয়ন চাই? কার জন্য শহর? কার জন্য গ্রাম? কার জন্য অর্থনীতি? কার জন্য শিক্ষা? আর সবচেয়ে বড় কথা যে, মানুষের জন্য আমাদের সমাজ কতটা মানবিক?
সুকান্তের সার্ধশতবর্ষে তাই কবিকে শুধু মাল্যদান করলে চলবে না। তাঁর কবিতা পাঠ করতে হবে নতুন করে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচীর বাইরে তরুণ প্রজন্মের হাতে তাঁর কবিতা পৌঁছে দিতে হবে। সাহিত্যসভায় তাঁর নাম উচ্চারণের পাশাপাশি তাঁর চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সমাজের পরিচয় তৈরি করতে হবে। কারণ, একজন কবির প্রকৃত জন্মতিথি শুধু জন্মতারিখে নয়, তাঁর কবিতা যখন নতুন কোনও প্রজন্মের বিবেককে নাড়া দেয়, তখনই কবি নতুন করে জন্ম নেন। তেমনি সুকান্ত আজও জন্ম নিচ্ছেন।
যখন কোনও তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন,
যখন কোনও শ্রমজীবী মানুষ তার অধিকার দাবি করেন, যখন কোনও ক্ষুধার্ত শিশুর মুখ আমাদের বিবেককে অস্বস্তিতে ফেলে, যখন কোনও মানুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন কোথাও না কোথাও সুকান্তের কবিতা আবার উচ্চারিত হয় বোধের গভীর থেকে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সাহিত্যকে যদি সমাজের আয়না বলা হয়, তাহলে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের শুধু আসল মুখ দেখান। এবং আমাদের বিবেকও স্পষ্ট করে জাগিয়ে তোলেন ও তুলে চলেছেন। সার্ধশতবর্ষে তাই সুকান্তের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা হোক ওঁর কবিতাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে। তাঁর কবিতাকে উৎসবের মঞ্চ থেকে মানুষের জীবনের মাটিতে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে। মনে রাখতে হবে যে, সুকান্ত ভট্টাচার্য আমাদের অতীত নন। তিনি আমাদের বর্তমানের প্রশ্ন ও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।
সাশ্রয় নিউজের সাহিত্য সম্পাদকীয়তে রইল
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য -এর সার্ধশতবর্ষে কবির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। 🍁
🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
দুর্গা নামের ফল
হরিচরণের নাম হরিচরণ হইলেও লোকে তাহাকে দুর্গাদাস বলিয়া ডাকিত৷ সে যখন দীক্ষা লয়,তখন তাহার গুরুদেব বলিয়াছিলেন ‘বাবা,সর্ব্বদা দুর্গা দুর্গা জপ করিবে৷’ দুর্গা দুর্গা দুর্গা এই দুর্গানামই পরম মন্ত্র, এ নাম যে মানব সতত জপ করে— সে জীবন্মুক্ত৷ শ্রীগুরুদেবের মুখে এই কথা শুনিয়া হরিচরণ দুর্গা দুর্গা বলিতে আরম্ভ করিল। হরিচরণ সকালে দুর্গা দুর্গা করিতে করিতে উঠে, অবিরাম দুর্গা দুর্গা করিতে করিতে স্নান করিয়া আসে, পূজা জপান্তে দুর্গা দুর্গা করিতে করিতে শাঁখার পুঁটলি কাঁধে করিয়া যাত্রা করে৷

হরিচরণ জাতিতে শাঁথারি, শাঁখা বিক্রয় দ্বারাই তাহার জীবিকা নির্ব্বাহ হয়। এইরূপ কিছুদিন দুর্গা দুর্গা করার পরই সকলে সম্মুখে তাহাকে দুর্গাদাস, আড়ালে দুগো পাগলা বলিতে লাগিল। হরিচরণ সে সব কথায় লক্ষ্য না করিয়াই আপনভাবে দুর্গা দুর্গা করিত। সারাদিন দুর্গা দুর্গা করত শাঁখা বিক্রয় করিয়া বেড়াইত। সন্ধ্যার পর কর্ম্মক্লান্ত দেহে দুর্গা দুর্গা বলিয়া শয়ন করিত ৷ তাহার এইরূপ অবস্থা হইল— সে নিদ্রিত থাকলেও তাহার জিহ্বা দুর্গা দুর্গা জপ করিত।
যাইহোক অবিরাম দুর্গানাম করার জন্য তাহার পিতামাতার দত্ত হরিচরণ নামটি লোপ হইয়া গেল। জনসমাজে দুর্গাদাস বলিয়া সে পরিচিত হইল তাহাতে তাহার কোন দুঃখ ছিল না। বৈশাখ মাস। দুপুরবেলা রৌদ্রে ঝাঁ ঝাঁ করছে৷ দুর্গাদাস শাঁখার পুঁটলি কাঁধে লইয়া দুর্গা দুর্গা করিতে করিতে তারিণীপুরের সীমা ছাড়াইয়া মাঠে পড়িল। কিয়দ্দূরে যাইবার পর মাঠের মাঝখানে একটি দীঘি আছে,দুর্গাদাস দীঘি পার হইয়া গিয়াছে এমন সময় তাহার কানে একটি আওয়াজ গেল, —‘ও ছেলে, ও ছেলে,আমায় শাঁখা দিবে?’ দুর্গাদাস এমন মিষ্টি কথা কখনও শুনে নাই। সে পিছু ফিরিয়া দেখিল একটা মেয়ে জলে দাঁড়াইয়া পা রগড়াইতে রগড়াইতে তাহাকে ডাকিতেছে। সে পিছু ফিরিয়া অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। অনেক বড় বড় লোকের বাড়ী শাঁখা পরাইয়াছে। কিন্তু এমন রূপ কখনও দেখে নাই! সে বলিল— কেন দিব না মা!
একটা বট গাছের তলায় সে বসিল। ধীরে ধীরে মেয়েটি তাহার নিকটে আসিল, সে অপরূপ রূপ দেখিয়া দুর্গাদাস ভাবিল যে ছেলেরা বলে “দুর্গা তার পিছু পিছু ঘুরিয়া বেড়ায়” আজ সত্যই তাহা হইল না কি! মেয়েটি বালিকা কি যুবতী দুর্গাদাস ঠিক করিতে পারিল না। কখনও তাহার মনে হইতেছে যুবতী কখনও মনে হইতেছে বালিকা। মেয়েটি হাসিতে হাসিতে কাছে আসিয়া বলিল— বেশ ভালো দেখে আমায় শাঁখা দাও না ছেলে। দুর্গাদাস বাছিয়া বাছিয়া খুব ভাল শাঁখা বাহির করিয়া পরাইতে লাগিল। যেমন মেয়েটির অঙ্গ স্পর্শ করিয়াছে অমনি তাহার শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া থর থর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। ‘দুর্গা দুর্গা’ বলিয়া সে তাহা সামলাইয়া লইল। দুর্গা দুর্গা বলিয়া শাঁখা পরাইতেছে— মেয়েটি জিজ্ঞাসা করিল— হ্যাঁ ছেলে! অমন করে দুর্গা দুর্গা বলছ কেন? আর বললে কি হয়?
দুর্গাদাস কথা কহিতে পারিতেছে না। খানিক পরে দুর্গাদাস বলিল— গুরুঠাকুর দুর্গা দুর্গা বলতে বলেছেন তাই বলি মা— আর দুর্গা দুর্গা বললে মা দয়া করেন ৷
—হ্যাঁ ছেলে তুমি মাকে দেখেছ ?
—না মা,আমি এমন পুণ্যি কি করেছি যে মাকে দেখতে পাবো ?
—কেন দুর্গা দুর্গা করলে কি দেখা যায় না ? যদি দেখা না যায়—তবে ডাক কেন ?
দুর্গাদাস বলিল— মা,আমি মুখ্যু মানুষ অত জানিনে ৷ যদি নাম করলে দেখতে পাওয়া যায় তবে দেখা পাবই ৷
শাঁখা পরান শেষ হইল। মেয়েটি হাসিতে হাসিতে বলিল— ওই যাঃ! ও ছেলে, আমার কাছে তো পয়সা নেই। তোমায় কি করে দাম দেবো? তোমার শাঁখা খুলে নাও!
দুর্গাদাস যেন কেমন হয়ে গেছে৷ না থাকুকগে— এয়োস্ত্রী মানুষ— সাক্ষাৎ ভগবতী,আমি হাত থেকে শাঁখা খুলতে পারবো না; আমার দামের কাজ নেই বলিয়া পোঁটলা বাঁধিতে লাগিল ৷
মেয়েটি বলিল— তা হবে কেন? আমিই বা তোমার কাছে অমনি শাঁখা পরবো কেন? তুমি যেও না, তুমি এক কাজ কর; গ্রামের ভিতর যাও৷ আমার বাবার নাম উমাপদ ভট্টাচার্য্য৷ তাঁর কাছ থেকে দামটা আনগে৷ বলগে আপনার মেয়ে শাঁখা পরেছে দাম দিন৷ তিনি যদি বলেন— কৈ আমার মেয়ে তো নেই; মেয়েকে তো দেখিনি! তুমি সে কথা শুনো না, —বোল এইমাত্র শাঁখা দিয়ে এলাম। মেয়ে নেই বললে শুনবো কেন? ওই দুর্গাঠাকুরের পায়ের তলায় সিঁদুরের কৌটাতে একটা আধুলি আছে তিনি দিতে বলেছেন— বলিও। যাও ছেলে যাও।
‘আবার যাব, আবার যাব’— বলিতে বলিতে দুর্গাদাস অগ্রসর হইল আর মেয়েটি জলে নামিল৷
🍁চোখের জলে মায়ের পূজা | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী 🍁 (বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)
🍂প্রসঙ্গ : সুকান্ত ভট্টাচার্য
রাজনৈতিক বিশ্বাস কবির কবিতায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে তাঁকে রাজনৈতিক কবির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্বকে ভীষণই ছোট করা হবে। কারণ তাঁর কবিতার কেন্দ্রে আছেন, মানুষ। রাজনীতি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য -এর কাছে মানুষের জীবন বদলের একটি মাধ্যম আর কবিতা সেইসব মানুষের যন্ত্রণার তীব্র ভাষা।
সুকান্ত ভট্টাচার্য: অল্প আয়ু কিন্তু অনন্ত উচ্চারণ

দেবব্রত সরকার
ক্ষুধা, শ্রম, যুদ্ধ আর মানুষের মুক্তির স্বপ্নে যে কবি বাংলা কবিতাকে নতুন ভাষা দিয়েছিলেন। কবির বয়স তখন খুব বেশি নয়। পৃথিবীকে দেখার চোখে তখনও কৈশোরের স্বচ্ছতা থাকার কথা। অথচ সেই চোখেই তিনি দেখে ফেলেছিলেন এক ক্ষুধার্ত পৃথিবী, একটি অসাম্যভরা সমাজ, যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানুষের বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রাম। তিনিই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাঁর জীবন যেন অসমাপ্ত বাক্য। মাত্র একুশ বছর বয়সে জীবন থেমে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর কবিতা থামেনি। সময় যত এগিয়েছে, সুকান্তের কবিতা ততই নতুন অর্থে ফিরে এসেছে পাঠকের কাছে। পাঠকের বোধে।
সময়টা স্বাধীনতার ঠিক কয়েক মাস আগে। যে স্বাধীনতার স্বপ্ন তাঁর প্রজন্ম দেখেছিল, সেই স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় দেখার সুযোগ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর হয়নি। এ যেন বাংলা সাহিত্যের গভীর বেদনা। কিন্তু কবির মৃত্যু হয়নি। একজন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। একজন কবিরও শারীরিক মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর উচ্চারণ যদি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তাঁর মৃত্যু সম্পূর্ণ হয় না। সুকান্তের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন এমন একজন কবি, যাঁর কাছে কবিতা শুধুই সৌন্দর্যের অন্বেষণ ছিল মনে করে নিলে খুব বড় ভুল হবে। সুকান্ত-এর কবিতা ছিল মানুষের কথা বলার ভাষা। ক্ষুধার্ত মানুষের কথা, শ্রমজীবী মানুষের কথা, শোষিত মানুষের কথা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা ওঁর কবিতায় প্রবলতর ভাবে বর্ণিত। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় জন্ম হয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য -এর। তাঁর পারিবারিক শিকড় ছিল বাংলাদেশের ফরিদপুর অঞ্চলে। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। অল্প বয়সেই লেখালেখির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। কবিতা, গল্প, নাটক সহ বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে সুকান্ত নিজের সৃষ্টিশীল সত্তাকে গড়ে তুলতে থাকেন। কিন্তু তাঁর কৈশোরের পৃথিবী শান্ত ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক শাসন, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁর প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময়ের বাস্তবতা সুকান্ত ভট্টাচার্য -এর কবিতার ভিত গড়ে দেয় বললে ভুল হবে না।
সেই সময় দুর্ভিক্ষের ছায়ায় জন্ম নেয় অন্য কবিতা। ১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ ছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। রাস্তায় ক্ষুধার্ত মানুষের সারি, খাদ্যের অভাবে মৃত্যুমিছিল, অসহায় মানুষের চোখ এই বাস্তবতা তরুণ সুকান্তকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাঁর কবিতায় তাই বারবার ফিরে আসে খাদ্য ও জীবনের প্রশ্ন। ‘ক্ষুধা’ সুকান্তের কাছে ছিল একটি সামাজিক সত্য, রাজনৈতিক প্রশ্ন ও মানবতার পরীক্ষা।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য -এর কবিতার বিখ্যাত উচ্চারণ, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’…! এই একটি পঙ্ক্তিই যেন তাঁর কবিতার দর্শনের একটি বড় অংশকে ধারণ করে। যেখানে মানুষের পেটে খাবার নেই, সেখানে সৌন্দর্যের অলঙ্কার কতটা অর্থবহ? সুকান্ত সেই প্রশ্নই তুলেছিলেন। আবার ‘ছাড়পত্র’ -তেও নতুন কণ্ঠের আবির্ভাব লক্ষ্যণীয়। সুকান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’। এই বইয়ের কবিতাগুলিতে একদিকে রয়েছে তীব্র সামাজিক বাস্তবতা, অন্যদিকে রয়েছে পরিবর্তনের স্বপ্ন। কবি প্রকৃতিকে দেখেছেন, কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে যাননি। তিনি চাঁদ দেখেছেন, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের মুখের কথা ভুলে যাননি। তাঁর কাছে চাঁদও কখনও হয়ে উঠেছে ক্ষুধার অন্যতম বড় উদাহরণ।
এই জায়গাতেই সুকান্ত বাংলা কবিতায় আলাদা হয়ে ওঠেন। প্রচলিত কাব্যিক সৌন্দর্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কবিতায় রুটি, শ্রম, কারখানা, কৃষক, মজুর, ক্ষুধা এসবকেও কবিতার উপাদান করে তুলেছিলেন। অন্যদিকে, ‘হে মহাজীবন’ তো কবিতার কাছে জীবনের দাবি। সুকান্তের কবিতায় একটি প্রবল জীবনবোধ রয়েছে এটা সকলেরই জানা। কবিতাকে জীবনের বাইরে রাখতে চাননি কবি। কবিতা যেন তাঁকে বারবার বলেছে, মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনও সাহিত্য পূর্ণ হতে পারে না। ওঁর কাছে কবি হিসেবে দায়িত্ব ছিল সমাজের বাস্তবতাকে দেখা আর সেই বাস্তবতার ভিতর থেকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি করা। এ কারণেই তাঁর কবিতা একসঙ্গে কোমল, কঠিন ও সমাজের একটি জটিল শ্রেণীর জন্য কষাঘাত।
দেখা যায়, কখনও সেখানে শিশুর প্রতি মমতা, কখনও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংহতি, কখনও যুদ্ধ ও শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। ‘রানার’ -ও তেমনি এক মানুষের জীবনের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে সময়ের কাছে। মনে রাখা জরুরি যে, সুকান্ত ভট্টাচার্য -এর জনপ্রিয় কবিতাগুলির মধ্যে ‘রানার’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কী আছে সেখানে? রাতের অন্ধকারে ছুটে চলা এক ডাকবাহক। তার ক্লান্তি, দায়িত্ব আর অবিরাম পথ চলা সুকান্তের কবিতায় হয়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের বৃহত্তর উচ্চারণ। আসলে রানার শুধু একজন ডাকপিয়ন নন। তিনি সেই মানুষ, যে নিজের ক্লান্তিকে পাশে সরিয়ে রেখে অন্যের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেন। এই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে কবি শ্রমের মর্যাদা ও সাধারণ মানুষের অদৃশ্য অবদানকে সামনে নিয়ে আসেন।
এছাড়াও ‘হে মহাজীবন’ থেকে ‘আঠারো বছর বয়স’ সুকান্তের কবিতায় তরুণদের জন্যও রয়েছে বিশেষ আহ্বান। আঠারো বছর বয়স কবির কাছে শুধু জীবনের ধারাপাতের একটি সংখ্যা নয়। আসলে তা তারুণ্যের শক্তি, প্রশ্ন করার সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সময়। এই সময়ের তরুণ সমাজ যখন নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে, তখন সুকান্তের সেই তারুণ্য-চেতনা এখনও প্রাসঙ্গিক। কারণ সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, সমাজের কাঠামো বদলায়, কিন্তু নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার জন্য তরুণ মনের প্রয়োজন কখনও-ই ফুরোয় না।
অপর দিকে দেখলে দেখা যায় রাজনীতি ও সাহিত্য সুকান্ত -এর জীবনের অংশ। বলাই বাহুল্য যে, সুকান্তের সাহিত্যিক জীবন তাঁর রাজনৈতিক চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তিনি ঘোরতরভাবে বামপন্থী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্বাস কবির কবিতায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে তাঁকে রাজনৈতিক কবির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্বকে ভীষণই ছোট করা হবে। কারণ তাঁর কবিতার কেন্দ্রে আছেন, মানুষ। রাজনীতি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য -এর কাছে মানুষের জীবন বদলের একটি মাধ্যম আর কবিতা সেইসব মানুষের যন্ত্রণার তীব্র ভাষা। এখন প্রশ্ন আসে, কিশোর কবি’ এই পরিচয়ের সীমা কোথায়? দেখা যায়, সুকান্তকে বহুদিন ধরে ‘কিশোর কবি’ বলা হয়। নিঃসন্দেহে অল্প বয়স তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কবির কবিতাকে শুধুমাত্র বয়স দিয়ে বিচার করলে ওঁর সৃষ্টির গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। মাত্র একুশ বছরের জীবনে সুকান্ত যে সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক বোধ আর ভবিষ্যৎচিন্তার পরিচয় দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কবির কবিতা পড়লে মনে হয় যে, বয়সে তিনি তরুণ ছিলেন, কিন্তু সময়কে দেখার চোখে কবি সম্পূর্ণভাবে পরিণত।
কবির শেষ সময় বড় বেদনার। যক্ষ্মা কবির শরীরকে ক্রমশঃ দুর্বল করে দিয়েছিল। অসুস্থতার মধ্যেও লেখার ইচ্ছা থামেনি। শরীর ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু সৃষ্টি থামেনি। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে মাত্র ২১ বছর বয়সে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনাবসান ঘটে। সময়টা স্বাধীনতার ঠিক কয়েক মাস আগে। যে স্বাধীনতার স্বপ্ন তাঁর প্রজন্ম দেখেছিল, সেই স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় দেখার সুযোগ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর হয়নি। এ যেন বাংলা সাহিত্যের গভীর বেদনা। কিন্তু কবির মৃত্যু হয়নি। একজন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। একজন কবিরও শারীরিক মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর উচ্চারণ যদি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তাঁর মৃত্যু সম্পূর্ণ হয় না। সুকান্তের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। দশকের পর দশক পেরিয়ে গিয়েছে। পৃথিবী বদলেছে। কলকাতা বদলেছে। মানুষের জীবন বদলেছে। প্রযুক্তি নতুন প্রজন্মের হাতের মুঠোয় এসেছে। তবু ক্ষুধা আছে। বেকারত্ব আছে। অসাম্য আছে। শ্রমের অবমূল্যায়ন আছে। যুদ্ধ আছে। মানুষের উপর মানুষের শোষণ এখনও আছে। তাই সুকান্তও আছেন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের সার্ধশতবর্ষ আমাদের কাছে তাই শুধু একজন কবিকে স্মরণ করা শুধু উপলক্ষ্য নয়। এটি নিজেদের সময়কে নতুন করে দেখারও সুযোগ।
আমরা যদি সুকান্তকে সত্যিই শ্রদ্ধা করতে চাই, তাহলে শুধু তাঁর প্রতিকৃতিতে মালা দিলেই হবে না। তাঁর কবিতার প্রশ্নগুলির মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। যে পৃথিবীতে এখনও কোনও শিশু ক্ষুধার্ত থাকে, সেখানে সুকান্তের কবিতা শেষ হয়ে যায় না। যে পৃথিবীতে শ্রমিক তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য পায় না, সেখানে সুকান্তের কবিতা শেষ হয়ে যায় না। যে পৃথিবীতে তরুণের স্বপ্ন বারবার বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়, সেখানে সুকান্তের কবিতা শেষ হয়ে যায় না। বরং প্রতিটি অসমাপ্ত স্বপ্নের ভিতর থেকে তাঁর কবিতা আবার উচ্চারিত হয়। এটা ঠিক, সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন ক্ষণজন্মা কবি। কিন্তু তাঁর কবিতার আয়ু ক্ষণস্থায়ী নয়। কবি আমাদের শিখিয়েছেন, কবিতা শুধু ফুল, চাঁদ আর নক্ষত্রের কথা বলবে না। কবিতা রুটির কথাও বলবে। কবিতা মানুষের ক্ষুধার কথা বলবে। শ্রমের কথা বলবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেবে। তাঁর সার্ধশতবর্ষে তাই আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হতে পারে একটি প্রশ্ন, আজকের পৃথিবীকে দেখে সুকান্ত যদি আবার লিখতেন, তিনি কী লিখতেন? হয়ত সেই উত্তর খুঁজতেই আমাদের আবার তাঁর কবিতার কাছে ফিরতে হবে। কারণ সুকান্ত ভট্টাচার্য -এর দেহের প্রয়াণ হয়েছে বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর কবিতা এখনও আমাদের সময়ের বারবার দরজায় কড়া নাড়ে। সময়কে জাগিয়ে রাখে। 🍁
🍂কবিতায় সুকান্ত

স্বপন দত্ত -এর একটি কবিতা
নবজাতক সুকান্তের হাত থেকে নিষ্কৃতি
সুকান্ত তোমার এত মাথা ব্যথা কীসের?
একটু তো সভ্যভব্য হয়ে চলতে পারো।
এভাবে কেউ উঁচিবুঁচি নিয়ে কেউ নাচে?
সম্মান থাকে নবজাতকের, ওভাবে নাচলে?
আর নবজাতকের স্তেশ তার কথা
তাহলে সুকান্ত তোমার জন্ম কী একটি
নিছক দুর্ঘটনা?
লজ্জ্বায়-ঘেন্নায় রক্তও লাল থেকে ফিকে লাল!
তুমি কী নবজাতক সুকান্তের দিকে তাকিয়ে ছিলে?
বরং একটা ধান্দা নিয়ে
একটা অশ্লীল নোংরা ব্যালাট
এই নতুন সুকান্তকে শিখিয়ে দাও
এখন তো বুঝবেই না, আমি নয়, তুমি, তুমি, তুমি…
তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা
সুকান্ত
তুমি নেই তবু ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে
তোমার কবিতা জেগে থাকে।
শ্রমিকের ঘামে, রুটির গন্ধে,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা
একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতে
আজও বেঁচে আছ।
সুকান্ত,
তোমার বয়স থেমেছিল একুশে—
কিন্তু তোমার স্বপ্ন
এখনও আঠারো বছরের।
তাই তুমি কবি নও শুধু,
তুমি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।
সংবেদন শীল -এর একটি কবিতা
যদি সুকান্ত আজ লিখতেন
যদি সুকান্ত আজ লিখতেন,
চাঁদকে হয়ত বলতেন, একটু নেমে এসো,
ফুটপাথের শিশুটার পাশে বসো।
রুটির গন্ধে যদি কবিতা না জাগে
তাহলে সেটি কবিতা কিসের?
যদি আজ সুকান্ত লিখতেন,
শহরের আলো মেপে না মানুষের চোখের অন্ধকার মেপে
একটি নতুন ভোর লিখতেন।
আর বলতেন,
মানুষ বাঁচুক আগে, তারপর কবিতার জন্ম হোক
জয়ী বিশ্বাস -এর একটি কবিতা
সুকান্ত -এর জন্য…
একদিন আপনি বলেছিলেন
পৃথিবীকে সুন্দর করতে হবে
তাই এখনও কোনও কোনও তরুণ যখন স্বপ্ন দেখে
কোনও শ্রমিক যখন ঘাম ঝরায়, কোনও ক্ষুধার্ত মুখ
আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়
মনে হয়, আপনি কোথাও আছেন
কবিতায়, মানুষের পাশেই…
সুকান্ত,
আপনার কলম থেমেছে, আপনার স্বপ্ন বহমান…
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৩৯.
অপেক্ষার ভাষা
মানুষ যখন দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে, তখন তার ভেতরে আরেকজন মানুষ জন্ম নেয়। সে কথা কম বলে। কান্না চাপা দিতে শিখে যায়। ঘরের জিনিসপত্রের সঙ্গে কথা বলে। জানালার কাঠে হাত বুলিয়ে মানুষের শরীরের উষ্ণতা খোঁজে। সন্ধ্যার পর দূরে কুকুর ডাকলে মনে করে, কেউ বুঝি ফিরছে। তারপর আবার বুঝতে পারে, কেউ ফিরছে না।মেঘলার ভেতরে সেই দ্বিতীয় মানুষটি ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছিল। প্রথমদিকে সে দিন গুনত। তারপর সপ্তাহ। তারপর মাস। একসময় হিসেব রাখাও বন্ধ হয়ে গেল। শুধু জানালাটি রয়ে গেল। ওটি যেন বাড়ির একটি আসবাব নয়, পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য। প্রতিদিন তার ধুলো ঝাড়ে মেঘলা। কাঠে সরষের তেল মাখায়। কোথাও ফাটল ধরলে নিজেই মাটি আর আঠা দিয়ে ভরে দেয়।
মেঘলাও সেদিন একটি অদ্ভুত কাজ করল। বহুদিন ধরে লেখা সব চিঠি বের করল। মেঝেতে সাজিয়ে রাখল। একশো বত্রিশটি চিঠি। একটি একটি করে পড়তে লাগল। প্রথম দিকের চিঠিগুলোয় উচ্ছ্বাস। তারপর উদ্বেগ। তারপর অভিমান। তারপর নীরবতা। শেষ দিকের চিঠিগুলোয় আর নীলয়ের কথা কম, নিজের কথা বেশি। সে অবাক হয়ে দেখল, অপেক্ষা করতে করতে সে নিজেই একজন লেখক হয়ে উঠেছে। যার সমস্ত লেখা একজন অনুপস্থিত মানুষকে উদ্দেশ্য করে। চোখ ভিজে উঠল।
এইসব দেখে গ্রামের লোকেরা হাসত। জানালাকেও আবার মানুষ এভাবে আগলে রাখে নাকি?
মেঘলা হেসে বলত, না। কারণ সে জানত, কিছু জিনিসকে ব্যাখ্যা করা যায় না। যেমন বাতাসের গন্ধ, নদীর স্মৃতি, কিংবা অপেক্ষা! এদিকে জাহাজে নতুন এক নাবিক উঠেছে। তার নাম অর্জুন। বয়স তেইশ-চব্বিশ। চোখে সর্বক্ষণ বাড়ি ফেরার টান। প্রথম দিনই নীলয়কে জিজ্ঞেস করেছিল, দাদা, এতদিন সমুদ্রে থাকেন কী করে?
নীলয় উত্তর দিতে পারেনি। সে কী থাকে? নাকি কেবল ভেসে বেড়ায়? অর্জুন নিজেই বলতে শুরু করল, আমার মেয়ের বয়স ছয় মাস। এখনও কোলে নিইনি। ভিডিওতে দেখি। ও-নাকি আমাকে দেখে হাসে। কিন্তু আমি জানি না, সেই হাসি আমাকে দেখে, না মোবাইলের পর্দাটিকে দেখে!
কথাটা শুনে নীলয়ের বুকের কোথাও ব্যথা করল। তার নিজের তো সন্তানও নেই। মেঘলা একবার বলেছিল, তুমি যখন ঘরে থাকবে, তখনই সন্তান নেব। সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। এখন মনে হয়, সেই কথার ভেতরেও কতখানি অভিমান লুকিয়ে ছিল। রাতের সমুদ্রকে কেউ যদি খুব মন দিয়ে শোনে, তবে বুঝতে পারবে, ঢেউ কখনও একই শব্দ করে না। একটি ঢেউ আসে রাগ নিয়ে। একটি আসে স্মৃতি নিয়ে। একটি আসে ক্ষমা নিয়ে। সেদিন গভীর রাতে নীলয় ডেকে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশ পরিষ্কার। অসংখ্য তারা। মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের গায়ে কেউ নুন ছিটিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ সে দেখল, জলের ওপর দিয়ে একটি সাদা পাখি উড়ে যাচ্ছে। অসম্ভব সাদা ও সুন্দর। এত দূরে কোনও পাখি থাকে না! পাখিটি একবার জাহাজের চারপাশে চক্কর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ইউসুফ মৃদুস্বরে বলল,
—দেখলি?
—হ্যাঁ।
—ওটা পাখি নয়।
—তাহলে?
—যারা খুব বেশি বাড়ির কথা ভাবে, তাদের কাছে সমুদ্র মাঝে মাঝে খবর পাঠায়।
নীলয় আর প্রশ্ন করল না। সমুদ্রের গল্পে প্রশ্ন কম করতে হয়।
চরকমলপুরে এদিকে একটি নতুন ঘটনা ঘটল। বৃদ্ধ সমুদ্রবাবা একদিন মেঘলাকে ডাকলেন। তার হাতে একটি পুরনো কম্পাস। কম্পাসটির কাচ ভাঙা। মরচে পড়ে গিয়েছে। তবু কাঁটাটি এখনও কাঁপছে। তিনি বললেন,
—এটা রাখো।
—এটা দিয়ে আমি কী করব?
—যেদিন তোমার মনে হবে, সব পথ হারিয়ে ফেলেছ, সেদিন এই কাঁটাটার দিকে তাকিও।
মেঘলা হেসে বলল,
—এটা তো উত্তর দিক দেখাবে।
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
—না। মানুষ ভাবে কম্পাস উত্তর দেখায়। আসলে সে দেখায়, তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছ।
মেঘলা কম্পাসটি নিয়ে বাড়ি ফিরল। সেই রাতে ও-সেটি জানালার পাশে রেখে দিল। ভোরে উঠে দেখে, কম্পাসের কাঁটা উত্তরমুখী নয়। সোজা জানালার দিকে। সেদিনই নীলয়ের জাহাজে এল একটি বার্তা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা দেশে ফিরবে। খবরটা শুনে সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ল। অর্জুন লাফিয়ে উঠল। কেউ বাড়ির জন্য কী কী নিয়ে ফিরবে, তালিকা করতে লাগল। কেউ হিসেব করল, ছেলের জন্য কী খেলনা নেওয়া যায়। কিন্তু নীলয়ের আনন্দের সঙ্গে অদ্ভুত ভয়ও মিশে গেল যে, সে কি আগের সেই মানুষটি আছে? যে বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিল? মেঘলা কি এখনও আগের মতোই আছে?
নাকি অপেক্ষা মানুষকে অন্যরকম করে দেয়? সেদিন রাতে সে প্রথমবার একটি চিঠি লিখতে বসল। ‘মেঘলা, তোমাকে কী লিখব জানি না। এতদিন পরে বুঝতে পারছি, মানুষ সমুদ্রকে জয় করতে যায় না। সে নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ভরাট করতে যায়। কিন্তু ফিরে আসে আরও ফাঁকা হয়ে। আমি যখন ফিরব, যদি আমাকে চিনতে না পারো, ভয় পেও না। আমি নিজেকেও আর চিনতে পারি না।’ এ পর্যন্ত লিখেই সে থেমে গেল। চিঠিটি ভাঁজ করল না। পাঠালও না। সে হঠাৎ বুঝতে পারল, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হল, নিজের বদলে যাওয়ার কথা স্বীকার করা। বৃদ্ধ ইউসুফ চিঠিটি পড়লেন না, শুধু তার পাশে বসে বললেন,
—জানিস, ঘরে ফিরতে যতটা পথ লাগে, তার চেয়েও বেশি পথ লাগে ঘরের মানুষ হয়ে ফিরতে।
নীলয় তাকিয়ে রইল।
ইউসুফ বললেন,
সমুদ্র শরীরকে ক্লান্ত করে না, বদলেও দেয় রে।
এদিকে মেঘলাও সেদিন একটি অদ্ভুত কাজ করল। বহুদিন ধরে লেখা সব চিঠি বের করল। মেঝেতে সাজিয়ে রাখল। একশো বত্রিশটি চিঠি। একটি একটি করে পড়তে লাগল। প্রথম দিকের চিঠিগুলোয় উচ্ছ্বাস। তারপর উদ্বেগ। তারপর অভিমান। তারপর নীরবতা। শেষ দিকের চিঠিগুলোয় আর নীলয়ের কথা কম, নিজের কথা বেশি। সে অবাক হয়ে দেখল, অপেক্ষা করতে করতে সে নিজেই একজন লেখক হয়ে উঠেছে। যার সমস্ত লেখা একজন অনুপস্থিত মানুষকে উদ্দেশ্য করে। চোখ ভিজে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল, তুমি ফিরে এলে, এগুলো কি পড়বে? জানালাও নীরব। কিন্তু বাইরে বাতাসে শিউলিগাছের শুকনো ডাল দুলে উঠল। সেই রাতেই ঘটল ঘটনাটি। জাহাজের কেবিনে রাখা ছোট্ট কাঠের জানালাটি হঠাৎ নিজে থেকেই খুলে গেল। কোনও বাতাস নেই। কেউ ছোঁয়ওনি। তবু ওই দু’টি ধীরে ধীরে খুলে গেল। ভেতর থেকে নোনতা হাওয়া বেরিয়ে এল। আর সেই হাওয়ার সঙ্গে একটি খুব পরিচিত গন্ধ। শিউলিফুলের।নীলয় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সমুদ্রের মাঝখানে শিউলির গন্ধ! অসম্ভব। সে জানালার ভেতরে তাকাল। প্রথমবার সে স্পষ্ট দেখল, মেঘলা জানালার পাশে বসে আছে। তার সামনে ছড়িয়ে অসংখ্য চিঠি। সে কাঁদছে না। হাসছেও না। শুধু একটি চিঠির শেষ লাইনে লিখছে, ‘যদি মানুষ ফিরে না-ও আসে, তার জন্য খোলা রাখা জানালাটি যেন কখনও বন্ধ না হয়। কারণ হয়ত একদিন মানুষ নয়, তার আলো ফিরে আসে।’
ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘলার কলম থেমে গেল। তার মনে হল, কেউ তাকে দেখছে। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে জানালার ওপারে তাকাল। প্রথমবার তাদের চোখ সত্যিই একে অপরের সঙ্গে মিলল। দু’জনেই হাত বাড়াল।
মাঝখানে ছিল না কাচ, ছিল না সমুদ্রও। ছিল কেবল সময়। আর সময়েরও ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল গভীর, অব্যক্ত ভালবাসা, যা হয়ত কোনওদিন উচ্চারণ করা যায় না; কেবল বহন করে নিয়ে যেতে হয়, ঠিক যেমন সমুদ্র বহন করে নিয়ে যায় জাহাজকে। 🍁 (ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
বৃন্দাবন দাস -এর চারটি কবিতা

চার প্রকারের কবিতা
১.
মৌন মিছিল বলে
মিছিল হয় না
ভাষা তার থাকেই;
যেভাবে শব্দ জাগে
যেভাবে শহীদ বেদী কাঁপে
এভাবেই ভালো মানুষ
সিঁড়ি ভাঙে
সাঁতারু জীবন—
২.
শৈশব ছিল তার
কিংবা কৈশোর!
যৌবন মেখেছে রোদ্দুর
দৃশ্যত নষ্ট হাওয়া
স্বপ্নদোষে জীবনের গন্ধ ওঠে
হলুদ জন্মের ঘ্রাণ
ভাঙছে তবুও পাহাড়
বরফ গলে যদি
স্বপ্ন চুরি করা যায়—
৩.
শিশুকে স্তব্ধতার ইতিহাস শেখানো
যত কঠিন— তেমনই
মাস্টারমশাইদের কবিতা
অভ্যস্ত হাতে ইচ্ছাকল নাড়ি
সুযোগ বুঝে
পালানোর রাস্তা;
পছন্দের রঙ খুঁজতে খুঁজতে
আমি মহা পৃথিবীর
স্বরূপ দেখতে পাই—
৪.
কারো না কারো শৈশব
ছিল নিশ্চিত
এখন বিপন্ন ভালোবাসায়
স্বীকারোক্তি
আদৌ সম্ভব নয়:
এবার দেখা হলে বলে দিও
কার জন্য রোদ্দুরে
শুকোও চুল
প্রিয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রসাধন
মূলত মুন্ডহীন আমি
এক আলোকবর্ষ থেকে
আর এক আলোকবর্ষে
সটান চলে যেতে থাকি—
শর্বাণীরঞ্জন কুণ্ডু -এর একটি কবিতা

মানুষের ইতিহাস
সংঘবদ্ধ হলে মানুষ খারাপ কাজ করবেই।
একাকিত্বে মানুষের বড় ভয়।
তাই মানুষ সংঘবদ্ধ হয়।
সংঘবদ্ধতা খোঁজে উদ্দেশ্য।
সবচেয়ে সহজ উদ্দেশ্য হতে পারে
অন্য একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর সাথে বিবাদ।
বিবাদ ন থাকলে
দুটো গোষ্ঠীর এক হয়ে যেতে বাধা নেই।
সমস্যা পরিচালনার।
যত বড় গোষ্ঠী তত বেশি পরিচালনার সমস্যা।
কারণ মানুষ তো সবাই আলাদা আলাদা!
তাই অনেক অনেক গোষ্ঠী।
বিবাদ গোষ্ঠী ধরে রাখে।
তাই দেখ রোজ নতুন নতুন বিবাদ।
বিভিন্ন গোষ্ঠী সমন্বয় হলে একটা দেশ বা একটা রাজ্য।
তাই আলাদা আলাদ দেশ, আলাদা আলাদা রাজ্য।
তাই দেশে দেশে লড়াই।
গোষ্ঠী বিবাদ ও লড়াই
এই হলো মানুষের ইতিহাস।
সানি সরকার -এর একটি কবিতা

নি-র্বাসনা
কী চাও, সুখ? কী খুঁজছ, শান্তি…?
যেন সমস্তই সাজানো থাকে সবসময়
যেন সব মেঘের-তুলোর মতন ওড়ে!
কেন স্থির নয়, কেন এত বেচাল বাতাস…
বাতাসও এমন বিবাগী— সবই ফিরিয়ে দেয়
যখন যেমন
শুধু
সময়…
সময়
গুনতে হয়, ততটাই স্তব্ধতা নিঃসৃত গন্ধহীন-ঘ্রাণ
এখন আর কান্না আসে না তেমন
এখন লজ্জ্বা করে, ঘেন্নাও!
লজ্জ্বা ও ঘেন্না বিছানার দুই পাশে থাকে
মাঝটিতে সেই দুলে ওঠা গাছ
যে পুড়তে পুড়তে চমৎকার—
একটি পাথর হয়ে গিয়েছে
পঞ্চটান সরলরেখার ওপর একই সঙ্গে হাঁটলে
এই ব্রহ্মাণ্ড এমনি সুন্দর : সবই সুখ, সবই শান্তি…
লজ্জ্বা নেই, ঘেন্না নেই, শুধু আনন্দ
কান পাতো, বুকে হাত দিয়ে দ্যাখো
একটি সাদা ফিনফিনে রিবন
সকলের দশদিক পরিক্রমণ করছে
এতটাই পরম শান্ত ভাবে
মনে পড়ে, চুম্বন, যৌনতা, পলাতক হাওয়া!
কোথায় ভাল আছ তুমি, কোথায় বেঁধেছ মন, দ্যাখো
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
২৫.
সুনয়না দি
তিথি সমস্ত কাজ সামলে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। আজ গুরু পূর্ণিমার দিন চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ যেন মনে হল, তার পোড় খাওয়া বোধগুলো যদি আবার জেগে ওঠে নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করে কেমন হয়। কেমন হয় যদি দূর সমুদ্রের বাতাস এসে গায়ে দোলা দেয় রক্তে মেশে লবণ। হৃদয় মরুভূমি যদি আবার জেগে ওঠে মরুদ্যান। প্রজাপতির মেলা বসে কেমন হয়। কেমন হয় যদি সুনয়না ঘুরে দাঁড়ায়। আজ কাগজি মাসির কথাগুলো বড্ড কানে বাজছে। সত্যি কি ভালবাসা এভাবে হারিয়ে যায়? যেতে পারে? যদি তাই হয় তাহলে মানুষ কেন এত ভালোবাসার কাঙাল। হঠাৎই এই বোধের নাড়াচাড়াতে কেউ যেন দোলা দেয় কার কণ্ঠস্বর যেন ভেসে আসে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে টের পায় তিথি।
বলেছে ও-এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, তবে ওর মেয়েকে ঠিক ভাবে মানুষ করতে হবে। ও চায় না ওর মত নরম যন্ত্রণায় মেয়ে পড়ুক। কিন্তু ও না থাকলে ওর মেয়ের উপর কি হবে সে গ্যারান্টি কী দেবে?
সুনয়নাকে আমি যত দেখছি জানো বৌমা— অবাক হয়ে গেছি। কতটা কঠিন হয়ে গিয়েছে। ও-কিন্তু একটা কোর্টের কাগজে ব্ন্ড না কি লিখে দিয়েছে। ওই মেয়েকে সঠিকভাবে লালন পালন করার দায়িত্ব তার স্বামীকে নিতে হবে।
—কিগো? কানে কি শুনতে পাচ্ছ না? কখন থেকে ডাকছি।
তিথি অবাক হয়ে তাকিয়ে।
—কী করছো বারান্দার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে
দাঁড়িয়ে?
তিথির একগাল হাসি।
—আপন মনে কি কথা বলে যাচ্ছ?
তিথি নিরুত্তর।
—গোপনে পরকীয়া!
—হ্যাঁ! কি বলছ?
—সেকি গো তুমি আমার কোন কথা শোননি পবিত্র বলল।
—বল না কি বলছিলে?
—শুনতে যখন পাওনি আর বলে কি হবে, শুতে এসো।
—হ্যাঁ যাই।
—কি ব্যাপার প্রতিদিন আমার তোতা পাখিটা পুচু চলে আসে, আজ ব্যাটা আসলো না কেন?
ব্যালকনি থেকে বেরিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিল ঘরে এসে ড্রেসিং টেবিলে নিজেকে দেখল।
—বাহ বাহ কি চেহারার হাল হয়েছে!
—বলছি তুমি কী চিন্তা করছিলে এত?
মাথায় চিরুনি দিতে দিতে তিথি বলল,
—কই কিছু না তো!
—তুমি কিন্তু কিছু একটা লুকোচ্ছ আমার কাছে।
—কি যে বলো না!
পবিত্র তিথির হাতটা নিজের হাতের উপর রাখল একটা আলত ভালবাসার ছোঁয়া সারা শরীর জুড়ে আঁকিবুকি কাটতে শুরু করল।
—হ্যাঁ গো কাগজি মাসি আজকে থেকে গেল।
—থেকে গেল তো ভালই হল কিন্তু আমার পুচুটা কোথায় গেল?
—আরে ও-আছে কোথাও না কোথাও।
—কে জানে, আমি তো ভেবেছি তোমার কাছে।
—যাই দেখে আসি কাগজি মাসির কাছে কিনা।
—একটু দাঁড়াও না। আমার জন্য কি তোমার একটুও সময় নেই?
—কি হচ্ছে এসব, বুবুন আছে না! তাছাড়া পুচুটা কোথায় আছে!
—সব সময় তুমি ওদের কথা ভাবছ, আমার দিকে ফিরেও তাকাও না।
—এসব আবার কি কথা!
—ঠিক কথা।
—দেখো ওরা আমাদের সন্তানসম, নজরে নজরে রাখতে হয়।
—এজন্য আমি বাদ।
—এসব কথা তোমার মানায় না পবিত্র।
—কী হয়েছে তোমার? মনটা এত খারাপ কেন?
—কই কিছু না তো।
—তোমার চোখে জল।
—যাই দেখে আসি…
—তিথি, তিথি, তিথি…
—এ বাবা মাসির দরজাটা হার্ট করে খুলে রেখে শুয়েছে কেন? কিগো মাসি।
—কে বৌমা?
—হ্যাঁ গো।
—পুচু কই?
—ওই দেখো খাটের তলায়।
—ওমা তুমি খাটের তলায় শুয়ে আছো? কেন?
পুচু লেজ নাড়তে থাকে।
—মাসি দেখো ও-কেমন চিনে গেছে তোমাকে?
—মনে তো রেখেছে বলো।
—আচ্ছা মাসি, সুনয়না সত্যিই ভাল নেই বলো।
—কী বলি তোমাকে? কিছু কথা তোমাকে বলতেই হবে।
তিথি খুব উৎসুক ভরে তাকিয়ে রইল।
অনেক রাত হল আজকেই —শুনবে।
—বলো না শুনি। ভাল লাগছে না।
—জানো ও-কদিন জেল খেটেছে।
–কী বলছ মাসি এসব কথা!
—ঠিকই বলছি।
—কেন?
—ওই যে ভালবাসার কাঙ্গাল!
—মানে।
—বোসো বোসো বোসো।
মাসি পায়ের ব্যথাটা বোধহয় আবার নাড়া দিয়ে উঠেছে কোনও রকমে পা’টা টেনে বসার চেষ্টা করল, আর হাত দিয়ে টিপতে শুরু করল।
—কী মাসি ব্যথা করছে?
—ব্যথার আর কী দোষ বলো বৌমা? বয়স হয়েছে চারিদিক থেকে যেন ওরা আমাকে চেপে ধরছে হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম…
তিথি চেয়ারটাকে টেনে নিয়ে বসে বলল,
—বলো।
—আরে বাবা ও-বলত না, ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে শুধু টাকা, টাকা চায়! যে করেই হোক টাকা রোজগার করতে হবে।
—হ্যাঁ গো মাসি, এ কথা সুনয়না আমাকেও বলেছে।
—তারপর শোনো, সে গল্প। সে আর এক ইতিহাস। আসলে ও লোকের বাড়ির কাজ ধরল কিন্তু ক’ টাকা পাবে বলো? ওতেও ওদের মন ভরছে না।
—তারপর।
তারপর যেটা হয় কেউ স্বভাব দোষে চুরি করে কেউ অভাবে। —কী বলছ, চুরি!
—হ্যাঁ গো…
—সোমাদিও এসব কথা বলছিল— চুরির কথা।
কিন্তু আমি ওর কথা বিশ্বাস করি না।
—চুরির কথা আমিও বিশ্বাস করি না। তবে কি জানো, একবার আমার খুব শরীর খারাপ হয়েছিল, আমার বাড়িতে দেখতে গিয়েছিল-ও। তখন বলেছিল,
—মাসি আমাকে কিছু টাকা ধার দেবে? আমি তোমাকে দিয়ে দেব।
আমি ওকে বললাম,
—দেখ আমি কোথায় টাকা পাব? এখন বয়স হয়েছে রোজগার-পাতিও সেরকম করতে পারি না।
—তারপর?
—ওকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছিল, যেন মনে হচ্ছিল, ওই টাকাটা খুব ভীষণ দরকার।
—কত টাকা?
—ওই মুহূর্তে ওর ২৫-৩০ হাজার টাকার দরকার ছিল।
—তারপর?
—তারপর বলাতে চলে আসলো এবং পরের দিনই শুনলাম যে ও-চুরি করেছে।
—সে কী!
—হ্যাঁ গো এবং যে বাড়িতে কাজ করত সেই বাড়ির মালিক তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।
—সে কি মাসি!
—আর বোলো না, গলির মেয়ে বলে এমনিতেই বদনাম তারপর চুরি! ওর জীবনে আর কী থাকল? ওকে আর কেউ বিশ্বাস করে কাজ দেবে বলো? —জানো মাসি, ও-আমার কাছে কাজ চাইতে এসেছিল।
—তাই!
—হ্যাঁ গো, কিন্তু তখন তো সোমাদি কাজ করছিল। আমি কী করে ওকে কাছ থেকে ছাড়াই বলো?
—সে তো হক কথা।
—ওকে না সেদিন খুব উদ্ভ্রান্তের মতো মনে হয়েছিল।
—ও যেন দিকহারা নাবিকের মতো।
—হ্যাঁ।
—তারপর আর কি!
—কে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনল?
—না না ওর ধারে কাছে যায়নি শ্বশুরবাড়ির লোকজন।
—বলো কি?
—তখন ওর নামেই গালমন্দ করছে। আর কী বলি!
—তাহলে ছাড়া পেল কি করে।
ওই যে নিজেই ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে।
—নিজে!
—আর কি বলবো বলো।মেয়েদের কাছে যখন সবকিছু চলে যায় তার কাছে থাকেটা কি?
মাসি কি বোঝাতে চাইল তিথি বুঝল, কিন্তু তিথি তাতে খারাপ কিছু মনে করল না। কী করবে একটি মেয়ে এর থেকে আর কী করতে পারে।
—তারপর কী হল ওর?
—বাড়িতে আসলে ওকে আর সেই জায়গা দেবে? তারপরে তো জানো ওর ভাসুর গলির মেয়ে বলে, তখনও গলির মেয়ে ভেবে যা করার সেই করার দিকেই নজর।
—সত্যি জীবনটা কি!
–ও আর একবার আমার কাছে এসেছিল।
—এটা বলতে ও-আবার গলিতেই ফিরে যেতে চায়।
—মাসি!
চোখে শুধু জল আর জল। আর বলল, মাসি আমার আর ভাল হওয়া হয়ে উঠল না।
—আর ওর মেয়েটা?
—হ্যাঁ, তবে একটা কাজ ও করেছে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে।
—কী!
—বলেছে ও-এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, তবে ওর মেয়েকে ঠিক ভাবে মানুষ করতে হবে। ও চায় না ওর মত নরম যন্ত্রণায় মেয়ে পড়ুক। কিন্তু ও না থাকলে ওর মেয়ের উপর কি হবে সে গ্যারান্টি কী দেবে?
সুনয়নাকে আমি যত দেখছি জানো বৌমা— অবাক হয়ে গেছি। কতটা কঠিন হয়ে গিয়েছে। ও-কিন্তু একটা কোর্টের কাগজে ব্ন্ড না কি লিখে দিয়েছে। ওই মেয়েকে সঠিকভাবে লালন পালন করার দায়িত্ব তার স্বামীকে নিতে হবে।
—কিন্তু তারপরেও মাসি!
—ও বলেছে, যদি শুনতে পায় কোনও কারণে ওর মেয়ের উপর টর্চার হয়েছে তাহলে কিন্তু সেদিন ও-আবার এই বাড়িতে ফিরে আসবে।
চোখের জল ওর যেন ভেতরের পানসে স্বাদে লবণের ব্যবস্থা করেছে। উড়াল দিয়েছে ওর মন পাখি আকাশে ডানা মেলে ওড়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ পাখি উড়তে জানে না। ডানা ঝাপটাতে-ঝাপটাতে মুখ থুবড়ে পড়েছে আবার মাটিতে। 🍁(ক্রমশঃ)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।




