প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : গলের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচে ব্যাট হাতে ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও সামনে থেকে দলের দায়িত্ব নিলেন অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill)। এমন একটি ক্যাচ ধরলেন তিনি, যা দেখার পর কয়েক মুহূর্তের জন্য বিশ্বাসই করতে পারলেন না শ্রীলঙ্কার ব্যাটার কামিন্দু মেন্ডিস (Kamindu Mendis)। শর্ট কভারে দাঁড়িয়ে থাকা শুভমনের থেকে বলটি বেশ দূরে ছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক হাত বাড়িয়ে মাটি ছোঁয়ার আগেই বলটি তালুবন্দি করেন ভারত অধিনায়ক। সেই দৃশ্য ইতিমধ্যেই ক্রিকেটমহলে আলোচনার কেন্দ্রে।
ভারতীয় দলের ফিল্ডিং নিয়ে গত কয়েক মাসে কম আলোচনা হয়নি। কোচিং ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পর গলের মাঠে ভারতীয় ফিল্ডারদের পারফরম্যান্সের দিকেও নজর ছিল। বিশেষ করে ফিল্ডিং কোচের দায়িত্বে বদলের পর নতুন ব্যবস্থার প্রথম বড় পরীক্ষাগুলির একটি ছিল এই ম্যাচ। সেখানে অধিনায়ক নিজেই এমন একটি ক্যাচ নিয়ে দলের সতীর্থদের সামনে দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন।ঘটনাটি শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংসের সময়। বল হাতে ছিলেন বাঁহাতি স্পিনার কুলদীপ যাদব (Kuldeep Yadav)। তাঁর বল সামনের দিকে ঠেলে রক্ষণাত্মক শট খেলার চেষ্টা করেন কামিন্দু মেন্ডিস। কিন্তু বল ব্যাটে লেগে সোজা উপরে উঠে যায়। শর্ট কভারে দাঁড়িয়ে থাকা শুভমনের দিকে বল যাচ্ছিল না। তাঁর অবস্থান থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে যাচ্ছিল সেটি। সাধারণ ফিল্ডিংয়ে ওই বল হয়তো বাঁচানোই কঠিন হত। কিন্তু শুভমন সেই মুহূর্তে একটুও দেরি করেননি। বলের গতিপথ বুঝে বাঁ দিকে শরীর ছুড়ে দেন তিনি। কয়েক মুহূর্তের জন্য ভারত অধিনায়কের শরীর মাটির সমান্তরালে চলে যায়। তার মধ্যেই বাঁ হাত বাড়িয়ে বলটি ধরে ফেলেন শুভমন। বল মাটিতে পড়ার আগেই ক্যাচ সম্পূর্ণ হয়।
ক্যাচটি নেওয়ার পর ভারতীয় ক্রিকেটারদের উচ্ছ্বাসও নজর কেড়েছে। শুভমন নিজেও সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দে যোগ দেন। অন্য দিকে, কামিন্দু মেন্ডিসের মুখে তখন অবিশ্বাস। যে বলটি তাঁর ব্যাট থেকে উঠে যাওয়ার পর ক্যাচ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলেই মনে হচ্ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় অধিনায়কের অসাধারণ দক্ষতায় উইকেটে পরিণত হয়। মাঠের সেই দৃশ্য গ্যালারি থেকে সাজঘর, সর্বত্র আলোড়ন তৈরি করে। ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir) -সহ সাজঘরে থাকা ক্রিকেটারদের মুখেও দেখা যায় উচ্ছ্বাস। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন একটি ক্যাচ ভারতের পক্ষে বাড়তি সুবিধা এনে দেয়।
ধারাভাষ্যকারদের কাছেও শুভমনের এই প্রচেষ্টা আলাদা করে প্রশংসা পেয়েছে। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয় মঞ্জরেকর (Sanjay Manjrekar) ক্যাচটির কঠিনতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বলটি শুভমনের স্বাভাবিক নাগালের অনেকটাই বাইরে ছিল। ফলে ওই অবস্থান থেকে শরীর ছুড়ে এক হাতে ক্যাচ নেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। এমনকী ব্যাটারও হয়তো ভাবেননি যে বলটি ফিল্ডারের হাতে পৌঁছবে। মাঠের ওই জায়গায় শুভমনের নেওয়া ক্যাচকে তাঁর দেখা অন্যতম সেরা প্রচেষ্টাগুলির একটি হিসাবেও উল্লেখ করেন মঞ্জরেকর। তাঁর মন্তব্যের মূল বক্তব্য ছিল, এমন ক্যাচ নেওয়ার জন্য ফিল্ডারের দ্রুত প্রতিক্রিয়া, সাহস এবং শরীরের নিয়ন্ত্রণ, তিনটিই প্রয়োজন।
শুভমনের এই ক্যাচের প্রশংসা করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের প্রাক্তন ক্রিকেটার ইয়ান বিশপ (Ian Bishop)-সহ ক্রিকেটমহলের আরও অনেকে। সমাজমাধ্যমেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ক্যাচটির ভিডিয়ো। ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশ শুভমনের ডাইভকে ‘সুপারম্যান’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এক হাত বাড়িয়ে বলটি লুফে নেওয়ার দৃশ্যই সেই তুলনার মূল কারণ।
উল্লেখ যে, গলের ম্যাচে ভারতের বোলারদের কাজও সহজ করে দিয়েছে ফিল্ডারদের এই ধরনের সাফল্য। প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কা দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়েছিল। এক সময় তাদের রান ছিল ৫৯-এ চার উইকেট। পরে সোনাল দিনুশা (Sonal Dinusha) এবং নিরোশান ডিকওয়ালা (Niroshan Dickwella) বড় জুটি গড়ে দলকে বিপর্যয় থেকে কিছুটা উদ্ধার করেন। দিনুশা শতরান করেন এবং ডিকওয়ালা করেন ৮০ রান। তাঁদের ১৪৬ রানের জুটি শ্রীলঙ্কাকে লড়াইয়ে ফেরায়। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত ভারতের স্পিন আক্রমণের সামনে আয়োজকদের ইনিংস বড় জায়গায় পৌঁছতে পারেনি। মানব সুতার (Manav Suthar) চারটি উইকেট নেন। রবীন্দ্র জাডেজা (Ravindra Jadeja) তুলে নেন তিনটি উইকেট। কুলদীপ যাদবও গুরুত্বপূর্ণ উইকেট পান। শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। ভারতের প্রথম ইনিংসের ৪৬২ রানের জবাবে ১৭৮ রানের লিড পায় শুভমন গিলের দল।
এই ম্যাচে শুভমনের অধিনায়কত্বের পাশাপাশি তাঁর ফিল্ডিং নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। অধিনায়ক হিসেবে মাঠের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজে ফিল্ডিং করা নতুন কিছু নয়। তবে কঠিন পরিস্থিতিতে এমন ক্যাচ নেওয়া দলের মনোবল বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে স্পিনারদের বলে ব্যাটারদের সামান্য ভুলকে কাজে লাগাতে শর্ট কভার ও সিলি পয়েন্টের মতো জায়গার ফিল্ডারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।কামিন্দু মেন্ডিসের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন শুভমন নিজেই। কুলদীপের বলটি মেন্ডিস খুব বেশি জোরে খেলেননি। কিন্তু ব্যাটের সংস্পর্শে বলের দিক বদলে যাওয়ায় সেটি দ্রুত শুভমনের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার ফলেই উইকেটটি আসে।
ভারতীয় ক্রিকেটে শুভমন গিলকে নিয়ে আলোচনা মূলত ব্যাটিং ঘিরেই। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিং দক্ষতা, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। কিন্তু গলের মাঠে তাঁর ফিল্ডিং দেখাল, দলের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ভূমিকাতেও তিনি নিজেকে সামনে আনতে প্রস্তুত। এই ক্যাচের সবচেয়ে বড় দিক হল, এটি শুধু একটি উইকেট নেওয়ার ঘটনা নয়। কঠিন মুহূর্তে একজন অধিনায়ক কী ভাবে নিজের শারীরিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দলের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারেন, তারই উদাহরণ হয়ে থাকল ঘটনাটি। ক্যাচ নেওয়ার পর ভারতীয় দলের সম্মিলিত উচ্ছ্বাসও বুঝিয়ে দিয়েছে, সতীর্থদের কাছে মুহূর্তটির গুরুত্ব কতটা। গলের টেস্টে ভারত যখন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে বড় লিড নিয়ে এগিয়ে রয়েছে, তখন শুভমন গিলের এই ক্যাচ ম্যাচের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। ব্যাট হাতে বড় রান, অধিনায়ক হিসেবে কৌশল এবং ফিল্ডিংয়ে এক হাতে ঝাঁপিয়ে ক্যাচ, সমস্ত দিক থেকেই ভারতীয় অধিনায়ক নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। আর কামিন্দু মেন্ডিসের জন্য সেই মুহূর্তটি হয়ে থাকল একেবারেই অপ্রত্যাশিত বিদায়। কিন্তু, শুভমনের ওই এক হাতের ক্যাচ, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন একটি অসাধারণ ফিল্ডিং প্রচেষ্টা ভারতীয় দলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। আর ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে ‘সুপারম্যান গিল’-এর সেই ঝাঁপ দীর্ঘদিন মনে থাকার মতো দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Galle Test : India vs Sri Lanka Test latest news | শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৭৮ রানে এগিয়ে ভারত, গল টেস্টে তৃতীয় দিনেই ঘুরছে ম্যাচের হাওয়া! চাপে আয়োজকেরাই




