সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ রোজারিয়ো: ফুটবল মাঠে তাঁর উপস্থিতিই যে কোটি কোটি সমর্থকের কাছে আবেগের সমার্থক, সেই লিয়োনেল মেসি (Lionel Messi) আপাতত নিজেই সরে দাঁড়ালেন সবুজ ঘাসের দুনিয়া থেকে। বাবার মৃত্যুতে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত আর্জেন্টিনার (Argentina) অধিনায়ক অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফুটবল থেকে ছুটি নিয়েছেন। ক্লাব ইন্টার মায়ামির (Inter Miami) কাছে ছুটির আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি। সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। কবে আবার মাঠে ফিরবেন, সেই সিদ্ধান্ত মেসিই নেবেন বলে জানা গিয়েছে। মেসির জীবনে তাঁর বাবা জর্জে মেসি (Jorge Messi) শুধু পরিবারের অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন না, ছিলেন তাঁর পেশাদার জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। দীর্ঘ সময় ধরে মেসির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন জর্জে। ছেলের ফুটবলজীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, চুক্তি ও পেশাগত বিষয় দেখভালের দায়িত্বও ছিল তাঁর হাতে। ফলে বাবাকে হারানোর ধাক্কা মেসির ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি তাঁর ফুটবলজীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্জের মৃত্যুর পর আপাতত ফুটবল থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেসি। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের পর ক্লাবের তরফে তাঁকে প্রয়োজনমতো সময় নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কোনও প্রত্যাবর্তনের তারিখ মেসিকে দেওয়া হয়নি। যত দিন প্রয়োজন, তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারবেন। পরে নিজের মানসিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই মাঠে ফেরার সিদ্ধান্ত নেবেন আর্জেন্টিনার তারকা। মেসির ফুটবলজীবনে সাম্প্রতিক সময়টাও ছিল অত্যন্ত ব্যস্ত। বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রতিযোগিতায় তাঁর গোলের সংখ্যা ছিল আট। দলকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছলেও স্পেনের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে কাঙ্ক্ষিত জয় পায়নি আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের পর মেসি সাময়িক বিশ্রাম নিয়ে ফের ক্লাব ফুটবলে যোগ দিয়েছিলেন।
বিশ্রামের পরে ইন্টার মায়ামির হয়ে মাঠে নেমেও গোল করেছিলেন মেসি। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফেরার পর তাঁর পারফরম্যান্সে কোনও বড় ছন্দপতন দেখা যায়নি। কিন্তু তার পরেই ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে বড় ধাক্কা। বাবার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর দ্রুত মায়ামি থেকে তিনি আর্জেন্টিনায় ফিরে যান। জর্জে মেসির সঙ্গে লিয়োনেল মেসির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মেসির ছোটবেলার ফুটবলযাত্রা থেকে শুরু করে পেশাদার জীবনের দীর্ঘ পথ, বাবা ছিলেন তাঁর পাশে। আর্জেন্টিনার রোজারিয়ো থেকে বার্সেলোনায় মেসির যাত্রা, পরে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারে পরিণত হওয়া—প্রতিটি পর্যায়েই জর্জের ভূমিকা ছিল। ছেলের এজেন্ট হিসাবে তিনি শুধু চুক্তি বা অর্থনৈতিক বিষয় দেখতেন না, মেসির পেশাগত জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও তাঁর উপস্থিতি ছিল।
মেসির ক্ষেত্রে পরিবার বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের বাইরে তাঁর জীবনযাত্রায় পরিবারকে ঘিরে থাকার প্রবণতা বহু বার সামনে এসেছে। বড় ম্যাচের আগে বা পরে পরিবারকে পাশে পাওয়ার বিষয়টি মেসির কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সেই পরিবারেরই গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্যকে হারানোর পর তাঁর কিছু সময় ফুটবল থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত তাই অস্বাভাবিক নয়। গত ৯ আগস্ট জর্জে মেসির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। রোজারিয়োয় পারিবারিক পরিসরে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং বন্ধুদের উপস্থিতি ছিল। বাবার শেষকৃত্যের পর আপাতত নিজের শহরেই রয়েছেন মেসি। পরিবারের সঙ্গে তিনি সময় কাটাচ্ছেন। মেসির এই ছুটির সময়ে ইন্টার মায়ামির উপরও বাড়তি দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। ক্লাবের অন্যতম প্রধান তারকা এবং দলের আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় তিনি। তাঁর অনুপস্থিতি মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ক্লাবের তরফে মেসির ব্যক্তিগত পরিস্থিতিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কবে তিনি অনুশীলনে ফিরবেন বা কবে ম্যাচ খেলবেন, সেই বিষয়ে এখনই কোনও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
মেসির অনুপস্থিতি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ক্ষেত্রেও নজর কাড়বে। তিনি শুধু দলের অধিনায়ক নন, জাতীয় দলের অন্যতম প্রধান মুখ। আগামী আন্তর্জাতিক সূচীতে তিনি থাকবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে আপাতত জাতীয় দলের দায়িত্বের আগে ব্যক্তিগত শোক সামলানোর সময়টাই মেসির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আর্জেন্টিনার ফুটবল সমর্থকদের কাছেও জর্জে মেসির নাম অপরিচিত নয়। মেসির ফুটবলজীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বাবার নাম জড়িয়ে রয়েছে। মেসির প্রতিভা যখন রোজারিয়োর মাঠে ধীরে ধীরে নজর কাড়ছিল, তখন থেকেই জর্জে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার পরও সেই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। মেসির সাফল্যের সঙ্গে তাঁর বাবার নাম তাই বার বার উঠে এসেছে।
মেসির ফুটবলজীবনে নানা কঠিন মুহূর্ত এসেছে। চোট, পরাজয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যর্থতার চাপ, ক্লাব পরিবর্তন, প্রতিটি পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি মাঠে ফিরে এসেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত শোকের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। সেই কারণেই এ বার ফুটবল থেকে ফেরার জন্য তিনি কোনও তাড়াহুড়ো করতে চাইছেন না। ইন্টার মায়ামির তরফে মেসিকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই পরিস্থিতির কথাই সামনে আনছে। ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি, ম্যাচের সূচি বা অনুশীলনের চাপের বাইরে গিয়ে মেসির ব্যক্তিগত সময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহে তাঁকে মাঠে না দেখা গেলেও তা নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট প্রত্যাবর্তনের দিনক্ষণ এখনও সামনে আসেনি। উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের পর মেসি যখন ক্লাব ফুটবলে ফিরেছিলেন, তখন সমর্থকেরা আশা করেছিলেন, আগামী মরসুমেও তাঁকে নিয়মিত মাঠে দেখা যাবে। কিন্তু বাবার মৃত্যু সেই পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনল। এখন তাঁর সামনে ফুটবল নয়, পরিবার এবং নিজের মানসিক অবস্থাকে সামলানোর সময়।
আর্জেন্টিনার অধিনায়ক কবে আবার বল পায়ে মাঠে নামবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর আপাতত মেসির কাছেই রয়েছে। ক্লাব তাঁকে সময় দিয়েছে, জাতীয় দলের পক্ষ থেকেও তাঁর পরিস্থিতিকে সম্মান করা হচ্ছে। ফলে প্রত্যাবর্তনের কোনও নির্দিষ্ট তারিখ না থাকলেও ফুটবলবিশ্ব অপেক্ষা করবে সেই দিনের জন্য, যেদিন আবার মেসিকে দেখা যাবে তাঁর পরিচিত ১০ নম্বর জার্সিতে। এই মুহূর্তে অবশ্য সব কিছুর আগে পরিবার। রোজারিয়োয় নিজের বাড়িতে থেকে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন মেসি। বাবাকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে তাঁকে যতটা সময় প্রয়োজন, সেই সময়ই নিতে চাইছেন তিনি। মাঠের বাইরের এই কঠিন সময়ে গোটা ফুটবলবিশ্বের নজর এখন আর্জেন্টিনার অধিনায়কের দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Harry Kane future England team, Kane Messi comparison World Cup | ইংল্যান্ডের জার্সিতে শেষ কি হ্যারি কেন? ভবিষ্যৎ নিয়ে জবাবে মেসির উদাহরণ টানলেন অধিনায়ক, ভাঙলেন নীরবতা




