সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়াল বীরভূমের নেতা অনুব্রত মণ্ডল -এর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। গরুপাচার মামলায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার পর এবার প্রকাশ্যে এসে নিজের জেলযাত্রার দায় চাপালেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) উপর। শুধু তাই নয়, তাঁর এই বক্তব্যে সুর মিলিয়েছেন সদ্য শিবির বদল করা কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র (Madan Mitra)। ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) অন্দরে চাপানউতোর আরও জোরদার হয়েছে। একাধিক জনসমক্ষে অনুব্রত জানিয়েছেন, ‘আমি জেলে গেলাম কেন? কার জন্য গেলাম? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য।’ তাঁর এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন তিহাড় জেলে থাকার পর সম্প্রতি রাজ্যে ফিরে এসেছেন তিনি।
সেই অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে তাঁর এই দাবি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একই সুরে মদন মিত্রও অভিষেককে নিশানা করে বলেন, ‘দলের এই অবস্থার জন্য দায়ী একজনই, অভিষেক। অনেককে জেলে যেতে হয়েছে ওর জন্য। যে টাকা দেয়নি, তাকেই জেলে যেতে হয়েছে।’ তাঁর এই বক্তব্যে ‘মাল’ শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, ‘মাল মানে টাকা।’ এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হয়েছে। উল্লেখ্য, বুধবার রাজনৈতিক শিবির বদলের পর থেকেই মদনের বক্তব্যে অভিষেক বিরোধিতা স্পষ্ট। তিনি দাবি করেন, আগে মুখ খুললে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হত। তাঁর কথায়, ‘তখন বললে পুলিশ দিয়ে ঢুকিয়ে দিত।’ এই মন্তব্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এদিন অনুব্রত মণ্ডল আরও জানান, তিনি এখনও তৃণমূলের সঙ্গেই যুক্ত। তাঁর কথায়, ‘ঋতব্রতও তৃণমূল, আমিও তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সঙ্গে প্রথম থেকেই ছিলাম, এখনও আছি।’ তবে দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ যে রয়েছে, তা তাঁর বক্তব্যেই উঠে এসেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফল এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি তৃণমূলের অন্দরে মতবিরোধকে সামনে নিয়ে এসেছে। অনুব্রত দাবি করেন, তাঁকে ভোটের কাজ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। এমনকি প্রচারেও অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, মাঠে নামতে দেওয়া হয়নি।’ ফলে দলের ভেতরে তাঁর ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়েছিল বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
মদন মিত্রের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য। পুরসভায় নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের তলব করে ইডি (ED)। তার পরেই তিনি অন্য শিবিরে যোগ দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকেই কেন্দ্রীয় সংস্থার চাপের প্রসঙ্গ তুলেছেন। যদিও মদন এই অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করেননি। একইভাবে অনুব্রতের বিরুদ্ধেও ইটভাটা সংক্রান্ত অভিযোগ সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষিতেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদলের জল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ও সব বাজে কথা, আমি ভয় পাই না।’ তিনি আরও দাবি করেন, নির্বাচনের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে একাধিক বার ফোন করেছিলেন। অনুব্রতের কথায়, ‘চার বার ফোন করেছিল। আমি বলেছি, চোখে দেখো না, কানে দেখো তুমি।’
এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে আলাদা তাৎপর্য তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি দলের ভেতরের যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ইঙ্গিত বহন করছে। একই সঙ্গে দলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নও উঠে আসছে। উল্লেখ্য, গরুপাচার মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর দীর্ঘ সময় জেলে কাটাতে হয়েছিল অনুব্রতকে। সেই সময় তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। জেল থেকে ফেরার পর বীরভূমে তাঁর প্রভাব আগের মতো নেই বলেই অনেকের মত। কাজল শেখ (Kajol Sheikh) -এর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধও প্রকাশ্যে আসে। ফলে জেলার রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এর আগেও অনুব্রত দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে আইপ্যাক (I-PAC)-এর ভূমিকা নিয়ে তাঁর অভিযোগ ছিল, ‘সবার কাছ থেকে টাকা তোলা হত, টিকিট বণ্টনে প্রভাব ছিল।’ এবার সেই অভিযোগের সঙ্গেই যোগ হল তাঁর জেলযাত্রা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে এখনও পর্যন্ত এই মন্তব্যগুলির উপর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দলের ভেতরে যে অস্বস্তি বাড়ছে, তা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। শাসকদলের একাংশের মতে, এই ধরনের মন্তব্য দলের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। রাজ্য রাজনীতির এই পরিস্থিতি আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়েই এখন জোর জল্পনা। অনুব্রত ও মদনের মন্তব্য যে রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Madan Mitra statement controversy, TMC vs BJP Bengal hawker issue | ‘ক্ষমতায় নেই তবুও ভয়’ মদন মিত্রর মন্তব্যে উত্তাল রাজ্য রাজনীতি



