সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: জীবনের সাফল্য মানেই উচ্চ বেতন, বিদেশের চাকরি আর আরামদায়ক জীবন, এমন ধারণা সমাজে বহুদিন ধরেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেই চেনা সংজ্ঞা ভেঙে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন সুইজারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া স্যান্ড্রা লাভি গইকোভিচ (Sandra Lavie Gojkovic)। দুবাইয়ের (Dubai) প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট জীবন ছেড়ে তিনি চলে এসেছেন পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) সুন্দরবনের সাগর দ্বীপে (Sagar Island), যেখানে আজ তাঁর উদ্যোগে শতাধিক শিশুর ভবিষ্যৎ নতুনভাবে গড়ে উঠছে। প্রায় দেড় দশক আগে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে তাঁর জীবনযাত্রা, আর সেই সঙ্গে বদলেছে বহু পরিবার ও শিশুর শিক্ষার সুযোগ। তাঁর এই পথচলা আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্যান্ড্রা নিজেই জানিয়েছেন, দুবাইয়ে কর্পোরেট দুনিয়ায় কাজ করার সময় তাঁর কোনও অভাব ছিল না। উন্নত জীবনযাপন, আর্থিক স্থিতি, বিদেশ ভ্রমণ, সবই ছিল তাঁর নাগালে। তবুও একটি প্রশ্ন তাঁকে বারবার ভাবিয়ে তুলত, ‘আমার জীবনে এত সুযোগ রয়েছে, অথচ বহু মানুষ মৌলিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন। চাকরি ছাড়ার পর তিনি প্রায় কিছুই সঙ্গে না নিয়েই ভারতে পাড়ি দেন। তাঁর কথায়, ‘আমার কাছে ছিল মাত্র দু’টি শার্ট, দু’টি প্যান্ট আর একটি একমুখী বিমানের টিকিট।’ এরপর একাই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে দেখেন তিনি। কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করেন। এই যাত্রাপথেই তিনি উপলব্ধি করেন, শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলে কাজ করার মধ্যেই প্রকৃত পরিবর্তনের সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে।
প্রথমদিকে তিনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে আর্থিক সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কাজ দেখতে গিয়ে বুঝতে পারেন, অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে যায়। তখনই তিনি নিজেই একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্বচ্ছ উদ্যোগ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সরাসরি মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করা। এই ভাবনা থেকেই তিনি পৌঁছন সুন্দরবনের সাগর দ্বীপে। ট্রেন ও নৌকায় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি দ্বীপের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে যান। সেখানে গিয়ে কোনও পরিকল্পনা চাপিয়ে না দিয়ে প্রথমে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের সমস্যা ও চাহিদা বোঝার চেষ্টা করেন। সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে নিজের কাজের রূপরেখা তৈরি করেন।
একজন বিদেশি হিসেবে গ্রামের মানুষের আস্থা অর্জন করা সহজ ছিল না। তবুও স্যান্ড্রা হাল ছাড়েননি। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। শুরুতে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আন্তরিকতা মানুষকে প্রভাবিত করে। একজন, দু’জন করে ধীরে ধীরে বহু শিশু তাঁর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমানে তাঁর পরিচালিত সংস্থার অধীনে একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে, যেখানে প্রায় ১৫০ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে। পাশাপাশি সরকারি স্কুলে পড়া আরও ১২০ জন শিশুকে অতিরিক্ত পাঠদান ও পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে শিক্ষার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্যও সুরক্ষিত থাকছে।
শুধু শিক্ষার মধ্যেই তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় ২০ জন মহিলাকে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা নিজের আয়ের পথ তৈরি করতে পারেন। এর ফলে গ্রামের মহিলাদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি শিশুবিবাহ, গার্হস্থ্য নির্যাতন, মানব পাচার এবং শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে গ্রামে সচেতনতা বাড়ানোর কাজও চালানো হচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই কাজ করে চললেও স্যান্ড্রার মনে কোনও আক্ষেপ নেই। তাঁর মতে, জীবনের মূল্য শুধু অর্থ বা আরামে নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই তা খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘অন্যের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্যেই আমি আমার জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছি।’ ভবিষ্যতেও তিনি এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
সাগর দ্বীপের মতো দুর্গম অঞ্চলে দাঁড়িয়ে এক বিদেশি নারীর এই প্রয়াস দেখিয়ে দিচ্ছে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে পথ তিনি তৈরি করেছেন, তা অনেকের কাছেই এক নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। তাঁর এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই বহু শিশুর জীবনে নতুন দিশা এনে দিয়েছে এবং আগামী দিনেও সেই প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India mega refinery project, Narendra Modi announcement refinery | ৪০টি আইফেল টাওয়ারের সমান স্টিল! ভারতের মেগা রিফাইনারি প্রকল্পে নজর, মোদীর ঘোষণায় চর্চা তুঙ্গে



