সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ব্রাসেলস: গ্রীষ্মের তীব্রতায় বিপর্যস্ত ইউরোপ (Europe heatwave)। গত কয়েক দিনের অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহে মহাদেশ জুড়ে মৃতের সংখ্যা ১৩০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্স (France)-এই প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১০০০ জন। পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু (WHO)। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী গরম আর রাতেও না কমা উত্তাপ, সব মিলিয়ে ইউরোপের বহু দেশের জনজীবন চরম চাপে, পরিসংখ্যান বলছে, ২১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। জার্মানি (Germany), ডেনমার্ক (Denmark), চেক প্রজাতন্ত্র (Czech Republic), হাঙ্গেরি (Hungary), পোল্যান্ড (Poland), স্লোভাকিয়া (Slovakia), সার্বিয়া (Serbia), ক্রোয়েশিয়া (Croatia), ইতালি (Italy), অস্ট্রিয়া (Austria) এবং পশ্চিম ইউক্রেন (Ukraine)-সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও পারদ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে, কোথাও ৪০ ডিগ্রি পেরিয়েছে, আবার কিছু এলাকায় তা আরও উপরে উঠেছে।
রবিবার হু (WHO) জানায়, ‘২১ জুন থেকে এখনও পর্যন্ত ইউরোপে তাপপ্রবাহজনিত কারণে ১৩০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।’ এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর ইতিমধ্যেই চাপ বাড়তে শুরু করেছে। হু-র প্রধান টেড্রোস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস (Tedros Adhanom Ghebreyesus) পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইউরোপের অধিকাংশ বাড়ি, অফিস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই মাত্রার তাপমাত্রা সহ্য করার মতো করে তৈরি নয়।’ তাঁর কথায়, ‘এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর আরও চাপ তৈরি হবে।’
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, ফ্রান্সে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের ফলে ইতিমধ্যেই ১০০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মৃতদের বড় অংশই প্রবীণ নাগরিক। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের উপর এই তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। যদিও তীব্র গরমে সব বয়সের মানুষেরই সমস্যা বাড়ছে। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতি সামাল দিতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বহু জায়গায় স্কুল, জাদুঘর এবং অন্যান্য জনসমাগমস্থল বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে মানুষকে অপ্রয়োজনে বাইরে বেরোতে নিষেধ করা হয়েছে। পানীয় জলের ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে এবং তাপঘাত এড়াতে নানা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট (Stéphanie Rist) একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘এই তাপপ্রবাহ আরও অন্তত ১০ দিন চলতে পারে।’ ফলে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে জরুরি পরিষেবাগুলিকে সতর্ক রাখা হয়েছে।
তাপমাত্রার চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে ইউরোপের নানা প্রান্তে। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ (Prague) -এর উত্তরের ডকসানিতে (Doksany) রবিবার তাপমাত্রা পৌঁছয় ৪১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। জার্মানির একাধিক শহরে ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং চেক প্রজাতন্ত্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় একই অবস্থা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, রাতের তাপমাত্রাও খুব একটা কমছে না। ফলে মানুষ গরম থেকে স্বস্তি পাচ্ছেন না। যেমন, জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় শহর কুবশুট্জ (Kubschütz)-এ শনিবার রাতেও তাপমাত্রা ২৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি। এতে ঘুমের সমস্যা, শরীরের ক্লান্তি এবং তাপঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
চিকিৎসা মহলের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে থাকলে শরীরে জলের ঘাটতি, হিট স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে প্রবীণ, শিশু এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি বিপদের মুখে পড়েন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে এই পরিস্থিতিতে। প্রতি বছরই ইউরোপে গরমের তীব্রতা বাড়ছে এবং তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাপপ্রবাহ কতদিন চলবে এবং আরও কতটা ক্ষয়ক্ষতি হবে, তা নিয়েই এখন চিন্তা বাড়ছে মহাদেশ জুড়ে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Europe Heatwave Crisis: 42°C in France, 20 Dead Including Children | ৪২ ডিগ্রির দাপটে দগ্ধ ইউরোপ, ফ্রান্সে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ২ শিশু-সহ মৃত ২০, বন্ধ শত শত স্কুল, বিপর্যস্ত জনজীবন



