সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বহু বছর আগে যে সিঙ্গুর (Singur) শিল্প বনাম জমি আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই মাটিকেই আবার শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বললেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। তাঁর দাবি, টাটা গোষ্ঠী-কে (Tata Group) ফের সিঙ্গুরে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলে রাজ্যের বিনিয়োগের ভাবমূর্তি বদলানো সম্ভব। এই মন্তব্য সামনে আসতেই নতুন করে রাজনৈতিক ও শিল্পমহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘যদি টাটাদের আবার সিঙ্গুরে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে প্রায় দুই দশক আগে যে ন্যানো প্রকল্পের বিদায় হয়েছিল, তার ফলে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা যাবে।’ তাঁর মতে, সিঙ্গুর থেকে টাটার সরে যাওয়া শুধু একটি প্রকল্পের ক্ষতি নয়, বরং গোটা রাজ্যের বিনিয়োগ পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।
২০০৮ সালে টাটা মোটরস (Tata Motors) -এর ন্যানো (Nano) প্রকল্প সিঙ্গুর থেকে গুজরাটে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেই সময় জমি আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে তৈরি হয়ে যাওয়া কারখানা ভেঙে ফেলার ঘটনাও জাতীয় স্তরে আলোড়ন তোলে। শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘সেই সময়ের ঘটনাই শিল্পের প্রতি বাংলার অনীহাকে চিহ্নিত করে দেয় এবং কর্পোরেট জগতে একটি বিরূপ ধারণা তৈরি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই টাটারা ফিরে আসুক, শুধু সিঙ্গুরেই নয়, গোটা বাংলায়। আমরা দেশ-বিদেশে এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চাই যে পশ্চিমবঙ্গ এখন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, শিল্প পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে সিঙ্গুরকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে বিজেপি।
সিঙ্গুরের প্রসঙ্গ রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর নেতৃত্বে যে আন্দোলনের মাধ্যমে ন্যানো প্রকল্প বন্ধ হয়েছিল, সেটিই তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করা হয়। সেই জায়গাতেই টাটা গোষ্ঠীকে ফেরানোর কথা বলা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘যে জায়গা একসময় শিল্পের বিদায়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, আমরা সেই জায়গাকেই শিল্পের প্রত্যাবর্তনের উদাহরণ করতে চাই।’ তাঁর দাবি, সিঙ্গুরের মাধ্যমে রাজ্যের শিল্পনীতি নিয়ে নতুন দিশা দেখানো সম্ভব। তিনি এ-ও উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র একটি সংস্থাকে ফেরানোই লক্ষ্য নয়, বরং বৃহত্তর বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। তাঁর কথায়, ‘টাটা গোষ্ঠী দেশের অন্যতম পুরনো ও সম্মানিত শিল্পগোষ্ঠী। তারা যদি আবার বাংলায় আসে, তাহলে অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যাবে।’
তবে, এই প্রস্তাবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জমি নীতির প্রশ্নও। শমীক ভট্টাচার্য মনে করেন, সঠিক জমি অধিগ্রহণ নীতি ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘আগে কোনও সুসংহত জমি নীতি ছিল না। শিল্পের জন্য জমি পেতে গিয়ে সংস্থাগুলিকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের নীতির ফলে শিল্পপতিরা সরাসরি জমি কিনতে বাধ্য হয়েছিলেন, যা বাস্তবে জটিলতা তৈরি করে। তিনি জানান, নতুন করে জমি নীতি নিয়ে কাজ চলছে এবং ভবিষ্যতে তা প্রকাশ করা হবে। যদিও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাননি, তবুও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই মূল লক্ষ্য।
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী -এর (Narendra Modi) কথাও উঠে এসেছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে রাজ্যে বিনিয়োগ ফেরানোর কথা বলেছিলেন। যদিও তখন টাটা গোষ্ঠীর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্য বিজেপি সেই প্রসঙ্গকে সামনে এনে নতুন করে শিল্পের প্রশ্ন তুলছে। শিল্পমহলে এই প্রস্তাব নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একাংশ মনে করছে, টাটা গোষ্ঠীর মতো একটি বড় সংস্থার প্রত্যাবর্তন রাজ্যের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতার পর সেই একই জায়গায় নতুন করে শিল্প গড়ে তোলা কতটা বাস্তবসম্মত।
উল্লেখ্য, সিঙ্গুরের ঘটনাটি এখনও অনেকের মনে তাজা। জমি অধিগ্রহণ, কৃষকদের আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংঘাত, এটি একটি সংবেদনশীল অধ্যায়। ফলে সেখানে নতুন করে শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিলে তা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। অন্যদিকে, শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার, বিজেপি সিঙ্গুরকে প্রতীক হিসেবেই ব্যবহার করতে চাইছে। অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়কে পেছনে ফেলে নতুন করে শিল্পের পথ তৈরি করার বার্তা দিতেই এই উদ্যোগ। আগামী দিনে এই প্রস্তাব কতটা বাস্তব রূপ পায় এবং টাটা গোষ্ঠী এই বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে। তবে আপাতত সিঙ্গুরকে ঘিরে আবারও শিল্প ও রাজনীতির সংযোগ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Mamata Banerjee protest, Samik Bhattacharya statement | হাই কোর্ট চত্বরে ‘চোর-চোর’ স্লোগান ঘিরে তোলপাড়: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে বিক্ষোভ, বিজেপির শমীক ভট্টাচার্যর পাল্টা দাবি ‘তৃণমূলের কৃতকর্মের ফল’



