সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: এক সময় সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ছিল ‘দিদিকে বলো’। কিন্তু তার উত্তরসূরি ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ (Sarasari Mukhyamantri) কর্মসূচী সেই জায়গা ধরে রাখতে পারেনি, এমনই আক্ষেপ এখন তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর অন্দরেই শোনা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে খারাপ ফলাফলের পর দলীয় নেতাদের একাংশ মনে করছেন, সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সঠিক প্রতিফলন যদি শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছত, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর দীর্ঘ শাসনকালে নানা উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি অভিযোগও জমেছিল বিস্তর। কোথাও স্থানীয় স্তরে দাদাগিরি, কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ, আবার কোথাও সরকারি পরিষেবা না-পাওয়ার ক্ষোভ, এই সব নিয়ে বহুদিন ধরেই অসন্তোষ বাড়ছিল। সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ জানিয়েও সুরাহা পাননি বলে দাবি করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচী একসময় সরাসরি যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে উঠেছিল।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ধাক্কার পর ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC) -এর পরামর্শে চালু হয়েছিল ‘দিদিকে বলো’। একটি নির্দিষ্ট হেল্পলাইন নম্বরের মাধ্যমে মানুষ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে অভিযোগ জানাতে পারতেন। সেই সময় আইপ্যাক-এর প্রধান প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor) -এর তত্ত্বাবধানে দ্রুত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হত। ফলে অল্প সময়েই এই উদ্যোগ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং মানুষের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব কমাতে ভূমিকা নেয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তার প্রভাবও লক্ষ্য করা গিয়েছিল বলে মনে করে রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগের গতি কমতে থাকে। পরে ২০২৩ সালের ১৯ মে নতুন নামে এবং নতুন কাঠামোয় চালু হয় ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’। ৮ জুন আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় এই প্রকল্পের। তবে এ বার দায়িত্বে আর বেসরকারি পেশাদার দল নয়, বরং সরকারি আধিকারিকরা। অভিযোগ গ্রহণ থেকে নিষ্পত্তি, সবই প্রশাসনের উপর ন্যস্ত করা হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে ফোনের সংখ্যা ভালই ছিল বলে প্রশাসনের একটি অংশ দাবি করছে। তবে পরবর্তীকালে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, অনেক সময় ফোন করলেও সাড়া মেলেনি। কখনও বা ফোন ধরা হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি, বরং আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে ধীরে ধীরে মানুষের আগ্রহ কমেছে এবং অভিযোগ জানানোর প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। তৃণমূলের একাংশ এখন মনে করছে, এই জায়গাতেই বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। এক নেতা বলেন, ‘যদি এই হেল্পলাইন কার্যকর থাকত, তাহলে নিচুতলার অসন্তোষ আগে থেকেই ধরা পড়ত।’ আরেকজনের কথায়, ‘মানুষের প্রতিক্রিয়া জানার এই সুযোগটা ঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়নি।’
প্রচার-পরিকল্পনার ঘাটতিও এই প্রকল্পের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এক প্রশাসনিক আধিকারিকের মতে, ‘এই ধরনের উদ্যোগকে নিয়মিত প্রচার না করলে মানুষ ভুলে যায়। এখানে সেটাই হয়েছে।’ ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটি মানুষের নজর থেকে সরে যায় এবং প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকাতেও পিছিয়ে পড়ে। অভিযোগের নিষ্পত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে জমি সংক্রান্ত সমস্যা, স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ, স্বাস্থ্য বা শিক্ষা পরিষেবা নিয়ে অভিযোগ, এই সব বিষয় নিয়ে বহু ফোন এসেছিল বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলির কতটা কার্যকরভাবে সমাধান হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ শীর্ষস্তরে পৌঁছয়নি বলেও দাবি করেছেন প্রশাসনেরই একাংশ।ভবানীপুর (Bhabanipur) -এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকেও প্রোমোটিং সংক্রান্ত অসন্তোষের খবর সামনে এসেছে। একইভাবে জঙ্গলমহল (Jangalmahal) এলাকায় এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমার অভিযোগও উঠে এসেছে। স্থানীয়দের একাংশ হেল্পলাইনে অভিযোগ জানিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। কিন্তু সেই সব অভিযোগের ভিত্তিতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ হয়নি, এমনটাই অভিযোগ।
দক্ষিণবঙ্গের আলু উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলিতেও একই চিত্র দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কৃষকদের একাংশের অভিযোগ, চাষ ও বিপণন সংক্রান্ত সমস্যার কথা জানানো হলেও তা গুরুত্ব পায়নি। নির্বাচনের ফলাফলে সেই অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছে তৃণমূলের একটি অংশ। তাদের মতে, ‘যদি সময়মতো প্রতিক্রিয়া জানা যেত, তাহলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব ছিল।’ তবে দলীয়ভাবে এই ব্যর্থতা স্বীকার করতে নারাজ তৃণমূল নেতৃত্বের আরেক অংশ। বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় (Shovandeb Chattopadhyay) বলেন, ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ কর্মসূচী ব্যর্থ হয়েছে, এমনটা বলা ঠিক নয়। অনেক মানুষ এর মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন।’ তাঁর মতে, নির্বাচনের ফলাফলের পিছনে অন্য কারণও রয়েছে এবং শুধুমাত্র এই প্রকল্পকে দায়ী করা ঠিক হবে না।
রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচনা, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা যে কোনও সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই যোগাযোগ দুর্বল হলে অসন্তোষ জমতে থাকে এবং তার প্রভাব পড়ে ভোটের বাক্সে। ‘দিদিকে বলো’ একসময় সেই যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম ছিল, কিন্তু ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ সেই জায়গা ধরে রাখতে পারেনি, এমন ধারণা ক্রমশ জোরাল হচ্ছে। পরিস্থিতির পর্যালোচনায় তৃণমূলের অন্দরে এখন নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর। ভবিষ্যতে মানুষের অভিযোগ দ্রুত শোনা এবং সমাধানের জন্য আরও কার্যকর পদ্ধতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে পেতে গেলে এই ধরনের উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ritabrata Banerjee Suvendu Adhikari meeting | ৪০ সেকেন্ডের সাক্ষাৎেই বিতর্ক! শুভেন্দুর সঙ্গে গোপন বৈঠক জল্পনায় কী বললেন ঋতব্রত




