সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ফলতা (Flata) বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফল সামনে আসতেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। লক্ষাধিক ভোটে বিজেপি প্রার্থীর জয় নিশ্চিত হতেই সমাজমাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস-কে তীব্র কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। ফলতা কেন্দ্রের গণনা তখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি, কিন্তু বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডা (Debangshu Panda) বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতেই শুভেন্দু সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে লেখেন, ‘ফলতার মানুষকে নতমস্তকে প্রণাম। আমি এক লক্ষ ভোটে জেতানোর আবেদন করেছিলাম, মানুষ সেই প্রত্যাশার থেকেও বেশি সাড়া দিয়েছেন।’ তাঁর দাবি, জয়ের ব্যবধান এক লক্ষ আট হাজারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এই জয়ের জন্য ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও লেখেন, ‘উন্নয়নের মাধ্যমে এই আস্থা ফিরিয়ে দেব। সোনার ফলতা গড়ে তুলতে আমরা দায়বদ্ধ।’ তবে এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। তৃণমূলকে আক্রমণ করে একাধিক মন্তব্য করেন, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
নিজের পোস্টে শুভেন্দু অধিকারী লিখেছেন, ‘একটি নীতি-আদর্শহীন দল ক্ষমতা হারাতেই তার প্রকৃত চেহারা সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক শক্তির অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং তোলাবাজির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে চাপে রাখা হয়েছিল।’ তাঁর এই মন্তব্য যে তৃণমূলকে উদ্দেশ্য করে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই রাজনৈতিক মহলে। সবচেয়ে বেশি চর্চায় এসেছে তাঁর ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ নিয়ে মন্তব্য। তিনি লেখেন, ‘যে মডেল এত দিন প্রচার করা হত, সেটাই এখন হার-বার মডেলে পরিণত হয়েছে।’ রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মন্তব্য সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই লক্ষ্য করে করা হয়েছে। কারণ, বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারে অভিষেক নিজেই ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’-এর কথা উল্লেখ করতেন।
শুভেন্দু আরও তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে বলেন, ‘প্যারাসুটে নেমে নেতৃত্ব পাওয়া এক ব্যক্তি এমন কোনও অপরাধ নেই যা করেননি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টাও হয়েছে।’ যদিও তিনি কারও নাম নেননি, তবে ইঙ্গিত কার দিকে তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কোনও দ্বিধা নেই। ফলতা কেন্দ্রের আগের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি লেখেন, ‘পূর্ববর্তী ভোটকে প্রহসনে পরিণত করে এই আসনে বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছিল একটি দল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি বদলেছে।’ তাঁর আরও দাবি, ‘অনেক বছর পর মানুষ নিজের ভোট নিজে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাই প্রকৃত ফল সামনে এসেছে।’
উল্লেখ্য, গত লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার (Diamond Harbour) কেন্দ্রের অন্তর্গত ফলতা বিধানসভা এলাকা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় দেড় লক্ষ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। সেই ফলাফলকে ঘিরে বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ ছিল ভোট প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। যদিও তৃণমূল সেই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে। উল্লেখ্য, এ বার উপনির্বাচনের আগে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান (Jahangir Khan) হঠাৎ করেই সক্রিয় প্রচার থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় দলীয় স্তরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের সময় পেরিয়ে যাওয়ায় ইভিএমে তাঁর নাম থাকলেও কার্যত মাঠে ছিলেন না তিনি। ফলে সংগঠনের ওপর তার প্রভাব পড়ে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফলাফলে দেখা যায়, তৃণমূল প্রার্থী মাত্র ৭,৭৮৩ ভোট পান। এই সংখ্যাকে ঘিরেও কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি লেখেন, ‘এটা কেবল শুরু। সামনে আরও কঠিন পথ অপেক্ষা করছে।’ তাঁর দাবি, আগামী দিনে তৃণমূলের লড়াই ‘নোটা’ (NOTA)-র সঙ্গে হতে পারে। ত্রিপুরা (Tripura) নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘একটি রাজ্যে ইতিমধ্যেই ওই দল নোটার থেকেও কম ভোট পেয়েছে। ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গেও সেই চিত্র দেখা যেতে পারে।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ফলতা উপনির্বাচনের ফলাফল শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটের অবস্থান এবং বিরোধী রাজনীতির পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। বিজেপির এই বিপুল জয় রাজ্যে তাদের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে, তৃণমূলের জন্য এই ফল আত্মসমালোচনার সুযোগ এনে দিয়েছে বলে মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের। আগামী দিনে নন্দীগ্রাম (Nandigram)-সহ একাধিক উপনির্বাচন এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের দিকে এখন নজর রাজ্যবাসীর। ফলতার ফল সেই লড়াইয়ের আগে এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Delhi visit, Amit Shah meeting | শাহ-শুভেন্দু বৈঠকের পর বড় ইঙ্গিত! বাংলায় শীঘ্রই পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন




