মাননীয়
রাজ্য সভাপতি,
ভারতীয় জনতা পার্টি
পশ্চিমবঙ্গ
মহাশয়,
নতুন সরকার, নতুন প্রত্যাশা। বিগত দিনগুলো শাসক যেভাবে একটার পর একটা অন্যায় বা ভুল করেছে যদি আপনারা জ্ঞানত বা অজ্ঞানত যদি না করেন তাহলে অবশ্যই খুশির ব্যাপার। সীমাহীন দূর্নীতি, তোলাবাজি, সংখ্যালঘু তোষণ ও ধর্ষণ থেকে শুরু করে শিক্ষক পেটানো যখন প্রতিনিয়ত সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয় শুধুমাত্র লক্ষীর ভান্ডার ও মুসলিম ভোট ভিত্তি করে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসা যা আজকের দিনে সম্ভব নয় তা চোখে আঙুল দিয়ে সাধারণ মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন। ২০১১ সাল থেকে মানুষের মধ্যে আস্তে আস্তে যেভাবে মানসিক ভাবে দংশিত হচ্ছিল আর তার থেকে যে এভাবে যেখানে শুধুমাত্র মুসলিম ভোটকেন্দ্রিক সরকার গড়তে ৫০ শতাংশ নির্ণায়ক কেন্দ্র নিমেষের মধ্যে শাসক কে টেনে হিচরে এভাবে গদিচ্যুত হতে হবে তা হয়তো আপনারা অর্থাৎ ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃবৃন্দ কখনই এতখানি আশাবাদী হতে পারেননি। যাই হোক চিন্তা ভাবনা এবং কতকগুলি বিষয়ের উপরে আলোকপাত করলাম একটু ধৈর্য ধরে বিষয়টি পর্যালোচনা করার অনুরোধ রইল।
আরও পড়ুন : Samik Bhattacharya | দল ও সরকার পৃথক: শমীক ভট্টাচার্যের তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা
১) সুবিধাভোগী ও তোষামোদকারী বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে শিল্পপতি অবশ্যই দলের দূরত্ব বজায় রাখুন এবং কোনভাবেই কোন কিছুতেই অন্তর্ভুক্তি করা নয়।
২) পুলিশ প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিন। মিথ্যা মামলায় বিরোধী কাউকে না ফাসিয়ে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। শুধুমাত্র বুলডোজার চালিয়েই অবৈধ কে বৈধ করা যায় না। তাই কোন অবস্থাতেই এইসব অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রেয়াত করা নয়।তাতে করে মানুষের আস্থা ও ভরসা বাড়বে যা আপনারা বলে এসেছেন।
৩) মানুষের সমালোচনা যথাযথ মর্যাদার সাথে ধৈর্য ধরে গ্রহণ করুন। অকারণে সমালোচনাকে ক্ষতিকর প্রতিপক্ষ কখনোই ভাববেন না। যে কোনও সমালোচনা বা আন্দোলন বলপূর্বক দলের কার্যকর্তা বা পুলিশ প্রশাসন দিয়ে দাবিয়ে দিতে যাবেন না।
৪) স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে রাজনীতি মুক্ত করে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে আবার গৌরবের জায়গায় ফিরিয়ে দিন। বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার শিক্ষার উপর বেশি বেশি মনোনিবেশ করবার পরিবেশ অবশ্যই সৃষ্টি করা যাতে করে আগামী দিনে ছাত্র-ছাত্রীরা আরো বেশি বেশি সাফল্য লাভ করতে পারে এবং মেধার বিকাশ ঘটে।
৫) যত দ্রুত সম্ভব স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা। যাতে করে শিক্ষিত সমাজের স্বপ্নগুলো সাকার করতে পারে।
৬) সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা কোন অবস্থাতেই ভাতা বা আর্থিক সহায়তা বিলিয়ে দেবেন না।সরকারি প্রকল্পের সুবিধা শুধুমাত্র দলের কার্যকর্তা দের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে তা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করন অবশ্যই দরকার। প্রয়োজনে সমীক্ষা করে প্রকৃত প্রাপক দের হাতে তুলে দিন।
৭) কোনওরূপ কোনও রঙের রাজনীতি করবেন না। গেরুয়া রং করার নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির পথকে অবলম্বন করবেন না।
৮) শিল্প যেখানে ভবিষ্যৎ, শিল্প হলে অর্থনীতিও উন্নত হবে। নতুন কর্মস্থানের সুযোগ যেমন বাড়বে তেমন বেকারত্ব দূর হবে। পাশাপাশি আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের নতুন রোজগারের পথ যেমন প্রশস্ত হবে তেমনি আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে।
৯) সাইফুদ্দিন চৌধুরী একদিন দলের মধ্যে গণতন্ত্রের কথা বলেছিলেন আশা করি মনে আছে আপনাদের। অতএব দলের অভ্যন্তরে কথা বলার অবশ্যই সুযোগ রাখবেন এবং ধৈর্য ধরে সঠিক বিচার করবেন।
৯) সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে দলের কার্যকর্তাদের অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ অবশ্যই মার্জিত হতে হবে।
১০) ৮০ দশক থেকে যেসব কার্যকর্তা এই দলটির হয়ে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও লড়াই করে গেছেন এবং পরবর্তীকালে অসৎ উপায় অবলম্বন না করে বা কোনও অমানুষিক চাপ বা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ায় দলত্যাগ যদি করে থাকেন বা পুনরায় দলে অন্তর্ভুক্ত হলে অবশ্যই আত্মপক্ষ সমালোচনার মাধ্যমে দলের কার্য ভার বন্টন নিশ্চিত করন অবশ্যই দরকার। মনে রাখা অবশ্যই দরকার বাংলা প্রবাদ ‘এক হাতে তালি বাজে না’।
১১) শুধুমাত্র অভিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ ব্যতীত সৎ এবং দক্ষ সংগঠক তিনি যে দলেরই হোক না কেন নিজ দলের অন্তর্ভুক্তি করানো অবশ্যই সম্পূর্ণ নিশ্চিত করনের পরেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। ১২) তৃণমূল রাজ্য সরকারের দুর্নীতিমূলক সমস্ত কার্যকলাপকে বিশেষ পদ্ধতি (সরকারী) দ্বারা সংশোধন করা হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
ক) রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি, যেমন জায়গা জমি রেজিস্ট্রি। তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ বরাদ্ধ তা বামফ্রন্ট সরকারের সময় কালে ন্যুনতম ছিল। ফলে যদি জমি রেজিস্ট্রির আর্থিক বোঝা কমিয়ে দিলে (প্রতি কাঠা প্রতি) রাজ্যবাসী উপকৃত হবেন।
খ) স্বাস্থ্যদপ্তরে যে সমস্ত কন্ট্যাক্ট বেসড কোম্পানি কাজ করছে তাঁদের খতিয়ে দেখা ও নবীকরণ করা।
গ) গ্রামীণ রাস্তাঘাট আরও বেশি উজ্জ্বল করা।
ঘ) বাসস্থানের ক্ষেত্রে যে দুর্নীতি তা নির্মুল করা। ঘর ঘর জল। প্রতিটি রাস্তায় পানীয়জলের ব্যবস্থা।
ঙ) রাজ্য বিদ্যুৎ বিল সাধারণ মানুষের আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে আসা। প্রভৃতি বিষয়গুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ ভিত্তিক গড়ে তুললে রাজ্যবাসী বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থাভাজন হবে। এবং ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় না দিয়ে মানবিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলা– এটাই প্রধান কাজ। এই কাজগুলি বাস্তবায়ন করলে রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী হবে বর্তমান সরকার।
২০১৮ সাল থেকে যেভাবে পূর্ববর্তী শাসক ক্ষমতার আস্ফালন ও রক্তচক্ষু সঙ্গে এ যাবত কিছুদিন ধরে যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে ১ মিনিটে সব শেষ করে দেবে বলে ধরনা মঞ্চ থেকে হুংকার দিয়েছিলেন তাতে করে মাননীয়া ভুলে গিছিলেন যে, ইতিহাস কখনো কাউকে ক্ষমা করে না। ফলস্বরপ অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দম্ভ কিভাবে একটা দলকে একেবারে ২ অংকে অর্থাৎ মাত্র ৮০টি তে নামিয়ে দেয় তা চোখে আঙুল দিয়ে সাধারণ মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে এই নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট হল বিজেপি ২৯২২৪৮০৪ আর তৃণমূল কংগ্রেস ২৬০১৩৩৭৭। প্রাপ্ত মোট ভোটের সংখ্যা থেকেই অনুমান করা যায়, নির্বাচন কমিশন, SIR, পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী প্রতিবার জনতার রায়কে প্রভাবিত করতে পারবেন না এটা নিশ্চিত কারণ এই ভোট শুধুমাত্র পরিবর্তনের ভোট নয় অনেক অনেক জমে থাকা প্রতিবাদের ভোট।
বিরোধী আন্দোলনের প্রতীক মাননীয়া প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, তৃণমূল স্তরে শক্তিশালী সংগঠন, মহিলা ভোট, ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট থাকা সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেসকে যেভাবে বজ্রাঘাতে মানুষ আঘাত করে বুঝিয়ে দিয়েছে তাতে করে আপনাদের স্মরণ রাখা উচিত শুধুমাত্র অবশিষ্ট ৭০ শতাংশের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ সমর্থন ছাড়া আপনাদের কিছু ছিল না। ইতিহাস সাক্ষী ১৯৭৭ সালে যেভাবে ক্ষমতা পরিবর্তন হয়েছিল আবার ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্টের মত শক্তিশালী এবং বিজ্ঞানসম্মত সংগঠন থাকা সত্ত্বেও পরাজয় শিকার হতে হয়েছিল ঠিক তেমনি ২০২৬ সালেও তারই প্রতিফলন। দায়িত্ব নিয়ে বলা যেতেই পারে অত্যাধিক বর্তমান কার্যকর্তাদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে, পুরানো বা নতুন সৎ ও দক্ষ সংগঠক কে সরিয়ে না রেখে এবং পুলিশ প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল না থেকে আপনাদের সংখ্যাগুরুর সাথে সংখ্যালঘুরও সরকার হিসেবে রাষ্ট্রবাদী সত্তাকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে তবে ইতিহাস আপনাদের কে চিরকাল মনে রাখবে আর হ্যাঁ,গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী থাকা খুব প্রয়োজন।
পরিশেষে একটা কথা উল্লেখ করা অবশ্যই দরকার, বাঁধের গায়ে একটি ছোট্ট ছিদ্র কে অবজ্ঞা করলে সম্পূর্ণ বাঁধ যেমন ধ্বংস হতে পারে ঠিক তেমনি প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক দিশা এবং পদক্ষেপ করতে না পারলে আগামী পাঁচ বছর পর বিরোধী আসন লাভ হতে পারে।
বিনীত,
—অগ্নি প্রতাপ
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Vande Mataram mandatory in schools, Suvendu Adhikari decision | স্কুলে বাধ্যতামূলক ‘বন্দে মাতরম’: সোমবার থেকেই নতুন নিয়ম, শুভেন্দু অধিকারী -এর ঘোষণায় জোর চর্চা রাজ্যে



