সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনশৃঙ্খলা জোরদার করতে বড় সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুটি পৃথক তদন্ত কমিশন গঠন করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। সোমবার মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং পরে সাংবাদিক বৈঠকে তা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারের এই পদক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই দেখা হচ্ছে, কারণ ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হল দ্রুত সময়ের মধ্যেই। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ১ জুন থেকে এই দুই কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু (Biswajit Basu) -এর হাতে। এই কমিশনের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন সিনিয়র আইপিএস কে জয়রামন (K Jayaraman), বর্তমানে তিনি এডিজি (উত্তরবঙ্গ) পদে কর্মরত। অন্যদিকে, নারী ও শিশুকন্যাদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠিত কমিশনের নেতৃত্বে থাকছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায় (Samapti Chattopadhyay)। তাঁর সঙ্গে সদস্যসচিব হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন আইপিএস দময়ন্তী সেন (Damayanti Sen), বর্তমানে এডিজি (আর্মড ফোর্স) পদে রয়েছেন।
মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পরেই মুখ্যমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে দ্বিতীয় বৈঠকে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। সেই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হল। নির্বাচন পর্বে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং নারী নিরাপত্তা, এই দুই ইস্যুতে পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শাসক দল বিজেপি (Bharatiya Janata Party)। সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে। কাটমানি নেওয়া হয়েছে, ঘুষের লেনদেন হয়েছে, সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকারি আধিকারিক থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত প্রতিনিধি, কাউন্সিলর এবং মধ্যস্থতাকারীরাও জড়িত ছিলেন।’ তিনি জানান, এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই বিচারপতি বসুর নেতৃত্বে কমিশন গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনিক সহায়তার বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই কমিশনের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, নথিপত্র এবং জনবল দেওয়া হবে। মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিব বিষয়টি তদারকি করবেন।’ তিনি আরও জানান, কমিশন কাজ শুরু করার ৩০ দিনের মধ্যে প্রাথমিক সুপারিশ জমা দেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে পুলিশ এফআইআর দায়ের করবে এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (Bharatiya Nyaya Sanhita) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত কমিশন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই কমিশন চালু হলে একটি নির্দিষ্ট পোর্টালের মাধ্যমে অভিযোগ জানানো যাবে। পুরনো অভিযোগ এবং অমীমাংসিত এফআইআরগুলিও সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হবে।’ পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC), তফসিলি জাতি ও উপজাতি কমিশন, ওবিসি কমিশন এবং অন্যান্য সংস্থার পূর্ববর্তী সুপারিশগুলিও বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এই কমিশনগুলির কাজের ধরনও আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তদন্তের জন্য সাধারণ মানুষকে কলকাতায় আসতে হবে না। সদস্যসচিবেরা জেলা স্তরে গিয়ে থানায় থানায় তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং সরাসরি মানুষের বয়ান নেবেন। এতে অভিযোগ জানানো আরও সহজ হবে বলেই প্রশাসনের ধারণা। নারী নিরাপত্তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘মহিলা ও শিশুকন্যাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। সেই লক্ষ্যেই এই কমিশন গঠন করা হয়েছে।’ তিনি জানান, পুরনো অভিযোগগুলিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে এবং দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।
রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনিক স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, দুর্নীতির অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিতও মিলেছে সরকারের পক্ষ থেকে। সরকারের এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে পারে। দুর্নীতি ও নারী নির্যাতনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরাসরি তদন্ত শুরু হওয়ায় আগামী দিনে আরও নতুন তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন নজর থাকবে, কমিশনগুলি কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Park Circus Violence, Suvendu Adhikari | পার্ক সার্কাসে অশান্তির পর কড়া বার্তা শুভেন্দুর, ‘পাথর ছোড়া বন্ধ হবেই’, ৪০ গ্রেফতার




