সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথি হিন্দু ধর্মাচরণের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বিশেষ তিথিতেই দেবী কালী (Goddess Kali) পূজিত হন ফলহারিণী রূপে, যিনি ভক্তদের জীবনের অশুভ কর্মফল হরণ করেন বলে বিশ্বাস। চলতি বছর ১৬ মে, শনিবার পালিত হচ্ছে ফলহারিণী অমাবস্যা (Phalaharini Amavasya)। ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে সঠিক নিয়মে দেবীর আরাধনা করলে জীবনের নানা বাধা দূর হয় এবং শুভ ফল লাভের পথ সুগম হয়। তবে পুজোর বিধি না মানলে প্রত্যাশিত ফল মেলে না বলেই মত ধর্মীয় মহলের।
‘ফলহারিণী’ শব্দের অর্থই হল ‘ফল হরণকারী’। অর্থাৎ, মানুষের জীবনে সঞ্চিত পাপ বা অশুভ কর্মের ফলকে নাশ করেন যিনি, তিনি দেবী ফলহারিণী। এই তিথির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ধর্মীয় ঘটনা। কথিত আছে, এই দিনেই শ্রীরামকৃষ্ণ (Sri Ramakrishna) তাঁর সহধর্মিণী মা সারদা দেবীকে (Sarada Devi) দশমহাবিদ্যার অন্তর্গত ষোড়শী রূপে পূজা করেছিলেন। সেই থেকে এই অমাবস্যা বিশেষ মাহাত্ম্য লাভ করে। ধর্মীয় আচার অনুসারে, ফলহারিণী অমাবস্যার পুজোয় ফলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এই দিনে দেবীকে ফুলের মালার পরিবর্তে ফলের মালা দিয়ে সাজানো হয়। বিভিন্ন মরসুমি ফল দিয়ে দেবীর পূজা করা আবশ্যিক বলে মনে করা হয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, ‘এই তিথিতে নিজের সবচেয়ে প্রিয় ফলটি দেবীর চরণে নিবেদন করলে মনোবাসনা পূরণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।’ তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বিশেষ নিয়ম। পুজোর পর সেই ফলটি ঘরে এনে এক বছর পর্যন্ত অক্ষত রাখতে হয় এবং তা খাওয়া যায় না। যদি সেই সময়ের মধ্যে ইচ্ছা পূরণ হয়, তবে ফলটি নদীর জলে বিসর্জন দেওয়া হয়।
আচার অনুসারে, যদি কেউ মনোস্কামনা পূরণের আগেই সেই ফল ভক্ষণ করেন, তবে পূজার ফল নষ্ট হয়ে যায় বলে মনে করা হয়। ফলে ভক্তদের মধ্যে এই নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই এই তিথিকে আত্মশুদ্ধির দিন হিসেবেও দেখেন। ফলহারিণী অমাবস্যায় স্নান ও ব্রত পালনও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গায় স্নান করলে তা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। তবে গঙ্গা না থাকলে কাছাকাছি কোনও পুকুর বা জলাশয়ে স্নান করলেও পুণ্য লাভ হয় বলে ধর্মীয় বিশ্বাস। স্নানের পর অনেক ভক্তই মৌনব্রত পালন করেন। এই ব্রতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখতে হয়। ধর্মীয় মতে, ‘মৌনব্রত পালনের মাধ্যমে মানসিক সংযম বৃদ্ধি পায় এবং দেবীর কৃপা লাভ সহজ হয়।’
পুজো শেষে দান-ধ্যান করার প্রচলনও রয়েছে এই দিনে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের মধ্যে খাদ্য বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করলে দেবী সন্তুষ্ট হন বলে বিশ্বাস করা হয়। বিশেষ করে শিশুদের লেখাপড়ার উপকরণ দান করলে শুভ ফল পাওয়া যায় বলে মনে করা হয়। সমাজের দুর্বল অংশের পাশে দাঁড়ানোর এই দিকটি ধর্মীয় আচারকে আরও মানবিক করে তোলে। এই তিথিতে শুধু দেবী কালী নন, ভোলেনাথ শিব (Lord Shiva) -এর পূজাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। শিবের পঞ্চামৃত দিয়ে অভিষেক করলে সংসারের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হয় বলে বিশ্বাস। অনেক ভক্ত একই সঙ্গে কালী ও শিবের পূজা করে থাকেন।
অন্যদিকে, জ্যোতিষশাস্ত্রের দিক থেকেও এই দিনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলহারিণী অমাবস্যায় অশ্বত্থ গাছের পূজা করলে বিভিন্ন গ্রহদোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে প্রচলিত ধারণা। বিশেষ করে জন্মকুণ্ডলীতে চন্দ্র বা মঙ্গলের অশুভ প্রভাব থাকলে কালো তিল, দুধ এবং গঙ্গাজল দিয়ে অশ্বত্থ গাছের পূজা করলে উপকার পাওয়া যায় বলে মনে করা হয়। ‘এই আচারগুলি পালন করলে জীবনের নানা বাধা দূর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে’ এমন বিশ্বাস বহু মানুষের মধ্যে প্রচলিত। উল্লেখ্য, ফলহারিণী অমাবস্যা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি ভক্তদের আত্মসংযম, দানশীলতা এবং বিশ্বাসের এক প্রতিফলন। নিয়ম মেনে, নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুজো পালন করলে জীবনের নেতিবাচক প্রভাব কমে আসে বলে বহু মানুষের ধারণা। তবে এই তিথির প্রতিটি নিয়ম ও আচার যথাযথভাবে পালন করাই মূল চাবিকাঠি বলে মনে করা হয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : toe astrology | পায়ের তর্জনি যদি বুড়ো আঙুলের চেয়েও দীর্ঘ হয়, শাস্ত্র কী বলছে আপনার ভাগ্য আর চরিত্র নিয়ে?




