Sasraya News Sunday’s Literature Special | 10th May 2026, Sunday, Issue 109| সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল, ৯ মে ২০২৬, রবিবার, সংখ্যা ১০৯

SHARE:

সম্পাদকীয়

রিবর্তন। এই শব্দটির ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে জীবনের অনিবার্য স্রোত। মানুষ যতই স্থিরতা কামনা করুক। জীবন ততই তাকে ঠেলে দেয় রূপান্তরের দিকে। কখনও তা রাজনীতির মঞ্চে। কখনও সমাজের ভিতরে। আবার কখনও মানুষের অন্তর্জগতে। এই পরিবর্তনকে আমরা অনেক সময় ভয় পাই এটা স্বাভাবিক বিষয় । কারণ তা আমাদের কাছে অচেনা। কিন্তু সত্য এটাই যে এই অচেনার মধ্যেই আমাদের ভবিষ্যৎ জন্ম নেয়।ল আজকের পৃথিবী এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে পরিচিত দৃশ্যপট থেকে মানবিকতা। যে শহর একদিন ছিল নীরব। সেই শহরেই এখন কোলাহল। যে চিন্তা একদিন ছিল প্রান্তিক অথচ সেই চিন্তা আজ মূলধারার আলোচনার কেন্দ্র। এই বদল কেবল বাহ্যিক কি? প্রশ্ন। আসলে এই চিন্তা মানুষের মানসিকতার গভীরে গিয়েও আঘাত করে। আমরা আমাদের বিশ্বাস মূল্যবোধ মানবিক সম্পর্ক সবকিছুকে নতুন করে বিচার করতে বাধ্য হই। কারণ আমরা এখন সময়ের স্রোতে ভাসছি। এই স্রোত কোথায় গিয়ে যে শেষ হবে কেউ জানে না আর জানার চেষ্টা করাও আমাদের বৃথা। আমাদের দৈনন্দিন মুহূর্ত মুহূর্ত পরিবর্তন ঘটছে। আমরা কিচ্ছু বুঝতে পারিনা। আর বুঝে ওঠার কারণও নেই কারণ এটা প্রকৃতির নিয়মেই ঘটে যাবে। আর আর সামাজিক স্তরের পরিবর্তন এটা মানসিক পরিবর্তন ঘটে যায়। যেমন মানুষ হাওয়া বদল করতে থাকে ঠিক তেমনই সামাজিক স্তর বদল করে। আসলে সবটাই সময় তার নিয়ম এর মধ্যেই প্রবাহিত। ফলে পরিবর্তন হওয়ার ছিল এবং তা সংঘবদ্ধ। এখানে কোন শক্তি নয় সামাজিক স্তরের ভালো থাকার জন্য পরিবর্তন ঘটানো হয়ে থাকে।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন যেন এক অবিরাম নাট্যমঞ্চ। ক্ষমতার পালাবদল। নতুন মুখের উত্থান। পুরনো আদর্শের পুনর্বিবেচনা। সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক জটিল ক্যানভাস। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো এই পরিবর্তন কি কেবল মুখ বদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নাকি তা মানুষের জীবনে প্রকৃত উন্নতির পথ তৈরি করছে? এ সব মানুষ নিজেদের ভালো থাকার জন্য নতুন মুখ অর্থাৎ মানুষের খোঁজ করে থাকে। পরিবর্তনের আসল মূল্যায়ন সেখানেই। যেখানে তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্পর্শ করে তাদের স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করানোর এক প্রয়াস চালিয়ে যায়। তবে পরিবর্তনের আরেকটি স্তর আছে। যা অনেক বেশি সূক্ষ্ম। অনেক বেশি গভীর। তা হলো মানুষের অন্তরের পরিবর্তন। আমরা বাইরে যতই বদলাই। ভেতরে যদি একই সংকীর্ণতা, একই ভয়, একই দ্বিধা- দ্বন্ধ বহন করি। ফলে সেই পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সত্যিকারের রূপান্তর ঘটে তখনই যখন মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে শেখে। নিজের ভেতরের অন্ধকারকে স্বীকার করে আলো খুঁজে পায়। প্রেম কে তৃপ্তির স্তরে নিয়ে যায়। ভালোবাসা পরিণয়ে রূপান্তরিত হয়। এ সব আসলে পরিবর্তন এর মাঝে এক বিষন্নতার মন নড়েচড়ে ওঠে। ভালোবাসা কঠিন। প্রেম আরও কঠিন। তবে যে বিষয়ে আমরা পরিবর্তন উল্লেখ করছি এটাই সার্বিক। কিন্তু সামাজিক পরিবর্তন একটি সময়ের ঢেউ। যেখানে উথাল পাথাল হয়। আর মজার বিষয় এই ঢেউয়ে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলেই জয় নিশ্চিত।

সমাজের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধ্যানধারণা সংস্কার এমনকি কুসংস্কারও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ে। নতুন প্রজন্ম সেই প্রশ্ন তোলে। কখনও নিজেরাই প্রতিবাদ করে। কখনও নতুন পথ দেখায়। এই সংঘাতই আসলে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পরিবর্তন এখানে কোনও বিপদ নয়। এখানে পরিবর্তন আমাদের একটি প্রয়োজন, একটি স্বাভাবিক বিবর্তন মাত্র। এটাই জীবনের একটি দৃষ্টতা। কিন্তু আমাদের পরিবর্তনের সঙ্গে আসে দায়িত্বও। অন্ধভাবে পরিবর্তনের পেছনে ছুটলে আমরা আমাদের শিকড় হারাতে পারি। আবার পরিবর্তনকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে আমরা পিছিয়ে পড়তে পড়ি। তাই প্রয়োজন একটি সুষম দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া স্বাভাবিক দর্শন। যেখানে আমরা নতুনকে গ্রহণ করি। আবার কিন্তু পুরনোর মূল্যও বুঝে রাখি। এই ভারসাম্যই আমাদের আগামীর পথ দেখাতে পারে। শেষ পর্যন্ত উল্লেখ করতে পারি বে পরিবর্তন এক ধরনের যাত্রা। যার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। এ চলতে থাকে। সময়ের সঙ্গে। মানুষের সঙ্গে। আমরা চাই বা না চাই। এই যাত্রার অংশ আমরা সকলেই। তাই হয়তো সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে তাকে বোঝা। তাকে গ্রহণ করা। এবং তার মধ্যেই নিজের অবস্থান খুঁজে নেওয়া। কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে সহজ ভাবে বলতে পারি পরিবর্তনই একমাত্র সত্য। এই পরিবর্তন যা কখনও কোনদিনও থামে না। চিরন্তন হয়ে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। ক্ষোভ হোক বা রাগ। অভিমান হোক বা অভিসার । ভালোবাসা হোক বা প্রেম। সব কিছুর ক্ষেত্রেই পরিবর্তন চিরন্তন হয়ে ওঠে। সকলে ভালো ও সুস্থতা কামনা করুন। আমরা কামনা করে থাকি এটাই আগামীর প্রেম হয়ে উঠুক মহা পরিবর্তন।

 

 

মহামিনের কথা

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
সীতারাম! তোমার কিছু ভাবতে হবে না,শুধু রাম রাম করে যাও, কোথা দিয়ে কি হয়ে যাবে টেরও পাবে না। উদ্বিগ্ন হয়ো না,কেবল রাম রাম কর,জয়গুরু,সোহহং শোন আরও কত কি মা গান গাচ্ছেন শোন, রাম রাম কর।।

সীতারাম! দিনের পর রাত আসে,দিনকে কোন চেষ্টা,কোন সাধনা করতে হয় না; আপনা আপনি রাত এসে তাকে বিশ্রাম দেয়। তেমনি যা প্রয়োজন কোথা দিয়ে কেমন করে আসবে তা জানতেও পারবে না,কেবল রাম রাম কর।।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

সীতারাম! শীতের পর বসন্ত ঋতু আসে, গাছের পাতা ঝরে যায়,আবার আপনা আপনি পাতা গজায়। পাতা ঝরা বা গজাবার জন্য গাছদের কোন চেষ্টা করতে হয় না—মা আমার আপনি সব করে দেন,তোমার সেই মা আছেন। তুমি রাম রাম কর,কি করে কি হবে বুঝতেও পারবে না।।

সীতারাম! রামনাম রসায়ন। মন প্রাণ দেহ সকলকে সুস্থ রাখতে এমন রসায়ন আর হয় নাই, এ মূল্য দিয়ে কিনতে হয় না, এর অনুপান কিছু নাই, দেশকালের কোন নিয়ম নাই, তুমি পান কর, যত পার পান কর,একবারে রোগ সেরে যাবে। কেবল রাম রাম কর।।

সীতারাম! রোগ তো বহুদর্শন! এক ঠাকুরটি বহু সেজে খেলা করছেন,সব সেজে তিনিই আছেন এই সত্যকে ধরতে পারলেই ছুটি হয়ে গেল, কেবল রাম রাম কর।।

সীতারাম ! মাটির হাঁড়ি,কলসী,সরা মাটি ছাড়া কিছু নয়। সোনার হার, মাকড়ী, অনন্ত, বালা সোনা ভিন্ন অন্য কিছু নয়, তেমনি জগতে যা কিছু দেখছো সেই একজন। সেই মা, সেই বাবা, তুমি রাম রাম কর।।

🍁শ্রীউজ্জীবন | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

🍂ফিরেপড়া 

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর একটি কবিতা

১৪০০ সাল 

আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহলভরে—
আজি হতে শতবর্ষ পরে।
আজি নববসন্তের প্রভাতের আনন্দের
লেশমাত্র ভাগ–
আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান,
আজিকার কোনো রক্তরাগ
অনুরাগে সিক্ত করি পারিব কি পাঠাইতে
তোমাদের করে
আজি হতে শতবর্ষ পরে?।

তবু তুমি একবার খুলিয়া দক্ষিণদ্বার
বসি বাতায়নে
সুদূর দিগন্তে চাহি কল্পনায় অবগাহি
ভেবে দেখো মনে—
একদিন শতবর্ষ আগে
চঞ্চল পুলকরাশি কোন্‌ স্বর্গ হতে ভাসি
নিখিলের মর্মে আসি লাগে—
নবীন ফাল্গুনদিন সকল বন্ধনহীন
উন্মত্ত অধীর—
উড়ায়ে চঞ্চল পাখা পুষ্পরেণুগন্ধমাখা
দক্ষিণসমীর–
সহসা আসিয়া ত্বরা রাঙায়ে দিয়েছে ধরা
যৌবনের রাগে
তোমাদের শতবর্ষ আগে।
সেদিন উতলা প্রাণে, হৃদয় মগন গানে,
কবি এক জাগে—
কত কথা পুষ্পপ্রায় বিকশি তুলিতে চায়
কত অনুরাগে
একদিন শতবর্ষ আগে।
আজি হতে শতবর্ষ পরে
এখন করিছে গান সে কোন্‌ নূতন কবি
তোমাদের ঘরে?
আজিকার বসন্তের আনন্দ-অভিবাদন
পাঠায়ে দিলাম তাঁর করে।
আমার বসন্তগান তোমার বসন্তদিনে
ধ্বনিত হউক ক্ষণতরে
হৃদয়স্পন্দনে তব ভ্রমরগুঞ্জনে নব
পল্লবমর্মরে
আজি হতে শতবর্ষ পরে।

 

 

শঙ্খ ঘোষ -এর একটি কবিতা

 

একদিন আমরাও

একদিন-আমরাও এসে বসব
এইসব পার্কে
একদিন আমরাও বলব, বয়স কত হলো? দিনকাল কেমন?

পিছনে পড়ে থাকবে কম্পাস
কিংবা কবুতরের ডানা
একদিন আমরাও বলব, ভুল বাপু, ভুল

হাতের তালুতে তুলে নেব আমলকী একদিন আমরাও
আর এ ওকে বলব হাওয়ায় হাওয়ায়:
দেখো, এই হলো আমাদের পৃথিবী।

 

হেলাল হাফিজ -এর একটি কবিতা

অমিমাংসিত সন্ধি 

তোমাকে শুধু তোমাকে চাই, পাবো?
পাই বা না পাই এক জীবনে তোমার কাছেই যাবো।

ইচ্ছে হলে দেখতে দিও, দেখো
হাত বাড়িয়ে হাত চেয়েছি রাখতে দিও, রেখো

অপূর্ণতায় নষ্টে-কষ্টে গেলো এতোটা কাল, আজকে যদি মাতাল জোয়ার এলো এসো দু’জন প্লাবিত হই প্রেমে নিরাভরণ সখ্য হবে যুগল-স্নানে নেমে।

থাকবো ব্যাকুল শর্তবিহীন নত
পরস্পরের বুকের কাছে মুগ্ধ অভিভূত।
 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১ 
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

 

শব্দদের রাত্রি হয় 

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় 

২৭

নীরবতার আবর্তে

 

সেদিন রান্নাঘরের ভিতর যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তার শব্দ অনীক অনেক রাত পর্যন্ত শুনেছিল। নীরবতারও যে পরিধি আছে, ঘনত্ব আছে, এমনকি একটি দৃষ্টি আছে— তা সে আগে জানত না। মনে হচ্ছিল, কথোপকথন শেষ হয়ে গেলেও তার প্রতিধ্বনি ঘরের দেওয়ালে, জানালার কাঁচে, টেবিলের উপর রাখা চায়ের কাপে, এমনকি রান্নাঘরের অর্ধেক কাটা লাউয়ের সাদাটে শরীরেও লেগে আছে। সে যা বলেছে, তা আর নিছক একটি খবর নয়। তা যেন অদৃশ্য কোনো সুতোয় বাঁধা হয়ে মায়ের বহুদিনের নীরব জীবনের এক গোপন ঘরে গিয়ে ঠেকেছে।
“তিতাস” নামটা উচ্চারণের পর সোমদত্তার মুখে যে সামান্য পরিবর্তন এসেছিল, তা অনীক ভুলতে পারছিল না। তা তীব্র কিছু নয়, কোনো নাটকীয় বিস্ময়ও নয়; বরং অত্যন্ত ক্ষীণ, সংযত, কিন্তু গভীর। যেন একজন বহুদিন পর নিজের পুরনো আয়নায় হঠাৎ নিজের যৌবনের মুখ দেখে ফেলেছেন, চমকে ওঠেননি, কিন্তু অস্বীকারও করতে পারেননি।

চিঠিটা সামনে আসার পর থেকে অনীক বুঝেছিল, বিষয়টি তার ধারণার চেয়ে অনেক জটিল। সে ভেবেছিল, মাকে তিতাসের কথা বলবে, মা হয়ত একটু মৃদু হেসে প্রশ্ন করবেন, “ভালোবাসা নাকি ভালো লাগা?” তারপর হয়ত ধীরে ধীরে কথাবার্তা এগোবে। কিন্তু সেখানে এসে দাঁড়াল এক পুরনো চিঠি, এক পুরনো নাম, এক অমীমাংসিত অতীত, আর এক অদ্ভুত সম্ভাবনা, তার তিতাস কি কেবল বর্তমানের একজন মেয়ে, নাকি মায়ের জীবনের বহু বছর আগের কোনো অসমাপ্ত আবেগের প্রতিধ্বনি বহন করে আসা এক দ্বিতীয় উপস্থিতি?
সেই রাতেই খাবার টেবিলে বসে তারা দু’জনেই প্রায় স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছিল। স্বাভাবিকতা কখনও কখনও মানুষ ইচ্ছা করে পরিধান করে, যেন তা তাকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করবে। সোমদত্তা ডাল বাড়ছিলেন, ভাতের পাশে আলুভাজা দিলেন, বললেন —“আর নে।” অনীক বলল,
—“হবে।” এই ছোট ছোট বাক্যগুলি যেন প্রাত্যহিকতার দড়ি ধরে তাদের দাঁড় করিয়ে রাখছিল। কিন্তু দু’জনেই জানত, স্বাভাবিক কথার নিচে আজ অন্য এক নদী বয়ে যাচ্ছে।

সোমদত্তা একটু হাসলেন। “যারা অতীতকে সযত্নে ভাঁজ করে রাখে, তারা ভয় পায় না, কিন্তু জানে, ভাঁজ খুললে কাগজে পুরনো দাগ দেখা যায়।”
এমন সময় টেবিলের উপর রাখা ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল। এত রাতে ল্যান্ডফোনে ফোন আসে না প্রায় কখনোই। দুজনেই চমকে তাকাল।
সোমদত্তা এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুললেন। “হ্যালো?”
ওপাশে কী বলা হল, অনীক শুনতে পেল না। কিন্তু দেখল, মায়ের মুখের রং বদলে গেল। তার আঙুল রিসিভারের উপর শক্ত হয়ে উঠল। চোখের মণি সামান্য বড় হল।

খাওয়া শেষে অনীক বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। দূরে রাস্তায় আলো, পাশের বাড়ির টিভির মৃদু শব্দ, কোথাও কুকুর ডাকছে। আকাশে মেঘ নেই, তবু রাতটি ভারী। সে ভাবছিল, এখন কী হবে? মা কি আরও কিছু বলবেন? সেই পুরনো তিতাসের কথা? চিঠিটা কীভাবে এসেছে? আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি তার তিতাসকে কীভাবে চিনলেন? নামের মিলেই? নাকি আর কিছু?
ভেতর থেকে মায়ের ডাক এল না। এটাও অস্বাভাবিক। সাধারণত সে বাড়ি ফিরলে রাতে চা বানিয়ে ডাকেন, দু-একটা হালকা কথা বলেন, কলেজের গল্প শোনেন। আজ কিছুই না। নীরবতা। যেন সোমদত্তা নিজের ভিতরে নেমে গিয়েছেন।
রাত গভীর হলে অনীক নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ল, কিন্তু ঘুম এল না। দেয়ালে লেগে থাকা ছায়াগুলো বদলাচ্ছিল, জানলার পর্দা হালকা দুলছিল, আর তার মনে হচ্ছিল, একটি নাম কতভাবে মানুষের জীবনকে জটিল করে তুলতে পারে! তিতাসকে সে কি পরদিন মেসেজ করবে? এই ঘটনার কথা বলবে? না, তা বলা যায় না। আবার না বললেও কি পারা যায়? কোনো সম্পর্কের গভীরতা যেমন শব্দে তৈরি হয়, তেমনি অনেক সময় গোপন রাখার ক্ষমতাতেও তা পরিমাপ করা যায়। সে বুঝতে পারছিল না কোনটা উচিত।

হঠাৎ তার মনে হল, মা কি কাঁদছেন?
ঘর থেকে বেরিয়ে খুব আস্তে করিডোরে এল। সোমদত্তার ঘরের দরজা পুরো বন্ধ নয়, আধখোলা। ভেতরে আলো জ্বলছে ক্ষীণভাবে। তিনি টেবিলের সামনে বসে আছেন, সামান্য ঝুঁকে। সামনে সেই চিঠি খোলা। কিন্তু এবার তিনি কাঁদছেন না। বরং স্থির, অস্বাভাবিকভাবে স্থির। এমনভাবে বসে আছেন যেন কোনো দীর্ঘ যাত্রার আগে মানুষ নিজের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলে নেয়।
অনীক সরে এল। সে বুঝল, এখন ভেতরে ঢোকা যায় না। কিছু নীরবতা প্রত্যক্ষ করা যায়, ভাঙা যায় না।
পরদিন সকালটা আশ্চর্যরকম সাধারণভাবে শুরু হলো। চায়ের কাপে বাষ্প উঠছে, কাগজ এসে গেছে, রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বদলে খবর। সোমদত্তা চশমা পরে কাগজে চোখ রেখেছেন। মুখে কোনো অতিরিক্ত ভাব নেই। কিন্তু অনীক দেখল, তার মা আজ অস্বাভাবিক পরিপাটি। শাড়ির আঁচল খুব গুছিয়ে তোলা, চুল বাঁধা কঠোরভাবে, যেন তিনি নিজের ভিতরের শিথিলতাকে বাহ্যিক শৃঙ্খলায় বেঁধে ফেলতে চাইছেন।
অনীক অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষমেশ বলল, “মা…”
সোমদত্তা কাগজ নামালেন।
“হুঁ?”
“কাল যা বললে… মানে… ওই চিঠি…”
তিনি তাকে থামালেন না। বরং তাকিয়ে রইলেন। সেই তাকানোয় বিরক্তি নেই, তাড়া নেই, আবার সহজ আমন্ত্রণও নেই। যেন তিনি জানতে চাইছেন, তুই কতদূর পর্যন্ত শুনতে প্রস্তুত?
অনীক বলল, “তোমার ওই তিতাস… সে কে ছিল?”
প্রশ্নটা শোনার পর সোমদত্তা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না। চায়ের কাপ থেকে এক চুমুক খেলেন। তারপর অত্যন্ত স্থির গলায় বললেন, “সব গল্পের পরিচয় থাকে না। কিছু মানুষ জীবনে আসে নাম হয়ে, কিছু থেকে যায় কেবল অসমাপ্ত বাক্য হয়ে।”
অনীক অস্থির হয়ে উঠল। “তা বুঝলাম। কিন্তু…”
“তুই কি জানতে চাইছিস, আমি তাকে স্নেহ করতাম কি না ভালোবাসত কি না ?” সোমদত্তা প্রশ্ন করলেন এমনভাবে, যেন দীর্ঘ এড়িয়ে চলার পর হঠাৎ সরাসরি কেন্দ্রে আঘাত করলেন।
অনীক চুপ।
সোমদত্তা হালকা হেসে বললেন, “ভালবাসা খুব বড় শব্দ। ছোট বয়সে মানুষ তার বদলে অনেক কিছু বোঝায়, আসক্তি, আকর্ষণ, কৃতজ্ঞতা, নির্ভরতা, মুগ্ধতা। কখনো কখনো সব মিলিয়েও।
“তুমি উত্তর দিলে না।”
“উত্তর সবসময় ঘটনার মধ্যে থাকে না, অনীক। অনেক সময় প্রশ্নটাই বেশি সত্যি।”
এই ধরণের কথা শুনে অনীক বিরক্ত হল না, কিন্তু আরও কৌতূহলী হয়ে উঠল। তার মা যে এভাবে বিষয়টিকে সরল হতে দেবেন না, তা সে জানত। কিন্তু আজ তার মনে হচ্ছিল, এর নিচে আরও কিছু আছে। তিনি ইচ্ছে করেই সরাসরি বলছেন না।
সোমদত্তা কাগজ গুটিয়ে রেখে বললেন, “তুই তিতাসকে কবে থেকে চিনিস?”
প্রশ্নের দিক ঘুরে গেল। অনীক বুঝল, এখন তাকে বলতে হবে। সে ধীরে ধীরে সব বলল। প্রাঙ্গণে গান, তিতাসের গান শোনার অনুরোধ, “ভিতরের কিছু খুলে যায়” কথাটি, তারপর কলেজে কাছাকাছি আসা, তারপর জানা, তিতাস তার মায়ের ছাত্রী ছিল।
সোমদত্তা খুব মন দিয়ে শুনলেন। কোথাও বাধা দিলেন না। শুধু যখন অনীক বলল, “ও বলেছিল তুমি ওকে লিখতে সাহস দিয়েছিলে” তখন তার চোখে খুব ক্ষণিকের জন্য জল চিকচিক করে উঠল। তিনি সামলে নিলেন।
“সে এখন কী লেখে?” সোমদত্তা জিজ্ঞেস করলেন।
প্রশ্নটা এত নির্দিষ্ট যে অনীক অবাক। “মানে?”
“ডায়েরি? কবিতা? গদ্য? লিখে কিছু?”
“জানি না ঠিক। তবে সাহিত্যচর্চার অনুষ্ঠানে যায়। কথা বলে অন্যরকম। বাকিরা যেমন বলে তেমন না।”
সোমদত্তা সামান্য মাথা নেড়ে বললেন, “বুঝেছি।”
“কী বুঝলে?”
“যে সে এখনও নিজের ভিতরটা নষ্ট হতে দেয়নি।”
অনীক চুপ করে রইল। এই প্রথম তার মনে হল, মা তিতাসকে নামের কারণে নয়, হয়ত মানসিক গড়নের কারণেও চিনতে চাইছেন।
সেদিন দুপুরের পর বাড়ির ভেতরে এক ধরনের অস্বাভাবিক প্রস্তুতি টের পাওয়া গেল। সোমদত্তা আলমারির উপর থেকে পুরনো একটি টিনের বাক্স নামালেন। বাক্সটি অনীক আগে দেখেছে, কিন্তু কখনও খোলেনি। তার ধারণা ছিল, এর মধ্যে হয়তো পুরনো সার্টিফিকেট, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কিছু ছবি থাকবে। কিন্তু আজ মা সেটি টেবিলে এনে চাবি দিয়ে খুললেন।

অনীক দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
ভেতরে হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ, কয়েকটি পোস্টকার্ড, কিছু শুকনো ফুলের চ্যাপ্টা দাগ, পুরনো স্কুল ম্যাগাজিন, আর নীল সুতোয় বাঁধা কিছু চিঠি। সোমদত্তা একে একে সব ছুঁয়ে দেখছিলেন। ছোঁয়ার ভঙ্গি এমন, যেন এগুলো বস্তু নয়, সময়ের ঘনীভূত অংশ।
“এসব কী?” অনীক জিজ্ঞেস করল।
“যা ফেলে দিতে পারিনি,” তিনি বললেন।
“সব কি তোমার ছাত্রছাত্রীদের?”
“সব নয়।”
উত্তর সংক্ষিপ্ত। তবু এর ভিতরে কত যে অসমাপ্ত স্মৃতির সরণি!
তিনি একটি স্কুল ম্যাগাজিন বের করলেন। মলাট ছিঁড়ে গেছে। অনীক দেখল, ভেতরে কোথাও পেন্সিলে দাগ দেওয়া। সোমদত্তা সেটি তার হাতে দিলেন। “এই লেখাটা পড়।”
অনীক পড়তে শুরু করল। লেখাটি এক কিশোরীর, শিরোনাম, “ভয়কে ভাষা দিলে কী হয়”। ভাষা কাঁচা, কিন্তু অনুভূতি তীক্ষ্ণ। লেখা শেষ হয়েছে এই বাক্যে, “যে মানুষ আমাদের ভিতর থেকে ভয় সরিয়ে নেয় না, তাকে আমরা হয়তো সারা জীবন ভালবাসি না; কিন্তু তার কাছে সারাজীবন ঋণী থাকি।”
নিচে নাম—তিতাস মিত্র।
অনীকের বুকের ভেতর হঠাৎ কেঁপে উঠল।
“এটা…” সে তাকাল।
“হ্যাঁ,” সোমদত্তা বললেন, “স্কুল ম্যাগাজিনে লিখেছিল।”
“মানে… এই তিতাস… আমার তিতাস?”
“তোর তিতাস যদি তিতাস মিত্র হয়, তবে সম্ভব।”
“সম্ভব মানে? নিশ্চিত নও?”
সোমদত্তা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “অনেক বছর হয়ে গেছে। সেই কবে ফাইভে ভর্তি হয়েছিল, এইট অবধি পড়ে চলে গেছিল অন্য স্কুলে, মানুষ বদলায়। নাম একই থাকলেই মানুষ একই থাকে না। তবু কিছু বাক্য, কিছু দৃষ্টি, কিছু প্রতিক্রিয়া… তারা হারায় না।”
অনীকের মনে হচ্ছিল, সে যেন ধীরে ধীরে একটি জটিল ঘরের ভিতর ঢুকছে, যেখানে প্রতিটি দরজা আরেকটি দরজার দিকে খুলছে। সে বলল, “তোমার কাছে তার চিঠি এল কীভাবে? এখন? এতদিন পরে?”
সোমদত্তা চুপ।
এই চুপ এবার দীর্ঘ। এত দীর্ঘ যে অনীক প্রায় ভেবেছিল মা উত্তর দেবেন না। তারপর তিনি ধীরে বললেন, “চিঠিটা নতুন নয়।”
“মানে?”
“পুরনো। খুব পুরনো। বহুদিন ধরে ছিল। কেবল কাল রাতে আবার পড়ছিলাম।”
“তাহলে তুমি আমাকে…?”
“ইচ্ছে করে দেখাইনি,” তিনি শান্ত গলায় বললেন। “তুই দেখে ফেলেছিস।”
অনীক বিভ্রান্ত। “তাহলে কাল যখন আমি তিতাসের নাম বললাম—”
“তখন পুরনো একটি চিঠি হঠাৎ বর্তমান হয়ে উঠল।”
কথাটা এত নিঃশব্দে বলা হলো যে, অনীকের কাঁধে যেন শীত নেমে এল।
সে ভাবল, মায়ের জীবন কি তবে এতদিন তার চোখের সামনে থেকেও অদেখা ছিল? একজন মানুষ মা হতে হতে কি তার নিজের বাকি পরিচয়গুলি এত গভীরে সরিয়ে রাখতে পারেন যে সন্তান তা টেরই পায় না?

সন্ধের দিকে সোমদত্তা হঠাৎ বললেন, “তিতাস কি তোকে কিছু বলেছে?”
“কী?”
“আমার কথা জেনে ওর আচরণ বদলেছে?”
প্রশ্নটি শোনার পর অনীক থমকে গেল। সে ভাবল। “হ্যাঁ… একটু। মানে, ও যেন হঠাৎ অন্যভাবে তাকাতে শুরু করল। যেন আমি শুধু আমি নই।”
সোমদত্তা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। “এটাই স্বাভাবিক।”
“কেন?”
“কারণ মানুষ কখনও একা আসে না। সে তার বংশ, শিক্ষা, স্মৃতি, সম্পর্ক, অজস্র অদৃশ্য ইতিহাস নিয়ে আসে। তুই ওর কাছে এখন শুধু অনীক নোস, তুই সোমদত্তারও ছেলে।”
অনীক প্রথমবার এই পরিচয়ের ভার অনুভব করল। এতদিন সে এটাকে আশ্রয় ভেবেছে; আজ মনে হলো, এটা কখনো কখনো দায়ও।
রাতে খাওয়ার পর সোমদত্তা তাকে ডাকলেন। “ছাদে আয়।”
ছাদে বাতাস ছিল নরম। দূরে আলোগুলো মিটমিট করছে। শীত পুরো নামেনি, কিন্তু হাওয়া ঠাণ্ডা। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
তারপর সোমদত্তা নিজেই বললেন, “তোকে একটা কথা বলি। শিক্ষকতা করতে করতে একটা ভুল মানুষ প্রায়ই করে ফেলে, সে ভাবে, সে কেবল পাঠ দিচ্ছে। আসলে সে অনেকের ভিতরে এমন কিছু রেখে যায়, যার দায় সে পরে আর নিতে পারে না।”
অনীক শুনছিল।
“ছাত্রছাত্রীরা যে বয়সে থাকে, তা খুব বিপজ্জনক বয়স,” সোমদত্তা বললেন। “তারা প্রথমবার নিজেদের চিনতে শুরু করে। যে মানুষ তাদের এই চিনতে সাহায্য করে, তার প্রতি আবেগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সেই আবেগ সবসময় প্রেম নয়। কিন্তু প্রেমের মতো তীব্র হতে পারে। ওই বয়সে দিশাও, দিশা মিত্র, তিতাসের মা … সবকিছুই প্রেম নয়, মোহকে প্রেম বলে ভুল হয় অনেক সময়”
“সে কি বুঝতে পেরেছিলে?”
সোমদত্তা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “সম্ভবত। খুব দেরিতে।”
“তারপর?”
“কিছুই না। কিছু করারও ছিল না।
উত্তরটি অনীককে আঘাত করল। কারণ সে কখনো তার মাকে এভাবে কথা বলতে শোনেনি।
“ইচ্ছে করে?”
“না। কিন্তু সব আঘাত ইচ্ছে করে দেওয়া হয় না। কিছু আঘাত আসে সীমারেখা রক্ষার ভেতর দিয়ে।”
হাওয়া আরও ঠাণ্ডা মনে হল।
অনীক ধীরে বলল, “তাহলে যদি… যদি এই তিতাস সেই দিশা মিত্রের মেয়ে হয়?”
সোমদত্তা কেঁপে উঠলেন কি? খুব সামান্য, কিন্তু অনীক টের পেল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না। তারপর বললেন, “আমি এই সম্ভাবনাটা ভাবিনি—এ কথা বললে মিথ্যে বলা হবে।”
“মানে তুমি ভেবেছ?”
“কাল রাত থেকে।”
“আর?”
“আর ভাবছি, সময় মাঝে মাঝে বড় নিষ্ঠুর খেলোয়াড়।”
অনীকের গলা শুকিয়ে গেল। “তুমি জানো ও কার মেয়ে?”
জানি না, তবে খুব সম্ভবত দিশার মেয়েই হবে।
“জানতে চাও?”
“চাই কি না, সেটাও জানি না।”
এই অসহায় সততা মুহূর্তটাকে আরও ভারী করে তুলল।
পরদিন সকাল থেকে সোমদত্তার আচরণে সূক্ষ্ম বদল দেখা গেল। তিনি অনীককে কিছু বলেন না, কিন্তু তার দিকে নতুন মনোযোগে তাকান। যেন ছেলের মধ্যে এখন তিনি শুধু ছেলেকে নয়, আরেকটি গল্পের কেন্দ্রও দেখছেন। অনীক কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, ফোনে কে মেসেজ করছে, এসব নিয়ে কখনো প্রশ্ন তোলেননি; আজও তুললেন না। কিন্তু তিনি শুনছিলেন বেশি। লক্ষ্য করছিলেন।
অনীক দুপুরে ফোনে তিতাসের একটি মেসেজ পেল: “বাড়ি গেছ?” সে উত্তর দিল: “হ্যাঁ।” বেশ কিছুক্ষণ পরে আরেকটি মেসেজ: “তোমার মা কেমন আছেন?”
এই প্রশ্নটি দেখে অনীকের শরীরে কাঁপন উঠল। কী উত্তর দেবে? “ভাল” লিখল সে। তারপর অনেকক্ষণ কিছু লিখল না।
তিতাস আবার লিখল: “কেন জানি আজ সারাদিন ওর কথা মনে পড়ছে।”
এই একটি বাক্য অনীকের মনে অদ্ভুত চাপ তৈরি করল। সে কি লিখবে, “আমিও মাকে তোমার কথা বলেছি”? না, তা এখন বলা যায় না। আবার গোপনও কি রাখা যায়? শব্দেরও তো সময় আছে; সময়ের আগে বললে তা ভেঙে যায়, পরে বললে বিকৃত হয়।
সে লিখল: “ফিরে গিয়ে সব বলব।”
তিতাস আর কিছু লিখল না।
সন্ধ্যাবেলায় সোমদত্তা তার ঘরে এসে দাঁড়ালেন। হাতে একটি ছোট খাতা। “এটা দেখ।”
খাতাটি খুলতেই অনীক দেখল, কিছু নোট, কিছু ছাত্রছাত্রীদের নাম, কিছু পঙ্‌ক্তি, কিছু তারিখ। পেছনের দিকে একটি পাতায় লেখা, “তিতাস, অতিরিক্ত সংবেদনশীল। ভাষা আছে। সীমানা বোঝাতে হবে। প্রশ্রয় নয়, দিশা।”
অনীক স্তব্ধ।
“তুমি এমন নোট রাখতে?” সে জিজ্ঞেস করল।
সোমদত্তা মাথা নেড়ে বললেন, “কখনও কখনও। যাদের মনে হতো হারিয়ে যেতে পারে।”
“ও হারিয়ে গিয়েছিল?”
“জানি না,” তিনি বললেন। “শুধু জানি, কিছু চোখ আমাকে অনেকদিন তাড়া করেছে।”
অনীকের মনে হল, তার মাকে সে প্রথমবার মানুষ হিসেবে দেখছে। শুধু মা নয়, একজন তরুণী শিক্ষক, যিনি প্রভাব ফেলেছেন, আহত করেছেন, বাঁচিয়েছেন, হয়তো ভুলও করেছেন। এই আবিষ্কার তাকে একই সঙ্গে বিস্মিত ও ব্যথিত করল।
রাতের খাওয়ার পর হঠাৎ সোমদত্তা বললেন, “তুই যদি কখনো তিতাসকে বাড়িতে আনিস, আমাকে আগে বলিস।”
অনীক চমকে উঠল। “তুমি দেখা করতে চাও?”
“চাওয়া-না-চাওয়ার প্রশ্ন নয়,” তিনি বললেন। “কিছু সাক্ষাৎ এড়ানো যায় না।”
“তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”
সোমদত্তা একটু হাসলেন। “যারা অতীতকে সযত্নে ভাঁজ করে রাখে, তারা ভয় পায় না, কিন্তু জানে, ভাঁজ খুললে কাগজে পুরনো দাগ দেখা যায়।”
এমন সময় টেবিলের উপর রাখা ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল।
এত রাতে ল্যান্ডফোনে ফোন আসে না প্রায় কখনোই। দুজনেই চমকে তাকাল।
সোমদত্তা এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুললেন। “হ্যালো?”
ওপাশে কী বলা হল, অনীক শুনতে পেল না। কিন্তু দেখল, মায়ের মুখের রং বদলে গেল। তার আঙুল রিসিভারের উপর শক্ত হয়ে উঠল। চোখের মণি সামান্য বড় হল।
“কে?” তিনি খুব আস্তে বললেন।
কিছুক্ষণ শুনলেন। তারপর বসে পড়লেন প্রায়। অনীকের মনে হচ্ছিল, তার বুকের ধুকপুকানি এই নীরব ঘরেও শোনা যাচ্ছে।
সোমদত্তা বললেন, “হ্যাঁ… আমি সোমদত্তা… বলুন…”
তারপর আরেকটু চুপ থেকে, একেবারে নিম্ন স্বরে, “তিতাস?… কোন তিতাস?”
অনীক উঠে দাঁড়াল।
সোমদত্তার চোখ এবার তার দিকে ফিরল, একটি আতঙ্কিত, অবিশ্বাসী, আবার অদ্ভুতভাবে প্রস্তুত দৃষ্টি।
ওপাশ থেকে যা-ই বলা হোক, তার প্রতিটি শব্দ যেন ঘরের বাতাসকে আরও ভারী করে দিচ্ছিল।
অবশেষে সোমদত্তা খুব ধীরে বললেন, “আপনি… তিতাসের মা?”
নীরবতা।
তারপর,
“কালই আসছেন?… এখানে?”
রিসিভার নামিয়ে রাখার পর অনেকক্ষণ তিনি কিছু বললেন না।
অনীক আর থাকতে না পেরে এগিয়ে এল। “কে ছিল?”
সোমদত্তা তার দিকে তাকালেন। চোখে এমন এক আলো, যা ভয়, বিস্ময়, অতীত ও নিয়তির একসঙ্গে জেগে ওঠা ছাড়া আর কিছু নয়।
তিনি বললেন, খুব ধীরে, স্পষ্ট করে,
“যে তিতাসকে তুই ভালোবেসেছিস… তার মা কাল আমাকে দেখতে আসছেন।”
অনীকের গলা শুকিয়ে গেল। “কেন?”
সোমদত্তা এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ রাখলেন। তারপর খুলে বললেন,
“কারণ তিনি বললেন, অনেক বছর আগে তিনি আমাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। আর সেই চিঠির জবাব আমি কোনওদিন দিইনি।”
ঘরের ভেতর সবকিছু স্থির হয়ে গেল।
টেবিলের উপর ভাঁজ করা পুরনো চিঠি।
জানলার বাইরে গাঢ় রাত।
মায়ের মুখে ফিরে আসা বহু বছরের দমিয়ে রাখা আলো-আঁধারি।
আর অনীকের মনে হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠল, সে যে ভালবাসার কথা বলতে এসে ভেবেছিল কেবল নিজের ভবিষ্যৎ খুলবে, সে আসলে খুলে ফেলেছে দু-প্রজন্মের মাঝখানে চাপা পড়ে থাকা একটি অসমাপ্ত দরজা।
কাল সেই দরজায় কড়া নাড়বে আরেকজন নারী।
যিনি একসময় ছাত্রী ছিলেন। যার একও সময় তিতাসের মতো একটা বয়স ছিল। অথবা, তিতাসের মা হয়েও এখনও কোথাও তিতাস হয়েই আছেন।🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

 

🍂কবিতা 

 

শ্রীমতী পার্বতী মিত্র -এর একটি কবিতা

নির্দয়

শান বাঁধানো মনে
সহানুভূতি প্রবেশ করতে পারে না

কংক্রিটের তলায় গুমরে মরে
সেখানে নেই আনন্দ

নেই কোনও স্নেহশীতল স্পর্শ…
শুধুই একাকিত্বের হাহাকার

দিন-রাত্রি কুরে কুরে খায় অন্তর ও বাহির…

 

 

মোফাক হোসেন -এর একটি কবিতা 

খোলসের দেওয়াল

ভেবেছিলাম—
ফুটন্ত জলের বাস্প হয়ে
বাতাসের শরীর ছুঁয়ে
তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবে সময়।
দেখছিলাম—
রূপান্তরিত ভাতের মাড়।
কিন্তু পেলাম—
চকচকে মোড়কের কৌটায়
শুধু জর্দার গন্ধ।
তেপান্তরের মাঠে
বাঁশ হয়ে দাঁড়িয়ে আজও
ঝোপের ফাঁক গলে দেখি—
ছেড়ে আসা পুরোনো খোলসের দেয়ালে
তোমার মাথার ক্লিপ নড়ে ওঠে ।
হয়তো এটাই—
স্বপ্ন বোনার ব্যর্থ আশ্রয়।
বৃষ্টির জলাশয়ে
হঠাৎ ভেসে ওঠে সেই ছবি,
যে ডায়রির পাতায়
লেগে আছে যাপিত জীবনের গন্ধ।

 

 

মোঃ সেলিম মিয়া -এর একটি কবিতা

বাবা তোমায় পড়ছে মনে

বাবা তোমায় পড়ছে মনে আঁখি ভেজা জলে!
সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে থাকছ কেমন করে?
কেমন আছো বাবা তুমি প্রশ্ন বার বার?
বিষাদ ভরা মন যে আমার ভেঙে চুরমার!
সন্তান শোকে সংসার সুখে কতই ছিলে কাতর?
আজ তুমি নিঃস্ব অসহায় কবে যে হবে হাসর?
জীবন মৃত্যু অমোঘ নিয়ম নেই যে কারো হাত?
তোমার পথেই সহযাত্রী আসবেই আযরাইলের হাক।
দুই দিন কি আগে পরে এই টুকুন তো তফাৎ?
তাইতো খুঁজি শান্তনার বাণী তোমায় হারানোর আঘাত!
তুমি ছিলে বটবৃক্ষ মাথার উপর তাজ,
মর্মে মর্মে করছি উপলব্ধি চোখ কপালে ভাঁজ!
আদর মাখা সোহাগ স্মৃতি ভুলি কেমন করে?
সঠিক পথে শাসন বারণ হৃদয় কম্পিত করে!
তুমি ছিলে ন্যায়ের শাসক মানুষ কারিগর,
তোমার শিক্ষা লালন করে আঁধার মারিয়েছি ঘর।
তোমার তরে করছি ফরিয়াদ জান্নাত যেন জুটে?
কবর যেন হয় বাগিচা সুঘ্রাণে ফুল ফোটে!

 

রাজকুমার শেখ -এর একটি কবিতা

ফুল আর তুমি

বিকেল তুলে রাখি তোমার নিংড়ে যাওয়া মন বারান্দায়
যা ছিল এখানে
আজকাক তুমি পাথর হয়ে গেছ
এত ভুল করি রাস্তা
তবু হাঁটি সামনে
আসলে ফুল ভেবে
এতকাল কাঁটা ধরেছি হাতে!

 

শ্রেয়সী সরকার -এর একটি কবিতা

কুয়াশা ও বর্ণমালা

ভাঙাচোরা চোয়াল দেখলে গা শিউরে ওঠে
বটগাছে বাসা বাঁধে মারণপোকা।
তাকে তাড়া করে বর্ণমালার আলো
তার চোখে এখন বেঁচে থাকে কুয়াশার কথা,
একে একে ব্যার্থ জীবনের প্রতিটি কাগজ-
যেখানে সাঁতারু মাছের রক্ত জমে যায়
হারিয়ে যায় মেঘের কোলে নয়তো অতলে…

 

 

যতন কুমার দেবনাথ -এর একটি কবিতা

পানিতাওয়া

দুঃখ যার যার আনন্দ সবার
শতবার আওড়ালেও ক্ষত শুকোবে কি?

এই তো সেদিন, সাত ঘাটের জল খাওয়ালাম
গ্রিল কেটে তবু ঘরে ঢুকেছিল চোর

বুকের উপর খুঁটো গেড়ে বসেছিল বৈশাখী মেলায়
খাট পালঙ্কের বাহারি দোকান

দায়সারা গোছের দেঁতো হাসিতে রস টলমল পানিতাওয়া

 

ভোলা দেবনাথ -এর একটি কবিতা

ঘুম ভাঙে জাগে পৃথিবী

সকালের ঘুম ভাঙায় শিশিরস্নাত ভোর
দলবদ্ধ এক ঝাঁক শালিক পাতিকাক,
দলছুট বুলবুলি দোয়েল ডানায় ভূঁইফোড়
ভাদ্রের কুকুর আনাগোনায় মাতাল দিক,
অপেক্ষমাণ পরিবেশ তারপর প্রকৃতি
মিশেছে নিঃসঙ্গতার নৈকট্যে মৌন সময়ে
আসবেন প্রতীক্ষিত কুয়াশাভেদে অতিথি
খোদিত কারুকাজে বিচিত্র পৃথিবী দাঁড়িয়ে,
উড়াও প্রাণ ছড়াও হাসি সুবাসিত মানদণ্ডে
রাতভর ঝমঝম বৃষ্টি কাশবনে ফুলে ফুলে
শরতের স্বচ্ছতায় নিকষমেঘে দাগ কলঙ্কে,
শিউলিরা ফোটবেনা ভোরে ভাসবে না জলে
মাটির গন্ধে শিকড় টানে গভীর-গভীরতায়
কৃষ্ণকলি খেলা করে নগ্নে মনের উঠোনে
আঁকি জগৎজুড়ে আকাশ-পাতাল সরলতায়
স্বপ্নবুনন ঘাটে কারিগর আমি জ্বলি নিত্য আগুনে।

 

প্রিয়াংকা নিয়োগী সনি -এর একটি কবিতা

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী

বিশ্বাস নিজের উপর জন্মায় কাজে তা প্রমাণ পায়,
থাকে যে কাজ করার মানসিকতায়,সেই কাজে সাফল্য তার,
বিশ্বাস জমতে জমতে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
প্রতিটি কাজে ধারাবাহিক সাফল্য নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তৈরী করায়,
আত্মবিশ্বাস বজায় থাকে কাজের সাফল্যের ধারায়,
আত্মবিশ্বাস জন্মাতে জন্মাতে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস
জন্মায়,
যদি ব্যর্থতার মুখোমুখি হয় তবুও ভেঙে না যায়,
নিজেকে শক্ত,তৈরী করে ফের দৌঁড়ায় জয়ী হওয়ায়।
সেখানে নেই কোনও ভয়, শুধুই স্বপ্ন জয়,পারদর্শিতার স্পর্ধায়।

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী

 

সুনয়নাদি 

১৪.

তিথি স্কুল থেকে বেরনোর সময়ই বৃষ্টি পড়ছিল। ছাতাটা নিয়ে যায়নি। কী করবে বুঝতে পারছে না। বেরিয়ে যাবে নাকি একটু দেখবে এরম ভাবতে ভাবতেই শুধু একটা কথাই মনে পড়ছে, আজকে তো সুনয়নার কাজের মেয়েকে নিয়ে আসার কথা ঠিক সময় বাড়ি যেতে না পারলেও তো অসুবিধা হবে। বেচারা শরীরটা এমনি খারাপ শুধু আমার কথা ভেবেই ও কাজের মেয়েটা ঠিক করেছে। আর আজকেই আসার কথা সাত পাঁচ ভাবছে। তখনই ফোন বেজে উঠল। ব্যাগটা খুলে ফোনটা বার করতে করতেই কেটে গেল। ফোনটা বের করে দেখল পবিত্রর ফোন। কি ব্যাপার হঠাৎ পবিত্র ফোন করল কেন? সাধারণত এই সময় তো ফোন করে না। ওকে বাড়ি এসে গেছে নাকি, কারোর কিছু হল! একটা দুশ্চিন্তা যেন ভর করতে শুরু করেছে মাথার উপর। একবার রিং করেই দেখি তিথি মনে মনে ভাবল। রিং করার সঙ্গে সঙ্গেই পবিত্রফোনটা ধরল, হ্যালো।

শীতকালে এমন বৃষ্টি যেন মনে হচ্ছে ভরা বর্ষা কাল। আজ বৃষ্টি থামবে বলে মনে হচ্ছে না।
জানলাটা খুলে দিল বাপরে সুরঞ্জনাদেব নারকেল গাছগুলো কেমন দুলছে।
শহরে এসে বৃষ্টি ভেজা গাছপালা সেরকম দেখতে পায় না গ্রাম হলে ওর খুব পাতা ঘুরে আসছে একটু হাওয়া দিলেই। গাছপালাগুলো যেন বৃষ্টির জল পেয়ে কেমন সরস হয়ে উঠত। মনে পড়ে যায় গ্রামের বৃষ্টিতে ভেজা কৃষকদের অনাবিল স্নেহময় চাউনি।

—তুমি বাড়িতে এসেছ?
তিথি বুঝলো পবিত্র বাড়িতে আসেনি- তাহলে হঠাৎ ফোন কেন?
—না, না, না বৃষ্টি পড়ছে তো ।
—ঠিক আছে তুমি একটা টোটোতে উঠে পড়ো না…
—হ্যাঁ, সেটাই ভাবছি কিন্তু তুমি ফোনটা কেন করলে?
—মায়ের শরীরটা খারাপ করছে আমার পৌঁছানোর আগে তো তুমি পৌঁছে যাবে, সেজন্যই ফোনটা করলাম।
তিথি যা মনে মনে ভাবছিল তাই হল!
—আচ্ছা আচ্ছা তুমি জানলে কি করে? কে ফোন করেছে?
—সুইটি ফোন করেছিল?
—কী হয়েছে?
—ও-তো বললো শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
—হ্যাঁ মায়ের তো এমনি ঠাণ্ডা লেগেছে ।
—না বৃষ্টির কমার ভরসায় ঘরে বসে থাকলে হবে না, ওকে বেড়োতেই হবে।
আস্তে আস্তে গেটের কাছে গেল। আজ ছাতাটাও আনেনি। কি দুর্ভোগ, কি দুর্ভোগ,
—এই টোটো, এই টোটো।
এত স্পিডে চলে যাচ্ছে তার মধ্যে একজন বলল, ৫০ টাকা লাগবে।
—আপনি কি ভাবছেন এটা মগের মুল্লুক বাড়িটা পাঁচ মিনিট নয়।
তারপর আবার ভাবল কি আর করা যাবে হেঁটে গেলে তো আরও ভিজে যাবে। এর মধ্যে যা ভিজেছে। শুধুমাত্র মাথাটাকে বাঁচানোর জন্য।
—এই টোটো…
এই টোটো এবার একজন দাঁড়াল। ৩০ টাকা লাগবে।
—দাঁড়ান, দাঁড়ান, দাঁড়ান।
—একটু তাড়াতাড়ি করুন।
—বাবা সিট তো ভিজে গিয়েছে।
—যা বৃষ্টি পড়েছে সিট ভিজবে না।
—কোথায় নামবেন?
—দাঁড়ান, দাঁড়ান, দাঁড়ান এসে গেছি।
—এত কাছে!
—তাহলে ভাড়া কত দেবো, বলছেন কাছে।
—হ্যাঁ ৩০ টাকাই লাগবে।
—কেন ভাড়া তো ১০ টাকা
—আমি তো ওঠার আগেই বলেছিলাম, যা বৃষ্টি পড়ছে দাঁড়িয়ে থাকলেও টোটো পেতেন না। তিথি আর কথা বাড়াল না। পার্স থেকে টাকা বের করে দিল।
লোকটা গজ গজ করতে করতে বলল, এত টাকা মাইনে ভাড়া দিতে গেলে কষ্ট। তিথি গেট দিয়ে ঢুকতে যাবে কথাটা শুনে মাথাটা এত গরম হয়ে গেল তারপর বলল, দাঁড়ান, দাঁড়ান, দাঁড়ান…
—আপনি কী বললেন?
—এত টাকা মাইনে।
—আপনি এই কাজটা করতে পারলেন না কেন?
—মানে!
—শুনুন যখন আপনারা আমতলা জামতলায় বসে গল্প করেছেন আমরা তখন পড়াশোনা ঠিক করে করেছি। এই কাজটা সেই সময় ঠিকঠাক করে পড়তেন তাহলে আজকে আপনাকে একাজ করতে হত না।
লোকটা কি একটা বলতে যাবে তখনই তিথি বলল,
—চামড়ার মুখ তো কথা বলতে গেলে ট্যাক্স দিতে হয় না।
—লোকটা কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
মাইন্ড ইট ভবিষ্যতে এসব কথা বলতে গেলে ভাবনা চিন্তা করে কথা বলবেন।
তাছাড়া এরপর আমরাই কমপ্লেন করব পৌরসভার থেকে ভাড়ার চার্ট আছে তো? সেগুলো মেনটেন করছেন?
—আসলে তা নয় বৃষ্টি পড়ছে তো এজন্যই কথাটা বলেছি।
—হ্যাঁ সেজন্য তো দিয়েওছি।
লোকটা কোন কথা না বলে সোজা চলে গেল।
পা থেকে মাথা পর্যন্ত তিথির রাগে জ্বলে পুড়ে গেল।
গেট খুলতে না খুলতই শ্বেতাম্বরী এসে জড়িয়ে ধরল।
—চলো, চলো মা।
—বৌদি এসে গেছ আমি তাহলে আসি।
—একটা কথা বলি সুইটি ব্যাগটা আমি এখনও রাখিনি তার মধ্যেই তুমি আসি আসি… বৃষ্টির মধ্যে যাবে কি করে গো।
—আমি ঠিক চলে যাব।
মায়ের শরীরটা কেমন আছে।
ডাক্তার অরিন্দমকে ডেকেছিলে?
—হ্যাঁ দাদা ফোন করে বলে দিয়েছিলেন উনি এসেছিলেন।
—উনি ওষুধ পত্র দিয়ে গেছেন।
—ইসিজি করেছেন?
—হ্যাঁ।
—কি বললেন ডাক্তার বাবু?
—বললেন ঠাণ্ডা থেকে হয়েছে।
—এখন কি করছেন?
—ঘুমোচ্ছেন।
—বুবুন?
—বুবনকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।
আমি আসি আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
—ঠিক আছে এস।
তিথি রাগটাকে খুব কন্ট্রোল করল। নইলে আজকে বলে দিত তোমাকে কাল থেকে আর আসতে হবে না। একেতে রাস্তায় টোটোওয়ালার সাথে ঝামেলা হল। শ্বেতাম্বরী লেজ নাড়তেই থাকল। ব্যাগটা টেবিলে রেখে তিথি শাশুড়ি মায়ের ঘরে ঢুকল।
দেখল ঘুমাচ্ছেন। তিথি না ডেকে বেরিয়ে আসছে তখনই কল্যাণী দেবী ডাকলেন,
—কে বৌমা?
—হ্যাঁ, এখন কেমন আছেন?
কল্যাণীদেবী পাশ ফিরে তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, এই আছি আগের থেকে ভাল।
—কিছু খাবেন?
—না কিছু খাব না।
একটু চা খাব। আচ্ছা তোমরা যখন খাবে তখন দিও।
এর মধ্যে ফোনের আওয়াজ।
—কার ফোন বাজছে?
—দেখি বাইরে টেবিলে রেখে এসেছি…
—খোকা করল নাকি?
ফোনটা খুলতেই দেখল, সুনয়নাদির ফোন।
—হ্যালো…
—হ্যাঁ বৌদি আমি সুনয়না বলছি।
—হ্যাঁ বলো।
—যা বৃষ্টি পড়ছে আজ তো তোমার ওখানে যাওয়ার কথা।
—হ্যাঁ চলে এসো। সেটাই ভাবছি।
আজকে আসবে না? দেখো কি করবে তাহলে আমাকে জানিয়ে দিও।
—না গেলেও তো নয় তোমার তো লোকের দরকার।
—হ্যাঁ গো।
—ঠিক আছে দেখি, আর একটু বৃষ্টি ঝরে কিনা…
—আচ্ছা।
শীতকালে এমন বৃষ্টি যেন মনে হচ্ছে ভরা বর্ষা কাল। আজ বৃষ্টি থামবে বলে মনে হচ্ছে না।
জানলাটা খুলে দিল বাপরে সুরঞ্জনাদেব নারকেল গাছগুলো কেমন দুলছে।
শহরে এসে বৃষ্টি ভেজা গাছপালা সেরকম দেখতে পায় না গ্রাম হলে ওর খুব পাতা ঘুরে আসছে একটু হাওয়া দিলেই। গাছপালাগুলো যেন বৃষ্টির জল পেয়ে কেমন সরস হয়ে উঠত। মনে পড়ে যায় গ্রামের বৃষ্টিতে ভেজা কৃষকদের অনাবিল স্নেহময় চাউনি। যেন ফসলের সঙ্গে কৃষকের এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠত। মনের সুখে তারা গান ধরত। এসব ভাবতে ভাবতেই বৃষ্টির ঝাঁট কখন যে
তিথির হাত মুখ ভিজে গিয়েছে বুঝতেও পারেনি। হঠাৎ শ্বেতাম্বরীর কিউ কিউ আওয়াজে হুঁশ ফেরে। 🍁 (ক্রমশঃ)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com 

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরে পড়া’ বিভাগের লেখা  আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন