সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকল : পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের (WB Election) প্রথম দফা একদিকে যেমন রেকর্ড ভোটদানের সাক্ষী থাকল, তেমনই ছড়িয়ে ছিটিয়ে অশান্তির ঘটনাও সামনে এল। তবে দিনের শেষে প্রশাসনের মূল্যায়ন,,মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে ভোটগ্রহণ। একই সঙ্গে রাজনীতির মাঠে দেখা গেল ভিন্ন এক ছবি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সৌজন্য বিনিময়, যা নজর কেড়েছে ভোটারদেরও।
প্রথম দফার ভোট শেষ হওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ভোটদানের উচ্চ হার নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘এ বার প্রচুর ভোট পড়েছে। অনেকের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ায় কেউ ঝুঁকি নিতে চাননি। সবাই বুথে গিয়েছেন। এটা ভালো লক্ষণ।’ তাঁর এই মন্তব্যে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন, অর্থাৎ এসআইআর (SIR) প্রসঙ্গ আবারও সামনে এসেছে।।অন্যদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) সমাজমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করে রাজনৈতিক বার্তা দেন। সূর্যাস্তের সেই ছবির সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘তৃণমূলের দুর্নীতি ও গুন্ডারাজের সূর্য অস্ত গেছে।’ প্রথম দফার ভোট শেষ হতেই দুই শিবিরের এই ভিন্ন সুরে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। মাঠের ছবিতে যেমন ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গিয়েছে, তেমনই কিছু জায়গায় উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। কোচবিহারের সিতাই (Sitai) এলাকায় বিজেপি কর্মী জাহানুর ইসলাম (Jahanur Islam)-এর উপর ছুরিকাঘাতের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর হাত জখম হয়েছে বলে জানা গিয়েছে এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযোগের তির শাসকদলের দিকে, যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল শিবির।
বীরভূমের সাঁইথিয়া (Sainthia)-তেও ভোটের শেষ দিকে উত্তেজনা ছড়ায়। সিউড়ি ২ ব্লকের একটি বুথে বিজেপির সহায়তাকেন্দ্র ঘিরে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ, তৃণমূল কর্মীরা সেই কেন্দ্র ভেঙে দেয়, যা ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। মুর্শিদাবাদের বহরমপুর (Berhampore)-এ কংগ্রেস প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury)-এর পোলিং এজেন্টের পরিবারের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে। অধীর অভিযোগ করে বলেন, ‘শেষ বেলায় কিছু বুথ দখলের চেষ্টা চলছে। পরিকল্পিত ভাবে এজেন্টদের টার্গেট করা হয়েছে।’ যদিও তৃণমূল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বীরভূমের খয়রাশোল (Khoyrasol)-এ ইভিএমে পগোলমালের জেরে উত্তেজনা ছড়ায়। ভোট বন্ধ থাকার অভিযোগে ক্ষুব্ধ ভোটারদের একাংশ কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং বাহিনীর জওয়ানদের লক্ষ্য করে ইট ছোড়ার অভিযোগও ওঠে। কয়েক জন জওয়ান আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে অস্ত্র বের করতে হয়। এ ছাড়া পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা (Pingla)-র একটি বুথে চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে আসে। অভিযোগ, প্রিসাইডিং অফিসার-সহ সমস্ত ভোটকর্মী একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে বেরিয়ে যান, ফলে কিছু সময়ের জন্য বুথ কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়ে। এই ঘটনায় কমিশন কড়া পদক্ষেপ নেয়, সংশ্লিষ্ট ভোটকর্মীদের নিলম্বিত করা হয় এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের নওদায় (Naoda) আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (AJUP)-এর নেতা হুমায়ুন কবীরকে (Humayun Kabir ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। তৃণমূল কর্মীদের বিক্ষোভের মধ্যে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে তিন জনকে আটক করে।
আসানসোল দক্ষিণ (Asansol South)-এ বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul)-এর গাড়িতে হামলার অভিযোগও সামনে আসে। তিনি জানান, ‘বুথ পরিদর্শন করে ফেরার সময় চলন্ত গাড়িতে পাথর ছোড়া হয়।’ ঘটনায় গাড়ির পিছনের কাচ ভেঙে যায় এবং থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এই উত্তেজনার মাঝেই অন্য ছবি তুলে ধরল খড়্গপুর সদর (Kharagpur Sadar)। সেখানে বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh) এবং তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকার (Pradip Sarkar) মুখোমুখি হয়ে হাসিমুখে হাত মেলান। দিলীপ বলেন, ‘এটাই আমাদের রাজনীতি হওয়া উচিত।’ প্রদীপের প্রতিক্রিয়া, ‘মানুষ যাঁকে চাইবেন, তাঁকেই ভোট দেবেন।’ এই দৃশ্য ভোটের আবহে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে।
ভোটদানের দিন ব্যক্তিগত স্তরেও কিছু ঘটনা নজরে এসেছে। মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ (Jiaganj)-এ সঙ্গীতশিল্পী অরিজিৎ সিং (Arijit Singh) সস্ত্রীক ভোট দেন। অন্যদিকে বোলপুর (Bolpur)-এ চিত্রকর নন্দলাল বসু (Nandalal Bose)-র নাতি সুপ্রবুদ্ধ সেন (Suprabuddha Sen) ও তাঁর স্ত্রী দীপা সেন (Deepa Sen) প্রথমে ভোট দিতে না পারলেও পরে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। উল্লেখ্য, প্রতিবাদের ছবিও দেখা যায়। মুর্শিদাবাদের সুতিতে (Suti) ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগে অনেকেই কালো ব্যাজ পরে ভোট দেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘পড়শিদের নাম বাদ পড়েছে, তাই প্রতিবাদ জানাতেই এই পদক্ষেপ।’
দুঃখজনকভাবে, কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর (Keshpur)-এ ভোট দিয়ে ফেরার পর অসুস্থ হয়ে শেখ বাবলু (Sheikh Bablu) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। বীরভূমের সিউড়িতেও (Suri) ভোট দিতে যাওয়ার পথে অসীম রায় (Asim Roy) নামে এক প্রবীণের মৃত্যু হয়েছে। দিনভর এই নানা ঘটনার মধ্যেও ভোটের সার্বিক চিত্র ছিল অংশগ্রহণমুখী। ভোটারদের উৎসাহ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, মাঝেমধ্যে উত্তেজনা, সব মিলিয়ে প্রথম দফার ভোট রাজ্যের নির্বাচনী আবহকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এখন নজর পরবর্তী দফা এবং চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে, যেখানে এই দিনের প্রভাব কতটা পড়বে, সেটাই দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : WB Assembly Election High Voting Percentage | অনুব্রতর দাবিতে বাড়ল জল্পনা, প্রথম দফার ভোটে আত্মবিশ্বাসে তৃণমূল


