সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হলদিয়া : কলকাতা ও পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনীতি ফের তেতে উঠল। হলদিয়ার জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী -এর উপস্থিতিতে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) যে বার্তা দিলেন, তা সরাসরি গিয়ে ঠেকল ভবানীপুরের (Bhabanipur) রাজনৈতিক লড়াইয়ে। নন্দীগ্রামের পর এবার ভবানীপুরেও জয়ের অঙ্গীকার করে তিনি বললেন, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, দায়িত্ব পালন করব, ভবানীপুরেও জিতে দেখাব।’ হলদিয়ার সভায় শুভেন্দুর বক্তব্যে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ, সঙ্গে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের ঝাঁজ। তিনি বলেন, ‘নন্দীগ্রামে যেমন জিতেছি, তেমনই ভবানীপুরেও মুখ্যমন্ত্রীকে হারাতে হবে। আপনার আশীর্বাদ চাই।’ এই বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন।
রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে নন্দীগ্রাম ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে রয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই কেন্দ্রেই মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে। ফলাফল ছিল নাটকীয়। সেই স্মৃতিকে সামনে রেখেই এবার ভবানীপুরকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে, ভবানীপুর বরাবরই মুখ্যমন্ত্রীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই কেন্দ্র থেকেই তিনি বিধানসভায় নির্বাচিত হন। ফলে এই আসনে লড়াই শুধুমাত্র ভোটের হিসাব নয়, রাজনৈতিক মর্যাদার বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুভেন্দুর কাছে এটি ‘প্রেস্টিজ ফাইট’, আর তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) -এর কাছে এটি নিজেদের জমি ধরে রাখার পরীক্ষা। হলদিয়ার সভায় শুভেন্দু আরও দাবি করেন, ‘পূর্ব মেদিনীপুরের ১৬টি আসনেই পদ্ম ফুটবে।’ এই মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনা বাড়িয়েছে। বিজেপি (Bharatiya Janata Party) এই অঞ্চলে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, আর সেই কৌশলেই এমন বক্তব্য বলে মনে করা হচ্ছে।
ভোটের অঙ্কেও ভবানীপুর এখন আলোচনায়। এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে বিজেপি নিজেদের পক্ষে পরিস্থিতি অনুকূল বলে দাবি করছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি নাম বাদ পড়ার ঘটনাকে হাতিয়ার করে বিরোধী শিবির ভোটব্যাঙ্কে পরিবর্তনের আশা দেখছে। এই প্রেক্ষাপটে শুভেন্দু ভবানীপুরে অ-বাঙালি ভোটারদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সমস্যার কথাও তুলে ধরছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে উন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতার প্রশ্ন। তিনি বোঝাতে চাইছেন, ‘শুধু আবেগ নয়, উন্নয়নের ভিত্তিতেই ভোট হওয়া উচিত।’ অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এই চ্যালেঞ্জকে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। দলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার (Jay Prakash Majumdar) কটাক্ষ করে বলেন, ‘কথা বলতে কোনও খরচ হয় না। আগেও অনেক বড় বড় দাবি শোনা গিয়েছে।’ তাঁর ইঙ্গিত, রাজনৈতিক বক্তব্য আর বাস্তব ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য থেকেই যায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবানীপুরের এই লড়াই শুধু একটি কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই কেন্দ্রের ফলাফল রাজ্যের বাকি আসনগুলিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এখানে যে বার্তা যাবে, তা গোটা বাংলার ভোটারদের মনোভাবেও প্রতিফলিত হতে পারে। হলদিয়ার সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতি এই লড়াইকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সমর্থন পেয়ে শুভেন্দু যে আত্মবিশ্বাসী, তা তাঁর বক্তব্যেই ধরা পড়েছে। তিনি কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন, এই লড়াই শুধু একটি আসনের নয়, বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে বিজেপি। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসও ভবানীপুরকে নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে ধরে রাখতে সর্বশক্তি দিয়ে নামবে, তা বলাই বাহুল্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং সংগঠনের শক্তি, দু’টিকেই কাজে লাগাতে চাইবে শাসকদল। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে পাল্টা কটাক্ষ, ভবানীপুর এখন বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। হলদিয়ার সভা সেই উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু, আগামী দিনে এই লড়াই কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এটুকু নিশ্চিত, ভবানীপুরের ময়দানেই নির্ধারিত হতে পারে বাংলার রাজনীতির আগামী দিশা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : CM Mamata Banerjee Post, West Bengal Communal Unity | মদনমোহন মন্দিরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘সর্বধর্মে শান্তির বাংলা গড়াই আমাদের সংকল্প’




