সাশ্রয় নিউজ ★ কোচবিহার: বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বঙ্গ রাজনীতিতে উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। রাজ্যজুড়ে ‘পরিবর্তন যাত্রা’ কর্মসূচী নিয়ে পথে নেমেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। রবিবার কোচবিহারের রাসমেলা ময়দানে দলীয় সমাবেশে একাধিক ইস্যুতে সরব হলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন (Nitin Nabin)। শিক্ষা ও চাকরি দুর্নীতি, কাটমানি অভিযোগ, অনুপ্রবেশ সমস্যা থেকে শুরু করে ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্ক বক্তৃতার বিভিন্ন পর্যায়ে শাসক দলকে তিনি তীব্র আক্রমণ করেন। সভামঞ্চ থেকেই ঘোষণা করেন, ‘৪ তারিখ একবার হোলি উদযাপন করব, আর ভোটের রেজাল্ট বেরনোর পর আমরা জয়ের হোলির খেলব।’ রাসমেলা ময়দানের জনসমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নীতিন নবীন বলেন, ‘যে অনুপ্রবেশকারীদের বাংলায় স্থান দেওয়া হয়েছিল, তাদেরকে এখন বাংলা থেকে বার করে দেওয়ার সময় এসেছে।’ তাঁর দাবি, সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বেআইনি অনুপ্রবেশ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অনুপ্রবেশকারীদের জন্যই স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করার জন্য মাঝরাতে সুপ্রিম কোর্টের দরজায় যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এখানকার মা-বোনেদের ওপর অত্যাচার হলে প্রশাসন নীরব থাকে।’
বিজেপি সভাপতির বক্তব্যে উঠে আসে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিয়েও অভিযোগ। তাঁর মতে, রাজ্যে ‘তুষ্টিকরণের রাজনীতি’ চলছে এবং সেই মানসিকতা থেকে বাংলাকে মুক্ত করতে হবে। সীমান্তে ফেন্সিংয়ের জন্য জমি না পাওয়া প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘যদি তুষ্টিকরণের রাজনীতির জন্য জমি লাগত, তা হলে রেড কার্পেট বিছানো থাকত।’ সভায় নীতিন নবীন দাবি করেন, প্রশাসন স্বীকার করেছে যে বিপুল সংখ্যক অনুপ্রবেশকারীর নাম বিভিন্ন তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘৫০ লক্ষের বেশি অনুপ্রবেশকারীদের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। তারা ভারতীয়দের অধিকার খর্ব করছিল। কাদের কাদের চাকরি খেয়েছে।’ যদিও এই পরিসংখ্যান নিয়ে শাসকদলের তরফে ভিন্ন দাবি রয়েছে।
চাকরি ও শিক্ষা দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে বিজেপি সভাপতি বলেন, সরকারি প্রকল্পের টাকা থেকে কাটমানি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, ‘সরকারি যে কোনও প্রকল্পের টাকা নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। বাংলার মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’ তুলনা টেনে তিনি বিহারের একটি প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, সেখানে লক্ষ লক্ষ মহিলাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। তাঁর মন্তব্য, ‘কেউ বলতে পারবে না, ১ টাকাও দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু এখানে প্রকল্পের টাকা থেকে কাটমানি নিতে বাড়ি পৌঁছে যান নেতারা।’ ‘বন্দে মাতরম’ ইস্যুতেও সরব হন নীতিন নবীন। সম্প্রতি জাতীয় স্তরে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া নিয়ে নতুন নিয়ম জারি হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট স্তবক গাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের সাংসদ সংসদে বন্দে মাতরম গান থামান। বন্দে মাতরমের অপমান করা হয়েছে।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘বন্দে মাতরম ধ্বনি বাংলাকে স্বাধীনতা দেবে এবার।’ উল্লেখ্য, এই বিতর্কে তৃণমূলের সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) সংসদে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
সমাবেশে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে নীতিন নবীন বলেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ‘পরিবর্তনের লড়াই’। তাঁর বক্তব্য, বাংলাকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে বিজেপি সরকার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বাংলা থেকে তৃণমূল সরকারকে উৎখাত করতে হবে।’ ভোটের ফল ঘোষণার দিনকে কেন্দ্র করে তাঁর মন্তব্যই সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে, ‘৪ তারিখ একবার হোলি উদযাপন করব, আরেকবার ভোটের রেজাল্ট বেরনোর পর আমরা জয়ের হোলির খেলব।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতৃত্ব রাজ্যে সংগঠন শক্তিশালী করতে একের পর এক কর্মসূচি নিচ্ছে। কোচবিহারের মতো সীমান্তবর্তী জেলায় অনুপ্রবেশ ইস্যু তুলেই ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে চাইছে দল। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই অভিযোগগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে।
সভাস্থলে উপস্থিত বিজেপি কর্মীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। ‘পরিবর্তন চাই’ স্লোগানে মুখর ছিল রাসমেলা ময়দান। নীতিন নবীনের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ‘অধিকার’ ও ‘স্বাধীনতা’ -এর প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। ভয়মুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।’ প্রসঙ্গত, নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজ্যে রাজনৈতিক সংঘাতের তাপমাত্রা বাড়ছে। পরিবর্তন যাত্রা, জনসভা, পাল্টা সভা এসব মিলিয়ে নির্বাচনী আবহে সরগরম কোচবিহার থেকে কলকাতা। এখন দেখার, ভোটের ফল ঘোষণার পর সত্যিই কি ‘জয়ের হোলি’ খেলতে পারে বিজেপি, নাকি শাসকদলই ধরে রাখে ক্ষমতার রং।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Jan Dhan Yojana 2026: ব্যালেন্স শূন্য হলেও ১০,০০০ টাকা ওভারড্রাফ্ট, জানুন শর্ত ও আবেদন পদ্ধতি




