সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লী : পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) ঘিরে চলা টানাপড়েনে এক নজিরবিহীন নির্দেশ দিল দেশের শীর্ষ আদালত। শুক্রবার শুনানিতে জানানো হয়, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যে সব তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলির নিষ্পত্তি করবেন কলকাতা হাই কোর্ট নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা। নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের আধিকারিকেরা কেবল তাঁদের সহায়তা করবেন। আদালত স্পষ্ট করে দেয়, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নির্দেশই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বলে গণ্য হবে এবং রাজ্যকে তা অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে। এই মামলার শুনানি হয় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়ার (NV Anjaria) বেঞ্চে। শুনানির শুরুতেই বেঞ্চ রাজ্য ও কমিশনের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘রাজ্যের ভূমিকায় আমরা হতাশ। কমিশন ও রাজ্যের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট।’ তাঁর পর্যবেক্ষণ, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরকে কেন্দ্র করে ‘এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে, যেখানে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আদালত কলকাতা হাই কোর্টকে এসআইআর তদারকির জন্য কয়েকজন বর্তমান বিচারক এবং অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা বিচারক নিয়োগের অনুরোধ জানায়। সূত্রের খবর, প্রতি জেলায় একাধিক বিচারবিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করা হবে, যাঁরা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। ওই দিনই সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে আদালত। প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যে সব সন্দেহ নিষ্পত্তি সম্ভব, তা দিয়েই তালিকা প্রকাশ করতে হবে। এটি চূড়ান্ত তালিকা নয়; প্রয়োজনে পরে সম্পূরক তালিকা দেওয়া যেতে পারে।’
আরও পড়ুন : Bengali comedian Uttam Das death news | হাসির জাদুকর আর নেই, প্রয়াত কৌতুকশিল্পী উত্তম দাস
শীর্ষ আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল (Sujay Pal)-এর সঙ্গে বৈঠকে বসতে হবে। বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি, রাজ্যের মুখ্যসচিব, সিইও, ডিজিপি, অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এবং অ্যাডভোকেট জেনারেল। এই সমন্বয় বৈঠকের লক্ষ্য, এসআইআর প্রক্রিয়া দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা। শুনানিতে আদালত স্বীকার করে নেয়, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের এই অতিরিক্ত দায়িত্বের ফলে হাই কোর্টের স্বাভাবিক কাজকর্মে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে কিছু মামলা অন্য বেঞ্চে স্থানান্তরিত হতে পারে। তবে সময়সীমা আর বাড়াতে রাজি নন প্রধান বিচারপতি। তাঁর বক্তব্য, ‘বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের দীর্ঘদিন এই কাজে আটকে রাখা যাবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এসআইআর শেষ করতে হবে।’ এসআইআর নিয়ে সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে গ্রুপ বি আধিকারিকদের নিয়োগ। কমিশনের অভিযোগ, পর্যাপ্ত গ্রুপ বি কর্মী সরবরাহ করেনি রাজ্য। পরিবর্তে গ্রুপ সি বা নিম্নপদস্থ কর্মী দেওয়া হয়েছে, যাঁদের দিয়ে এসআইআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সুষ্ঠুভাবে করা কঠিন। আদালত প্রশ্ন তোলে, ‘করণিক শ্রেণির কর্মীদের দিয়ে কীভাবে এমন সংবেদনশীল কাজ সম্পন্ন হবে?’ কমিশনের আইনজীবী জানান, তাঁরা একাধিকবার গ্রুপ বি আধিকারিক চেয়ে চিঠি দিয়েছেন, কিন্তু রাজ্য জানিয়েছে আবেদন ‘বিবেচনাধীন’। এই অবস্থায় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দুটি সম্ভাবনা আছে—হয় পর্যাপ্ত গ্রুপ বি কর্মী নেই, যা আইনি বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন তোলে; নয়তো রাজ্য তাঁদের ছাড়তে পারছে না। সে ক্ষেত্রে কমিশন বিকল্প ব্যবস্থা নিক।’
বিচারপতি বাগচী (Joymalya Bagchi) পর্যবেক্ষণ করেন, অন্য রাজ্য থেকে কর্মী আনলে বাংলা ভাষা ও বানান সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এই রাজ্যে এসআইআর সম্পন্ন করতে বিচারবিভাগীয় আধিকারিক বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নিয়োগ করতে হবে, অথবা অন্য রাজ্য থেকে আইএএস আধিকারিক আনতে হবে।’ রাজ্য সরকার জানায়, বিচারবিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগে তাদের আপত্তি নেই। শেষ পর্যন্ত আদালত সেই পথেই এগোয়। প্রসঙ্গত, এসআইআর নিয়ে পৃথক মামলা দায়ের করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তাঁর পক্ষে আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান (Shyam Divan) অভিযোগ করেন, কমিশন ‘বিশেষ পর্যবেক্ষক’ নিয়োগ করে ইআরওদের কাজে হস্তক্ষেপ করছে। তাঁর কথায়, ‘ইআরওদের সিদ্ধান্ত খারিজ করা হচ্ছে, ফাইল যাচাই করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে।’ কমিশনের জবাব, বিশেষ পর্যবেক্ষকেরা নতুন নন; প্রথম পর্যায় থেকেই তাঁরা দায়িত্বে রয়েছেন। এই পারস্পরিক দোষারোপে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি দোষারোপের খেলা চলছে। দুই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান একে অপরকে দায়ী করছে।’ আদালতের মতে, আস্থার ঘাটতি দূর না হলে এসআইআর প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়বে। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে চলেছে। বিচারবিভাগীয় তদারকিতে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন নজর ২৮ ফেব্রুয়ারির দিকে, সংশোধিত তালিকা প্রকাশের সময়সীমা মেনে রাজ্য ও কমিশন কতটা সমন্বয়ে কাজ করতে পারে, সেটাই দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India vs South Africa Super Eight, T20 World Cup India Match | ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা সুপার এইট ম্যাচে বিভক্ত মর্কেল পরিবার! ‘মা বুঝতে পারছে না কাকে সমর্থন করবে’ বিশ্বকাপের মহারণে চর্চায় দুই ভাই




