সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা : দেশজুড়ে রাজ্যসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর রাজনৈতিক অন্দরে যেমন তৎপরতা বেড়েছে, তেমনই প্রশাসনিক স্তরেও শুরু হয়েছে দ্রুত প্রস্তুতি। আগামী ১৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি আসন-সহ মোট ৩৭টি রাজ্যসভা আসনে ভোটগ্রহণ হবে বলে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। এই ঘোষণার পরপরই সক্রিয় হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা-এর (West Bengal Legislative Assembly) সচিবালয়। কারণ, রাজ্যসভা নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে হলেও ভোটপর্ব অনুষ্ঠিত হয় সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভা ভবনেই। ফলে গোটা প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হয় বিধানসভার প্রশাসনিক কাঠামোকেই।
বুধবার সকালে প্রকাশিত সূচী অনুযায়ী, ২৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ধার্য হয়েছে ৫ মার্চ। ৬ মার্চ হবে মনোনয়নপত্র যাচাই বা স্ক্রুটিনি, আর ৯ মার্চ পর্যন্ত প্রার্থীরা তাঁদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারবেন। তবে সময়সূচির মাঝে রয়েছে দু’দিন সরকারি ছুটি। তার উপর ৩ ও ৪ মার্চ দেশজুড়ে দোল ও হোলি উৎসব পালিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে বিধানসভার শীর্ষ আধিকারিকদের মতে, ‘উৎসবের কারণে নির্ধারিত দিনে সব প্রশাসনিক কাজ স্বাভাবিক ভাবে করা কঠিন হতে পারে’। তাই আগেভাগেই সমস্ত প্রস্তুতি সেরে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজ্যসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধানসভার সচিব রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। বিজ্ঞপ্তি জারি থেকে শুরু করে প্রার্থীদের জয়ী ঘোষণার শংসাপত্র প্রদান সবকিছুর দায়িত্ব তাঁর কাঁধে বর্তায়। বিধানসভার একজন আধিকারিকের কথায়, ‘যদি পাঁচটি আসনের জন্য ঠিক পাঁচজন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন এবং তা বৈধ হয়, তবে ভোটের প্রয়োজন পড়বে না। স্ক্রুটিনির পরই তাঁদের জয়ী ঘোষণা করা হবে।’ কিন্তু যদি অতিরিক্ত প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন, তা হলে ১৬ মার্চ বিধানসভায় গোপন ব্যালটে ভোটগ্রহণ হবে এবং সেই দিনই গণনার পর ফল ঘোষণা করা হবে।
এই নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে জয়ী হতে গেলে প্রয়োজন ৫০ জন বিধায়কের সমর্থন। বর্তমান সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (All India Trinamool Congress) চারটি আসনে এবং বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party) একটি আসনে জয়ী হওয়ার মতো সমর্থন রাখে। তবে রাজনৈতিক সমীকরণে যদি কোনও পক্ষ অতিরিক্ত প্রার্থী দেয়, তা হলে নির্বাচন অনিবার্য হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে দলীয় হুইপ মেনে সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায় যে, সম্ভাব্য দুই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একদিকে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সম্ভাবনা; অন্যদিকে, ভোটাভুটির সম্ভাব্য পরিস্থিতি। ভোট হলে নিরাপত্তা, ব্যালট পেপার ব্যবস্থা, গণনা প্রক্রিয়া এবং ফল ঘোষণার মতো প্রতিটি ধাপ নিখুঁত ভাবে সম্পন্ন করতে হবে। বিধানসভা সচিবালয়ের একজন কর্তার ভাষায়, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা মেনেই সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে ছুটির দিনেও দফতর খোলা রাখা হবে, যদিও উৎসবের দিন কাজ করা বাস্তবিক দিক থেকে কঠিন।’
এবার রাজ্যসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপট আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, খুব শিগগিরই পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্টও ঘোষণা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে একই সময়ে দুই ধরনের নির্বাচনী প্রস্তুতি সামলাতে হবে প্রশাসনকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘রাজ্যসভা নির্বাচন আপাতদৃষ্টিতে সীমিত পরিসরের হলেও এর রাজনৈতিক বার্তা সুদূরপ্রসারী।’ বিশেষত, রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য ও জাতীয় স্তরে দলের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উল্লেখ্য, রাজ্যসভা বা রাজ্যসভা (Rajya Sabha) হল ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ। এখানে সদস্যরা প্রত্যক্ষ জনভোটে নির্বাচিত হন না; তা সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধায়কেরাই তাঁদের ভোট দিয়ে প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেন। ফলে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরাসরি প্রভাব ফেলে রাজ্যসভা আসনের ফলাফলে। এই কারণেই রাজ্যসভা নির্বাচনকে অনেকেই ‘সংখ্যার লড়াই’ বলে উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক সমালোচকদের দৃষ্টিতে, এবারের নির্বাচন শুধু সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবেই সীমাবদ্ধ না। এই নির্বাচনের মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিতও। যদি কোনও দল অতিরিক্ত প্রার্থী দেয়, তবে তা হবে শক্তি প্রদর্শনের কৌশল। আবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন সম্পন্ন হলে তা প্রশাসনিক দক্ষতারও প্রমাণ বহন করবে। তবে, ১৬ মার্চের ভোট ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই যে দ্রুত প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, তা থেকেই বোঝা যায়, রাজ্যসভা নির্বাচনকে ঘিরে কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ প্রশাসন। উৎসবের মরসুম, সম্ভাব্য সাধারণ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অঙ্ক সব কিছুর মাঝেই নির্ধারিত সময়ে নির্বিঘ্ন ভোট সম্পন্ন করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী



