সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা: বহু টালবাহানার পর অবশেষে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ কার্যকর করল নবান্ন (Nabanna)। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিতর্কে জড়ানো চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার ছিল কমিশনের বেঁধে দেওয়া শেষ দিন। সময়সীমা পেরোনোর আগেই পদক্ষেপ সম্পন্ন হয়েছে বলে কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী (Nandini Chakraborty)। কমিশন সূত্রে খবর, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) -সহ ফুল বেঞ্চ বর্তমানে অসম সফরে রয়েছেন; তাঁরা ফিরে এলে বিষয়টি বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হবে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচী শুরু হওয়ার আগে। অভিযোগ ওঠে, দুই জেলার চার আধিকারিক বেআইনিভাবে ‘ভুয়ো’ বা ‘ভূতুড়ে’ ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। একই অভিযোগে ডেটা এন্ট্রির কাজে যুক্ত একজন কর্মীর নামও সামনে আসে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে যায়। বিরোধীদের দাবি ছিল, ‘ভোটার তালিকায় বেআইনি নাম তোলা গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।’ প্রশাসনের একাংশের মতে, ‘অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষ; তদন্ত ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।’ প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন প্রথমে ৫ আগস্ট রাজ্যকে চিঠি দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে পদক্ষেপের নির্দেশ দেয়। ৮ অগস্ট দ্বিতীয়বার স্মারক পাঠানো হয়। তৎকালীন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থকে (Manoj Pant) চার আধিকারিককে সাসপেন্ড করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের নির্দেশ জানানো হয়। কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছিল, ‘ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কঠোর ব্যবস্থা অপরিহার্য।’ কিন্তু নির্দেশ কার্যকর না-হওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয় যখন ২ জানুয়ারি কমিশন সংশ্লিষ্ট দুই জেলার জেলাশাসকদের এফআইআর করার নির্দেশ দেয়। তবু পদক্ষেপ হয়নি। সিইও দফতর থেকে দু’দফা ‘রিমাইন্ডার’ পাঠানো হয় বলেও জানা যায়। এই সময়েই নবান্ন রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেলের পরামর্শ নেয়। প্রশাসনিক সূত্রে দাবি, ‘অভিযোগের প্রকৃতি ও প্রমাণের মানদণ্ড খতিয়ে দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।’ এক পর্যায়ে সিইও দফতরে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগ এফআইআর করার মতো গুরুতর কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং ‘কম গুরুত্বপূর্ণ অপরাধে এত বড় শাস্তি যুক্তিযুক্ত নয়।’ নির্দেশ অমান্য হওয়ায় কমিশন গত শুক্রবার দিল্লির নির্বাচন সদনে বর্তমান মুখ্যসচিবকে তলব করে। শনিবার জানা যায়, মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে এফআইআর কার্যকর করতে। শেষমেশ সময়সীমার মধ্যেই নবান্ন পদক্ষেপ নেয়। মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, ‘নির্দেশ অনুযায়ী এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।’ কমিশন সূত্রে প্রতিক্রিয়া, ‘রাজ্যের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হবে।’
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে কমিশনের নির্দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান অনুযায়ী ভোটার তালিকার প্রস্তুতি ও সংশোধনের ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীন ভূমিকা রয়েছে। ফলে নির্দেশ বাস্তবায়ন না-হলে তা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। এক প্রাক্তন আমলা বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার তালিকার নির্ভুলতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।’ অন্যদিকে, রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিক্রিয়া তীব্র। বিরোধীদের বক্তব্য, ‘এফআইআর দায়ের প্রমাণ করে অভিযোগের ভিত্তি ছিল।’ অন্যদিকে শাসক শিবিরের দাবি, ‘আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত হয়েছে; তদন্তে সত্য সামনে আসবে।’ প্রশাসনিক মহল বলছে, এখন মূল নজর তদন্তের অগ্রগতির দিকে। প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে। নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে, এসআইআর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্ভুল হওয়া জরুরি। কারণ ভোটার তালিকার ভুল বা বেআইনি সংযোজন নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে। তাই কমিশনের কঠোর অবস্থানকে অনেকেই ‘গণতন্ত্র রক্ষার প্রয়াস’ হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে রাজ্যের পদক্ষেপে প্রশাসনিক সমন্বয়ের বার্তাও মিলেছে বলে মত তাঁদের। কিন্তু, এখন প্রশ্ন, তদন্তে কী উঠে আসে? চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়? কমিশন ও রাজ্যের মধ্যে এই টানাপোড়েনের পর ভবিষ্যতে এসআইআর প্রক্রিয়ায় কী পরিবর্তন আসবে? আপাতত সব নজর তদন্তের গতিপথে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ও আইনি জবাবদিহি- দুই-ই সামনে এসেছে নতুন করে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi on India US Trade Deal | ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’, দেশের প্রত্যেকেরই লাভ হবে: এনডিএ বৈঠকে ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর




