মোফাক হোসেন ★ মুর্শিদাবাদ : বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন বিনোদনের দুনিয়ায় মানুষ যখন ক্রমশ বেশি করে ডুবে যাচ্ছে, ঠিক সেই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে খেলাধুলার প্রতি সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ফের আগ্রহী করে তুলতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল আহসান ফ্রেন্ডস ক্লাব। ধারাবাহিকতার অঙ্গ হিসেবেই এ বছরও সফলভাবে আয়োজন করা হল একাদশতম নিমতিতা প্রিমিয়াম লীগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। এলাকার ক্রীড়াপ্রেমী মানুষদের কাছে এই টুর্নামেন্ট একটি উৎসবের মেজাজ, একটি সামাজিক মিলনমেলা। রবিবার নিমতিতা ফুটবল ময়দানে অনুষ্ঠিত হল এই বহুল প্রতীক্ষিত টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ। সকাল থেকেই মাঠের চারপাশে জমতে শুরু করে দর্শকদের ভিড়। বিকেলের দিকে সেই ভিড় রীতিমতো উৎসবের রূপ নেয়। শিশু থেকে প্রবীণ সকলের উপস্থিতিতে মাঠজুড়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত ও আবেগঘন পরিবেশ। ব্যাটে-বলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দর্শকদের করতালি আর উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা যেন আলাদা ছন্দে মেতে ওঠে।

এই গুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে আয়োজনে বিশেষ মাত্রা যোগ করেন অনুষ্ঠানের অতিথিরা। মুম্বাই থেকে আগত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সেম শাহরুখ খান (Same Shah Rukh Khan) অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন এবং আয়োজকদের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তাঁর মতে, মহানগরের বাইরে এমন গ্রাম বা মফস্বল এলাকায় নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজন সত্যিই অনুকরণীয়। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ওবাইদুর রহমান সিটু (Obaidur Rahman Situ), দীপক কুমার দাস (Dipak Kumar Das) সহ আরও একাধিক বিশিষ্ট ও সম্মানিত ব্যক্তি, যাঁদের উপস্থিতিতে ফাইনালের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। টুর্নামেন্টের প্রাণভোমরা আহসান ফ্রেন্ডস ক্লাবের কর্ণধার আহসান আলি (Ahsan Ali) নিজে মাঠে উপস্থিত থেকে খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর নেতৃত্বেই গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এই প্রিমিয়াম লীগ আয়োজন হয়ে আসছে। স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলাই যে এই টুর্নামেন্টের মূল উদ্দেশ্য, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট।

ফাইনাল অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক তহিরুল ইসলাম (Tahirul Islam), সমাজকর্মী আব্দুল সাজিদ মোমিন (Abdul Sajid Momin), শিক্ষানুরাগী জেকের আলি (Jaker Ali), পুতুল আমেদ (Putul Ahmed) সহ এলাকার আরও বহু বিশিষ্টজন। তাঁদের উপস্থিতি শুধু অনুষ্ঠানের মর্যাদাই বাড়ায়নি, পাশাপাশি স্থানীয় সমাজের সঙ্গে এই ক্রীড়া উদ্যোগের গভীর সংযোগকেও তুলে ধরেছে। অতিথিরা একবাক্যে স্বীকার করেন, এ ধরনের আয়োজন এলাকার তরুণদের জন্য ইতিবাচক দিকও দেখায়। অন্যদিকে, ফাইনাল ম্যাচটি ছিল রীতিমতো রোমাঞ্চকর। দুই দলের মধ্যে শুরু থেকেই চলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। প্রতিটি ওভারেই উত্তেজনা ছড়ায় দর্শকাসনে। ব্যাটসম্যানদের আক্রমণাত্মক শট, বোলারদের নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ এবং ফিল্ডারদের তৎপরতায় ম্যাচ জমে ওঠে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। যদিও এখানে ফলাফলের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা, দলগত স্পিরিট এবং ক্রীড়াসুলভ আচরণ, যা এই টুর্নামেন্টের প্রকৃত সাফল্য।
আয়োজক আহসান আলি জানান, এই ধরনের ক্রীড়া আয়োজন শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য নয়। এর সামাজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। আজকের তরুণ প্রজন্মকে মাদক, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং নেতিবাচক অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা এক শক্তিশালী মাধ্যম। মাঠে নামলে শরীর যেমন সুস্থ থাকে, তেমনই মনও ইতিবাচক থাকে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতেও আহসান ফ্রেন্ডস ক্লাব নিয়মিতভাবে এ ধরনের ক্রীড়া ও সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই টুর্নামেন্ট নিয়ে আলাদা উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই বলেন, নিমতিতা প্রিমিয়াম লীগ এখন তাঁদের এলাকার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। বছর জুড়ে মানুষ এই টুর্নামেন্টের অপেক্ষায় থাকেন। বিশেষ করে ফাইনাল ম্যাচ মানেই একদিনের উৎসব, দোকানপাট, চায়ের আড্ডা, মাঠের চারপাশের জমজমাট পরিবেশ সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। প্রসঙ্গত, ডিজিটাল নির্ভরতার এই সময়ে যেখানে মাঠের খেলাধুলা অনেক জায়গাতেই কোণঠাসা, সেখানে একাদশতম নিমতিতা প্রিমিয়াম লীগের সফল আয়োজন নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক বার্তা দেয়। এটি প্রমাণ করে, সঠিক উদ্যোগ আর আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে আজও মানুষ মাঠে ফিরতে পারে, খেলাধুলার আনন্দে মেতে উঠতে পারে। এই ফাইনালের মধ্য আগামী দিনের জন্য একটি শক্ত ভিতও গড়ে দিল ক্লাবটি।




