সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের সামরিক ও মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে আরও একটি গর্বের অধ্যায় যুক্ত হল। বীরত্বের জন্য দেশের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন সম্মান ‘অশোক চক্র’ পেলেন ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা (Shubhanshu Shukla)। ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে এই সম্মানে ভূষিত করা হল তাঁকে। এর আগে মহাকাশে পাড়ি দেওয়া প্রথম ভারতীয় নভশ্চর রাকেশ শর্মা (Rakesh Sharma) এই একই সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ ৪১ বছর পরে দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে সেই ঐতিহাসিক তালিকায় নাম জুড়ল শুভাংশুর।
উল্লেখ্য, ভারতের মহাকাশ অভিযানে শুভাংশুর অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পথনির্দেশ। গত বছরের ২৫ জুন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) -এর উদ্দেশ্যে স্পেসএক্সের ড্রাগন মহাকাশযানে তিনি যাত্রা করেন। এই অভিযানে তিনি ছিলেন অ্যাক্সিয়ম-৪ মিশনের অংশ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মিশন কমান্ডার পেগি হুইটসন (Peggy Whitson), মিশন বিশেষজ্ঞ স্লাওস উজানস্কি-উইজ়নিউস্কি (Sławosz Uznański-Wiśniewski) এবং টিবর কাপু (Tibor Kapu)। প্রায় ১৮ দিন মহাকাশে কাটিয়ে সফলভাবে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন শুভাংশু ও তাঁর সহযাত্রীরা।
রাকেশ শর্মার পরে দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে মহাকাশে পা রাখা শুভাংশু একাধিক দিক থেকেই অনন্য। তিনি আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে পৌঁছনো প্রথম ভারতীয়। এই অভিযানে নাসা (NASA) এবং ইসরো (ISRO) -এর যৌথ উদ্যোগে একাধিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় শূন্য মাধ্যাকর্ষণে থাকার ফলে মানবদেহে যে পরিবর্তন ঘটে, তা নিয়ে গবেষণা ছিল এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। মহাকাশে দীর্ঘ দিন কাটালে পেশি ও হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে, এই সমস্যার বাস্তব অভিজ্ঞতা আগেই সামনে এসেছিল মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামস (Sunita Williams) -এর ক্ষেত্রে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যত মহাকাশ অভিযানে কীভাবে এই সমস্যা এড়ানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা করেন শুভাংশু ও তাঁর দল। এই গবেষণাগুলি ভারতের আসন্ন ‘গগনযান’ প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। মানববাহী মহাকাশ অভিযানে ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে শুভাংশুর এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। শুধু গবেষণাই নয়, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
মহাকাশচারী হিসেবে পরিচিত হলেও শুভাংশুর আর একটি পরিচয় সমান ভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি একজন দক্ষ যুদ্ধবিমানচালক। ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে মিগ (MiG), জাগুয়ার (Jaguar), সুখোই (Sukhoi) -সহ একাধিক যুদ্ধবিমান ওড়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সব মিলিয়ে প্রায় ২০০০ ঘণ্টার বেশি উড়ান অভিজ্ঞতা তাঁকে দেশের অন্যতম অভিজ্ঞ পাইলটদের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে। এই সামরিক দক্ষতা এবং বৈজ্ঞানিক অভিযানের সমন্বয়ই তাঁকে অশোক চক্র সম্মানে ভূষিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিয়েছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। অন্যদিকে, মহাকাশ থেকে ফিরে আসার পরে গত বছরের অগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন শুভাংশু। সেই সময় তিনি মহাকাশ অভিযানে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ভারতের জাতীয় পতাকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। সেই মুহূর্তটি দেশবাসীর কাছে আবেগঘন হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় শুভাংশু তাঁর অভিজ্ঞতা, গবেষণার ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
উল্লেখ্য যে, এর আগে ১৯৮৪ সালের এপ্রিল মাসে সোভিয়েত রাশিয়ার ‘সোয়ুজ় টি-১১’ (Soyuz T-11) মহাকাশযানে চড়ে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন রাকেশ শর্মা। তিনি স্যালিউট ৭ (Salyut 7) মহাকাশ স্টেশনে প্রায় আট দিন কাটান। নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসার পরে তাঁকেও অশোক চক্র সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার চার দশকেরও বেশি সময় পরে শুভাংশুর হাতে একই সম্মান তুলে দেওয়া হল, যা ভারতের মহাকাশ অভিযানের ধারাবাহিক সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে। প্রসঙ্গত, ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে কেন্দ্র সরকার সামরিক বাহিনীর মোট ৭০ জন সদস্যকে বীরত্বের সম্মানে ভূষিত করার ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশুকে অশোক চক্র দেওয়ার পাশাপাশি তিন জন পাচ্ছেন কীর্তি চক্র, ১৩ জন পাচ্ছেন শৌর্য চক্র। এই সম্মানগুলি শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং দেশের প্রতিরক্ষা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ওয়াকিবহাল মহলের মত, শুভাংশু শুক্লর অশোক চক্র আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র শুধু মাটিতে সীমাবদ্ধ নয়, মহাকাশও আজ দেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। রাকেশ শর্মার পথ অনুসরণ করে শুভাংশু যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়েই থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubhanshu Shukla first Indian astronaut ISS | প্রথম ভারতীয় নভোচারীর বীরের মতো প্রত্যাবর্তন, লখনউয়ে শুভাংশু শুক্লাকে ঘিরে উচ্ছ্বাস




