সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ওয়াশিংটন : বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড়সড় ধাক্কা। কোভিড অতিমারি মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-এর (WHO বা World Health Organization) সদস্যপদ ছেড়ে দিল আমেরিকা (United States of America)। আগেই এই সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত মিলেছিল। এবার তা কার্যকর হল। বৃহস্পতিবার থেকে হু-র সঙ্গে সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে আমেরিকার স্বাস্থ্য দফতর (US Department of Health)। একই সঙ্গে হু-কে দেওয়া সব ধরনের আর্থিক অনুদান বন্ধ করার সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়েছে।
ব্লুমবার্গ (Bloomberg) -এর প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের জেরে শুধু অনুদানই বন্ধ হয়নি, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা হু-এর দফতরগুলি থেকে মার্কিন আধিকারিকদেরও দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। অর্থাৎ, হু-এর নীতিনির্ধারণ ও কার্যকরী পরিকাঠামোয় আর কোনওভাবেই যুক্ত থাকছে না আমেরিকা। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কূটনীতিতে যা এক ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে। উল্লেখ্য যে, আমেরিকার অভিযোগ, রাষ্ট্রপুঞ্জের (United Nations) নিয়ন্ত্রণাধীন এই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ অতিমারির সময় বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। হোয়াইট হাউস (White House) -এর তরফে দাবি করা হয়েছে, হু রাজনৈতিকভাবে একাধিক দেশের প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছিল। তার ফলেই প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। এই অভিযোগ নতুন নয়, তবে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেরার পর বিষয়টিকে কার্যকরী রূপ দেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পরেই ট্রাম্প প্রশাসন হু থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশনামায় স্বাক্ষর করেছিল। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনও দেশ হু-এর সদস্যপদ ছাড়তে চাইলে এক বছর আগে নোটিস দিতে হয়। সেই সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার পরেই এবার আনুষ্ঠানিক ভাবে হু-র সদস্যপদ ছাড়ল আমেরিকা। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে আর্থিক বিতর্কও কম নয়। হু-এর দাবি অনুযায়ী, আমেরিকার কাছ থেকে এখনও ২৬ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৪০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। নিয়ম অনুযায়ী, কোনও দেশ সদস্যপদ ছাড়ার আগে বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য। কিন্তু আমেরিকা সেই দাবি মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, সদস্যপদ ত্যাগের ক্ষেত্রে এমন কোনও বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। ফলে এই বকেয়া অর্থ আদায় হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়কালে হু-র সবচেয়ে বড় আর্থিক অনুদানদাতা দেশ ছিল আমেরিকাই। বিশ্বজুড়ে রোগনির্ণয়, টিকাকরণ, অতিমারি মোকাবিলা, প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সংক্রামক রোগ নির্মূলে হু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে পোলিও নির্মূলকরণ কর্মসূচিতে আমেরিকার আর্থিক সহায়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার সরে যাওয়া বিশ্বস্বাস্থ্যের উপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে পোলিও নির্মূলের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি ধাক্কা খেতে পারে। উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলিতে প্রসূতি ও শিশুদের পুষ্টি সংক্রান্ত প্রকল্পগুলিও অর্থের অভাবে সমস্যায় পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করা সহজ হবে না বলেই মত তাঁদের। হু-এর একাধিক আধিকারিক জানিয়েছেন, আমেরিকার মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির সরে যাওয়া শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং নীতিগত দিক থেকেও বড় ধাক্কা। কারণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্য আদানপ্রদান এবং জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারির ক্ষেত্রে আমেরিকার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যদিও হু-এর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বস্বাস্থ্যের স্বার্থে কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে এবং অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলির সহযোগিতায় এই ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’ অন্য দিকে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্ত ঘিরে মতভেদ স্পষ্ট। বিরোধী শিবিরের দাবি, হু থেকে সরে গিয়ে আমেরিকা নিজের প্রভাবই কমাল। তাঁদের মতে, ভিতরে থেকে সংস্কারের চেষ্টা করলে বেশি ফলপ্রসূ হত। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, ‘একটি ব্যর্থ ও রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত সংস্থায় অর্থ ঢালা আমেরিকার করদাতাদের সঙ্গে অন্যায়।’
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। এক দিকে যেমন হু-র আর্থিক কাঠামো নতুন করে সাজানোর চাপ বাড়বে, অন্য দিকে তেমনই চিন (China) বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union) -এর মতো শক্তিগুলির প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক কুটনৈতিক মহল সূত্রে উল্লেখ, কোভিড অতিমারির অভিঘাত কাটতে না কাটতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই বড়সড় ভাঙন নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া ভবিষ্যতের অতিমারি মোকাবিলা আদৌ সম্ভব কি না। আমেরিকার এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনই পুরোপুরি বোঝা না গেলেও, বিশ্বস্বাস্থ্য রাজনীতিতে এটি যে একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা, তা নিয়ে একমত বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Namrata Shirodkar business | অভিনয় ছেড়ে ব্যবসার দুনিয়ায় সফল নম্রতা শিরোদকর, মহেশবাবুর স্ত্রী হিসেবে নয় নিজের সম্পত্তিতেই নজর কাড়লেন দক্ষিণী পাওয়ার কাপল -এর অর্ধাঙ্গিনী




