পার্বতী কাশ্যপ ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ভারতীয় শিল্প ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা কোনও সরকারি নথি বা চুক্তিপত্রে লেখা নেই, অথচ যার প্রভাব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহমান। তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম হয়েছিল ১৮৯৩ সালে, সমুদ্রপথে এক জাহাজের ডেকে। সেই সময় স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda) এবং জামশেটজি টাটা-এর (Jamsetji Tata) মধ্যে হওয়া একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর আলাপচারিতা ভবিষ্যতের টাটা সাম্রাজ্যের ভিত রচনা করেছিল বলেই ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন। এককথায় বলা যায়, সেই কথোপকথনই ভারতীয় শিল্পায়নের নৈতিক দিকনির্দেশ ঠিক করে দিয়েছিল। ১৮৯৩ সাল। জাপানের ইয়োকোহামা বন্দর থেকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারগামী জাহাজ ‘এসএস এম্প্রেস অফ ইন্ডিয়া’ (SS Empress of India)। জাহাজের প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের মধ্যেই ছিলেন দুই ভিন্ন জগতের মানুষ। একজন গৈরিক বসনধারী সন্ন্যাসী, তিনি শিকাগোর ধর্ম সংসদে ভারতের বাণী পৌঁছে দিতে যাচ্ছেন। অন্যজন, দূরদর্শী শিল্পপতি, তিনি পশ্চিমে যাচ্ছেন শিল্পের কাঁচামাল ও আধুনিক প্রযুক্তির খোঁজে। সেই দুই যাত্রীই ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ ও জামশেটজি টাটা।
প্রথমে সৌজন্যমূলক আলাপ হলেও কথাবার্তা দ্রুতই গভীর দার্শনিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় পৌঁছে যায়। জানা যায়, আলোচনার একটা পর্যায়ে স্বামী বিবেকানন্দ জামশেটজিকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি যে শিল্পের জন্য কাঁচামাল আর প্রযুক্তির খোঁজে বিদেশে যাচ্ছেন, তার চাবিকাঠি তো ব্রিটিশদের হাতেই থাকবে। তাহলে ভারত কী ভাবে স্বাধীনভাবে শিল্পে স্বনির্ভর হবে?’ এই প্রশ্নেই যেন চমকে উঠেছিলেন জামশেটজি।স্বামীজির যুক্তি ছিল আরও পরিষ্কার। তাঁর মতে, ভারত কেবল কাঁচামাল রপ্তানি করে ও প্রস্তুত সামগ্রী আমদানি করে কখনও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারবে না। বরং প্রয়োজন দেশের মাটিতেই ইস্পাত শিল্প ও ভারী শিল্প স্থাপন। তবে তার জন্য শুধু কারখানা নয়, প্রয়োজন মানসম্পন্ন বিজ্ঞান শিক্ষা। স্বামী বিবেকানন্দ সেদিন জামশেটজিকে বলেছিলেন, ‘যুবসমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে না পারলে শিল্পও টিকবে না।’ সেই সঙ্গে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, ভারতে একটি উচ্চমানের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার।
এই এককথার প্রভাব জামশেটজি টাটার মনে কতটা গভীর ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় কয়েক বছর পর। ১৮৯৮ সালে, যখন জামশেটজি ভারতে একটি বিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনা করেন, তখন তিনি স্বামী বিবেকানন্দকে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস, সেই জাহাজের ডেকে আমাদের কথোপকথন আপনার এখনও মনে আছে। আমি এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে চাই, যেখানে আপনার দর্শনের সঙ্গে বিজ্ঞানের মিলন ঘটবে।’ তখন অবশ্য স্বামী বিবেকানন্দ শারীরিকভাবে অসুস্থ। সরাসরি কাজের তদারকি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবু তিনি তাঁর শিষ্যা সিস্টার নিবেদিতাকে (Sister Nivedita) এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে বলেন। ব্রিটিশ সরকারের নানা রকম অনীহা ও প্রশাসনিক বাধা সত্ত্বেও, বিবেকানন্দের আদর্শ ও নিবেদিতার সক্রিয় ভূমিকার ফলে মহীশূরের মহারাজার জমিতে গড়ে ওঠে আজকের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’ (Indian Institute of Science – IISc)। যদিও এই প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ রূপে গড়ে ওঠার দৃশ্য দেখে যেতে পারেননি স্বামী বিবেকানন্দ বা জামশেটজি টাটা, দু’জনের কেউই। পরবর্তী সময়ে জামশেটজি টাটার স্বপ্ন বাস্তব রূপ নেয় টাটা স্টিল (Tata Steel), জামশেদপুর (Jamshedpur) শহর এবং টাটা গ্রুপের বিস্তারে। তবে এই শিল্প সাম্রাজ্যের ভিত ছিল কেবল মুনাফা নয়। মানবকল্যাণ, শ্রমিকদের অধিকার, শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতা, এই মূল্যবোধই টাটা দর্শনের মূল স্তম্ভ হয়ে ওঠে। অনেকের মতে, এই নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বীজ বপন হয়েছিল স্বামী বিবেকানন্দের সেই এককথাতেই।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যখন ভারতের শিল্পায়ন ও আত্মনির্ভরতার কথা বলা হয়, তখন সেই ১৮৯৩ সালের জাহাজযাত্রার গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় আসে। ইতিহাস সাক্ষী, কখনও কখনও একটি কথাই বদলে দিতে পারে একটি দেশের ভবিষ্যৎ। স্বামী বিবেকানন্দ ও জামশেটজি টাটার সেই সংলাপ তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :

স্বামী বিবেকানন্দ, জামশেটজি টাটা, টাটা সাম্রাজ্যের ইতিহাস, ভারতীয় শিল্পায়ন, IISc ইতিহাস,
বিবেকানন্দ ও টাটা, টাটা সাম্রাজ্যের সূচনা, স্বামী বিবেকানন্দ শিল্প দর্শন,
Swami Vivekananda, Jamsetji Tata, Tata Empire history, Indiaindustrialization, IISc origin, Vivekananda Jamsetji Tata meeting, Tata empire origin, Indian industrial history,




