সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: বায়ুদূষণের লাগাম টানতে বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীতে কার্যকর হল ‘নো পিইউসি, নো ফুয়েল’ নীতি। এর জেরে দিল্লির বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দেখা গেল একেবারেই ভিন্ন চিত্র। স্বাভাবিক দিনের তুলনায় গাড়ির ভিড় কম, প্রবেশপথে কড়া নজরদারি, আর দূষণ নিয়ন্ত্রণ শংসাপত্র বা পিইউসি (Pollution Under Control – PUC) না থাকলে জ্বালানি না দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ। সকাল থেকেই একাধিক পাম্পে যানবাহনের কাগজ পরীক্ষা করতে দেখা যায় পরিবহণ দফতর ও ট্রাফিক পুলিশের যৌথ দলকে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নীরব পরিবেশ লক্ষ্য করা যায় বহু পেট্রোল পাম্পে। যেসব গাড়ি এসেছে, সেগুলিকে লাইনে দাঁড় করিয়ে আগে পিইউসি সার্টিফিকেট যাচাই করা হয়েছে। যাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় নথি ছিল না, তাঁদের অনেককেই জ্বালানি না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কয়েকজন চালককে ফোনে পরিচিতদের সাহায্য চাইতেও দেখা যায়। কোথাও কোথাও হালকা অসন্তোষ প্রকাশ পেলেও বড় কোনও অশান্তির খবর নেই।জনপথ (Janpath) এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা মুকেশ কুমার (Mukesh Kumar) বলেন, ‘দূষণ কমাতে নিয়ম দরকার, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষ কষ্টার্জিত অর্থে গাড়ি কিনেছে, হঠাৎ করে ব্যবহার বন্ধ করা কি বাস্তবসম্মত?’ তাঁর বক্তব্যে যেমন বাস্তবের প্রশ্ন উঠে এসেছে, তেমনই অনেক গ্রাহক এই সিদ্ধান্তকে সমর্থনও করেছেন। একই পাম্পে আরেকজন গ্রাহক জানান, ‘দিল্লির বাতাস যে অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এই নিয়ম প্রয়োজনীয়।’
এই নতুন নিয়ম কার্যকর করতে মাঠে নামানো হয়েছে দিল্লি ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (Delhi Transport Corporation – DTC) -এর আধিকারিকদেরও। এক পেট্রোল পাম্পে দায়িত্বে থাকা ডিটিসি ইনচার্জ জেডি শর্মা (JD Sharma) বলেন, ‘এখানে কোনও ক্যামেরা নেই, তাই আমাদের হাতে হাতে পরীক্ষা করতে হচ্ছে। পিইউসি সার্টিফিকেট দেখা হচ্ছে, গাড়ির নম্বর নথিভুক্ত করা হচ্ছে এবং পরে তা সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হবে।’ তাঁর কথায় স্পষ্ট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো অনেক জায়গায় মানবনির্ভর তদারকির উপর ভরসা করতে হচ্ছে। দিল্লি-নয়ডা (Delhi-Noida) সীমান্ত এলাকায় আরও কড়া নজরদারি চোখে পড়ে। সেখানে ডিটিসি সাব-ইন্সপেক্টর জিতেন্দ্র কুমার (Jitendra Kumar) নিজে দাঁড়িয়ে গাড়ির কাগজ পরীক্ষা করেন। তিনি জানান, ‘আমরা বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে যাচাই করছি গাড়িগুলি বিএস-সিক্স (BS-VI) মান মেনে চলছে কি না এবং পিইউসি সার্টিফিকেট বৈধ কি না। যেগুলি মান পূরণ করছে না, সেগুলিকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।’ তাঁর দাবি, সচেতনতা বাড়ায় এদিন এই ধরনের গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে সকাল থেকেই প্রায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে পিইউসি সংক্রান্ত লঙ্ঘনের জন্য।পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনগুলিও এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। দিল্লি পেট্রোল ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (Delhi Petrol Dealers’ Association) সভাপতি নিশাল সিঙ্ঘানিয়া (Nischal Singhania) জানান, ‘এখনও পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ। একাধিক পাম্পে ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহণ দফতরের এনফোর্সমেন্ট টিম রয়েছে। মাইকে খুব বেশি ঘোষণা হচ্ছে না, কিন্তু গাড়ির সংখ্যা যে কমেছে তা স্পষ্ট।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে হয়তো পাশের রাজ্য থেকে জ্বালানি নিচ্ছেন। তাই আমরা চাই, গোটা এনসিআর (NCR) জুড়ে একসঙ্গে এই নিয়ম কার্যকর হোক।’
উল্লেখ্য, সব পক্ষ যে পুরোপুরি সন্তুষ্ট, তা নয়। এক পেট্রোল পাম্প মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এনফোর্সমেন্ট এত বেশি যে ব্যবসায়িক চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে মানবশক্তি মোতায়েন রাখা কতটা টেকসই, সেটা বড় প্রশ্ন।’ তিনি আরও জানান, অটোমেটিক নাম্বার প্লেট রিডার (Automatic Number Plate Reader – ANPR) ক্যামেরা থাকলেও সেগুলি সব সময় ভেহান (Vahan) ডেটাবেসের সঙ্গে সঠিকভাবে মিলিয়ে তথ্য দিতে পারছে না। ফলে শেষ পর্যন্ত শারীরিকভাবে কাগজ পরীক্ষা করতেই হচ্ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘নো পিইউসি, নো ফুয়েল’ নীতি দিল্লির মতো দূষণকবলিত শহরের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে শুধু নিয়ম চালু করলেই হবে না, তার সুষ্ঠু ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি, বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার এবং সচেতনতা বাড়ানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। আপাতত, প্রথম দিনের অভিজ্ঞতায় প্রশাসন ও পেট্রোল পাম্প মালিক, দু’পক্ষই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আগামী দিনে নিয়ম আরও কীভাবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Delhi NCR dense fog | ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকল দিল্লি-এনসিআর, দৃষ্টিসীমা কমে ব্যাহত সড়ক ও রেল চলাচল, সতর্ক প্রশাসন



