বসুধা চৌধুরী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর থেকেই বহু ভোটারের মনে প্রশ্ন, নাম থাকলেও কি নিশ্চিন্ত থাকা যাবে? না কি হঠাৎ করে ডাক আসতে পারে ‘হিয়ারিং’-এর? নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision (SIR) 2025 প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শুরু হয়েছে Special Electoral Roll Hearing। কমিশনের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ভোটার সংক্রান্ত কোনও তথ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ডাকা হবে শুনানিতে। এই হিয়ারিংয়ে কী করতে হবে, কেন ডাকা হচ্ছে এবং সঙ্গে কী কী নথি রাখতে হবে, এই সব বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধন্দ তৈরি হয়েছে। সেই সব প্রশ্নের উত্তরই এবার প্রকাশ্যে আনল কমিশন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকা, ব্যক্তিগত তথ্যের অসঙ্গতি, ঠিকানা বা জন্মতারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি কিংবা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সন্দেহ, এই সব কারণেই মূলত হিয়ারিংয়ের ডাক আসতে পারে। কমিশনের মতে, ‘ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা বজায় রাখতেই এই শুনানির ব্যবস্থা’। অর্থাৎ, এটি কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নয়, বরং যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া। যদি আপনার বিরুদ্ধে কোনও প্রশ্ন ওঠে, তা হলে প্রথমেই নির্বাচন কমিশন আপনাকে নোটিস পাঠাবে। সেই নোটিস সরাসরি আপনার হাতে পৌঁছে দেবেন সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসার (BLO)। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইলে মেসেজ করেও জানানো হতে পারে। নোটিসে স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকবে, কবে, কোথায় এবং কোন কারণে আপনাকে হিয়ারিংয়ে হাজির হতে হবে। সাধারণত আপনার নিজের জেলার মধ্যেই কোনও সরকারি দফতরে এই শুনানি হবে। জেলা শাসকের কার্যালয়, মহকুমা শাসকের অফিস বা অন্য কোনও নির্ধারিত সরকারি ভবন- এই সব জায়গাতেই হিয়ারিং আয়োজন করা হতে পারে।
হিয়ারিংয়ে পৌঁছনোর পর প্রথমেই আপনার সঙ্গে কথা বলবেন নির্বাচনী আধিকারিকরা। এই দায়িত্বে থাকবেন ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (Electoral Registration Officer – ERO) অথবা অ্যাসিস্ট্যান্ট ইআরও (Assistant ERO – AERO)। তাঁরা আপনাকে সরাসরি প্রশ্ন করবেন, আপনাকে কেন ডাকা হয়েছে তা জানেন কি না। এরপর জানানো হবে, ঠিক কোন তথ্য দেখে কমিশনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারও ক্ষেত্রে জন্মতারিখ নিয়ে অসঙ্গতি, কারও ক্ষেত্রে ঠিকানা বদল, আবার কারও ক্ষেত্রে খসড়া তালিকায় নাম বাদ পড়ার কারণ, সবটাই ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। এই শুনানিতে আপনার প্রধান দায়িত্ব হল নিজের পরিচয় ও তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করা। নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিকের কথায়, ‘হিয়ারিংয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাঁদের ডাকা হচ্ছে, তাঁদের কেবলমাত্র বৈধ নথি দেখিয়ে নিজেদের তথ্য যাচাই করাতে হবে’। তাই হিয়ারিংয়ে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সঙ্গে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
যদি কমিশনের সন্দেহ আপনার পরিচয় বা জন্ম সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে হয়, তা হলে জন্ম তারিখের প্রমাণ হিসেবে Birth Certificate, মাধ্যমিকের Admit Card, পাসপোর্ট বা সমমানের কোনও সরকারি নথি দেখাতে হতে পারে। একই সঙ্গে ঠিকানার প্রমাণও চাইতে পারে কমিশন। সেক্ষেত্রে আধার কার্ড, ভোটার আইডি, রেশন কার্ড, বিদ্যুৎ বিল, জলকর রসিদ কিংবা সরকারি বাসস্থানের নথি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। মূল লক্ষ্য একটাই, আপনি যে সত্যিই উল্লিখিত ঠিকানার স্থায়ী বাসিন্দা, তা নিশ্চিত হওয়া।
বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, যদি নাগরিকত্ব বা রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তা হলে আপনাকে অতিরিক্ত নথিও দেখাতে হতে পারে। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, আপনি যে পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) স্থায়ী বাসিন্দা, তার যথাযথ প্রমাণ দিতে হবে। তবে নথি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কমিশন কোনও অযৌক্তিক কড়াকড়ি করছে না বলেই দাবি আধিকারিকদের। তাঁদের বক্তব্য, ‘সাধারণ মানুষের সুবিধার কথাই মাথায় রেখে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে’। হিয়ারিং চলাকালীন আপনার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা হবে। প্রয়োজনে আপনাকে লিখিত বিবৃতি জমা দিতে বলা হতে পারে। সব নথি ও বক্তব্য খতিয়ে দেখে ইআরও বা এইআরও সিদ্ধান্ত নেবেন, আপনার নাম খসড়া তালিকায় রাখা হবে কি না, কিংবা কোনও সংশোধন প্রয়োজন আছে কি না। যদি সব কিছু সন্তোষজনক হয়, তা হলে আপনার ভোটার হিসেবে অধিকার বজায় থাকবে। অন্য দিকে, অসঙ্গতি ধরা পড়লে কমিশন নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
নির্বাচন কমিশনের তরফে আরও জানানো হয়েছে, এই হিয়ারিং কোনওভাবেই হয়রানির উদ্দেশ্যে নয়। তা ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়া এবং প্রকৃত ভোটারের অধিকার সুরক্ষিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এক আধিকারিকের কথায়, ‘সঠিক নথি থাকলে চিন্তার কোনও কারণ নেই’। তাই যাঁদের ডাক এসেছে, তাঁদের আতঙ্কিত না হয়ে নির্ধারিত দিনে হাজির হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, Special Electoral Roll Hearing ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সচেতনতা ও সঠিক নথির মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়া সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব। কমিশনের বার্তা স্পষ্ট, ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখতে সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : West Bengal SIR Ghost Voters | বঙ্গে ভোটার তালিকায় ৫৪.৬ লাখ মৃত-ডুপ্লিকেট ভোটার চিহ্নিত




