প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন অসহ্য অস্বস্তির সঙ্গে লড়াই করে যেতে হয় অধিকাংশ মহিলাকে। পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগের কয়েক দিন থেকেই আচরণে দেখা যায় প্রকট পরিবর্তন, কখনও হঠাৎ রাগ, কখনও কান্না পায়, আবার কখনও সারাদিন অস্থিরতা গ্রাস করে ফেলে। চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ভাষায় এই আচরণগত ওঠানামাকে বলা হয় মুড সুইং (Mood Swings), যা মূলত প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোম বা PMS-এর একটি অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে যেন লড়াই করে যেতে হয় এই সময়টায়।
গবেষণা জানাচ্ছে, পৃথিবীর প্রায় ৭৫% মহিলাই এই সময়ে মুড সুইংয়ের সমস্যার মুখোমুখি হন। গাইনোকোলজিস্ট ডা. সুপ্রিয়া সেন জানান, “মাসিকের আগে ও চলাকালীন সময়ে হরমোনের ওঠানামা এতটাই তীব্র হয় যে মস্তিষ্কের সেরোটোনিন লেভেল দ্রুত পাল্টে যায়। ফলে আচরণে অস্থিরতা ও বিরক্তি স্বাভাবিক।” তাঁর কথায়, এটিকে সাধারণ লক্ষণ বলে এড়িয়ে গেলে চলবে না, কারণ তীব্র হলে এটি প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিস্ফোরিক ডিসঅর্ডার বা PMDD -এর দিকেও এগোতে পারে। মুড সুইংয়ের পিছনে প্রধান ভূমিকা পালন করে শরীরে নানা ধরনের হরমোনের পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিরিয়ডের আগের সপ্তাহে ইস্ট্রোজেন (Estrogen) হরমোনের মাত্রায় দ্রুত পতন ঘটে। ইস্ট্রোজেন সরাসরি সেরোটোনিন (Serotonin) নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, যা ভালো মুড তৈরি করে। ফলে ইস্ট্রোজেন কমে গেলে মন-মেজাজ খিটখিটে হতে থাকে। পাশাপাশি প্রোজেস্টেরন (Progesterone) হরমোনও এই সময়ে হ্রাস পায়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরকে শান্ত ও স্থির থাকতে সাহায্য করে। যখন এটি কমতে শুরু করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ, টেনশন ও মানসিক অস্থিরতা বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন : Scam, Safe Travel Tips | বেড়াতে গিয়ে সর্বস্বান্ত! ভ্রমণপ্রেমীরা কীভাবে এড়াবেন স্ক্যামের ফাঁদ?
আচমকা সেরোটোনিন কমে যাওয়ায় আসে খারাপ লাগা, কান্না পেতে থাকা কিংবা গভীর বিষণ্ণতা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অরিন্দম রায় বলেন, “অনেক মহিলা মনে করেন তাঁরা ইচ্ছে করে রাগ করছেন বা অস্থির হচ্ছেন। অথচ সত্যি বলতে এই সময়ে শরীরের ভেতরের রাসায়নিক পরিবর্তনই মূলত আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে।” তবে শুধু হরমোন নয়, পিরিয়ডের সময় শারীরিক ব্যথা ও ক্লান্তিও মুড সুইং আরও বাড়িয়ে তোলে। প্রচণ্ড তলপেটের ব্যথা (Cramps), পিঠে টান, মাথা ব্যথা কিংবা বমিভাব মানসিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে। এ ছাড়া কর্টিসোল (Cortisol) বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মন-মেজাজে অস্থিরতা বাড়ে। অনেকের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার ওঠানামাও বিরক্তি বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে যাঁরা পিরিয়ডের আগে মিষ্টি বা জাঙ্ক ফুডের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট।
এই সবের পাশাপাশি ঘুমের অভাবও মুড সুইংয়ের বড় কারণ। হরমোন পরিবর্তনের জন্য অনেকেই পিরিয়ডের সময় ইনসমনিয়ায় ভোগেন, যা মানসিক অবসাদকে তীব্র করে তোলে। কিছু ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্যান্য অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির অসামঞ্জস্যও PMS-কে আরও জটিল করে তোলে। কিন্তু, সমস্যা যতই জটিল মনে হোক, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সহজ অভ্যাসই মুড সুইং নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। যেমন নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীরে এন্ডর্ফিন নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে মুড ভাল করে। বিশেষজ্ঞ ডা. সেন বলেন, “হালকা হাঁটা, যোগ বা স্ট্রেচিং PMS-এর লক্ষণ কমাতে অসাধারণ ভাবে সাহায্য করে।” পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চললে মুড সুইং অনেকটাই কমে আসে।
পিরিয়ডের আগে এবং চলাকালীন পর্যাপ্ত ঘুম, প্রচুর জলপান এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট খুব জরুরি। মেডিটেশন, ডিপ ব্রিদিং কিংবা নিজের পছন্দের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন বি৬, ম্যাগনেসিয়াম বা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাও উপকারী হতে পারে। মুড সুইংয়ের মাত্রা যদি এতটাই বেশি হয় যে দৈনন্দিন জীবনে কাজকর্ম ব্যাহত হয়, তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। ডা. অরিন্দম রায় বলেন, “PMDD হলে চিকিৎসা প্রয়োজন। সঠিক পরামর্শ পাওয়া গেলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।” সুতরাং, পিরিয়ডের সময় মুড সুইং কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বরং শরীরে জটিল হরমোন পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু নিজের শরীরকে বোঝা ও যথাসময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াই পারে এই মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Periods During Vacation | ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ পিরিয়ডস! ব্যথাকে বলুন টা টা, বিন্দাস থাকুন সহজ কিছু টিপসে




