সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : রাজ্যসভায় শুক্রবার মালদার আদিনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হল। বিজেপি সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার সুরক্ষা, প্রত্নতাত্ত্বিক পরিস্কার ব্যাখ্যা এবং পুনরুদ্ধারের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য ঘিরে শাসক ও বিরোধী দলের সাংসদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তেজনা ও বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। মালদার গৌড়-লৌকিক সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এই আদিনাথ মন্দির, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রবল টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) রাজ্যসভায় বলেন, ‘এই মন্দির শুধু ইট-কাঠের স্থাপনা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক। বহু বছর ধরে এর রক্ষণাবেক্ষণ অবহেলায় পড়ে আছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে অমূল্য এই ইতিহাস হারিয়ে যেতে পারে।’ তিনি আরও দাবি করেন যে, মালদার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির কারণে মন্দির চত্ত্বরে ক্ষয় ও নাশ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিরীক্ষার অভাবে ঐতিহাসিক সত্য ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাংসদ তাঁর বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রকের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং একটি বিশেষ প্রত্নতাত্ত্বিক দল পাঠানোর অনুরোধ জানান। তাঁর ভাষায়, ‘একটি সঠিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ছাড়া আমরা বুঝতেই পারব না এই স্থাপনার প্রকৃত বয়স, ইতিহাস এবং তার বর্তমান অবস্থার মাত্রা কতখানি ভয়াবহ। কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।’
এই বক্তব্য শোনার পরই তৃণমূল কংগ্রেসসহ (TMC) ইণ্ডি জোটের সাংসদরা তীব্র আপত্তি জানান। তাঁদের দাবি, রাজ্য সরকার যথাযথ কাজ করছে এবং বিজেপির পক্ষ থেকে এই বিষয়কে ‘রাজনৈতিক রং’ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তৃণমূল সাংসদরা অভিযোগ করেন বিজেপি সাংসদ ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্য সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে চাইছেন। বিরোধিতার জবাবে শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) সরাসরি পাল্টা বক্তব্য দিয়ে বলেন, ‘এটি রাজনীতির বিষয় নয়। ঐতিহ্যকে বাঁচানো কোনও দলের একার দায়িত্ব নয়, এটি দেশের সম্পদ। আর সেই সম্পদের হাল যখন খারাপ, তখন সংসদে তা তোলা আমার দায়িত্ব।’ তিনি আরও জানান, স্থানীয়দের বহুদিনের অভিযোগ যে মন্দির চত্বরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই, এবং নানা কারণে স্থাপনার কিছু অংশ ক্রমে ভেঙে পড়ছে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্যসভায় ক’য়েক মুহূর্তের জন্য সরব পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুই পক্ষের সাংসদদের তর্ক-বিতর্কে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উপ-সভাপতি বারবার অনুরোধ করেন শান্ত হতে এবং বিষয়টি নিয়ম অনুযায়ী আলোচনা করতে। যদিও কয়েক মিনিটের জন্য কক্ষের পরিবেশ উত্তেজিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত আলোচনা পুনরায় স্বাভাবিক গতি ফিরে পায়। উল্লেখ্য যে দীর্ঘদিন এই মন্দির ঘিরে জনগণের ভেতরে চাপানোতর চলছে। ফলে, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে দৃষ্টি রাখা খুব জরুরি বলেই মনে করছে বুদ্ধিজীবী মহল।
মালদার আদিনাথ মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে গবেষকদের মতে, এই স্থাপনাটি অঞ্চলের প্রাচীন শৈব সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের অমূল্য দলিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সঠিক পরিচর্যার অভাবে মন্দিরের বিভিন্ন অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় পুরাতাত্ত্বিকেরা বহুবার দাবি করেছেন মন্দিরটির পূর্ণাঙ্গ জরিপ প্রয়োজন, এবং তার ভিত্তিতে পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করা জরুরি।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লোকসভা নির্বাচনের আগে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে চলেছে। আদিনাথ মন্দির ইস্যু সেই চাপানউতোরেরই একটি বড় উদাহরণ। শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, তবে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কোন দিকে যায় তা নিয়েই এখন কৌতূহল তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও প্রতিক্রিয়া জোরাল। তাঁদের অভিযোগ, বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কোনও সরকারই কার্যকর ভাবে মন্দিরকে রক্ষার উদ্যোগ নেয়নি। তাঁরা চান কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিতভাবে জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প হাতে নিক। কারণ তাঁদের ভাষায়, ‘আমাদের ইতিহাস হারিয়ে যাওয়ার আগে জেগে ওঠা জরুরি।’ উল্লেখ্য, রাজ্যসভায় তোলা বিষয়টির পর এখন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রক কী সিদ্ধান্ত নেয়, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ আদৌ শুরু হয় কিনা, এখন সব নজর সেই দিকেই।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Samik Bhattacharya | মন্দারমণির অবৈধ রিসোর্ট থেকে রাজবংশী-কামতাপুরি ভাষা স্বীকৃতি : রাজ্যসভায় দ্বিমুখী ইস্যুতে সরব শমীক ভট্টাচার্য


