মধুজা সান্যাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : সিনেমা মানেই আবেগ, শিল্প আর সংস্কৃতির সেতুবন্ধন। সেই আবেগ নিয়েই শুরু হতে চলেছে ৩১ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (31st Kolkata International Film Festival – KIFF)। ৬ নভেম্বর থেকে পর্দা উঠছে টলিউডের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই উৎসবের। এবারের আয়োজনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে ক্লাসিক ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ, পুরনো দিনের নস্টালজিয়া থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা, সব কিছুই জায়গা পাচ্ছে এই বর্ণাঢ্য উৎসবে।
উৎসবের আগে রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস (Aroop Biswas), ইন্দ্রনীল সেন (Indranil Sen), শান্তনু বসু (Shantanu Basu), হরনাথ চক্রবর্তী (Haranath Chakraborty), অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee), কোয়েল মল্লিক (Koel Mallick), জুন মালিয়া (June Maliah) এবং পোল্যান্ডের প্রতিনিধি জয়দীপ রায় (Jaydeep Roy) উপস্থিত ছিলেন। উৎসবের প্রস্তুতি, নতুনত্ব ও এ বছরের আকর্ষণ নিয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন তাঁরা। রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, “কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুধু একটা ফেস্টিভ্যাল নয়, এটা বাংলার গর্ব। সিনেমা মানুষকে যুক্ত করে, বিভাজন নয়, সংযোগ ঘটায়। আমরা চাই এই উৎসবের মাধ্যমে বিশ্বের সব সংস্কৃতি একসঙ্গে মিলেমিশে যাক।”
এবারের উৎসবের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে উত্তম কুমার (Uttam Kumar) ও সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)-এর কালজয়ী রোমান্টিক ক্লাসিক ‘সপ্তপদী (Saptapadi)’। ৬ নভেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ধনধান্য অডিটোরিয়ামে (Dhono Dhanyo Auditorium) এই ছবির প্রদর্শনের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। সংগঠকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলার চলচ্চিত্র ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানানোই মূল উদ্দেশ্য।
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এ বছর প্রদর্শিত হবে মোট ১৮৫টি ফিচার ফিল্ম, ৩০টি শর্ট ফিল্ম এবং ৩৫টি তথ্যচিত্র (Documentary)। তার মধ্যে রয়েছে ১৮টি ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষার ও ৩৯টি বিদেশি ভাষার সিনেমা। উৎসবে জমা পড়েছিল প্রায় ১,৮২৭টি চলচ্চিত্র, যার মধ্যে থেকে ৩৯টি দেশের ২১৫টি ছবি বাছাই করা হয়েছে প্রদর্শনের জন্য। এই বিশাল নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে আন্তর্জাতিক মানের জুরি বোর্ড, যেখানে ছিলেন ভারত ও বিদেশের স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতারা।প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আজ বিশ্বমানের। নতুন প্রজন্মকে এই উৎসব সিনেমার ভুবনে নতুন দিগন্ত চিনতে শেখায়। এখানে পুরনো দিনের কিংবদন্তি ও নতুন প্রতিভার সহাবস্থান এক অনন্য মঞ্চ তৈরি করে।”
এ বছর উৎসবের জনপ্রিয় পর্ব ‘সিনে আড্ডা (Cine Adda)’-র নাম বদলে রাখা হয়েছে, ‘গানে গানে সিনেমা (Gane Gane Cinema)’। এই অংশে শুধু সিনেমা নয়, থাকবে সঙ্গীত ও কথোপকথনের এক নতুন আঙ্গিক। ৭ নভেম্বর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত একতারা মঞ্চে (Ektara Mancha) অনুষ্ঠিত হবে এই সাংস্কৃতিক আসর। যেখানে উপস্থিত থাকবেন জনপ্রিয় গায়ক, অভিনেতা ও পরিচালকরা। সিনেমার গান, পেছনের গল্প, এবং সেইসব গানের সৃষ্টির প্রক্রিয়া নিয়ে হবে উন্মুক্ত আলোচনা ও লাইভ পারফরম্যান্স।পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী বলেন, “এবারের উৎসবে আমরা সিনেমাকে শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ রাখছি না। সংগীত, কথোপকথন, সংস্কৃতি সব মিলিয়ে এটাকে এক উৎসবে পরিণত করা হচ্ছে যেখানে দর্শকই হবে আসল নায়ক।”
কলকাতা আন্তর্জাতিক উৎসবের আরও একটি বিশেষ দিক হল, এ বছর বেশ কিছু নবীন চলচ্চিত্র নির্মাতা (New Filmmakers)-এর কাজ প্রদর্শিত হবে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে। তরুণ প্রজন্মের জন্য আলাদা বিভাগ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে তাদের নির্মিত ছোট ও পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র দেখানো হবে। পাশাপাশি পোল্যান্ড (Poland), স্পেন (Spain), ফ্রান্স (France), জাপান (Japan), এবং কোরিয়া (Korea) থেকে আসছে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার।ইন্দ্রনীল সেন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কেবল বিনোদন নয়, সিনেমার ভাষায় মানবতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া। বাংলা যেমন গান, সাহিত্য আর শিল্পে সমৃদ্ধ, তেমনি সিনেমাতেও আমরা বিশ্বের সঙ্গে সমানতালে এগোতে চাই।”
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক বিশাল সুযোগ, কারণ এখানে ক্লাসিক থেকে সমকালীন, ভারত থেকে ইউরোপ সব ধারার চলচ্চিত্র এক মঞ্চে। উৎসব চলবে ৬ নভেম্বর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত কলকাতার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে। শহর জুড়ে তখন ছড়িয়ে পড়বে সিনেমার আলো, শিল্পের ছোঁয়া আর সংস্কৃতির আবেশ। প্রতি বছরের মতো এবারও দর্শকরা অনলাইনে এবং অফলাইনে টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন। ইতিমধ্যেই অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রি-রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়ে গিয়েছে। অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক বলেন, “কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আমাদের কাছে শুধু সিনেমা নয়, আবেগ। এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা বিশ্বকে জানাই, বাংলা সিনেমা আজও শক্তভাবে নিজের জায়গা ধরে রেখেছে।” ৩১ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবার তাই হয়ে উঠতে চলেছে এক সত্যিকারের ‘গ্লোবাল সেলিব্রেশন অফ সিনেমা’, যেখানে সিনেমা, সংগীত, সংস্কৃতি এবং মানবিকতার বার্তা মিলেমিশে তৈরি করবে এক অনন্য সুর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shraddha Kapoor | শ্রদ্ধা কাপূর: বলিউডে ঝলমলে যাত্রার আগে কফি আর স্যান্ডউইচে কাটানো দিনগুলো




