সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে রাজ্যের লক্ষাধিক চাকরিপ্রার্থীর। পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC – School Service Commission) সূত্রে জানা গিয়েছে, আসছে ৭ নভেম্বরের মধ্যেই প্রকাশ হতে পারে এসএসসি নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল। এর পরেই জেলা ভিত্তিক ইন্টারভিউ শুরু হবে। কমিশনের লক্ষ্য, ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা। মোট ৩৫,৭২৬টি শূন্যপদে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ করা হবে বলে সরকারি সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে।
এই নিয়োগকে ঘিরে শিক্ষাক্ষেত্রে এখন প্রবল উৎসাহ এবং উদ্বেগ, দুটোই সমান তালে চলছে। কারণ, ২০১৬ সালের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলার জেরে একদিকে যেমন চাকরি হারিয়েছেন হাজারো শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী, তেমনই রাজ্যে নতুন করে শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল ক্রমাগত। সেই মামলার জের গড়িয়ে গিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court) থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে বাতিল হয় প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি। বহু আবেদন ও প্রতিবাদের পরও তাঁদের চাকরি ফেরেনি। এরপর আদালত নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেয় এবং স্পষ্টভাবে জানায়, ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যেই সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
এই প্রেক্ষিতেই ২০২৫ সালে এসএসসি নতুন নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করে। গত ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, যেখানে অংশ নেন ৩ লক্ষ ১৯ হাজার ৯১৯ জন প্রার্থী। তার ঠিক এক সপ্তাহ পর, ১৪ সেপ্টেম্বর হয় একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, তাতে অংশ নেন ২ লক্ষ ৪৬ হাজার প্রার্থী। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়েছিলেন, “পুজোর পর ফলপ্রকাশ করা হবে, সবকিছু স্বচ্ছভাবে হবে। রাজ্য সরকার এবং কমিশন উভয়েই চান যাতে ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষক নিয়োগ সম্পূর্ণ হয়।” সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এসএসসি চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদারও (Siddhartha Majumdar)-ও। তিনি জানিয়েছিলেন, “আমরা চাই প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করতে। এবার ফলাফল প্রকাশের পর জেলা-জেলায় ইন্টারভিউয়ের সময়সূচী জানিয়ে দেওয়া হবে।”
নতুন এই নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতেই শিক্ষক বাছাই হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে কমিশন। এবার ফলাফল প্রকাশের পর ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া শুরু হবে রাজ্যের সব জেলা জুড়ে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই জেলা ভিত্তিক সাক্ষাৎকার শুরু হতে পারে বলে সূত্রের খবর। অন্যদিকে, শুধুমাত্র শিক্ষক নয়, শিক্ষাকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে একসঙ্গে। ৩ নভেম্বর থেকে শুরু হবে শিক্ষাকর্মী নিয়োগের আবেদন, যা চলবে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এসএসসি জানিয়েছে, শিক্ষাকর্মীদের মোট ৮,৫০০ শূন্যপদ পূরণ করা হবে। পুরনো শিক্ষাকর্মীদের অভিজ্ঞতার জন্য ৫ নম্বর অতিরিক্ত ক্রেডিট দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এসএসসি সূত্রে জানা গিয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে যাতে কোনও প্রকার অনিয়ম বা স্বজনপোষণ না ঘটে। পরীক্ষার ফলাফলও অনলাইনে প্রকাশ করা হবে এবং প্রত্যেক প্রার্থী নিজের রেজাল্ট কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকেই দেখতে পারবেন। শিক্ষাবিদদের মতে, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এসএসসি-র প্রতি যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে এবার কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পেতে চাইছে। শিক্ষাবিদ অচিন্ত্য মিত্র বলেন, “এবার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। কারণ রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে এই নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
রাজ্য সরকারের তরফেও জোর দেওয়া হচ্ছে সময়সীমা মেনে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার ওপর। কারণ, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো নিয়োগ সম্পূর্ণ করতে হবে। তাই রাজ্য প্রশাসন, এসএসসি এবং শিক্ষাদপ্তর এখন একযোগে এই বিশাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।একইসঙ্গে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের আশা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাঁরা এবার যোগ্যতার ভিত্তিতেই শিক্ষক হিসেবে স্কুলে কাজ করার সুযোগ পাবেন। চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা সঞ্চার। পায়েল দাস নামে এক প্রার্থী বলেন, “২০১৬ সালের পর থেকে আমরা অনেক আশা হারিয়েছি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে সত্যিই একটা নতুন শুরু হতে যাচ্ছে।”
এসএসসি-র তরফে প্রকাশিত সম্ভাব্য সময়সূচী অনুযায়ী, ফলাফল প্রকাশের পর ইন্টারভিউ পর্যায় শেষ হবে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে। ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগপত্র হাতে পেতে পারেন নির্বাচিত প্রার্থীরা। এই নিয়োগের মাধ্যমে বহু স্কুলে দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট মিটবে বলেও আশা করা হচ্ছে। প্রশাসনিক পর্যায়ে সূত্র জানিয়েছে, “রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় গতি আনতেই এই বৃহৎ নিয়োগ পরিকল্পনা। ডিসেম্বরের মধ্যে সব প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।” ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ রাজ্যের স্কুলগুলোতে নতুন শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের যোগদান দেখতে পাবে রাজ্যবাসী। এই নিয়োগ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবেও ধরা হচ্ছে।
ছবি: প্রতীকী




