সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ চেন্নাই, ২৯ অক্টোবর: দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই শহরে ঘটে গেল এক নারকীয় ঘটনা। বাইক ট্যাক্সি পরিষেবার সুযোগ নিতে গিয়ে এক ২২ বছর বয়সী তরুণী পড়লেন এক ভয়ঙ্কর ফাঁদে। অভিযোগ, বাইক ট্যাক্সি চালক শিবকুমার (Shivakumar) তাঁকে নির্জন পথে নিয়ে গিয়ে যৌন নির্যাতন করে। পরে অভিযুক্ত ওই মহিলাকে তাঁর বাড়িতে ফেলে পালিয়ে যায়। পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে এবং মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
চেন্নাই পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, সোমবার রাতে পাক্কিকরণাই (Pakkikaranai) এলাকায় তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন ওই তরুণী। বাড়ি ফেরার জন্য তিনি একটি বাইক ট্যাক্সি বুক করেন। চালক হিসেবে নিযুক্ত ছিল শিবকুমার, তিনি জনপ্রিয় এক অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। ভুক্তভোগী জানান, তিনি বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে শিবকুমারকে অপেক্ষা করতে বলেন, যাতে ফেরার পথে একই বাইকেই ফিরতে পারেন। কিন্তু ঘটনার মোড় বদলে যায় ফেরার পথে। অভিযোগ, মঙ্গলবার ভোরে শিবকুমার তাঁকে নির্জন পথে নিয়ে যান, যেখানে আশেপাশে তেমন কোনও বাড়িঘর ছিল না। সেখানে তিনি তরুণীকে ভয় দেখিয়ে শারীরিক নির্যাতন করেন। ঘটনার পর অভিযুক্ত তাঁকে তাঁর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। চরম আতঙ্কিত অবস্থায় ওই তরুণী তাঁর স্বামীকে সব কিছু জানান, এবং তৎক্ষণাৎ পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন।
চেন্নাই পুলিশ জানিয়েছে, “টি-৫ ভানাগ্রাম (T-5 Vanagaram) থানায় অভিযোগ দায়েরের পর তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ মেলে যে ঘটনাটি সত্য। অভিযুক্ত শিবকুমারকে শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।” পুলিশের এক কর্তা জানান, “আমরা অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুক্তভোগীর বয়ান রেকর্ড করি এবং চিকিৎসার জন্য পাঠাই। প্রমাণ অনুযায়ী শিবকুমারের বিরুদ্ধে ৩৭৬ ধারাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। আদালতে তাঁকে হাজির করা হলে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।”
এই ঘটনার পর চেন্নাই শহরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। নাগরিক সমাজ, নারী অধিকার কর্মী এবং রাজনীতিকরা এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, তামিলনাড়ুতে (Tamil Nadu) নারীদের নিরাপত্তা ক্রমশ প্রশ্নের মুখে পড়ছে। রাজ্য বিজেপি এবং এআইএডিএমকে নেতারা দাবি করেছেন, “বর্তমান সরকারের শাসনে মহিলাদের উপর অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অথচ প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা নিচ্ছে।” অন্যদিকে, ডিএমকে (DMK) সরকার এবং পুলিশ প্রশাসন দাবি করেছে যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চেন্নাই পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা মহিলাদের নিরাপত্তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। অভিযুক্ত যে-ই হোক না কেন, কোনও দয়া দেখানো হবে না। আইন নিজের মতো কাজ করবে।”
চেন্নাই মেট্রো অঞ্চলে সম্প্রতি অ্যাপ-ভিত্তিক বাইক ও ক্যাব পরিষেবার সংখ্যা বাড়ছে, এবং তার সঙ্গে বেড়েছে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিকে আরও কড়া নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা উচিত। সাইবার সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ সি. শঙ্কর (C. Shankar) বলেন, “প্রতিটি চালকের ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন যথাযথভাবে না করলে এই ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে। নিরাপত্তা মানদণ্ডকে আরও শক্ত করতে হবে।” স্থানীয় মহিলারা জানিয়েছেন, এই ঘটনায় তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কলেজ পড়ুয়া অনন্যা রমেশ (Ananya Ramesh) বলেন, “আমরা প্রায়ই বাইক ট্যাক্সি ব্যবহার করি কারণ তা দ্রুত এবং সাশ্রয়ী। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এভাবে একা যাত্রা করাই বিপজ্জনক।”
পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্তের মোবাইল ফোন এবং জিপিএস ডেটা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়াও ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এটি পরিকল্পিত অপরাধ হতে পারে। রাজ্য মহিলা কমিশনও ঘটনাটির বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে। কমিশনের চেয়ারপার্সন বলেছেন, “আমরা পুলিশ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছি। ভুক্তভোগীকে সমস্ত রকম আইনি ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হবে।” ঘটনার পর চেন্নাই শহরে অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি পরিষেবাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন চালকদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নারী সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি। সমাজকর্মী লক্ষ্মী মেনন (Lakshmi Menon) বলেন, “এই ধরনের ঘটনা কেবল আইন-শৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, আমাদের সমাজের গভীর সংকটের প্রতিফলন। অপরাধীরা যদি দ্রুত শাস্তি না পায়, তাহলে এই চক্র থামবে না।” চেন্নাই পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করবে। শিবকুমার বর্তমানে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন, এবং আদালতের পরবর্তী শুনানি আগামী সপ্তাহে নির্ধারিত।
ছবি : প্রতীকী



