Iran hijab controversy, Shamkhani daughter wedding | হিজাববিহীন বিয়ে: খামেনেই-ঘনিষ্ঠ শামখানির কন্যার পশ্চিমী সাজে ঝড় তেহরানে

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ তেহরান : ইরান, পশ্চিম এশিয়া একদিকে রাষ্ট্রীয় কঠোরতার দাপটে যেখানে ইরানের নারীদের জন্য হিজাব পরা বাধ্যতামূলক, সেখানে অন্যদিকে ক্ষমতাবানদের পরিবারের জীবনযাত্রা যেন সেই আইনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল হওয়া একটি বিয়ের ভিডিও সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। বিয়েটি আর পাঁচটা সাধারণ ইরানি বিয়ে নয়, এটি দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডমিরাল আলি শামখানি (Admiral Ali Shamkhani) -এর কন্যা সেতায়েশের (Setayesh) বিয়ে। আর সেই বিয়েতেই দেখা গিয়েছে পশ্চিমী স্টাইলের পোশাক, হিজাববিহীন নারী এবং উচ্ছল উদযাপন, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রচলিত ধর্মীয় নিয়মের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

শামিখানির মেয়ের বিয়ের ছবি। ছবি : সংগৃহীত
শামখানির মেয়ের বিয়ের ছবি। ছবি : সংগৃহীত

ইরানের আইন অনুযায়ী, নারীদের জনসমক্ষে সর্বদা মাথা ঢেকে এবং শরীর আবৃত রেখে চলা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম ভাঙলে শুধু জরিমানা নয়, জেল পর্যন্ত হতে পারে। অথচ যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নারীদের পোশাকবিধির কঠোরতা রক্ষা ও প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁর পরিবারের মেয়ের বিয়েতেই দেখা গেল তার উল্টো চিত্র। সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া (যদিও সেই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি সাশ্রয় নিউজ) ৫৫ সেকেন্ডের সেই ভিডিওতে দেখা যায়, অ্যাডমিরাল শামখানি তাঁর কন্যার হাত ধরে করিডর পেরিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রবেশ করছেন। কনের পরনে হিজাব নেই, বরং পশ্চিমী ধাঁচের সাদা লো-কাট গাউন, খোলা চুল ও কাঁধ উন্মুক্ত পোশাক। পাশে দেখা যায় তাঁর মাকেও, নীল রঙের আধুনিক পোশাকে, তাঁরও মাথায় নেই কোনও ওড়না।
এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে প্রবল প্রতিক্রিয়া। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে সমাজকর্মী, সাংবাদিক, সবাই প্রশ্ন তুলেছেন, “এই আইন কি শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের জন্য?” একাধিক ইরানি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী কটাক্ষ করেছেন, “যাঁরা মেয়েদের হিজাব না পরার অপরাধে রাস্তায় টেনে নিয়ে যান, তাঁদের পরিবারেই হিজাবহীন উৎসব!”

শামখানি দীর্ঘদিন ইরানের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের (Supreme National Security Council) প্রধান ছিলেন, তাঁকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের (Ayatollah Ali Khamenei) ঘনিষ্ঠ হিসেবে গণ্য করা হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম The New York Times জানিয়েছে, ইরানে নারীদের পোশাকবিধি জোরদার করার দায়িত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। এমনকী মাহসা আমিনি (Mahsa Amini)-এর মৃত্যুর পর যে দমননীতি শুরু হয়, তারও মূল তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন এই অ্যাডমিরাল।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনি হিজাব সঠিকভাবে না পরার অভিযোগে ইরানের নীতিপুলিশ (Morality Police) -এর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে মারা যান। তাঁর মৃত্যু দেশজুড়ে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দেয়, নারীরা রাস্তায় হিজাব খুলে প্রতিবাদে সামিল হন, পুরুষরাও যোগ দেন ‘Women, Life, Freedom’ আন্দোলনে। তখন সরকারের তরফে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, শতাধিক মানুষ নিহত হন, হাজারো মানুষ গ্রেফতার হন। সেই সময় জনসমক্ষে হিজাবহীন নারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশে অন্যতম ভূমিকা ছিল শামখানির। তাই যখন তাঁর নিজের কন্যার বিয়েতে দেখা গেল হিজাবহীন উচ্ছ্বাস, তখন দেশজুড়ে প্রশ্ন তুলেছে: এই দ্বিচারিতা কতদিন চলবে? এক ইরানি সমাজকর্মী BBC Persian-কে বলেন, “যে ক্ষমতাবানরা নিয়ম তৈরি করেন, তাঁরা নিজেরাই তা মানেন না। ইরানে এখন ন্যায় ও ভণ্ডামির লড়াই চলছে।”

বিয়ের ভিডিওটি ফাঁস হওয়ার পর ইরানের রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, ভিডিওটি হয়তো বিদেশি এজেন্ডার অংশ। তবে অনেকেই বলছেন, “এই বাস্তবতা আর আড়াল করা সম্ভব নয়।” তেহরানে রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে কানাঘুষো চলছে। খামেনেইয়ের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে এটি নজিরবিহীন ঘটনা। অনেকেই বলছেন, এই ভিডিও শাসকগোষ্ঠীর ‘দ্বিচারিতার প্রতীক’। অতীতে শামখানিকে দেশের ধর্মীয় আইন রক্ষার কট্টর সমর্থক বলা হতো। কিন্তু আজ তাঁর পরিবারই যেন সেই নিয়ম ভাঙার প্রতীক হয়ে উঠেছে।অতীতে এমন বহু উদাহরণ আছে, যখন সাধারণ ইরানি নারীরা হিজাব না পরায় কঠোর শাস্তির মুখে পড়েছেন। তেহরানের ইসলামিক আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আহু দারইয়াই (Ahoo Daryaei) প্রকাশ্যে অন্তর্বাস পরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পোশাকবিধির বিরুদ্ধে। তাঁকে গ্রেফতার করে মানসিক রোগীর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। আরেকজন নারী শিল্পী কাঁধখোলা পোশাকে গান পরিবেশন করার অপরাধে নিষিদ্ধ হন।

এমন পটভূমিতে শামখানির কন্যার ‘হিজাববিহীন বিয়ে’ যেন সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, “এখন সময় এসেছে, এই ভণ্ডামি বন্ধ করার।” অন্যদিকে, সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো এখনও বিষয়টি নিয়ে নীরব।আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনাটি ইরানে সংস্কৃতি ও রাজনীতির গভীরে থাকা দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। একদিকে কঠোর ইসলামি আইন, অন্যদিকে ক্ষমতাবান শ্রেণির বিলাসী পশ্চিমমুখী জীবনযাপন, এই ফারাকই জনরোষের কারণ।
যদিও, ভিডিওর সত্যতা এখনও সরকারিভাবে যাচাই হয়নি, কিন্তু এর প্রভাব ইতিমধ্যেই ইরানি সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক মাধ্যমজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে: “হিজাব আইন কি শুধু গরিবের জন্য?”

ছবি প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ উনিশ-তম কিস্তি)

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment