হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কৌশল সফল, এনডিএ-তে যোগ দিল বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট – অসম রাজনীতিতে পাল্টে গেল সমীকরণ

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি : অসমের (Assam) রাজনৈতিক পটে আজ এক ঐতিহাসিক দিন। বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট (Bodoland People’s Front – BPF) আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিল জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটে (National Democratic Alliance – NDA)। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma)-এর রাজনৈতিক পরিকল্পনা যে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, তা আজ প্রমাণিত। এই যোগদানের সাথে সাথেই বিপিএফ নেতা ও মাজবাতের দুইবারের বিধায়ক চরণ বরো (Charan Boro) অসম সরকারের নতুন পরিবহণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। রাজভবনে (Raj Bhavan) অনুষ্ঠিত শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে গভর্নর লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য (Lakshman Prasad Acharya) তাঁকে শপথ করান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, বিটিআর (Bodoland Territorial Region – BTR)-এর চিফ এক্সিকিউটিভ মেম্বার হগ্রামা মোহিলারি (Hagrama Mohilary) এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যরা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিপিএফের এনডিএ-তে প্রত্যাবর্তন বিটিআর-এ বিজেপি জোটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে, যা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর ‘দাবা কৌশল’-এর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শপথের পরে চরণ বরো বলেন, “আমি মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। যে দায়িত্ব পেয়েছি, তা আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করব। এই জোট বিটিআর-এর উন্নয়ন ও শান্তির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।” মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “বিপিএফ বিটিসি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আমরা বলেছিলাম, তারা এনডিএ-তে স্বাগত। আজ সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে। বিটিআর অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য এই সংযুক্তি এক মাইলফলক।”

অতীতের সম্পর্ক ও নতুন সমীকরণ

বিপিএফ ও বিজেপির সম্পর্ক বরাবরই ওঠানামা করেছে। ২০২০ সালের বিটিসি (Bodoland Territorial Council – BTC) নির্বাচনের আগে বিপিএফ বিজেপির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। তখন বিজেপি ইউপিপিএল (United People’s Party Liberal – UPPL)-এর সঙ্গে জোট গড়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু গত মাসে অনুষ্ঠিত বিটিসি নির্বাচনে বিপিএফ নাটকীয়ভাবে প্রত্যাবর্তন করে, ৪০টির মধ্যে ২৮টি আসনে জয় পেয়ে তারা আবারও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে, যেখানে ইউপিপিএল বড় ধাক্কা খায়। এই ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই বিজেপি সক্রিয় হয়ে ওঠে। দ্রুতই কেন্দ্রীয় স্তরে আলাপ শুরু হয়। গত ১৬ অক্টোবর দিল্লিতে (Delhi) কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, হগ্রামা মোহিলারি ও ইউপিপিএল প্রেসিডেন্ট প্রমোদ বরো (Pramod Boro)-র সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পর থেকেই স্পষ্ট ছিল,  অসমের রাজনীতিতে একটি বড় সমঝোতা তৈরি হচ্ছে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা পরে সাংবাদিকদের বলেন, “প্রমোদ বরো আমাদের, হগ্রামা মোহিলারিও আমাদের। অসমের উন্নয়নের জন্য সবাই একসাথে কাজ করবে, এটিই আমাদের উদ্দেশ্য।”

বিটিআর-এ এনডিএর শক্ত ঘাঁটি

অসমের মোট ১২৬টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিটিআর অঞ্চলে রয়েছে ১৫টি আসন। এই অঞ্চল পাঁচটি জেলায় বিস্তৃত– কোকরাঝার (Kokrajhar), উদালগুড়ি (Udalguri), চিরাং (Chirang), তামুলপুর (Tamulpur) এবং বক্সা (Baksa)। এই পাঁচ জেলায় বোরো জনগোষ্ঠীর (Bodo community) রাজনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি, এবং এই অঞ্চলে বিপিএফের ভিত্তি অটুট। এখন এনডিএর অধীনে বিপিএফের আসা মানে, এই ভোটব্যাঙ্ক সরাসরি বিজেপির পক্ষে চলে আসবে। হগ্রামা মোহিলারি বলেন, “বিপিএফ সব সময় বিটিআর-এর মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করে এসেছে। সরকারের সঙ্গে হাত মেলানো মানে উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। নভেম্বর থেকে আমরা বিটিআর-এ ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প শুরু করব।” তিনি আরও জানান, “বিটিসিতে বিজেপিকে দুটি এক্সিকিউটিভ মেম্বার এবং একটি ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়া হবে। এটি পারস্পরিক আস্থার প্রতীক। এই জোট বিটিআর-এর শান্তি ও অগ্রগতির জন্য ঐতিহাসিক।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপিএফের এনডিএতে যোগদানের অর্থ, অসমে বিরোধী শিবির আরও দুর্বল হয়ে পড়া। কংগ্রেস (Congress) এবং এআইইউডিএফ (AIUDF) বিটিআর অঞ্চলে প্রায় কোনও অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এখন কার্যত উত্তর-পূর্ব অসমে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে কৌশলগতভাবে জাতিগত ও আঞ্চলিক দলগুলিকে পাশে টানার নীতি অনুসরণ করছেন। এবার বিপিএফকে পুনরায় এনডিএর আওতায় এনে তিনি সেই ধারারই ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে এটি বিজেপির জন্য শক্ত মাটির প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।অ সমের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র ক্ষমতার সমীকরণ নয়, এটি শান্তি ও উন্নয়নের বার্তা। বিটিআর অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এমন একটি জোট প্রয়োজন ছিল।”

বোরোল্যান্ডে উন্নয়নের নতুন অধ্যায়

বিটিআর চুক্তির (Bodo Accord 2020) পর থেকে অঞ্চলটিতে শান্তি ফিরেছে, কিন্তু উন্নয়নের গতি প্রত্যাশিত ছিল না। বিপিএফের এনডিএ-তে ফেরা সেই গতি ফের জোরদার করতে পারে। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, শিক্ষা, অবকাঠামো ও পর্যটনের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হবে বিটিআর এলাকায়।চরণ বরো জানান, “আমরা আমাদের অঞ্চলের জনগণের জীবনযাত্রা উন্নত করতে চাই। মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে নতুনভাবে কাজ শুরু হবে। আমি চাই বিটিআর শান্তি, সংহতি ও উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠুক।” মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আমরা বিটিআরকে আগামী পাঁচ বছরে মডেল অঞ্চলে পরিণত করব। বিজেপি, বিপিএফ এবং ইউপিপিএল, তিন পক্ষ একসাথে থাকলে অসমের উত্তরাঞ্চল অভূতপূর্ব উন্নয়নের সাক্ষী হবে।” এই রাজনৈতিক পুনর্মিলন শুধুমাত্র ভোটগণিত নয়, এটি অসমের জাতিগত রাজনীতিতে এক নতুন মাইলফলক। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, তিনি কেবল প্রশাসক নন, একজন দক্ষ রাজনৈতিক কৌশলবিদও বটে। ২০২৬ সালের ভোটে বিটিআর অঞ্চল এখন এনডিএর ‘ফোর্ট্রেস’ বা দুর্গ হয়ে উঠতে চলেছে। অসমের রাজনীতিতে আজকের এই ঘটনাকে অনেকেই বলছেন  “হিমন্তের মাস্টারস্ট্রোক।” কারণ তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, আঞ্চলিক দলগুলিকে সাথে নিয়ে চলার দক্ষতাই রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী চাবিকাঠি।

ছবি : সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ চৌদ্দ-তম কিস্তি)

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন