Sasraya News, Sunday’s Literature Special | 21st September 2025, Issue 81| সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল, ৮১

SHARE:

সম্পাদকীয়

লো আর অন্ধকারের দোরগোড়ায় প্রতিটি জীবন। আনন্দ খোঁজে। সেই আনন্দের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয় মহালয়া। প্রতি বছর নতুন করে আসে। যাওয়া আসার মাঝে কত প্রিয়জন চলে যায় কত প্রিয়জন আসে। দুঃখ আর আনন্দে শরতের মেঘের খেলায়
আকাশে ভেসে ওঠা বাতাসে প্রথম ঢাকের আওয়াজেই বাঙালির প্রাণে নেমে আসে এক অদ্ভুত আলোড়ন। মহালয়া কেবল একটি দিন নয়, এটি বাঙালির চিরন্তন আবেগের এক সেতু। যেখানে শোক আর আনন্দ, মৃত্যু আর পুনর্জন্ম, অন্ধকার আর আলোক মিলেমিশে তৈরি করে এক অন্তহীন বৃত্ত। পিতৃপক্ষের অবসানে মহালয়া আমাদের স্মরণ করায় পূর্বপুরুষদের। এই দিনটি যেন আত্মীয়স্বজনের অদৃশ্য ছায়াদের আহ্বান “এসো, আমাদের স্মৃতিতে তোমরা অমর।” শ্রাদ্ধ ও আচার শোকের আবহকে মনে করায় বটে, কিন্তু সেই শোকের গভীরতায়ই লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা। মহালয়া আমাদের শেখায়, মৃত্যুর মধ্যেও জীবনের স্পন্দন বহমান, আর বেদনার গভীরে লুকিয়ে থাকে উৎসবের বীজ।


একই সঙ্গে এই দিনেই শাক্ত হৃদয়ে জেগে ওঠে মহাশক্তি দুর্গার আবাহন। দেবীপক্ষের সূচনা যেন বাঙালি জীবনে নতুন ঋতুর আগমন, যেখানে ভোরের অন্ধকার ভেদ করে উঠে আসে দেবীর আলোক।  আকাশবাণীতে মহিষাসুরমর্দিনীর ধ্বনি নয়, তা এক সমষ্টিগত অনুভূতি যেখানে প্রত্যেক বাঙালি, গ্রামের প্রান্তর থেকে শহরের ব্যস্ত অলিতে, অনুভব করে দেবী আগমনের আনন্দ। মহালয়া একই সঙ্গে দ্বৈতবাণী বহন করে শ্রদ্ধা আর উল্লাস, স্মরণ আর উদযাপন। এটি আমাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে, আবার একই সঙ্গে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায় নতুন সময়ের দিকে। মহালয়া মনে করায়, মানুষ আসলে আলো আর অন্ধকারেরই সন্তান, শোক আর আনন্দেরই মিলিত প্রতিধ্বনি। এই আলোর ভোরে আমরা প্রণাম জানাই পূর্বপুরুষকে, আর বরণ করি মাতৃশক্তিকে। মহালয়া তাই কেবল পঞ্জিকার একটি দিন নয় এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মার স্পন্দিত হৃদস্পন্দন। আমাদের সাশ্রয় নিউজের পক্ষ হতে সমস্ত পাঠক পাঠিকা লেখক লেখিকা ও শুভনুধায়ীদের জানাই হার্দিক শুভকামনা আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা অভিনন্দন ও ভালোবাসা। সকলে ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। ধন্যবাদ 🙏

 

 

 

🍂মহামিলনের থা শ্রীশ্রীঠাকুরের পত্র

 

ওঙ্কার মঠ
13/12/63

বাবা— ঠাকুরের আশীর্বাদ জানবি। কদিন একটা কথা লিখবো মনে হচ্ছিল। রামায়ণের মধ্যে একটা ব্যাপার দেখলাম— যথাকালে উপাসনা। রামচন্দ্র বাল্যকাল থেকে শেষ পর্য্যন্ত করেছেন। সীতা হরণ হয়ে গেছে। শোকের মধ্যেও ঠিক সূর্য্য অস্তের সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যা উপাসনা করেছেন। প্রাতঃ সন্ধ্যার কাল সূর্য্যদয়ের ২৪ মিনিট আগে থেকে ২৪ মিনিট পর পর্য্যন্ত। সায়ং সন্ধ্যার কাল সূর্য্য অস্তের ২৪ মিনিট আগে থেকে ২৪ মিনিট পর পর্য্যন্ত।
সীতারামের আদেশ সকলের প্রতি। গোবিন্দকেও এই পত্র দেখাবি, সকলে যেন যথাকালে জপে বসে। কিছুদিন যথাকালে উপাসনা করলে একটা শক্তি অনুভব করবেই। ব্রাহ্মণ যথাকালে সন্ধ্যা না করলে সূর্য্য হত্যার পাপে পাপী হয়।

শ্রীশ্রী ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

যারা সংসার ছেড়ে এসেছে তাদের সে শুভ মুহূর্ত উপেক্ষা করা কোন মতে উচিত নয়। সন্ধ্যায় সূর্য্য থাকতে থাকতে সকলে মিলিত হয়ে প্রার্থনা করে জপ করতে বসবি। যদি কারু বিশেষ কাজ থাকে জপ কম করবে। সীতারামের এ আদেশ সকলের উপর। যথাকালে আসনে বসে সন্ধ্যা জপ করা চাই। যে ভগবানকে পাবার জন্য এসেছে, সে কেন কাল অতিক্রম করবে? যদি কেউ যথাকালে জপ করা অসুবিধা মনে করে, সে আশ্রম এবং সীতারামকে ছেড়ে গেলে সীতারাম পরম আনন্দিত হবে। সকলকেই এই পত্র দেখাবি। আদেশ পালন করা চাই— মায় গোবিন্দ। যখন যেখানে যে কোন অবস্থায় থাকবে সে যেন বসে। নূতন শক্তির আবির্ভাব বুঝতে পারবে। যথাকালে উপাসনা না করা মানে সীতারামকে ত্যাগ করা।
বাবারা যেন একথাটি অন্তরের সহিত গ্রহণ করে। ধ্যানানন্দ বাংলা থেকে ফিরে এলে সেও এ আদেশ পালন করবে। চিরদিন সীতারাম যথাকালে সন্ধ্যা করে এসেছে। রামায়ণে রামচন্দ্রর দেখে প্রাণটা যথাকলের জন্য ব্যাকুল হয়েছে। যারা আগন্তুক আসবে তাদেরও বসাবি। বাবার আদেশ যথাকালে বসবার। যথাকাল ত্যাগ করা মহাপাপ। নিত্য শ্রীভগবান যথাকালে হৃদয়ে উপস্থিত হন। তাঁর পথ চেয়ে থাকতে হয়, নচেৎ তিনি ক্ষুন্ন মনে ফিরে যান। এ মিলন মুহূর্ত ত্যাগ করবি না— করবি না— করবি না। মঙ্গল।
তোর —–সীতারাম।

🍁চিঠিপত্রে সীতারাম। সংকলক : কিঙ্কর সংযমানন্দ (ধীরানন্দ জী)

 

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস 

 

কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয়  সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ আজকে থেকে শুরু হল তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস। আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এর পাঠকদের জন্য রইল উপন্যাসটির প্রথম পর্ব। 

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

 

১.

মুখোশের ছায়াতলে

রাত গভীর হয়েছে। শহরের আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে, দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক ভেসে আসে, যেন নিঃশব্দের বুক চিরে কারও ব্যর্থ প্রতিবাদ। ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে শব্দ করছে, একঘেয়ে, নির্লিপ্ত। সোমদত্তা বিছানায় শুয়ে আছে নিঃশব্দে। চাদরের নিচে তার পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে, সে দুই পা ঘষাঘষি করে উষ্ণতা আনার চেষ্টা করে, কিন্তু তাতে শরীরের চেয়ে মনে ঠাণ্ডা আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।তার মাথার ভেতর চিন্তা এসে হানা দেয় অনুপ্রবেশকারীর মতো—অসংখ্য শব্দ, অসমাপ্ত বাক্য, অপূর্ণ সংলাপ, দিনের শেষে যে মুখগুলো মুখোশ পরে কথা বলেছিল, সেসবের ছায়া তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

…মানুষ কেবল গুরুত্বের কথা বলে, লাভ-লোকসানের হিসেব কষে। সেই মানুষগুলো, যারা বুঝেছে, তারা মাটি নয়, ধূলি তারা নীরবতাকেই আপন করে নিয়েছে। সোমদত্তার ইচ্ছে হয়, সেও তাদের মতো হোক। সে বিছানায় উঠে বসে। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে চাঁদের আলো পড়েছে ছাদের কার্নিশে, যেন ক্ষতচিহ্নের ওপরে জোছনার প্রলেপ। 

সে চোখ বন্ধ করে, আবার খোলে। ঘুম আসছে না। বাইরের আলো জানালার কাঁচে ছায়া ফেলে, ঘরটিকে আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে। “আজ সারাদিন কী করলাম আমি?” সে নিজেকেই জিজ্ঞেস করে মনে মনে। একটি দীর্ঘশ্বাস আসে তার ঠোঁট থেকে। অভিনয় করেছে সে, সারাটা দিন। অদ্ভুতভাবে হাসছিল, এমন সব কথায় মাথা নাড়ছিল যেগুলোর মানে সে বুঝতেও চায়নি। প্রশংসা করছিল এমন কারও, যাকে সে হৃদয়ের গহিনে কিছুতেই গ্রহণ করতে পারে না। অথচ মুখে বলেছে, “তুমি দারুণ!” মুখোশ পরে থেকেছে, যেন এক অচেনা চেহারাকে নিজের করে তুলতে চেয়েছে।
তার সহকর্মী রিমি দুপুরে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি ঠিক আছ তো, সোমদত্তা?”
সে হেসে বলেছিল, “একদম। আজ তো বেশ ভালোই লাগছে।”
ভালো? কী ভালো লাগছিল? ভেতরে ভেতরে সে চিৎকার করতে চেয়েছিল, বলতে চেয়েছিল, “আমি ভালো নেই, রিমি। আমি ক্লান্ত, খুব একা, আমার ভেতরের মানুষটা প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যাচ্ছে।” কিন্তু সে তা বলেনি। কারণ জানত, কেউ শুনবে না। কিংবা শুনলেও বুঝবে না।
রাতের নিস্তব্ধতায় সে নিজের শব্দগুলোকে খুঁজে পেতে চায়। মনে হয়, এত এত শব্দ তার চারপাশে ঘুরছে, কিন্তু একটাও তার নয়। শব্দেরা যেন তার গায়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়, উঠে দাঁড়ায় না আর। তারা কেবল ঠোকর খেয়ে হারিয়ে যায় নিঃশব্দে।
সে বিড়বিড় করে, “এই যে আমি, আমার ভিতরেই আমি নেই কেন?”
কেউ উত্তর দেয় না। শুধু ঘরের নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হয়। সে ভাবে, এই নিস্তব্ধতাই হয়তো একমাত্র সত্য। এখানে কোনও মুখোশ নেই, কোনও অভিনয় নেই।
তার কণ্ঠে ক্লান্তি জমে ওঠে—“আর কত? কতদিন নিজেকে এভাবে হারাতে থাকব?”
তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে আগের রাতে সে মাকে ফোন করেছিল। মা বলেছিল, “তুই তো ভালোই আছিস, না রে? চাকরি, বাসা, সব তো আছে।” সে শুধু বলেছিল, “হ্যাঁ মা, ঠিকই আছি।”
কিন্তু এই “ঠিক আছি” কথাটার পেছনে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য না বলা গল্প, ব্যথা, দুঃখ, অনিশ্চয়তা। কেন সে এই মিথ্যে কথা বলে চলে? কেনই বা সে চায় না কেউ জানুক, তার ভেতরে কী খেলা চলছে?
সে ভাবে, মানুষ কি এমনই হয়? প্রত্যেকে নিজস্ব এক অদৃশ্য নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন অভিনয় করে যায়? সত্যের মুখোমুখি হতে না পেরে, মুখোশের আড়ালেই বেঁচে থাকার নাম দেয় স্থিতি?
সে নিজেকেই জিজ্ঞেস করে, “আমি কি এতটাই দুর্বল?”
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে হয়, দুর্বল হওয়া মানেই তো পরাজয় নয়। তা যারা ভেতরের কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকে, মুখে হাসি ধরে রাখে, তারা কি আসল বীর নয়?
তবুও, ক্লান্তি তাকে দমিয়ে রাখে। সে ভাবে, “যারা সত্য বুঝেছে, তারা কি এই সমাজ থেকে সরে দাঁড়ায়নি?”
সে জানে, অনেকেই আর বাইরে যায় না। বন্ধ করে দিয়েছে সেইসব দরজা, যেখানে মানুষ কেবল গুরুত্বের কথা বলে, লাভ-লোকসানের হিসেব কষে।
সেই মানুষগুলো, যারা বুঝেছে, তারা মাটি নয়, ধূলি তারা নীরবতাকেই আপন করে নিয়েছে। সোমদত্তার ইচ্ছে হয়, সেও তাদের মতো হোক।
সে বিছানায় উঠে বসে। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে চাঁদের আলো পড়েছে ছাদের কার্নিশে, যেন ক্ষতচিহ্নের ওপরে জোছনার প্রলেপ।
সে ধীরে ধীরে বলে, “আমি আর ওখানে যাব না।”
এই বাক্যটা তার নিজের কাছেই অদ্ভুত লাগে। “ওখানে” মানে কোথায়? অফিসে? বন্ধুদের আড্ডায়? না কি সেই সব মানুষের মধ্যে, যারা প্রতিনিয়ত তাকে এমন হতে বাধ্য করে, যা সে নয়?
সে জানে না। কিন্তু তার বুকের ভেতর একটা সিদ্ধান্ত দানা বাঁধে, “আমি আর এমন কোনও জায়গায় যাব না, যেখানে আমাকে প্রতিনিয়ত নিজেকে মুছে ফেলতে হয়।”
তার মনে প্রশ্ন জাগে, “তাহলে যাব কোথায়?”
সে কি এমন কোনও জায়গা চেনে, যেখানে কেবল সত্যিকারের কথা বলা হয়? যেখানে সে নিজেকে যেমন আছে, তেমনভাবে প্রকাশ করতে পারে?
না, সে চেনে না। এমন জায়গা হয়তো তার জন্য নেই। অথবা থাকলেও, তাকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হবে না কখনও।
এই ভেবে তার বুক ভার হয়ে আসে। তবুও সে জানে, আজকের রাতে অন্তত এই সত্য স্বীকার করে নিয়েছে সে। এটাই যথেষ্ট।
সে বিছানায় ফিরে আসে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে।
তার ভেতর থেকে একটি নরম কণ্ঠস্বর বলে উঠে, “তুমি একা নও, সোমদত্তা।”
সে জানে, হয়তো এই কণ্ঠটা কেবল তার কল্পনা। তবুও সে সেই কণ্ঠটিকে আঁকড়ে ধরে। যেন অন্ধকারের মধ্যে কোনও এক অদৃশ্য হাত তাকে টেনে তুলছে।
এইভাবে প্রতিটি রাত, প্রতিটি নিঃশ্বাস, সে শব্দদের ভারে পিষ্ট হতে হতে, নিজের গভীরে হারিয়ে যেতে যেতে, একদিন হয়তো নিজের সেই প্রকৃত মুখটি খুঁজে পাবে, যা এতদিন কেবল মুখোশের নিচে চাপা পড়ে ছিল।🍁 (চলবে)

 

 

🍂বিতা 

 

তৈমুর খান -এর একটি কবিতা 

রেললাইনের ধারে বাড়ি

এত মেঘ ডাকে, এত বজ্রপাত হয়
প্রতিদিন অন্ধকার এসে ভয় দেখিয়ে যায়
তবুও সকাল হয়, তবুও সূর্য ওঠে
রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে বাড়ি

ট্রেন যায়, কেঁপে কেঁপে ওঠে সময়ের ঘড়ি
স্বর্গে যাবার ইচ্ছা কবে চলে গেছে
হাওয়া মোরগের মতো এখন শুধু উড়ি
উড়তে উড়তে শেষ প্রহরের দিকে চলে যাই

ভালো থেকো রেললাইন, ভালো থেকো বাড়ি
চাঁদ এসে জ্যোৎস্না প্রসব করে যাবে
ট্রেনে চেপে চলে যাবে কোনও রাজকুমারী
সব বিরহের কাছে দুঃখের গান ঝরে যাবে

 

বিশ্বজিৎ মণ্ডল -এর একটি কবিতা 

কাপালিকের স্কেচ

ভেসে গেছি, আরাধ্য ভূমিতে পাষণ্ড কাপালিক…

মানত ছিল,শেষ বলিদানে তোকেই তুষ্ট করব দেবী
অনভিজ্ঞ হাতে সাজালাম,যূপ কাষ্ঠ, তেল, সিন্দুর, জবা
আর রক্ত বর্ণ চন্দনকাঠ

আয়োজন শেষ হতেই তুলে নিই,প্রবল খড়্গ
কিন্তু কোথায় বলিবদ্ধ কামনা?

প্রাপ্য নয় জেনে আবার লোভাতুর কামনা নিয়ে
ছুটে গেছি, ঐন্দ্রজালিকের আঁকা মিথ্যে বন্দরের দিকে
অজ্ঞাত কাপালিক

 

 

নবেন্দু বিকাশ ভট্টাচার্য-এর একটি কবিতা 

মহালয়ার ভোর

অন্ধকারের বুক চিরে শঙ্খধ্বনি
ঢাকের তাল ভেসে ওঠে আকাশে
ভোরের আলোয় নেমে আসে মায়ের ছায়া,
শিউলির গন্ধে ভরে ওঠে নিঃশ্বাস।

পিতৃপুরুষের নাম উচ্চারিত হয়
অগ্নির শিখায়, জলে, ফুলে…
তাদের স্মৃতিই পথ দেখায়,
আমাদের এই জীবনের উত্থান-পতনে।

তবুও শোকের মাঝেই জেগে ওঠে আনন্দ
অন্তহীন দুঃখের ভাঁজ ভেদ করে
এই উজ্জ্বল দেবীপক্ষ, আসে শক্তির গান
‘এসো মা, এসো, দাও নতুন প্রভাত।’

 

 

আমিনা তাবাসসুম -এর একটি কবিতা

চিকন রশ্মি

এখানে থমকে আছে এই দূরত্ব
একটা নতুন মুখ
নতুন অবয়ব
আর গুম হয়ে থাকা আলতাদিঘীর বিষন্ন টিপ

চিকন চিকন স্বপ্নে ভেসে আসে
নিরুৎসাহী সকাল দুপুর
তারপরে কোনো রশ্মি আসবে এমন কথা ছিল না

তবু তিন পাহাড়ির মাথা থেকে
এগিয়ে আসছে নরম হাওয়া

এখন এখানেই বুক পেতে রাখি
মনখারাপে সুখ খুঁটে খাই
পায়রার মতো

 

 

দীশা চ্যাটার্জি -এর দু’টি কবিতা 

এই শহরের অন্তরালে

শহরটা ব্যস্ত
চকচকে আলো, বিজ্ঞাপনের নাচন,
ভিড়ের ভেতরে কোথাও
নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে একলা মানুষ।

কলকাতার ট্রামের জানালায়
পুরনো বিকেলের ধূলো জমে থাকে,
বাসের ভিড়ে চাপা পড়ে গিয়েছে
আমাদের আধবোজা স্বপ্নবীজ

নন্দনের চত্বরে
দু’জনের হাসি হারিয়ে গিয়েছে
অচেনা পায়ের শব্দে।
কফিহাউসের কাপে জমে থাকা কফি
শীতল হয়ে গিয়েছে
অপেক্ষা করতে করতে।

এই শহরের বুকেই তবু
লুকিয়ে আছে আমাদের প্রেম,
ভাঙা ফুটপাতেও
জেগে ওঠে গোলাপের কুঁড়ি,
আর অন্ধকার হাসপাতালের বারান্দায়
মোমবাতির আলোয় জন্ম নেয় বিশ্বাস।

শহরটা শুধু কোলাহল নয়,
এ শহর আমাদেরই প্রতিচ্ছবি
প্রতিদিন হারানো আর খোঁজার মধ্যে
চলতে থাকে মানুষের দীর্ঘ যাত্রা।

নিঃস্তব্ধ

নির্জন রাত্রির আকাশে জেগে ওঠে কত অচেনা তারা।
ভাঙা সেতুর মতো স্মৃতি কেবল ঝরে পড়ে অরণ্যে।
অস্পষ্ট আলোয় ভাসে স্বপ্ন, ছুঁয়ে দেখে কেবল নিঃশ্বাসগুলো।
কোথাও কোনো উত্তর নেই, তবু প্রশ্ন জাগে মনের ভেতর।
ঝরাপাতা যেমন শূন্য শাখায় চুপ করে গুনগুনিয়ে মরে যায়।
তেমনি ভালোবাসা ক্লান্ত হয়ে হারায় দূরে, ফিরে আসে না।
এই শহরের কোলাহল থেমে গেলে শুনি কেবল অন্তরের কান্না।
তবু অন্ধকার ভেদ করে ভোর আসে, নিয়ে আসে  আলো, নিয়ে আনে আশা।
দুঃখের বুক ছিঁড়ে জন্ম প্রেম, শাশ্বত বিশ্বাস।
এই নিয়ে মানুষ বাঁচে, হারায় আবারও, নতুন স্বপ্নে এগিয়ে যায়।

 

মমতা রায় চৌধুরী -এর একটি কবিতা 

কেন আগের মত পারি না

কেন আগের মত পারি না মন খুলে বলতে
আগে তো কত সহজে তোমাকে বলতাম
এখনও ভাবি বলবো কিন্তু গলার মধ্যে দলা পাকিয়েই রয়ে যায়
মনে পড়ে যখন তুমি আমি বৃষ্টির দুপুরে
কলেজের কদম গাছের তলে
ক্লাস ফাকি দিয়ে নয়
তুমি জানো আমি কখনোই ক্লাস ফাঁকি দিতে পছন্দ করতাম না
এই নিয়ে প্রথমদিকে কত ঝগড়াই না হয়ে‌ যেত
তারপর অফ ক্লাসে যখন আসতাম তুমি যেন সব কিছু ভুলে যেতে ওই মুহূর্তটুকু যেন অনেক বেশি তোমার কাছে দামি।
কথা কি হতো কোন ক্লাসে কি নোটটা পেলাম
এটা হল না ওটা হল না এবার বোধহয় আমার রেজাল্ট ভালো হবে না।
তুমি কিন্তু বরাবর বলতে
সিরিয়াস মেয়েদের রেজাল্ট ভালো হবে না এটাকখনো হতে পারে?
তুমি কত কষ্ট করে আসতে তোমার ইউনিভার্সিটির কোন একটা ক্লাসকে এভোয়েড করে
কিন্তু আমি জানি তুমিও খুব সিরিয়াস ছিলে
তবুও কোন এক অদৃশ্য আকর্ষণ যেন তোমাকে চুম্বকের মত আমার কাছে এনে দিত
আমি তো যেতে পারতাম না আমার তো
লক্ষণ রেখা টানা ছিল সেটা তুমি জানতে
কত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা চলতো দুজনের মধ্যে
অথচ আজ দেখো তুমি আমি পাশাপাশি
তবুও হাজার যোজন দূরত্ব
যেন একটা কাঁটাতারের বেড়া আলাদা করেছে।
সেদিন তোমাকে দেখে খুব উদাসী মনে হয়েছিল মনে হয়েছিল তোমার ভেতরে অনেক ঝড় বয়ে গেছে
তুমি বোধহয় অনেক কিছুই বলতে চাও অথচ তুমি মনের ভেতরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছ
আমি একবার দূর থেকে দেখে তোমাকে ভাবলাম কিছু বলি তারপর হঠাৎই দেখি কোন এক নারী এসে হাত ধরল
বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো
হ্যাঁ সেই হাতটা যে হাত আর একটি হাতের উপর রেখে শপথ করেছিল স্বপ্ন দেখেছিল।
আমি একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেললাম
তারপর নিজের মনেই হাসতে লাগলাম যা কিছু একদিন আমার ছিল একদিন সেটা অন্যের হবে এটাই নিয়ম
প্রকৃতির নিয়মের কোন রদবদল নেই।
শুধু আমরাই কেমন যেন গিরগিটির মতো রং বদলে সবকিছুকে পাল্টে দিই
প্রকৃতির সবুজ রং টাকে কখন যেন আমরা দূষণে দূষণে কলুষিত করি
তবুও প্রকৃতি তার সবুজ হাতছানি দিয়ে স্বপ্ন দেখায়  সোনালী ভবিষ্যতের।

 

 

শিবনাথ নাথ -এর একটি কবিতা

প্রেম ও গন্তব্য 

প্রেম থেমে যায় না
স্রোত বয়ে যায় ভিতরে
মাঝে মাঝে জেগে ওঠে রাত্রির গভীরে
নিস্তব্ধতায় শোনা যায় ধ্বনি।

তুমি পাশে থাকো–
বাতাসে ভেসে আসে গান
অচেনা গলিতে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ
মনে হয় হাত ছুঁয়ে দিলে তুমি।

জানো, প্রেম একবার জন্ম নিলে
তার মৃত্যু হয় না কোনোদিন
শুধু রূপ বদলায়,
কখনও অশ্রু, কখনও হাসি,
কখনও মেঘের মত ভাসে…

 

 

প্রবাল মিত্র -এর একটি কবিতা

শুনছ?

পেট ফেটে যাচ্ছে
শব্দ নেই

ইট কাঁদছে
ধুলো গিলছে রোদ

মানে দাঁত
মানে ছুরি

একটা কবর
তার ভেতরে গন্ধ
গন্ধের ভেতরে আগুন

প্রেম নেই
শুধু নখ
শুধু চামড়া ছিঁড়ে যাওয়া অন্ধকার

মানে গালি
মানে রক্ত
মানে ভাঙা দরজার আর্তনাদ

আমরা লিখি
ছিঁড়ে ফেলি
আমরা জন্ম দিই…

দিই আমাদের…

 

আরণ্যক রায় -এর একটি কবিতা

পারাপার

অন্ধকার গায়ে মেখে আলো খুঁজি নিজেদের
ভোরের শিশিরে ভিজে যায় পায়ের ধুলো
কানে বাজে অদ্ভুত এক ডাক
যেন দূর গগনের প্রাচীনতম শঙ্খধ্বনি

দুঃখের ঘরে জন্মায় অচেনা গান
কান্নার ভিতরই লুকিয়ে থাকে সুর
আর ভাঙা স্বপ্নের দেওয়ালে
চুপিসারে আঁকতে থাকে প্রাচীন রোদ্দুর

ঝড় এলে ভেঙে পড়ে পুরোনো ডালপালা
কিন্তু শিকড় শক্ত মাটির ভেতরে
তাই আবার সবুজ হয় গভীর খাদ
আবার জন্ম নেয় প্রতিচ্ছবির সন্তান

জানি, হাসি-অশ্রু, হারানো-খোঁজা
সবই মিলেমিশে বানায় এক অন্তহীন নদী
ভেসে যায় শরীর, গুপ্তাঙ্গের রস,
গড়িয়ে যায় জীবনের দিকে…

 

সমরেন্দ্র দাস -এর একটি কবিতা

এসো, সৃষ্টি করি 

কুকুর ঘেউ ঘেউ করে রাস্তায়
ভাঙা নর্দমায় রোদ থেঁতলে গেছে
খিদের শব্দ লাথি মারছে বুকের ভেতরের অন্ধকারে।

লোহার সেতু দাঁত কেলিয়ে হাসল
পাথরের দেওয়াল গিলে খেল আমাকে
তোমার ঘাস শুকিয়ে গেছে
ভিজে আছে খালি চোখের দৃষ্টি।

মরচে ধরা তালা, চাবি নেই!
শুধু কাঁটার আঁচড়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে ঘাসের শিকড়ে থেকে?

বুক কেটে রেখা টেনে দিয়েছে যে
তাতে জন্ম নেবে ইঁদুরের ঘর, শব্দ নেই
শুধু শ্বাসরুদ্ধ অন্ধকার।

এসো এখন সৃষ্টি করি…

 

 

🍂ধারাবাহিক রস্য উপন্যা

সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

 

কিশাণগঞ্জের ফেলুদা


তাপস রায়

১৭.

মালবাবুর মাথা কাজ করছে না। কিশানগঞ্জে এতদিন আছেন, তাকে কেউ চক্কোত্তিবাবু বলে ডাকে না। সবাই মালবাবু বলেই চেনে। অফিসের খাতায় শুধু শিবপ্রসাদ চক্রবর্তী। আর কি সব কথা বলছে ফোনের লোকটা! মালবাবু কথা হারিয়ে ফেলেছেন। কোনওক্রমে বললেন, ‘আমাকে কী করতে হবে?’
ফোনের কণ্ঠ বলল, ‘তেমন কিছু নয়, পঞ্চাশ লাখ নিয়ে আপনি কাল সকাল এগারোটার মধ্যেই চলে আসার চেষ্টা করবেন কালিম্পং-এ। আপনাকে আমরা ফোনে নির্দেশ দেব। পুলিশকে জানালে আপনার বিপদ। ছেলে জেলে থাকবে।’
এক্সচেঞ্জে টিডিএম-এর নির্দেশে দুপুরের শিফটের জুনিয়র টেলিকম অফিসার প্রিয়রঞ্জন পুরো ভয়েসটাই রেকর্ড করেছে।
বোঁদে সেদিন চানুমতির কান্নাকাটির কথা বলার পর থেকে ফেলুদার কী যেন একটা খটকা লাগছিল। তার মনে হচ্ছিল, ইচ্ছে করে মালবাবু কোনও কান্ড ঘটাচ্ছে না তো! ব্যবসায়ী মানুষ মালবাবু। চাঁদ মিঞার সঙ্গে কোনও রফা করেনি তো! মনে হয়েছিল ফেলুদার। টেলিফোনের টিডিএমকে বলে মালবাবুর নম্বরে নজর রাখছিলেন। মালবাবু লোকটা কেমন যেন ঘোরেল মনে হচ্ছিল। কুকুর হারানোর পর, লাল খেরোখাতা হারানো, ফেলুদার নিজের পঞ্চায়েতের টিকিট উপরের অন্ধকার ছায়া ফেলে দিয়েছে। তাকে হঠাতে পারছেন না ফেলুদা। ওই ধরমশালার চাঁদ ভাইয়ের কোনও হাত নেই তো! ও উসমানি সাহাবের কাছ থেকে এবার পঞ্চায়েতের টিকিট চায়। উসমানি সাহেব ইতিমধ্যে সেকথা একবার শুনিয়েছে।

চানুমতি হাউমাউ করে কাঁদছে। বছরের পর বছর ধরে জমানো কান্নার নদী আজ প্লাবন জেনেছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে দেবদুতের মতো আদিত্য বিশ্বাস। কত বছর হল, এখনও তেমনি আছে। সেরকম দেবতাদের মতো দেখতে। প্রশস্ত কপাল, উঁচু নাক, ভাসা ভাসা স্বপ্ন লাগা চোখ। হ্যাঁ ভালো লাগত, এখনও লাগে। চানুমতি ঘরের ভেতর আদিত্যকে ডেকে এনে অবাক হতেও ভুলে যাচ্ছে। আজই কী করে চলে এল তার প্রাণের দেবতা।

কিন্তু একটা টিকিট নিয়ে মারামারি কেন! আরও তো আছে। সেখানে যাও। ঐ লোকটা তার দুর্নাম করতে চাইছে না তো! লোকটা ওয়াগন ক্লিয়ারেন্সের কাজ করে। অনেক ট্রাক হাতে। তাছাড়া কিশানগঞ্জের লরি অ্যাণ্ড ট্রাক ইউনিয়নের সেক্রেটারি। মালবাবুর সঙ্গে তার নিত্য ভাড়ার গাড়ির ব্যবসা। রেল ওয়াগন থেকে মাল পাঠানোর জন্য এইসব গাড়ি-ঘোড়ার দরকার হয়। চাঁদ মিঞা মালবাবুর সঙ্গে ষড় করে ফেলুদাকে হেকল করতে পারে। মানে নাম খারাপ করে পঞ্চায়েতের টিকিট নিজের নামে করিয়ে নিতে পারে। তা না হলে এতদিনেও কুকুরের কেসটা সলভ করতে পারছে্ন না কেন! তারপর কেস একটা না দু’টো। মালবাবুরই দু’টো কেস। কেমন যেন রহস্য বাড়িয়েই চলেছে। আর ফেলুদা লক্ষ্য করেছেন, মালবাবুর চোখে-মুখে তেমন তো কোনও উদ্‌বেগ দেখা যাচ্ছে না আজকাল। গঙ্গারামের দেখা নেই, মানে নেই-ই। তারপর ‘তিন তিনে চাপা চু’ লেখাটা কেন পাহাড়ের গায়ে, আবার মালবাবুর ছেলের হাতে ট্যাটু হয়ে ওঠে! ট্যাটুকরের দোকানে গিয়ে দেখা গেছে ওই লেখাটি অন্য কেউই লেখেনি। তাহলে!
জট পাকিয়ে গিয়েছে। হয় তুক নয় তাক— একটা ভাবনা থেকেই এই মালবাবুর ফোন ট্রাপ আর এই একটু সাফল্য যেন উঁকি মারছে।

***

ফেলুদা বোঁদেকে পাচ্ছে না। তাহলে কীভাবে এখন পিছু নেবে মালবাবুর! ভাবতে ভাবতে উপায় নিজে এসে ধরা দিতেই ফেলুদার মনে হল, এবার সমস্যার একটা হিল্লে হতে যাচ্ছে। মালবাবু নিজেই ফোন করেছেন। বলেছেন ছেলেকে দেখতে কালিম্পং যাবেন। ফেলুদা যদি যায়, ভরসা হয়। বাঃ বাঃ বেশ বেশ। এর আগের সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে
সমাধান এমনি করেই ফেলুদার সামনে আপনা আপনি হাজির হয়েছে। এই যে মালবাবুর ছেলের কাছে এক্ষুনি যাওয়াটা জরুরি, কিন্তু যাওয়া তো ঝট করে যায় না। কী অজুহাত নিয়ে সেখানে উপস্থিত হবেন!
পড়ে পাওয়া সুযোগ এসেছে এখন। মানে সুযোগ আপনা আপনি ধরা দিয়েছে। মালবাবুকে বললে হয়ত তিনি নানা ভাবনা চিন্তায় পড়তেন। একে ওকে জানাতেন। তাতে ছেলেটার ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এখন মালবাবু নিজেই প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছেন। ফেলুদা চাইছেন কালকেই যেতে। অপরাধী সময় পেলে নতুন নতুন সমস্যা বাধিয়ে ফেলতে আরে। মালবাবুর প্রস্তাব আসায় সঙ্গে সঙ্গে তাতে মত দিলেন না ফেলুদা। বোঁদে চানুমতির কান্নাকাটির বর্ণনা দেবার পর মালবাবুর দিক থেকে ফেলুদার মন উঠে গিয়েছে। ফেলুদা একটু খেলিয়ে নিতে চাইল। মুখে বলল, ‘এখন তো আমি খুব ব্যস্ত আছি, সন্ধ্যা নাগাদ বলতে পারব।’
হ্যাঁ হ্যাঁ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হওয়ার প্রশ্নই নেই। মালবাবু তেমন সুবিধের লোক না-ও হতে পারে। তাছাড়া সন্ধ্যার ভেতর ক’য়েকটি জরুরি কাজ সেরে নিতে হবে। উসমানি সাহেবের সাহায্য দরকার। মালবাবু খুব বড় বিপদের মধ্যে
পড়েছেন ঠিকই। ছেলেটাকেও তো বাঁচাতে হবে। উসমানি সাহেব যেন উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন মন্ত্রীকে দিয়ে কালিম্পং-এর পুলিশ প্রধানকে বলে রাখেন। বলে রাখেন যেন ঠিক সময় সাহায্য পাওয়া যায়। আর বনবিহারীকে হাতেনাতে ধরতে ফেলুদা ঠিক করলেন, মালবাবুকে দিয়ে বাড়িতে চানুমতিকে বলে রাখবেন সপ্তাহখানেক বাড়ি থাকবেন না। ফেলুদার ভাবনা যদি ঠিক হয়, তবে ওই সময়েই বনবিহারী ওই লোকটার কথা অনুযায়ী কালিম্পং-এ মালবাবুর স্ত্রীকে নিয়ে যাবে। কিন্তু এদিককার খবরাখবর কে তাকে দেবে! ভাবতে ভাবতে পেয়ে গেলেন ফেলুদা। রেল কোয়ার্টারের প্রায় সব বাড়িতেই টয়লেট বাথরুম পরিষ্কার করার দায় নিয়ে যে অবাধে ঘুরে বেড়ায় সেই গন্নাকাটা বাইকে কাজে লাগানো যেতে পারে। সেই নজর রাখবে চানুমতির ওপর।

***

চানুমতি হাউমাউ করে কাঁদছে। বছরের পর বছর ধরে জমানো কান্নার নদী আজ প্লাবন জেনেছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে দেবদুতের মতো আদিত্য বিশ্বাস। কত বছর হল, এখনও তেমনি আছে। সেরকম দেবতাদের মতো দেখতে। প্রশস্ত কপাল, উঁচু নাক, ভাসা ভাসা স্বপ্ন লাগা চোখ। হ্যাঁ ভালো লাগত, এখনও লাগে। চানুমতি ঘরের ভেতর আদিত্যকে ডেকে এনে অবাক হতেও ভুলে যাচ্ছে। আজই কী করে চলে এল তার প্রাণের দেবতা। আজ সকালের ট্রেনে মালবাবু জলপাইগুড়ি গিয়েছে। জানল কী করে!
কিন্তু এইসব ভাবনা ছাপিয়ে চানুমতির বেদনা আর আনন্দ মিশ্রিত কান্না বৃষ্টির মতো ঝরছে। ডাক্তার আদিত্য বিশ্বাস সেদিনের ফোন পেয়ে বিচলিত হয়েছে ঢের। অনেকদিন ধরেই ভেবেছে চানুমতিকে দেখতে যাবে। লুকিয়ে-চুরিয়ে হলেও একবার চোখের দেখা দেখবে। তাইত মালবাবুর অফিসে যাবার টাইম হয়ে যাবার পর এসেছে। একই রেলকোয়াটারের প্রেমিসেস-এর ভেতর তার বাবা থাকেন। বাবা এখনও রিটায়ার করেননি। না হলে বাবা-মাকে নিয়ে শিলিগুড়ি চলে যেত আদিত্য বিশ্বাস। সেদিনের চানুমতির টেলিফোন পাবার পর মন তার খুব উতলা হয়েছে, বড়দিনের ছুটির কয়েকদিন আগেই চলে এসেছে।
চানুমতি ডাক্তারকে ঘরের ভেতর এনে দোর দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে অনর্গল কান্নার ভেতর বলল, ‘ডাক্তার আমি কেমন করে বেঁচে আছি দেখো।’
একটু দূরত্বে থেকেই ওই স্বর্ণ প্রতিমা তার দু’টি হাত বের করে দিয়েছে শাড়ির আড়াল থেকে। হাতের পাতা থেকে কবজি পর্যন্ত দু’ই হাতের সাদা চামড়ায় দীর্ঘ নীল আর অল্প লাল দাগ।
‘দেখো ডাক্তার আমার পিঠ দেখো, গলা দেখো, দেখো দেখো আমার সর্বাঙ্গ দেখো। মানুষ এভাবে বেঁচে থাকতে পারে কিনা দেখো। তুমি এখান থেকে চলে যাবার পর থেকে, প্রতিদিন আমাকে এরকম থাকতে হয়। কিছুতেই ঘা শুকোয় না। পরের দিনের আঘাতে তা আবার দগদগে হয়ে ওঠে।’
চানুমতি শরীর থেকে সব আচ্ছাদন খুলে দিয়েছে। আদিত্যর চোখের উপর একটি পরীর ক্ষত বিক্ষত শরীর আর চোখ থেকে ঝরছে হিরের কণা। স্তনের লাল চূড়োর অনেক অংশই নীল। দুই উন্নত বুকের মাঝখানে অনেক রক্তাক্ত আঁচড়। আদিত্য ডাক্তারি চোখে বুঝতে পারলেন, দুই হাতের পাঁচ পাঁচ দশ নখে বুক চিরে ফেলার আয়োজন।
সাধারণ মানুষ হলে সহ্য করতে পারত না চানুমতির পশ্চাৎদেশের ক্ষত-বিক্ষত চেহারা দেখে। কিন্তু ডাক্তারদের অনেক বীভৎস জিনিষ দেখতে হয়। চিকিৎসা করতে হয়। তাদের হৃদয় দুর্বল হলে চলে না। এই সোনার শরীর এভাবে কেউ ক্ষত-বিক্ষত করে দিতে পারে, ভাবা যায় না। আর চানুমতির জন্য তাঁর দুর্বলতা তো রয়েছেই। তাঁর মুখ থেকে কথা সড়ছে না। আদিত্য বুদ্ধি করে নিজের ব্রিফকেসটা সঙ্গে এনেছিলেন। যার ভেতর টুকিটাকি ওষুধপত্র আর স্টেথোস্কোপ থাকে। তিনি বাক্স খুলে পেলেন মাইকোনাজোল নাইট্রেট কম্পোজিশন এর একটা স্কিন ক্রিম আর ওয়াইসোলোন ট্যাবলেট। এই ট্যাবলেটে একটু স্টেরয়েড আছে বটে, তবে ঘা দ্রুত শুকোবে। টেবিল থেকে জলের গ্লাস নিয়ে নিজের হাতে ট্যাবলেট খাওয়ায়। তারপর ওই নগ্ন দেবী মূর্তিকে উপুড় করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে স্কিন ক্রিম খুব যত্নে পেছনের সব কাঁটা জায়গায় লাগিয়ে দিতে দিতে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। দু’চোখ ফেটে ক’য়েক ফোঁটা জল চানুমতির পিঠের উপর আছড়ে পড়ে। চানুমতি উপুড় হয়ে তার প্রাণের আরাধ্যের স্পর্শ নিতে নিতে গলে যাচ্ছিল। এসময় ওই গরম জলের ফোঁটায় কেঁপে উঠল। ওই গরম জলের ফোঁটার স্পর্শ অভিজ্ঞতা তো তার আছেই। রোজই নিজের বুক ফাটা আর্তনাদ ওরকম ফোঁটা হয়ে নিজের হাতে বা পায়ে পড়ে। চানুমতি তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে ঘুরে বসে দেখল ডাক্তার কাঁদছে। তার ডাক্তার কাঁদছে।🍁 (চলবে)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : মহামিলনের কথা বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন