নবারুণ দাস ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : তিনি ছিলেন বিস্ময়। একদম নিজের নিয়মে চলতেন। তারকাখ্যাতি বা জনপ্রিয়তা তাঁকে কখনও জনতার হাতের মুঠোয় আনতে পারেনি। সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)। বাংলা এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের মহানায়িকা, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন ভীষণ প্রাইভেট। কোনও অনুষ্ঠান, কোনও উদ্বোধন, কোনও পুরস্কার বিতরণ মঞ্চ সবকিছুর থেকে সুচিত্রা শতহস্ত দূরে থাকতেন। তাঁর দর্শন মিলত শুধুই রূপালি পর্দায়। বাস্তব জীবনে সুচিত্রা সেনকে পাওয়া ছিল প্রায় অলৌকিক মুহূর্তের মতন।

একবার তাঁরই সৃষ্ট অলঙ্ঘনীয় নিয়ম নিজেই ভেঙেছিলেন মহানায়িকা। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়-এর অনুরোধেই করেছিলেন এমন কাজ, যা জীবনে আগে কোনওদিনও করেননি ও পরে আর কোনওদিন করেননি। সময়টা তখন পঞ্চাশের দশকের শেষ কিংবা ষাটের দশকের গোড়ার দিক। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় (Dr. Bidhan Chandra Roy) দক্ষিণ কলকাতায় একটি টিবি ক্লিনিক গড়ার উদ্যোগ নেন। সেই হাসপাতালের উদ্বোধন হোক অভিনেত্রীর হাত ধরে, এই প্রস্তাব আসে তাঁর কিছু সহচরের পক্ষ থেকে। মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করতে উদ্যোগী হলেন ইভেন্ট ম্যানেজার বারীন ধর (Barin Dhar)। তিনি পরে সুচিত্রা সেনের ছোট বোন রুনা সেনকে বিয়ে করেন। তিনিই তখন সাহস করে সুচিত্রার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বারীন জানতেন, এমন অনুরোধ নাকচ করাই সুচিত্রার স্বভাব। তাই আগেই বলে দিয়েছিলেন, “সুচিত্রা এসব উদ্বোধনে যান না, মুখ্যমন্ত্রী হলেও না।”

কিন্তু বিধান রায়ের নাম শুনেই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। বারীনের মুখ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সুচিত্রা সেন বলেন, “ঠিক সময়টা জানিয়ে দাও। আমি চলে যাব।” এই এক কথাতেই বোঝা যায়, তিনি কাদের সম্মান করতেন, আর কীভাবে হৃদয়ে ধারণ করতেন কিছু ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বকে।
সুচিত্রা সেন। ছবি : সংগৃহীতপরের কথায় বারীন যখন পারিশ্রমিক প্রসঙ্গে কথা তুললেন, সুচিত্রা হেসে বলেন, “সে বিষয়টা অনুষ্ঠানের পরেই দেখা যাবে!” এরকম সৌজন্যমূলক সরল্য ও স্নিগ্ধতা তাঁরই ছিল একধরনের স্বাক্ষর। উদ্বোধনের দিন, সুচিত্রা সেন একদম ঠিক সময়ে পৌঁছান ক্লিনিকে। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান রায় নিজে পাশে থেকে ফিতে কাটান মহানায়িকার হাত দিয়ে। সেদিন ক্লিনিক চত্বরে বহু অনুরাগী মহানায়িকাকে এক ঝলক দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর এই ‘রিয়েল লাইফ অ্যাপিয়ারেন্স’ ছিল আপামর জনতার কাছে ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু, যা সবচেয়ে চমকপ্রদ, তা হল সুচিত্রা সেন সেদিন একটি প্রতীকী সম্মানী হিসাবে ১০০১ টাকা গ্রহণ করেন। কিন্তু সে টাকাও নিজের কাছে রাখেননি। ক্লিনিকের উন্নয়নের জন্য তা নিজের হাতে দান করে দেন। এই নিঃস্বার্থ মনোভাব ও দায়িত্ববোধেই ফুটে উঠেছিল তাঁর আসল ব্যক্তিত্ব।

সুচিত্রা সেনকে এরপর আর কখনও কোনও সরকারি বা বেসরকারি অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। সেই একবারই, বিধান রায়ের (Bidhan Roy) অনুরোধেই তিনি নিজেকে ভেঙেছিলেন। হয়ত মানুষের সেবা ও মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা, এই দুইয়ের সেতুতেই হয়েছিল এক মহান সিদ্ধান্ত।

সুচিত্রা সেন ছিলেন নিঃসন্দেহে একজন মহা তারকা। কিন্তু সেই তারকার মানবিক রূপটিও যে কতখানি উজ্জ্বল হতে পারে, তা প্রমাণ করেছিলেন সেদিন। শুধু অভিনয়ের পর্দায় নয়, বাস্তবের মঞ্চেও তিনি একজন অনন্যা। এখনও এই গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে বিস্ময়। অনুপ্রেরণা। মহানায়িকা। তিনি নিজের নির্জনতা ভালবেসেছিলেন, সেই তিনি মানুষের সেবার জন্য, মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে, উপস্থিত হয়েছিলেন সেই উদ্বোধনে। নিয়েছিলেন প্রতীকী পারিশ্রমিক, আর তা-ও দান করেছিলেন ক্লিনিকের ভবিষ্যতের জন্য। এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে, একজন ‘স্টার’ শুধু রুপোলি পর্দাতেই নয়, প্রকৃত মানুষ হিসেবেও হয়ে উঠতে পারেন চিরস্মরণীয়।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suchitra Sen : মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের জীবনের মোড় ঘোরানো গল্প : একটি ইতিহাস




