সৌমি নন্দ ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : ঋতুস্রাব একটি প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হলেও, এর সঙ্গে জড়িত শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক অস্বস্তি অনেক নারীর জীবনে বারবার সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় অনেকেই জিমে যাওয়া বন্ধ করে দেন, কারণ তাঁদের ধারণা, শরীরচর্চা করলে যন্ত্রণার মাত্রা বেড়ে যায়। তবে, এই বিশ্বাস যে সর্বদা ঠিক নয়, তা মনে করিয়ে দিচ্ছেন ফিটনেস প্রশিক্ষক রাজা চৌধুরী (Raja Chowdhury)। রাজা বলছেন, ‘ঋতুস্রাবের সময়ে হালকা ব্যায়াম করলে যন্ত্রণা বাড়ে না, বরং অনেকাংশে কমে। শরীরে এন্ডরফিন (Endorphin) নিঃসরণ হয়, যা পিরিয়ড চলাকালীন ক্লান্তি, মেজাজের ওঠানামা ও পেট ব্যথা কমাতে দারুণ সাহায্য করে।’ তাঁর মতে, একেবারে বিশ্রাম না নিয়ে বরং উপযুক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারে আরাম।

কোন ব্যায়ামে মিলবে স্বস্তি?
ঋতুস্রাবের সময় শরীরে হরমোনের ভারসাম্য অনেক সময়েই বিঘ্নিত হয়। এই সময় মন খারাপ, ক্লান্তি ও তলপেটে টানধরা যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করতে হালকা ব্যায়াম কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। হাঁটাচলা, হালকা স্ট্রেচিং, বা মৃদু কার্ডিয়ো করলে শরীর সক্রিয় থাকে, কিন্তু বাড়তি চাপে পড়ে না। কিন্তু, সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে যোগব্যায়াম। রাজা চৌধুরীর মতে, ‘বদ্ধ কোণাসন (Baddha Konasana), সুপ্ত বদ্ধ কোণাসন (Supta Baddha Konasana), ধনুরাসন (Dhanurasana) এবং বালাসন (Balasana)-এর মতো যোগাসন ঋতুস্রাবকালীন পেটের যন্ত্রণা ও পিঠের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। মস্তিষ্কে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়ায় ও একপ্রকার মানসিক স্বস্তি দেয়।’ এই আসনগুলি শরীরকে আরাম দেয়, বিশেষ করে তলপেটের পেশি ও তলস্থলীতে রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়। ফলে ব্যথার তীব্রতা কমে।
কোন ব্যায়াম এড়িয়ে চলা উচিত?
যদিও শরীরচর্চা উপকারী, তবে সব ধরনের ব্যায়াম ঋতুস্রাবের সময় শরীরের পক্ষে সহনীয় নয়। বিশেষ করে যাঁরা ইতিমধ্যে পিরিয়ডের সময় দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত ব্যথার সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ভারী ব্যায়াম বিপজ্জনক হতে পারে। রাজা স্পষ্ট করেই বলছেন, ‘এই সময় হাই ইনটেনসিটি ইন্টারভ্যাল ট্রেনিং (High-Intensity Interval Training), হাই-ইমপ্যাক্ট কার্ডিয়ো (High-Impact Cardio), ভারী ওজন নিয়ে ব্যায়াম কিংবা কষ্টসাধ্য যোগাসন না করাই ভাল। শরীরে রক্তপাতের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, ক্লান্তি অনুভব হতে পারে, এমনকী মাথা ঘোরাও শুরু হতে পারে।’
তাই শরীরের ইঙ্গিত বোঝা সবচেয়ে জরুরি। শরীর যদি বিশ্রাম চায়, তা হলে বাধ্য হয়ে ব্যায়াম করা উচিত নয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, মৃদু হাঁটাহাঁটি বা এক্সারসাইজ করলে মন ভালো থাকে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে উৎসাহও আসে।মানসিক স্বস্তিও মিলবে ব্যায়ামে এই সময়ে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিকেও প্রভাব পড়ে। হরমোনের ওঠানামায় মেজাজ পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। অনেকেই হতাশা, উদ্বেগ কিংবা চরম মনখারাপের মধ্যে দিয়ে যান। এমন অবস্থায় ব্যায়াম মানসিক স্বস্তিও এনে দেয়। রাজা বলছেন, ‘ব্যায়াম করলে শরীরে যে এন্ডরফিন (Endorphin) নামে ‘হ্যাপি হরমোন’ নিঃসৃত হয়, তা ব্যথা কমায়, মেজাজ ঠিক রাখে এবং সার্বিকভাবে একজন নারীর শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
কখন ব্যায়াম বন্ধ করবেন?
যদি কারও অত্যধিক রক্তস্রাব হয়, যদি ব্যথা সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়, অথবা যদি মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা অতিরিক্ত মাত্রায় হয়, তাহলে অবিলম্বে শরীরচর্চা বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রত্যেকের শরীরের গঠন ও প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। একেক জনের ক্ষেত্রে ব্যায়াম উপকারী হলেও, অন্যজনের ক্ষেত্রে সেটি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
ঋতুস্রাব নারীর জীবনের স্বাভাবিক একটি চক্র। এটি কোনও রোগ নয়। কিন্তু সঠিক রুটিন ও শরীরচর্চার মাধ্যমে এই সময়টাকে অনেক সহজ ও স্বস্তির করে তোলা সম্ভব। তবে শরীরের সংকেত শুনে তবেই ব্যায়াম করতে হবে। হালকা যোগব্যায়াম বা হাঁটাচলা যেমন সাহায্য করে, তেমনই ভারী ও ক্লান্তিকর ব্যায়াম থেকে দূরে থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখা দরকার, ব্যায়াম কোনও প্রতিযোগিতা নয়, বরং নিজের শরীর ও মনের প্রতি যত্ন নেওয়ার একটি উপায়।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : MENSTRUAL PAIN : ঋতুস্রাবের ব্যথা হলে কী করবেন?




